মকবুল বান্দা হওয়ার পথ
মকবুল বান্দা হওয়ার পথ
আল্লাহ তাআলা মুসা আলাইহিস সালাম এবং হারুন আলাইহিস সালামকে বললেন, আমি তোমাদের সাথে আছি, তোমাদেরকে দেখছি এবং তোমাদেরকে শুনছি। আল্লাহ তাআলা তো সবার কথাই শোনেন; এটি মুসা আলাইহিস সালাম এবং হারুন আলাইহিস সালামকে বলার কী মানে?
আল্লাহ তাআলা তো সবার কথাই শোনেন। মানুষ বলে, ও আমার কথা শোনে না। 'শোনে না' মানে কী? ও কি কানে শোনে না? এর অর্থ হলো, কানে তো শোনে, কিন্তু মানে না। তো সে অর্থে বলা হচ্ছে যে, শোনে না অর্থাৎ, শোনে কিন্তু মানে না। আল্লাহ তাআলা যখন মুসা আলাইহিস সালাম এবং হারুন আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেন যে, আমি তোমাদের কথা শুনছি—এর মানে হলো, তোমাদের কথা আমি মানব।
শোনা প্রধানত দুই ধরনের: কানে শোনা এবং মনে শোনা। কানে শোনার ক্ষেত্রে কথাগুলো সবাই যে আগ্রহ নিয়ে শোনে—তা নয়। কেউ গান পছন্দ করে। এখন নাম করা শিল্পী বা গায়ক যদি হয়, এবং সে হয়তো সৌখিন, তবে সে অনেক দূর পর্যন্ত যাবে তার প্রিয় শিল্পীর গান শোনার জন্যই। ওর গান কেন শুনতে চায়? এজন্য যে, ওর গানের গলাতে বিশেষ আকর্ষণ আছে এবং এ আকর্ষণে সৃষ্টি হয় শুনতে শুনতে। ওই কথা (লিরিক) যদি অন্য কেউ গায়, তাহলে ও আর কান পেতে শুনবে না। এমনও হয় যে, গান শুনতে গিয়েছে। এখন যে গায়কের আকর্ষণে গিয়েছিল, সে ওখানে নেই; অন্য কোনো গায়ক গাইছে, তবে তার প্রতি সে আগ্রহী হবে না। কানে শুনলেও আগ্রহী হবে না। তো আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন একটি মেহনত দিয়ে, যে মেহনত করে মানুষ ওই পর্যায়ে যায়, যে পর্যায়ে কিছু বললে আল্লাহ তাআলা শুনবেন।
আমি যদি চাই আমার গান লোকে শুনুক, তবে ওই গানের কথাগুলো শিখে লাভ নেই। গান যারা শেখে, এর উপর যারা সাধনা করে, তারা ওই গানের কথাগুলোর উপর সাধনা করে না। অর্থাৎ, গানের কথাগুলো ভালো করে শিখে নেয় না। শেখার উপর বেশি চেষ্টা নেই; বরং, দীর্ঘ চেষ্টা কিসের উপর? গলা প্রস্তুত করার উপর। গলা যদি তার তৈরি হয়ে যায়, তাহলে যে গানই দেওয়া হোক না কেন, সে গানে সুর সৃষ্টি হবে।
নিকট অতীতে হিন্দুস্তানের একজন নাম করা গায়ক ছিল, যে কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই কোনো গজল বা গান গাইতে দিলে প্রথমবারের রেকর্ডই যথেষ্ট হতো। কখনো কখনো হয়তো সর্বোচ্চ এক-দুইটি পরিবর্তন করতে হতো; কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার প্রথম রেকর্ড যথেষ্ট হতো। কেন? কারণ, তার গলা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তো দ্বীন শেখা মানে নিজেকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে ওই গলা থেকে যা বের হবে, তাই চলবে। গলার ক্ষেত্রে যেরকম গানের সম্পর্ক, ঠিক দ্বীনের সম্পর্ক হচ্ছে মনের সাথে। গলার তৈরি করার এ ঘটনাটি বললাম বোঝার জন্য। মূলত মনকে এরকম তৈরি করা। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দোয়া করতে বলেছেন।
বান্দা দোয়া করে... এ বিষয়টি আমরা নিজেরাই জানি যে, অনেক ব্যাপারে আমরা অন্য কাউকে বলি, 'আমার জন্য দোয়া করবেন।' আমরা নিজেরা কেন দোয়া করি না? কারণ, আমি নিজেই জানি, আমার কথা শুনবে না, এবং তার কথা শুনবে। তার বিষয়ে যে আমি ধারণা করলাম, তার কথা শুনবে—এটি আমাকে কে বলেছে? যে সব সিফাতের কারণে আল্লাহ তাআলা বলেছেন শুনবেন, সে সব সিফাত সম্পর্কে আমাদের ধারণা আছে। সে ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে ওই ব্যক্তি সম্পর্কে ধারণা করছি, উনি বললে বোধহয় আল্লাহ তাআলা শুনবেন।
এক মজলিসের মধ্যে মারিফাত সম্পর্কে আলোচনা শুরু হলো। একজনকে জিজ্ঞাসা করল, মারিফাত কী বোঝো? বলল, হ্যাঁ। সেটি কী? বলল, জানাশোনা। বলল, জানাশোনা মানে কী? বলল, জানাশোনার মানে হলো, অমুকের সাথে আমার জানাশোনা আছে বা অমুক মন্ত্রীর সাথে আমার জানাশোনা আছে। এর মানে কী? এর মানে এই নয় যে, দেখলে উনি আমাকে চিনবেন বা আমি উনাকে চিনব। বাবার নাম বলে বুঝবেন—এর নাম জানাশোনা নয়। জানাশোনার মানে হলো, আমি যদি বলি তবে আমার কাজটি করে দেবেন। এর নামই হলো জানাশোনা।
মারিফাত কাকে বলে? আল্লাহ তাআলা কাকে না চেনেন। দুনিয়ায় এরকম কোনো মানুষ নেই, যাকে আল্লাহ তাআলা চেনেন না। মানুষও চেনে, গরুও চেনে, ছাগলও চেনে, মশাও চেনে। প্রত্যেক মশাকে আলাদা আলাদা করে চেনেন। আমাদের নিকট যদি আলাদা করে উপস্থাপন করা হয়, তবে আলাদা আলাদা করে চিনতে পারব না। যদি এই মশা আমাকে গতকাল কামড় দেয়, এবং যদি আজ দুটো মশা কামড় দিতে আসে, তবে আমরা আলাদা করতে পারব না যে, গতকাল কোন মশাটি আমাকে কামড় দিয়েছিল। তাহলে এই জানাশোনার মানে কী? আমি যদি আল্লাহকে বলি তাহলে আল্লাহ করে দেবেন। এটার মানেই হলো জানাশোনা। আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন, দুনিয়ার সব মানুষের সাথে আল্লাহর পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য। ওই রকম যে, তিনি যদি বলেন তবে কাজ হবে।
দুনিয়াতে আমাদের প্রতি মুহূর্তে কত প্রয়োজন; আল্লাহকে বলিও অনেক সময়। কিন্তু আগে-পরে নিজেই বুঝি, বলে-কয়ে কোনো লাভ নেই। সেজন্য আল্লাহকেও বলি, সাথে সাথে আরো অনেকজনকেও বলে রাখি। কারণ, আল্লাহকে বলেছি এবং ভবিষ্যতেও বলব, কিন্তু এটা বুঝতে পারছি যে, এই বলার দ্বারা যে কিছু হবে—এর আশাবাদী না। সেজন্য আরো অনেককে বলছি; নিজেও চেষ্টা করছি। এবং আল্লাহ তাআলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাঠিয়েছেন, এর আগেও নবীগণকে পাঠিয়েছেন, মানুষকে বাকি সব থেকে মুস্তাগনি (অমুখাপেক্ষী) করে দেওয়ার জন্য। অন্য কিছু দরকারই নেই, এমনকি যুদ্ধের ময়দানে ঢাল-তরবারিরও দরকার নেই। কিছুই লাগবে না।
إن يستجبون ربكم فاستجابكم.
'আল্লাহর সাথে এমন সম্পর্ক করা, যে সম্পর্কের কারণে সে যদি কিছু বলে তাহলে আল্লাহ তাআলা তা শুনবেন।'
এজন্য নিজেকে ওই সোনালি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া; এটি হলো আসল কাজ। কী বলব, কেমন করে বললাম—এটি বিষয় না। গায়কের জন্য যেমন গানের কথা বা কাব্য—এটি যেমন জরুরি না; বরং মূল বিষয় হচ্ছে, তার গলাকে তৈরি করা। এজন্য বছরের পর বছর এমন গান গায়, যেটি কোনো গানই না। সারেগামা এটি কোনো গান হলো না কি। এগুলো কিছু শব্দ মাত্র, কিন্তু মূল ফোকাস হলো মশক করা যা চর্চা করা। এগুলোই বছরের পর বছর চর্চা করে গলাকে তৈরি করা হয়। গলা যদি প্রস্তুত হয়ে যায়, তবে যে কথাই ঢালুক না কেন, সেটা সুর হয়ে বের হয়।
কোনো ব্যক্তির অন্তর যদি আল্লাহর নিকট মকবুল হয়ে যায়... গলা তৈরি হওয়ার মানে কী? শ্রোতাদের কাছে ওই গলা মকবুল বা গ্রহণযোগ্য হয়ে যাওয়া। অতঃপর এ গলা থেকে যে সুরই বের হবে, শ্রোতারা খুব পছন্দ করবে। এজন্য সংগীতের অনেক ধরন আছে। এবং সংগীতের বড় একটি অংশ, যা উস্তাদের নিকট শিখতে হয়, তাতে কোনো কথা নেই অথবা সর্বোচ্চ এক-দুইটি কথা থাকতে পারে। বান্দাও যখন আল্লাহর নিকট ওই পর্যায়ে পৌঁছে, তখন সে কোনোকিছু না করেও আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে পারে। সে কোনো কিছু করলেও আল্লাহর নিকট ভালো, আবার না করেও আল্লাহর নিকট ভালো।
মানুষ তথা শ্রোতার কাছে একজন গায়কের বিনা কথার গান যদি সুন্দর হয়। যেমন, শুধু হা হা করল, তাহলে শ্রোতা অবাক হয়ে শুনতে থাকে। এবং যদি আমরা কেউ হা করি তবে তাড়িয়ে দেবে। মূলত, এই নূর অতিসূক্ষ্ম, কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং এই জ্ঞান অর্জনের জন্য নিজস্ব গুণাবলি থাকার পরেও বহু সাধনা করতে হয়। যদি গলা অনেক ভালোই হয়, তারপরেও যে কোনো গান গাইতে হলে বছরের পর বছর সাধনা করতে হয়; বরং বলা ভালো, কঠিন সাধনা করতে হয়। তো এই প্রসঙ্গটি আমার জানার বিষয় নয়, তবে কোনো কিছু তুলনা দিয়ে বললে বোঝা সহজ হয়। মূল বিষয় হলো, দিল তৈরি করা তথা অন্তর প্রস্তুত করা। অন্তর তৈরি হওয়ার পর যে কথাই বলুন না কেন, মানুষের গ্রহণযোগ্যতা পায়। যে বাড়িতেই তিনি থাকুন না কেন, যে জামা-কাপড়ই তিনি পরুন না কেন, আল্লাহর নিকট তিনি এতই মকবুল হবেন যে, সে যাই বলুক না কেন, আল্লাহ তা কবুল করে নেন।
لو أقسَمَ على الله لَأَبَرَّهُ.
'সে যদি কসম করে বলে, আল্লাহ এমন করতেই হবে, তবে আল্লাহ তা করেই দেন।'
মৌসুম বর্ষার নয়, কিন্তু সে বলে বৃষ্টি হবে। তো আল্লাহ তাআলার পরিকল্পনায় বৃষ্টি ছিল না, কিন্তু ও বলেছে বৃষ্টি হবে—তাহলে আল্লাহ বৃষ্টি বর্ষান। কেন? কারণ আল্লাহর নিকট ওই বান্দা এত মকবুল যে, সে কথা বললে আল্লাহ পরিকল্পনাও পরিবর্তন করে দেন।
এজন্য এ মেহনতের প্রয়োজন। তো এখানে বৃষ্টির পরিকল্পনা না থাকলেও, এমনিতে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দার কথা পূর্ণ করার জন্য বৃষ্টি বর্ষাবেন। কেননা বান্দা বলেছে বলে সে কথার খাতিরে আল্লাহ তা বাস্তবায়ন করবেন।
অন্তর তৈরি করা অর্থাৎ অন্তর প্রস্তুত করা। অন্তর তৈরি হওয়ার পর যে কথাই বলা হোক না কেন, মানুষের গ্রহণযোগ্যতা পায়। যে বাড়িতেই তিনি থাকুন না কেন, যে জামা-কাপড়ই তিনি পরুন না কেন, আল্লাহর নিকট তিনি এতই মকবুল হবেন যে, সে যাই বলুক না কেন, আল্লাহ তা কবুল করে নেন।
হিন্দুস্তানের একজন বড় ব্যবসায়ী উলামাদের সাথে ভালো সম্পর্কও রাখেন। দেওবন্দের অনেক উলামাদের সাথে তার খুবই ভালো সম্পর্ক। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অবস্থা খুব খারাপের দিকে চলে গেছে। তার ভাই গাঙ্গুহী রহ.-এর নিকট আসলেন দোয়া করানোর জন্য যে, ভাই অসুস্থ। গাঙ্গুহী রহ. নানান ধরনের টালবাহানা করে বিদায় করে দেন। দোয়ার আশ্বাস দেন।
এ ঘটনা শুনে দেওবন্দের কিছু উলামা তার জন্য দোয়া করার জন্য আবারও সুপারিশ করেন। বড় আলেমদের জামাত সুপারিশ করছে যে, দোয়া করতে হবে। তো গাঙ্গুহী রহ. তাদের সুপারিশের কারণে দোয়া করেন। আসলে গাঙ্গুহী রহ. যে ওই ব্যবসায়ীকে পছন্দ করেন না, এমন নয়। কিন্তু উলামাদের মেজাজ এক এক সময় এক এক রকম থাকে। কখনো কোনো কাজে মন আগ্রহী হয়, আবার কখনো কোনো কাজে মন আগ্রহী হয় না। ঠিক এমনিভাবে ওই ব্যবসায়ীর জন্য মন আগ্রহী হয়নি, তাই তিনি দোয়া করেননি। তারপর দেওবন্দের বেশ কয়েকজন আলেম দোয়ার জন্য সুপারিশ করলেন, তখন তিনি দোয়া করলেন। দোয়া করার পরই খবর এলো, ওই ব্যবসায়ী ভালো হয়ে গেছেন। আর তারপরই মারা গেছে। আসলে মৃত্যুই ছিল প্রোগ্রামে। মাঝখানে ভালো হওয়া তো আর প্রোগ্রামে ছিল না। গাঙ্গুহী রহ. মাঝখানে ঢুকে গেছেন। তার কথা রাখতেও হয়। ফেলে দেওয়া যায় না। আল্লাহ তায়ালা তার কথাও রেখেছেন আবার নিজের পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করলেন।
ডাক্তার ভালো অপারেশন করেন; সার্জন। ইঞ্জিনিয়ার ভালো কাজ করেন। এই ভালো আর নামাজি যিনি ভালো নামাজ পড়েন, রোজাদার ভালো রোজা রাখেন—এ দুটো ভালোর মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে।
ইঞ্জিনিয়ার খুব ভালো একটি মেশিন বানিয়েছেন, কাজটি তার খুব ভালো হয়েছে। কাজ ভালো, এজন্য ভালো মেশিন বানিয়েছেন। মেশিনের খুব প্রশংসা। ওই ইঞ্জিনিয়ার... তাকে লোকে চেনে-না চেনে। হয়তো তার আগের মেশিনটি ভালো হয়নি। একদল বলে, আমার মেশিনটি খুব ভালো হয়েছে, আর আরেকদল বলে, আমার মেশিনটি ভালো হয়নি। তো কাজটি তো এমন—কে করেছে, সেটি মূল নয়। কিন্তু দীনের আমলের ব্যাপারে যে, ফলানের নামাজ খুব ভালো। আসলে নামাজ ভালো নয়, আসলে সে ভালো। সে যদি ভালো হয়, তার সোজা নামাজ, বাঁকা নামাজ—সবই আল্লাহর তায়ালার নিকট ভালো হয়। দীনের যত কাজ আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে করতে বলেছেন, সব কাজই করেছেন কাজের গুণে নয়, কর্মীর গুণে।
মনে করা যাক, মাজহাবগুলো বহুদিন থেকে চলে আসছে। আরও বহু মাজহাব ছিল, কিন্তু এই চারটি মাজহাব পুরো দুনিয়াতে প্রসিদ্ধি পেয়েছে। এগুলো এই জন্য নয় যে, এগুলো উন্নত মানের মাজহাব, বরং যাদের দ্বারা করা হয়েছে, তারা আল্লাহর নিকট বেশি মাহবুব। এটিই মূলত আল্লাহ তায়ালা চান। বাকি যাদের মাজহাব প্রসিদ্ধি পায়নি, তারা মাকবুল নন—এমন কথাও বলা যায় না। এটি আল্লাহর ইজাজত, আল্লাহ ব্যক্তিকে কবুল করেছেন।
ইমাম মালেক রহ. বলেন, তিনি স্বপ্নে দেখলেন, মাইলাতে বসে আছেন আর পেছনের দিকে বায়তুল্লাহ। এ স্বপ্ন দেখে তিনি পেরেশান হয়ে গেলেন যে, তিনি মাইলার উপরে বসে আছেন আবার পিঠ কেবলার দিকে। একজন আল্লাহওয়ালাকে বললেন। তিনি বললেন, দুনিয়া আপনার উপরে উঠেনি, আপনি দুনিয়ার উপর বসে আছেন। নাম, যশ, খ্যাতি—এগুলো নাজাফত অর্থাৎ মাইলা। আপনি সেগুলোর উপরে উঠে বসে আছেন। আপনার উপরে সেগুলো উঠেনি। আর কেবলা পেছন দিকে আর আপনি অন্য দিকে তাকিয়ে আছেন—এর তাবির হলো, আপনার এই ইলম, দাওয়াত পুরো দুনিয়ার দিকে যাবে। পরবর্তীতে এমনটিই হয়েছিল যে, এই মাজহাব পুরো দুনিয়াতেই ছড়িয়ে পড়েছে। পুরো আফ্রিকা মালেকি মাজহাব অনুসরণ করে থাকে। এবং মাগরিব বা ইউরোপেও মালেকি মাজহাব অনুসরণ করা হয়ে থাকে। সুতরাং ওই ব্যক্তি মকবুল। কারণ, আল্লাহ তায়ালা তার কাজকে কবুল করে নিয়েছেন।
আল্লাহ তায়ালাই তাবলিগের এই কাজকে চালাচ্ছেন। হুবহু এই উসুল অর্থাৎ, তাবলিগের যত নিয়মকানুন আছে, এগুলো যদি এমন একজন ব্যক্তি করতেন, যিনি আল্লাহর নিকট মকবুল নন, তাহলে এটিও কবুল হতো না। দীনের যত কাজ, সেই কাজের কারণে মকবুল হয় না, বরং করনেওয়ালা মকবুল হওয়ার কারণে তার কাজটি মকবুল হয়। তো আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে বড় মেহেরবানি করে দীন দিয়েছেন, আল্লাহর পথে বের হয়ে নিজেকে আল্লাহর নিকট মকবুল বানানোর জন্য।
মকবুল কীভাবে হবে? যাকে ভালো লাগে, তার সবকিছুই ভালো লাগে। এক ভদ্রলোক ছিলেন একটু বয়স্ক। কিছু মানুষ থাকেন যারা নিয়মমতো চলেন। তো তিনি দুপুরে খেয়ে-দেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করেন। আশেপাশে যদি কেউ অল্পশল্প কথা বলে বা শব্দ করে, তবে বিরক্ত হন। সবাইকে কড়াভাবে বলে দেওয়া হয়েছে, দুপুরে তার বিশ্রামের সময় কেউ যেন কথাবার্তা না বলে। ছেলে বা মেয়েরা বাইরে থাকে। এখন তারা বেড়াতে এসেছে নাতি-নাতনি সহকারে। নাতি কী আর এসব মানে নাকি। তার বিশ্রামের বিশ্রামের সময় নাতি লাঠি কুড়িয়ে পেয়েছে আর সামনে ছিল টিন। সে পায়ের সব শক্তি দিয়ে লাঠি টিনে পেটাতে লাগল; কিন্তু ভদ্রলোক বিরক্ত হচ্ছেন না। কেউ একজন তাকে জিজ্ঞাসা করলো, এই যে নাতি পেটাচ্ছে আর শব্দ করছে, কোনো অসুবিধা হচ্ছে না? তিনি বললেন, না, এটি ওই ধরনের শব্দ না। অর্থাৎ, নিজের নাতিপুতি যদি করে তখন বলে, এটি ওই ধরনের শব্দ না।
আবার অনেকে আছে, সৌখিন জিনিসের প্রতি অনেক যত্নবান। কাউকে ধরতেই দেয় না; কিন্তু নাতি এসেছে আর সিগনেচার সাইনপেন ইত্যাদি পেয়ে দেয়াল-কানে সব জায়গায় আঁকাআঁকি করছে। কেউ এতে নাখোশ না; বরং বলছে, যা লিখেছে, এগুলোকে আবার রিপিট করাও যাতে হাতের লেখা সুন্দর হয়। আবার কেউ কোনো মন্দও বলছে না। বরং প্রশংসা করে বলছে, সুন্দর হয়েছে তো! কেন সুন্দর লাগছে? নাতির সৌন্দর্যের কারণে, নাতির মাহব্বতের কারণে। তো যে মাহবুব, তার সবকিছুই মাহবুব, ভালো। তো দীন মানে ভালো আমল করার নাম নয়। ব্যক্তি যদি মকবুল না হয়, তবে তার কোনো ভালো আমল গ্রহণযোগ্য হবে না। আর সে যদি মকবুল হয়ে যায়, তার যেকোনো আমলই চলবে। আমল আমলের জন্য নয়; আমল হলো মকবুল হওয়ার জন্য।
নেক আমল করতে করতে নেক আমল দ্বারা যদি তার দিলকে সাজাতে পারে যেরকম ওই গায়ক সকাল-দুপুর-বিকাল গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে। বিভিন্ন অবস্থায় রেওয়াজ করছে, সে মূলত ওই সুরগুলোর জন্যই করছে। যদিও সে তার গলাতে রেওয়াজ করছে। অনেক সময় শহরের মতো জায়গায় হলে দরজা-জানালা বন্ধ করে রেওয়াজ করবে, যাতে আশেপাশের মানুষ বিরক্ত না হয়। তো আমলওয়ালা যে আমল করে, ওই আমলের জন্য আমল করে না। আমল তার জন্য একটি উপলক্ষ মাত্র। যে উপলক্ষে সে নিজেকে ঠিক করে, নিজেকে সাজাবে। আমল করতে করতে নিজেকে সাজায় যেমন গলার রেওয়াজ করতে করতে নিজেকে সাজায়। এভাবে একসময় গলা সুন্দর হয়ে যায়।
ঠিক তেমনিভাবে হাতের লেখা... লিখতে লিখতে একসময় তার হাতের লেখা সুন্দর হয়ে যাবে। হাতের লেখা যখন সুন্দর হয়ে যাবে, তখন আর সুন্দর করে সাজিয়ে সাজিয়ে লিখতে হবে না। এমনকি তখন হাতের লেখার স্পিডও অনেক দ্রুত হয়ে যাবে। এত দ্রুত লিখবে যে, তার হাতের লেখা সুন্দর করার কোনো খেয়ালই থাকবে না; কিন্তু তার হাত যেহেতু পাকা, তাই সে যাই লিখুক না কেন, সব সুন্দর হয়ে যাবে। তো বান্দা যখন আল্লাহর নিকট মকবুল হয়ে যাবে, মকবুল হবে আমল করে করে যখন তার দিলকে সাজাবে। গায়ক যেমন তার গান দিয়ে, সুর দিয়ে তার গলাকে সাজায়, ঠিক বান্দাও আমল দিয়ে তার দিলকে ঠিক করে। আর তার অন্তর যখন ঠিক হবে, তখন সে যাই বলুক না কেন, আল্লাহ কবুল করে নিবেন।
এক ব্যক্তি বিয়ে করবে। তো যে পরিবারে সে বিয়ে করবে, সে পরিবার আর তার নিজের পরিবারের মধ্যে খুবই শত্রুতা। তো তারা তো রাজিই হয় না। তো সে এসেছে হযরত গাঙ্গুহী রহ.-এর নিকট তাবিজ নেওয়ার জন্য, যাতে বিয়েটা দ্রুত হয়। এমনিতে তিনি তাবিজ-তুবিজ সম্পর্কে তেমন জানতেন না, কিন্তু বিয়ের তাবিজ খুব ভালো করেই জানতেন। এখন ছেলে থেকে কোনোরকমে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু ছেলে যাবেই না। আঠার মতো পিছে লেগে রইল। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তিনি তাবিজ লিখে দিলেন। তাবিজ নিয়ে ছেলেটি যখন গ্রামে ফিরল, দেখা গেল, দুই পরিবার অধীর হয়ে তার অপেক্ষা করছে বিয়ে দেওয়ার জন্য। আর সে যাওয়ার সাথে সাথেই বিয়ে হয়ে গেল।
ওই অঞ্চলে এই তাবিজের খুব চর্চা হয়। অতএব যারা সেখানে তাবিজ-কবজ ইত্যাদি দিয়ে থাকে, তারা দেখতে চাইল, তাবিজে কী লিখেছে। যেহেতু ওই অঞ্চলে এই তাবিজের খুব চর্চা হয় তাই তারা তাবিজের রহস্য উদঘাটনে উৎসুক। সুযোগ পেয়ে ওরা কজন মিলে খুব জোর করে ধরে তার থেকে তাবিজটি খুলে নিল। অতঃপর খুলে দেখল তাতে লেখা রয়েছে:
میں کچھ جانتا نہیں وہ میرے چہرتا نہیں
(আমি কিছুই জানি না, সে আমার চেহারা দেখে না।)
এই তাবিজের প্রভাবেই বিয়ে হয়ে গিয়েছে। কারণ, যিনি লিখেছেন, উনি যাই বলুন না কেন। এটুকু তো আল্লাহ তাআলা বুঝতে পেরেছেন যে, যদিও এ সরাসরি বিয়ের কথা বলছেন না, কিন্তু এসেছে তো গাঙ্গুলীর কাছে। অতএব, বিয়ে হয়ে যাক। তো আল্লাহ তাআলার অনেক নেক বান্দা আছেন, যারা আল্লাহর নিকট এতই মকবুল যে, তারা যাই বলবেন আল্লাহ তাআলা কবুল করে নেবেন। বাকি ওই সব নেক বান্দাগণ অপ্রয়োজনীয় জিনিস বলেও না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
رُبَّ أشعثَ أغبَرَ مدفوعٍ بالأبواب، لو أقسَمَ على الله لَأَبَرَّهُ
'আল্লাহর এমন কিছু বান্দা, যাদের শরীরে ধুলোয় ধূসরিত, এলোমেলো চুল, প্রতিটি দরজা থেকে বিতাড়িত, কিন্তু তারা আল্লাহর নিকট মকবুল।'
আল্লাহর নিকট মকবুল হওয়ার জন্য এমন নিঃস্ব হওয়া যে একেবারে শর্ত, তাও বলা যায় না; কিন্তু এটিই সাধারণত ওই সিফাত যা আল্লাহ ওয়ালাদের মাঝে পাওয়া যায় যে, তারা দুনিয়াওয়ালাদের নিকট মকবুল নন। যে আল্লাহ তাআলাকেই চায় আর বাকি সবকিছু থেকে বেপরোয়া হয়ে যায়, আল্লাহ তাআলা তাকে গ্রহণ করে নেন। আর যে দুনিয়ার মানুষের নিকট কদর চায় যে, আমি যে বাড়িতেই যাব, সবাই আমাকে হুজুর হুজুর করবে। তো এই ধরনের লোকদের আল্লাহর নিকট স্থান হওয়াও সম্ভাবনা খুবই কম। তো আল্লাহর নিকট তার মাকাম থাকার একটি বড় শর্ত হচ্ছে, আল্লাহর নিকট ব্যতীত অন্য কোনো স্থানে এই মাকাম চাইবে না।
অনেক লোকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, দুনিয়াতে তার খুব সম্মান; মূলত এই সম্মান তারা চায় না, এমনিতেই এসে ধরা দেয়। ঠিক তদ্রূপ, দুনিয়ার মানুষের নিকট যারা মান-সম্মান-মর্যাদা চায়, ও আল্লাহর নিকট কিছুই পাবে না। আর মকবুল বান্দাদের মনে আল্লাহ ছাড়া কোনো মানুষের নিকট তার মাকাম-মর্যাদার তলব নেই এবং কোনো আগ্রহও নেই; বরং তা না থাকাকেই পছন্দ করে।
সাধারণ মানুষের আল্লাহ ওয়ালা হওয়ার প্রধান বাধা এই দুনিয়া। এক তো হলো যথেষ্ট মাল-দৌলত চায় আরামের জন্য; যেটা জায়েজ। যেমন ভালো বিছানা আরামের জন্য, মজার জিনিস খাওয়া, আরামের জন্য নরম-পাতলা কাপড় পরা। এটা কোনো হারামও নয়, মাকরূহও নয়। কিন্তু অন্যান্য যে ইচ্ছাগুলো যে, আরামও হোক আবার লোকজন দেখুক। মানুষের নিকট তার মান-সম্মান বাড়ুক। এগুলো যদি আরামের জন্য হয়, তবে এটি গ্রহণযোগ্য। কিন্তু মানুষকে দেখানোর জন্য যে, মানুষের নিকট আমার মান-মর্যাদা হোক। সুতরাং দুনিয়া বলতে এই দুটো জিনিসই বোঝায় যে, তার আরাম হোক আর মানুষের কাছে তার মর্যাদা হোক, তাহলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদের কথা বলেছেন যে, لو أقسَمَ على الله لَأَبَرَّهُ এ হাদিসে দুটো বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন, এ দুটোকে অস্বীকার করার কারণে যে, ধুলোমাখা শরীরে আর এলোমেলো চুল। অর্থাৎ যাদের শরীরে আরাম আর যত্নআত্তি বেশি পড়েনি আর প্রতিটি দরজা থেকে বিতাড়িত। মানুষের নিকট তার চিন-পরিচয়ের বালাই নেই। তাদের মাঝে এই দুই বৈশিষ্ট্য নেই। এই দুই জিনিস না থাকার কারণে বড় বড় আমলকারীদের আমলের স্বাদ নষ্ট করে দেয়।
আজ সকালে এক আত্মীয়কে বলছিলাম, এক বিয়েবাড়িতে বিরিয়ানি পরিবেশন করা হচ্ছিল। হঠাৎ ভুলবশত কয়েক ফোঁটা কেরোসিন পড়ে গেল। তো সম্পূর্ণ বিরিয়ানি খাওয়ার অনুপযুক্ত হয়ে গেল। কয় ফোঁটা পড়েছে? কেরোসিন এমন একটি জিনিস, ওই এক ফোঁটা পড়াই যথেষ্ট। এমন দুর্গন্ধ, সহ্য করাই কষ্টকর। ঠিক তেমনিভাবে মানুষের নিকট মান-মর্যাদা কামনা করা, এটি সেই কেরোসিন জাতীয় জিনিস। আমলের ভাণ্ডার নষ্ট করে দেয়। প্রথমত আল্লাহর নিকট নিজের মর্যাদা পাওয়ার জন্য যতবেশি সম্ভব তার নিজের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে রাখা।
আরাম চাওয়া দূষণীয় নয়, কিন্তু এটি যেন বাড়াবাড়ির পর্যায়ে না যায়, বিলাসিতার পর্যায়ে না যায়। একটু আরামে থাকলাম, একটু ভালো খেলাম, এটি দূষণীয় নয়। কিন্তু মানুষের কাছে আমার মান-মর্যাদা কামনা করা, যার আড়ালে অহংকার জাগবে, সেটি দুই ফোঁটা কেরোসিনের মতো। যে এটাকে ছাড়তে পারবে, তার জন্য অল্প আমল দিয়ে আল্লাহর নিকট মকবুল হয়ে যাওয়া সম্ভব। আর অহংকার যদি রয়ে যায়, তবে বহু আমল দিয়েও কোনো কাজ হবে না। এজন্য আল্লাহর পথে বের হয়ে মেহনত করা। মকবুল যদি হই, তবে আমার রোজাও মকবুল হবে, আমার তেলাওয়াতও মকবুল হবে, আমার জিকিরও মকবুল হবে, কিছু করাও মকবুল হবে আর কিছু না করাও মকবুল হবে। আল্লাহওয়ালাদের কিছু না করাতেও মানুষের হেদায়াত হয়। বসে আছে... উনি বসে আছেন, কেউ দেখল আর হেদায়াত পেয়ে গেল। অথচ উনি কিছুই করছেও না। এমনকি আল্লাহওয়ালাদের মাজার দেখেও কত মানুষ হেদায়াতে পেয়ে যায়। শুধু কবর দেখেই।
কবরের শিরকের বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই শিরক সব আমল শেষ করে দেয়। কবরে কি আমল আছে? কোনো আমল নেই; কিন্তু তার কবর দ্বারা বহু মানুষ হেদায়াতে পেয়ে যাচ্ছে। পরবর্তীতে তার নাম দিয়ে হাজারো হাজারো, লাখো লাখো মানুষ হেদায়াত পেয়ে যায়। যেমন, যারা পুরো দুনিয়াতে ওয়াজ করে, তারা সেই আগের নামগুলোই আলোচনা করে। ওই নাম না নিলে তার ওয়াজ জমবে না; অথচ সেই বুজুর্গরা কবে চলে গিয়েছেন; কিন্তু তাদের নাম দিয়ে এমন পর্যন্ত বেনামাজি নামাজি হচ্ছে, ফাসেক তওবা করছে। কত হিন্দু মুসলমান হচ্ছে এই নাম দিয়ে। যদি একবার দুনিয়াতে মকবুল হয়ে যান, তবে তার আমলও মকবুল। তার না করাও মকবুল, তার হায়াতও মকবুল, তার মৃত্যুও মকবুল। এজন্য আমরা আল্লাহর পথে বের হয়ে আমি আমাকে মকবুল বানানো। ঠিক আছে না ইনশাআল্লাহ? বেশি থেকে বেশি মেহনত করার চেষ্টা করব। বেশি থেকে বেশি মেহনত করব।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন