মওতের মোরাকাবা
মওতের মোরাকাবা
কেউ খারাপ কিছু চিন্তা করল, খারাপ কাজের চিন্তা করল, কিন্তু কাজ করল না, তো শুধু চিন্তার কারণে ইনশাআল্লাহ তার উপর কোন গুনাহ লিখা হবে না। করলে গুনাহ লিখা হবে। কিন্তু কেউ ভাল চিন্তা করল, ওর চিন্তাতেই একটা নেকি লিখা হবে। আর যদি করে, আরো বেশি লিখা হবে। আর না করলো, তো যে চিন্তা করেছে আর সওয়াব লিখে দেওয়া হয়েছে, ঐটা মুছা হবে না।
মওতকে ইয়াদ করলে শহীদের সওয়াব পাওয়া যায়। মওতকে ইয়াদ করার মানে কি ‘অমুকে মরবে’- এটা আমি স্মরণ করলে শহীদের সওয়াব পাবো? বরং ‘আমিই মরব’- তবেই শহীদের সওয়াব পাওয়া যাবে। এটা স্মরণ করা খুব সহজ নয়। অনেকদিন আগের কথা, সম্ভবত ছাত্রজামানার কথা। আমার রুমমেট ছিল পরবর্তীতে নামকরা সাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তো ওর একটা কথা আমার খুব মনে আছে। বলছিল যে ‘মানুষ মরনশীল- এই কথা বিশ্বাস করি। আমি মরণশীল- এই ব্যাপারে আমার সন্দেহ’। অর্থাৎ, আমি যে মরবো, এই কথা মন মানতে চায় না। পাবলিক মরবে, এই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই! এখন যারা আছে তারা একশ বছর পরে কিংবা দেড়শ বছর পরে কেউ বেঁচে থাকবে না। কিন্তু আমিই বোধ হয় একমাত্র এক্সেপশন (ব্যতিক্রম)। না, সেটা অবশ্যভাবে না, কিন্তু মরবো যে এই কথা মনেও আনতে চায় না কিংবা আনাও মুশকিল। এই কথা অস্বীকার করবে না, কিন্তু তার চিন্তা, প্লান, প্রোগ্রামে এগুলোর মধ্যে ‘আমি যে মরবো’- এই কথার কোন স্থান নাই।
#ঢাকার বড় বড় বাড়ি- মানে ব্যয়বহুল বাড়িগুলোতে ছোটখাটো অনেক সূযোগ সুবিধা আছে। কিন্তু লাশ বের করার বন্দোবস্ত নাই। লিফট আছে, কিন্তু লিফটের ভিতর লাশ বহনকারী যে খাট, ঐটার জায়গা হবে না। সিঁড়ি আছে, কিন্তু সিঁড়ির প্যাচের কারণে ঐ খাট নিয়ে নামা যায় না। দু-তিন বছর আগে আমার ভাবী ইন্তেকাল করলেন, তখন এই সমস্যা দেখা দিল। আমি ঠিক ঐ সময় ছিলাম না, জানি না কিভাবে নামিয়েছে, কিন্তু বিরাট ঝুঁকি। তো লাশ বের করার কোন ব্যবস্থা নাই, কারণ চিন্তা, প্লান, প্রোগ্রামের মধ্যে ঐটার কোন জায়গা নাই। সব জীবনেই আছে।
দ্বীলের ভিতর যদি মউতের চিন্তা চলে আসে, হাজারো কথা নিষ্প্রয়োজন হয়ে যাবে। ওয়াজ নসীহত, হাদীস, তাফসিরের বড় অংশ নিষ্প্রয়োজন হয়ে যাবে। সব না, কিন্তু বড় একটা অংশ নিষ্প্রয়োজন হয়ে যাবে। গতকালকে যে বড় অহংকারী ছিল, আর আজকে সকালে তার রিপোর্ট এসেছে যে ক্যান্সার কনফার্ম। গতকালকে দুপুরের আচরণ, তার অহংকার আর তার দাপটে যেন বিল্ডিং কাঁপে! কিন্তু পরমুহুর্তেই ওর আচরণ একদম ভিন্ন। ওর মুখে যদি কেউ থুথুও দেয়, ও কিছুই বলবে না। কেউ যদি বলে- ‘তোমার মুখে থুথু দিল’। সে বলবে, ‘হ্যা দিতেই পারে, এটা এমন কিছু না’। আর (কিন্তু) আগে যদি হত! তো ঐ একটা কথা যে মউতকে সামনে দেখছে, (যেহেতু) ক্যান্সার কনফার্ম। আর ক্যান্সার মানে কি- ও সেটা ভালমতই জানে।
আল্লাহ তা’আলা মানুষের জন্য দুই নসীহতকারী রেখেছেন। এক নসীহতকারী নাতেক। যে ভাষায়, কথায় নসীহত করে। উপমা কুরআন শরীফ। আরেক নসীহতকারী সামিত। যে নিশ্চুপ নসীহত করে। ঐটা হচ্ছে মউত।
পরবর্তীকালে দ্বীনী মেহনতের - সব তরীকার মধ্যে না, অনেক তরীকার মধ্যে শাইখদের যে মেহনত আছে, এর মধ্যে ‘মউতের মোরাকাবা’ নামে একটা আমল আছে। অনেকেই করতেন। মউতের মোরাকাবা মানে নিজের মৃত্যুকে কল্পনা করা, চিন্তা করা। এটা এজন্য যে, যতবেশী আমি মউতকে বাস্তবেই স্মরণ করতে পারবো, ঐটার প্রভাব আমার আচরণের মধ্যে পড়বে। অহংকার এমনিই কেটে যাবে, বিনয়ী হয়ে যাবে, চুরি-চামারি বন্ধ হয়ে যাবে। (তখন মনে হবে) কার জন্য চুরি করবো, মরতেই যখন যাচ্ছি! তো, যে ভাল দামি জামার জন্য চুরি করে, সেও তখন দামী কাফনের জন্য চুরি করতে রাজি হবে না। (এমন না যে) চুরি যদি না করি, তাহলে নিম্নমানের কাপড় দিয়ে কাফন দিবে, সেহেতু আগে থেকেই কিছু পকেট মেরে যাই আর ছেলেকে বলে যাব যে, এখানে টাকা আছে, সিল্কের কাফন দিও। এমন করবে নাকি কেউ? কখনো করবে না। বরং সারাজীবন যে চুরি করেছে, সেও মরবার সময় বলবে যে, সামর্থে যদি না হয়, তবে পাশের বাড়ি থেকে ভিক্ষা করে হালাল টাকা দিয়ে হলেও আমার কাফন দিও। তো আচরণ বদলে যাবে। মউতের চিন্তা তাকে শুদ্ধ করে দিবে।
সেজন্য আমরা চেষ্টা করি শুধু নেক আমল নয়, বরং আমার ধারণাকে আরও উন্নত করা, যেন আমি একেবারেই কিছুই না, (ধরা যাক) ঘরে নিরাপদ জায়গায় বসে আছি, ঐ জায়গায়ও বসে বসে মউতের মোরাকাবা করা তো বড় বড় ওলিআল্লাহ ছাড়া মুশকিল। করতে পারিনা। একেবারে হোস্টেলে মধ্যে বসে আছি আর আমি ভাবছি আমি মরে গেছি, কেমন করে পারবো? আমি মউতের মোরাকাবার মধ্যে আছি, আর পাশে ওরা কেক খাচ্ছে। আমি মনে মনে ভাবছি, ‘আমার জন্য রাখছে কিনা’। তো মউতের মোরাকাবা করছি ঠিকই, কিন্তু কেক যে কেউ খাচ্ছে, সেটাও টের পাচ্ছি আর মনে মনে ভাবছি, কেউ বুঝি আমারটা শেয়ার করেই ফেলল! একেবারেই সুস্থ ব্যক্তি, তার জন্য চিন্তা করা কঠিন যে আমি কালকে মরে যাবো। কিন্তু শরীরে যদি একটু হালকা জ্বর থাকে, তাহলে কিন্তু সেই চিন্তা আসবে। যুদ্ধের ময়দানেও শরীরের এই অবস্থা হতে পারে। আর সাহাবারা ওরকমই ছিলেন।
প্রায় ত্রিশ হাজার সাহাবী ওখানে শহীদ হলেন। মু’আয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহ আনহু ওখানে শহীদ হয়েছেন। প্লেগ প্রথমে ফোঁড়ার আকারে আরম্ভ, তারপর ঐটাই দুই-চারদিন বেড়ে মারা যাওয়ার কারণ হয়। মু’আয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহ আনহুর সম্ভবত হাতে ফোঁড়া জাতীয় কিছু একটা হয়েছে। দেখছেন আর তাকাচ্ছেন যে প্লেগ হয়েছে কিনা। কাছেই একজন ছিল। সে সম্ভবত উনাকে স্বান্তনা দেওয়ার জন্য বলল, ‘না, না, এটা কিছু নয়’। কারণ যেহেতু প্লেগ চলছে আর ফোঁড়া বেড়ে গেছে, সেহেতু ফোঁড়া হওয়া মানেই জান চলে যাওয়া। আর এক ধরনের ভয়ও থাকে। কিছুদিন আগে কি যেন একটা সোয়াইন ফ্লু নিয়ে বেশ তোলপাড় হল। আমি আসছিলাম। ভালমত মনে নেই। সম্ভবত নিউইয়র্ক থেকে প্যারিসে। আমি দিয়েছি হাঁচি। যেই আমি হাঁচি দিয়েছি, আমার সিটের সামনে যে ছিল, ও তাকালো। (ভাব এমন) যে ও বোধ হয় মরেই যাবে! মুয়ায ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহ আনহুর ওরকম কিছু একটা ফোঁড়া বের হয়েছে। পাশে থেকে কেউ একজন বলল, ‘ও কিছু না’। মুয়ায ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহ আনহু বললেন, ‘না, না, হবে হবে। ইনশাআল্লাহ হবে’। উনি স্বান্তনা দেওয়ার জন্য বলছেন ‘কিছু হবে না’ আর উনি আশা করছেন যে, হবে।
কিছুই যদি না থাকে তাহলে আমি মারা যাচ্ছি এটা চিন্তা করা একটু কঠিন। ছোটখাট একটা রোগ থাকলেও এটাকে অবলম্বন করে মোরাকাবা করা সহজ হয়। তো আল্লাহর পথে কিছু মেহনত করা, কিছু বিপদের সম্মুখীন হওয়া- এইটা থেকে পুরো ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করি। কল্পনা করবার চেষ্টা করি যে, আমি জীবন দিতে যাচ্ছি। এই জমানায় জীবন দেওয়ার সূযোগই বা কোথায়? কিন্তু যদি আমি নিয়্যত করতে পারি আর ভাবতে পারি, আল্লাহ তা’আলা নিয়্যত ও ভাবার কারণে জীবন দেওয়ার সওয়াব দিবেন। তারপরে যদি ঘরে ফিরেও আসি, আল্লাহতাআলা একবার যে সওয়াব দেন, ওটা কেটে ফেলেন না। এইজন্য আল্লাহ তা’আলা আমাদের তৌফিক নসীব করুন যে, বেশী থেকে বেশী অগ্রসর হই। অল্পসল্প বিপদকে মনের চিন্তার ভিতরে ঐটাকে বড় করে দেখে নিজের মৃত্যুর আশংকা কল্পনা করার চেষ্টা করি। আর সেই কল্পনা অনুযায়ী নিজেকে শহীদ বানাবার মেহনত করি। আর আল্লাহ তা’আলা তো নিয়্যতের উপর দান করেন। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ আমাদেরকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করুন।