রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

رياض الصالحين من كلام سيد المرسلين

ভূমিকা অধ্যায় - এর পরিচ্ছেদসমূহ

মোট হাদীস ৬৭৯ টি

হাদীস নং: ৬১
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ অধ্যায় ৫
মুরাকাবা-সর্বাবস্থায় আল্লাহর ধ্যান ও স্মরণ।
৬১। যেখানেই থাক আল্লাহকে ভয় করো:

হযরত আবু যর জুনদুব ইবনে জুনাদা রাযি. ও হযরত আবু আব্দুর রহমান মুআয ইবনে জাবাল রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যেখানেই থাক আল্লাহকে ভয় করো এবং মন্দ কাজের পর নেককাজ করো। তা ওই মন্দকাজ মিটিয়ে দেবে। আর মানুষের সাথে আচরণ করো উত্তম চরিত্রের সাথে।
ইমাম তিরমিযী রহ. এ হাদীছটি উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেন, এটি একটি হাসান হাদীছ। (হাদীস নং ১৯৮৭)
مقدمة الامام النووي
5 - باب المراقبة
61 - الثاني: عن أبي ذر جُنْدُب بنِ جُنادَةَ وأبي عبدِ الرحمانِ معاذِ بنِ جبلٍ رضي الله عنهما، عن رسولِ الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «اتَّقِ الله حَيْثُمَا كُنْتَ وَأتْبعِ السَّيِّئَةَ الحَسَنَةَ تَمْحُهَا، وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ». رواه الترمذي، (1) وَقالَ: «حديث حسن».
হাদীস নং: ৬২
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ অধ্যায় ৫
মুরাকাবা-সর্বাবস্থায় আল্লাহর ধ্যান ও স্মরণ।
৬২। এক অমূল্য উপদেশ:

হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন আমি (একটি বাহনে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে (বসা) ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, হে বালক! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শেখাচ্ছি (তা মনে রেখ)। আল্লাহকে (অর্থাৎ তাঁর বিধানাবলীর) হেফাজত করো, তাহলে আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করবেন। আল্লাহকে (অর্থাৎ তাঁর বিধানাবলীর) হেফাজত করো, তাঁকে তোমার সামনে পাবে। যখন চাবে, আল্লাহরই কাছে চাবে এবং যখন সাহায্য প্রার্থনা করবে, আল্লাহরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করবে। জেনে রেখো, সমস্ত সৃষ্টিজীব যদি তোমার কোনও উপকার করার জন্য একত্র হয়, তবে তারা তোমার কোনও উপকার করতে পারবে না- সেইটুকু ছাড়া, যা আল্লাহ তোমার জন্য নির্ধারণ করেছেন। আর তারা যদি তোমার ক্ষতি করার জন্য একত্র হয়, তবে তারা তোমার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না- কেবল সেইটুকু ছাড়া, যা আল্লাহ তোমার জন্য নির্ধারণ করেছেন। কলম তুলে রাখা হয়েছে এবং লিপিসমূহ (ভাগ্যলিপি) শুকিয়ে গেছে।
এ হাদীছটি ইমাম তিরমিযী রহ. বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এটি একটি হাসান সহীহ হাদীছ। (হাদীস নং ২৫১৬)
তিরমিযী ছাড়া অন্য এক বর্ণনায় আছে-
আল্লাহকে (অর্থাৎ তাঁর বিধানাবলীর) হেফাজত করো, তাঁকে তোমার সামনে পাবে। সুখ সাচ্ছন্দ্যে আল্লাহকে স্মরণ রেখ, তিনি তোমার কষ্টকালে তোমাকে স্মরণ রাখবেন। জেনে রেখো, যা তোমার হাতছাড়া হয়ে গেছে, তা তুমি কখনও পাওয়ার ছিলে না। আর যা তোমার হস্তগত হয়েছে, তা তোমার কখনও হস্তচ্যুত হওয়ার ছিল না। জেনে রেখো সবরেরই সাথে রয়েছে আল্লাহর সাহায্য, সংকটেরই সাথে রয়েছে পরিত্রাণ এবং কষ্টেরই সাথে রয়েছে সাচ্ছন্দ্য।
مقدمة الامام النووي
5 - باب المراقبة
62 - الثالث: عن ابنِ عباسٍ رضي الله عنهما، قَالَ: كنت خلف النَّبيّ - صلى الله عليه وسلم - يومًا، فَقَالَ: «يَا غُلامُ، إنِّي أعلّمُكَ كَلِمَاتٍ: احْفَظِ اللهَ يَحْفَظْكَ (1)، احْفَظِ اللهَ تَجِدْهُ تُجَاهَكَ، إِذَا سَألْتَ فَاسْأَلِ اللهَ، وإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللهِ، وَاعْلَمْ: أَنَّ الأُمَّةَ لَوْ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إلاَّ بِشَيءٍ قَدْ كَتَبهُ اللهُ لَكَ، وَإِن اجتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إلاَّ بِشَيءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ عَلَيْكَ، رُفِعَتِ الأَقْلاَمُ وَجَفَّتِ الصُّحفُ (2)». رواه الترمذي، (3) وَقالَ: «حديث حسن صحيح».
وفي رواية غيرِ الترمذي: «احْفَظِ الله تَجِدْهُ أَمَامَكَ، تَعرَّفْ إِلَى اللهِ [ص:31] في الرَّخَاءِ يَعْرِفكَ في الشِّدَّةِ، وَاعْلَمْ: أنَّ مَا أَخْطَأكَ لَمْ يَكُنْ لِيُصِيبكَ، وَمَا أَصَابَكَ لَمْ يَكُنْ لِيُخْطِئَكَ، وَاعْلَمْ: أنَّ النَّصْرَ مَعَ الصَّبْرِ، وَأَنَّ الفَرَجَ مَعَ الكَرْبِ، وَأَنَّ مَعَ العُسْرِ يُسْرًا».
হাদীস নং: ৬৩
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ অধ্যায় ৫
মুরাকাবা-সর্বাবস্থায় আল্লাহর ধ্যান ও স্মরণ।
৬৩। গুনাহ মাত্রই ধ্বংসাত্মক:

হযরত আনাস রাযি. বলেন, তোমরা এমন এমন কাজ করে থাক, যা তোমাদের চোখে চুলের চেয়েও চিকন। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে আমরা তাকে ধ্বংসাত্মক মনে করতাম- বুখারী। (বুখারী শরীফ হাদীস নং ৬৪৯২)
مقدمة الامام النووي
5 - باب المراقبة
63 - الرابع: عن أنسٍ - رضي الله عنه - قَالَ: إِنَّكُمْ لَتعمَلُونَ أعْمَالًا هي أدَقُّ في أعيُنِكُمْ مِنَ الشَّعْرِ، كُنَّا نَعُدُّهَا عَلَى عَهْدِ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم - مِنَ المُوبِقاتِ. رواه البخاري. (1)
وَقالَ: «المُوبقاتُ»: المُهلِكَاتُ.
হাদীস নং: ৬৪
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ অধ্যায় ৫
মুরাকাবা-সর্বাবস্থায় আল্লাহর ধ্যান ও স্মরণ।
৬৪। হারাম কাজে লিপ্ত হলে আল্লাহর ক্রোধ সঞ্চার হয়

হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলারও গয়রত হয় (আত্মসম্মানে লাগে)। আল্লাহ তাআলার গয়রত হয়, যখন কেউ তিনি যা হারাম করেছেন তাতে লিপ্ত হয় – বুখারী ও মুসিলম । (বুখারী শরীফ হাদীস নং ৫২২৩, মুসলিম শরীফ হাদীস নং ২৭৬১)
مقدمة الامام النووي
5 - باب المراقبة
64 - الخامس: عن أبي هريرةَ - رضي الله عنه - عن النَّبيّ - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «إنَّ الله تَعَالَى يَغَارُ، وَغَيرَةُ الله تَعَالَى، أَنْ يَأتِيَ المَرْءُ مَا حَرَّمَ الله عَلَيهِ (1)» متفق عَلَيهِ. (2)
و «الغَيْرةُ»: بفتحِ الغين، وَأَصْلُهَا الأَنَفَةُ.
হাদীস নং: ৬৫
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ অধ্যায় ৫
মুরাকাবা-সর্বাবস্থায় আল্লাহর ধ্যান ও স্মরণ।
৬৫। বনী ইসরাইলের তিন ব্যক্তির ঘটনা:

হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন- বনী ইসরাঈলে তিনজন লোক ছিল। একজন কুষ্ঠরোগী, একজন টাকওয়ালা ও একজন অন্ধ। আল্লাহ তাদের পরীক্ষা করতে চাইলেন। সুতরাং তিনি একজন ফিরিশতা তাদের কাছে পাঠালেন। ফিরিশতা কুষ্ঠরোগীর কাছে আসলেন। তাকে বললেন, তোমার সর্বাপেক্ষা প্রিয়বস্তু কোনটি? সে বলল, সুন্দর রং ও সুন্দর ত্বক এবং লোকে এই যে (রোগের) কারণে আমাকে ঘৃণা করে তা থেকে মুক্তিলাভ। ফিরিশতা তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন। ফলে তার রোগ নিরাময় হল এবং তাকে সুন্দর রং ও সুন্দর ত্বক দেওয়া হল। তারপর ফিরিশতা বললেন, কোন সম্পদ তোমার কাছে সবচে বেশি প্রিয়? সে বলল, উট। অথবা বলল, গরু। এ ব্যাপারে বর্ণনাকারীর সন্দেহ হয়েছে। তো তাকে গাভীন উটনী দেওয়া হল। ফিরিশতা বললেন, আল্লাহ তোমাকে এতে বরকত দিন।
তারপর ফিরিশতা টাকওয়ালার নিকট আসলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে সর্বাপেক্ষা প্রিয়বস্তু কী? সে বলল, সুন্দর চুল আর লোকে আমাকে এই যে (টাকের) কারণে ঘৃণা করে, তা থেকে মুক্তি। ফিরিশতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। ফলে তার রোগ থেকে নিরাময় লাভ হল এবং তাকে সুন্দর চুল দেওয়া হল। তারপর বললেন, কোন সম্পদ তোমার কাছে সবচে' বেশি প্রিয়? সে বলল, গরু। তাকে একটি গাভীন গরু দেওয়া হল। ফিরিশতা দু'আ করলেন, আল্লাহ তোমাকে এতে বরকত দিন।
তারপর ফিরিশতা অন্ধ লোকটির কাছে আসলেন। তাকে বললেন, কোন বস্তু তোমার সবচে' বেশি প্রিয়? সে বলল, আমার সবচে' বেশি প্রিয় বিষয় এই যে, আল্লাহ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেবেন, যাতে আমি লোকজন দেখতে পাই। ফিরিশতা তার চোখে হাত বুলিয়ে দিলেন। ফলে আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। তারপর ফিরিশতা বললেন, কোন সম্পদ তোমার সবচে' বেশি প্রিয়? সে বলল, ছাগল। তাকে একটি গর্ভবতী ছাগল দেওয়া হল ।
তারপর উট ও গাভী বাচ্চা দিতে থাকল। ছাগলটিও বাচ্চা দিতে লাগল। তাতে প্রথম লোকটির এক মাঠ ভরা উট হয়ে গেল, দ্বিতীয় ব্যক্তির এক মাঠ ভরা গরু হয়ে গেল আর তৃতীয় লোকটির এক মাঠ ভরা ছাগল হয়ে গেল।
তারপর ফিরিশতা কুষ্ঠ লোকটির কাছে তার রূপ ও বেশে আসল এবং বলল, আমি একজন মিসকীন লোক। আমার সফরের অবলম্বন নিঃশেষ হয়ে গেছে। সুতরাং আল্লাহ ছাড়া, অতঃপর তোমার সাহায্য ছাড়া আজ আমার গন্তব্যে পৌঁছার কোনও উপায় নেই। যিনি তোমাকে সুন্দর রং, সুন্দর ত্বক ও সম্পদ দিয়েছেন, তাঁর নামে আমি তোমার কাছে একটি উট চাচ্ছি, যাতে আমি সফরের প্রয়োজন সমাধা করতে পারি। সে বলল, (আমার উপর অনেকের) অনেক হক রয়েছে (তোমাকে দেওয়ার মত অতিরিক্ত কিছু নেই, অন্য কোথাও দেখ)। তখন ফিরিশতা বললেন, আমি যেন তোমাকে চিনি। তুমি কি একজন কুষ্ঠরোগী ছিলে না যে, লোকে তোমাকে ঘৃণা করত? ছিলে না গরীব, তারপর আল্লাহ তোমাকে সম্পদ দান করেছেন? সে বলল, আমি তো এ সম্পদ প্রজন্ম পরম্পরায় লাভ করেছি। ফিরিশতা বললেন, তুমি যদি তোমার দাবিতে মিথ্যুক হয়ে থাক, তবে আল্লাহ তোমাকে তুমি যেমন ছিলে তেমন করে দিন।
তারপর ফিরিশতা টাকওয়ালার কাছে তার রূপ ও তার বেশে আসলেন। তারপর তাকেও ওই লোকটির মত একই কথা বললেন এবং সেও তার মত একই উত্তর দিল। শেষে তিনি বললেন, তুমি যদি মিথ্যুক হয়ে থাক, আল্লাহ তাআলা তোমাকে ওইরকম করে দিন, যেমন তুমি পূর্বে ছিলে ।
তারপর অন্ধ লোকটির কাছে তার রূপে ও তার বেশে আসলেন। তাকে বললেন, আমি একজন গরীব মানুষ ও একজন পথিক। সফরে আমার সব পাথেয় শেষ হয়ে গেছে। আজ আল্লাহ ছাড়া এবং তোমার সাহায্য ছাড়া গন্তব্যে পৌঁছার কোনও উপায় আমার নেই। তোমার কাছে আমি সেই আল্লাহর নামে একটি ছাগল চাচ্ছি, যিনি তোমাকে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন, যাতে আমি সফরের প্রয়োজন সমাধা করতে পারি। সে বলল, ঠিকই আমি অন্ধ ছিলাম। আল্লাহ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। কাজেই তুমি যা চাও নিয়ে নাও আর যা ইচ্ছা রেখে যাও। আল্লাহর কসম! আজ আল্লাহ ওয়াস্তে তুমি যাই নেবে, তাতে তোমাকে বারণ করব না। ফিরিশতা বললেন, তোমার মাল তুমিই রেখে দাও। বস্তুত তোমাদের পরীক্ষা করা হয়েছে। আল্লাহ তোমার প্রতি খুশি হয়েছেন এবং তোমার সাথীদ্বয়ের প্রতি নাখোশ হয়েছেন। বুখারী ও মুসলিম।
مقدمة الامام النووي
5 - باب المراقبة
65 - السادس: عن أبي هريرةَ - رضي الله عنه: أنَّه سَمِعَ النَّبيَّ - صلى الله عليه وسلم - يقُولُ: «إنَّ ثَلاثَةً مِنْ بَني إِسْرَائِيلَ: أبْرَصَ، وَأَقْرَعَ، وَأَعْمَى، أَرَادَ اللهُ أَنْ يَبْتَليَهُمْ فَبَعَثَ إِليْهمْ مَلَكًا، فَأَتَى الأَبْرَصَ، فَقَالَ: أَيُّ شَيءٍ أَحَبُّ إلَيْكَ؟ قَالَ: لَوْنٌ حَسَنٌ، وَجِلدٌ حَسَنٌ، وَيَذْهبُ عَنِّي الَّذِي قَدْ قَذِرَنِي النَّاسُ؛ فَمَسَحَهُ فَذَهَبَ عَنْهُ قَذَرُهُ وَأُعْطِيَ لَونًا حَسنًا. فَقَالَ: فَأيُّ المَالِ أَحَبُّ إِليكَ؟ قَالَ: الإِبلُ - أَوْ قالَ: البَقَرُ شكَّ الرَّاوي - فَأُعطِيَ نَاقَةً عُشَرَاءَ، فَقَالَ: بَاركَ الله لَكَ فِيهَا.
فَأَتَى الأَقْرَعَ، فَقَالَ: أَيُّ شَيءٍ أَحَبُّ إلَيْكَ؟ قَالَ: شَعْرٌ حَسَنٌ، وَيَذْهَبُ عَنِّي هَذَا الَّذِي قَذِرَني النَّاسُ؛ فَمَسَحَهُ فَذَهبَ عَنْهُ وأُعْطِيَ شَعرًا حَسَنًا. قالَ: فَأَيُّ المَالِ أَحَبُّ إِليْكَ؟ قَالَ: البَقَرُ، فَأُعْطِيَ بَقَرَةً حَامِلًا، وَقالَ: بَارَكَ الله لَكَ فِيهَا.
فَأَتَى الأَعْمَى، فَقَالَ: أَيُّ شَيءٍ أَحَبُّ إِلَيْكَ؟ قَالَ: أَنْ يَرُدَّ اللهُ إِلَيَّ بَصَرِي (1) فَأُبْصِرُ النَّاسَ؛ فَمَسَحَهُ فَرَدَّ اللهُ إِلَيْهِ بَصَرهُ. قَالَ: فَأَيُّ المَالِ أَحَبُّ إِليْكَ؟ قَالَ: الغَنَمُ، فَأُعْطِيَ
شَاةً والدًا، فَأَنْتَجَ هذَانِ وَوَلَّدَ هَذَا، فَكانَ لِهذَا وَادٍ مِنَ الإِبلِ، وَلِهذَا وَادٍ مِنَ البَقَرِ، وَلِهَذَا وَادٍ مِنَ الغَنَمِ.
ثُمَّ إنَّهُ أَتَى الأَبْرَصَ في صُورَتِهِ وَهَيئَتِهِ، فَقَالَ: رَجلٌ مِسْكينٌ قَدِ انقَطَعَتْ بِيَ الحِبَالُ في سَفَري فَلا بَلاغَ لِيَ اليَومَ إلاَّ باللهِ ثُمَّ بِكَ، أَسْأَلُكَ بِالَّذي أَعْطَاكَ اللَّونَ الحَسَنَ، والجِلْدَ الحَسَنَ، وَالمَالَ، بَعِيرًا أَتَبَلَّغُ بِهِ في سَفَري، فَقَالَ: الحُقُوقُ كثِيرةٌ. فَقَالَ: كأنِّي أَعْرِفُكَ، أَلَمْ تَكُنْ أَبْرَصَ يَقْذَرُكَ النَّاسُ فقيرًا فأعْطَاكَ اللهُ!؟ فَقَالَ: إِنَّمَا وَرِثْتُ هَذَا المالَ كَابِرًا عَنْ كَابِرٍ، فَقَالَ: إنْ كُنْتَ كَاذِبًا فَصَيَّرَكَ اللهُ إِلَى مَا كُنْتَ.
وَأَتَى الأَقْرَعَ في صُورَتِهِ وَهَيْئَتِهِ، فَقَالَ لَهُ مِثْلَ مَا قَالَ لِهَذا، وَرَدَّ عَلَيهِ مِثْلَ مَا رَدَّ هَذَا، فَقَالَ: إنْ كُنْتَ كَاذِبًا فَصَيَّرَكَ اللهُ إِلَى مَا كُنْتَ.
وَأَتَى الأَعْمَى في صُورَتِهِ وَهَيْئَتِهِ، فَقَالَ: رَجُلٌ مِسْكينٌ وابنُ سَبيلٍ انْقَطَعتْ بِيَ الحِبَالُ في سَفَرِي، فَلا بَلاَغَ لِيَ اليَومَ إلاَّ بِاللهِ ثُمَّ بِكَ، أَسأَلُكَ بالَّذِي رَدَّ عَلَيْكَ بَصَركَ شَاةً أَتَبَلَّغُ بِهَا في سَفري؟ فَقَالَ: قَدْ كُنْتُ أعمَى فَرَدَّ اللهُ إِلَيَّ بَصَرِي، فَخُذْ مَا شِئْتَ وَدَعْ مَا شِئْتَ، فَوَاللهِ ما أجْهَدُكَ اليَومَ بِشَيءٍ أخَذْتَهُ للهِ - عز وجل. فَقَالَ: أَمْسِكْ مالَكَ فِإنَّمَا ابْتُلِيتُمْ. فَقَدْ رضي الله عنك، وَسَخِطَ عَلَى صَاحِبَيكَ» (1) مُتَّفَقٌ عَلَيهِ. (2)
و «النَّاقةُ العُشَرَاءُ» بضم العين وفتح الشين وبالمد: هي الحامِل. قوله:
«أنْتَجَ» وفي رواية: «فَنتَجَ» معناه: تولَّى نِتاجها، والناتج لِلناقةِ كالقابِلةِ للمرأةِ. وقوله: «وَلَّدَ هَذَا» هُوَ بتشديد اللام: أي تولى ولادتها، وَهُوَ بمعنى أنتج في الناقة، فالمولّد، والناتج، والقابلة بمعنى؛ لكن هَذَا لِلحيوان وذاك لِغيرهِ. وقوله: «انْقَطَعَتْ بي الحِبَالُ» هُوَ بالحاءِ المهملةِ والباءِ الموحدة: أي الأسباب. وقوله: «لا أجْهَدُكَ» معناه: لا أشق عليك في رد شيء تأخذه أَوْ تطلبه من مالي. وفي رواية البخاري: «لا أحمَدُكَ» بالحاءِ المهملة والميمِ ومعناه: لا أحمدك بترك شيء تحتاج إِلَيْه، كما قالوا: لَيْسَ عَلَى طولِ الحياة ندم: أي عَلَى فواتِ طولِها.
হাদীস নং: ৬৬
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ অধ্যায় ৫
মুরাকাবা-সর্বাবস্থায় আল্লাহর ধ্যান ও স্মরণ।
৬৬। কে বুদ্ধিমান, কে নির্বোধ:

হযরত আবু ইয়া'লা শাদ্দাদ ইবনে আওস রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজে নিজের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের (জীবনের) জন্য আমল করে। আর দুর্বল (নির্বোধ) ওই ব্যক্তি, যে নিজেকে ইন্দ্রিয়ের (নফসের) অনুগামী বানায় আবার আল্লাহর কাছে আশা রাখে- তিরমিযী। (হাদীস নং ২৪৫৯)
مقدمة الامام النووي
5 - باب المراقبة
66 - السابع: عن أبي يعلى شداد بن أوس - رضي الله عنه - عن النَّبيّ - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «الكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ، وَعَمِلَ لِمَا بعدَ المَوتِ، والعَاجِزُ مَنْ أتْبَعَ نَفْسَهُ هَواهَا وَتَمنَّى عَلَى اللهِ». رواه الترمذي، وَقالَ: «حديث حسن». (1)
قَالَ الترمذي وغيره من العلماء: معنى «دَانَ نَفْسَهُ»: حاسبها.
হাদীস নং: ৬৭
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ অধ্যায় ৫
মুরাকাবা-সর্বাবস্থায় আল্লাহর ধ্যান ও স্মরণ।
৬৭। অহেতুক সবকিছু পরিহার ইসলামের অন্যতম প্রধান সৌন্দর্য:

হযরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ব্যক্তির ইসলামের একটি সৌন্দর্য হল যা-কিছু অনর্থক তা পরিহার করা- তিরমিযী হাদীস নং ২৩১৭।
এটি একটি হাসান হাদীস।
مقدمة الامام النووي
5 - باب المراقبة
67 - الثامن: عن أبي هريرة - رضي الله عنه - قَالَ: قَالَ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم: «مِنْ حُسْنِ إسْلامِ المَرْءِ تَرْكُهُ مَا لاَ يَعْنِيهِ». حديث حسن رواه الترمذي وغيرُه. (1)
হাদীস নং: ৬৮
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ অধ্যায় ৫
মুরাকাবা-সর্বাবস্থায় আল্লাহর ধ্যান ও স্মরণ।
হাদীছ নং: ৬৮

এই হাদীছটি এই অধ্যায়ের সাথে অপ্রাসঙ্গিক হওয়ায় এখান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
مقدمة الامام النووي
5 - باب المراقبة
68 - التاسع: عن عُمَرَ - رضي الله عنه - عَنِ النَّبيّ - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «لاَ يُسْأَلُ الرَّجُلُ فِيمَ ضَرَبَ امْرَأَتَهُ». رواه أبو داود وغيره. (1)
হাদীস নং: ৬৯
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ তাকওয়ার ব্যাখ্যা, গুরুত্ব ও ফযীলত

তাকওয়া (تقوى) শব্দটির উৎপত্তি وقاية থেকে। وقاية অর্থ: কষ্টদায়ক ও ক্ষতিকর জিনিস হতে কোনও কিছু রক্ষা করা।
তাকওয়া অর্থ কষ্টদায়ক ও ক্ষতিকর জিনিস হতে নিজেকে রক্ষা করা। ক্ষতিকর জিনিস থেকে আত্মরক্ষা করা হয় সে জিনিসের প্রতি ভীতির কারণে। তাই রূপকার্থে ভীতিকেও তাকওয়া বলে, বিশেষত আল্লাহভীতিকে। কেননা আল্লাহর ভয় থাকলেই তাঁর আদেশ-নিষেধ অমান্য করা হতে নিজেকে রক্ষা করা হয়। শরীআতের পরিভাষায় তাকওয়া বলা হয় গুনাহের কাজ থেকে বেঁচে থাকাকে। গুনাহ হয় আল্লাহ যা আদেশ করেছেন তা পালন না করলে এবং যা নিষেধ করেছেন তাতে লিপ্ত হলে। গুনাহ ও পাপাচারে লিপ্ত হলে আল্লাহ তাআলা নারাজ হন। কিয়ামতে তিনি গুনাহগার ব্যক্তিকে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি দিবেন। কাজেই গুনাহ ও পাপকর্ম মানুষের পক্ষে সর্বাপেক্ষা ক্ষতিকর বিষয়। এর থেকে বেঁচে থাকা সর্বাপেক্ষা বেশি জরুরি। গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা হয় শরীআতের আদেশ-নিষেধ মানার দ্বারা। সুতরাং শরীআতের আদেশ-নিষেধ অনুসরণের মাধ্যমে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকারই নাম তাকওয়া। আবু ইয়াযীদ বিসতামী [বায়েজিদ বোস্তামী] রহ. বলেন, যখন কোনও কথা বলা হবে, আল্লাহরই জন্য বলা হবে এবং যখন কোনও কাজ করা হবে, আল্লাহরই জন্য করা হবে- এরই নাম তাকওয়া।
অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকলে তাকওয়ার উপর চলা সহজ। নয়তো ব্যাপারটা অত্যন্ত কঠিন। কেননা মানুষের আছে নফস ও কুপ্রবৃত্তি। বাইরে আছে শয়তানের ছলনা। চতুর্দিকে পাপের প্রলোভন। মন তাতে খুব আকৃষ্ট হয়। গুনাহমাত্রই আনন্দদায়ী। তাতে ক্ষণিকের আনন্দ পাওয়া যায়। আল্লাহভীতি ছাড়া তা থেকে বাঁচা খুব কঠিন। তাই ইহজীবনের পদে পদে দরকার অন্তরে আল্লাহভীতি জাগ্রত করা ও সতর্ক হয়ে চলা। একদিন হযরত উমর রাযি. হযরত উবাঈ ইবন কা'ব রাযি.-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাকওয়া কী? তিনি বললেন, আপনি কি কখনও এমন পথ দিয়ে চলেছেন, যে পথে শুধু কাঁটা আর কাঁটা? হযরত উমর রাযি. বললেন, হাঁ চলেছি। হযরত উবাঈ রাঃ বললেন, তখন কী করেছেন? তিনি বললেন, কাপড়চোপড় গুটিয়ে ধরেছি এবং খুব সতর্ক হয়ে চলেছি। হযরত উবাঈ রাঃ বললেন, এটাই তাকওয়া।
তাকওয়া অতিবড় এক গুণ। যাবতীয় কল্যাণ এর মধ্যে নিহিত। আগের পরের সকল জাতিকে আল্লাহ তাআলা তাকওয়া অবলম্বনের আদেশ দিয়েছেন। মানুষ যত ভালো গুণ অর্জন করতে পারে, তাকওয়া তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। হযরত আবু উমামা রাঃ বর্ণিত এক হাদীছে আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- মু'মিন ব্যক্তি তাকওয়া ও আল্লাহভীতির পর নেক স্ত্রীর চেয়ে উত্তম কিছু লাভ করতে পারে না। এর দ্বারা বোঝা যায় মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন হল তাকওয়া।
তাকওয়া অবলম্বনের ফল হচ্ছে আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টি এবং তাঁর আযাব ও গযব থেকে রক্ষা পাওয়া। যে সকল বৈধ কাজ করলে ক্রমান্বয়ে গুনাহে লিপ্ত হয়ে পড়ার আশংকা থাকে, তা থেকে দূরে থাকাও তাকওয়ার অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে চলে, তাকে মুত্তাকী বলা হয়ে থাকে।
যেহেতু তাকওয়ার মাধ্যমেই গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা ও শরীআত অনুযায়ী চলা সম্ভব হয়, তাই ইসলামে এর গুরুত্ব অপরীসীম। কুরআন মাজীদের বহু আয়াতে তাকওয়া অবলম্বন ও আল্লাহভীতির আদেশ দেওয়া হয়েছে। এ সম্পর্কে আছে বহু হাদীছ। ইমাম নববী রহ. এ অধ্যায়ে কয়েকটি আয়াত ও কিছু হাদীছ উল্লেখ করেছেন। নিচে তার অর্থ ও ব্যাখ্যা পেশ করা হচ্ছে।

তাকওয়া সম্পর্কিত আয়াত
এক নং আয়াত
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَتِهِ
অর্থ : হে মু'মিনগণ! অন্তরে আল্লাহকে সেইভাবে ভয় কর, যেভাবে তাকে ভয় করা উচিত।

ব্যাখ্যা
আল্লাহ তা'আলাকে কেমন ভয় করা উচিত, তার ব্যাখ্যা এক হাদীছে এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁর আনুগত্য করা হবে, কখনও অবাধ্যতা করা হবে না; তাঁকে স্মরণ করা হবে, কখনও ভোলা হবে না এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করা হবে, কখনও অকৃতজ্ঞতা করা হবে না।
মুজাহিদ রহ.-এর মতে এর অর্থ আল্লাহর পথে যথার্থভাবে জিহাদ করা এবং এ পথে এমন অবিচলতা ও স্থিতিশীলতা প্রদর্শন করা, যাতে নিন্দুকের নিন্দার কোনও পরওয়া করা না হয়। সেইসংগে সত্য ও ন্যায়ের উপর এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকা যে, নিজের পিতামাতা ও সন্তান-সন্তুতির বিপক্ষে গেলেও তা থেকে বিচ্যুত হবে না।
হযরত আনাস রাযি. বলেন, বান্দা যতক্ষণ পর্যন্ত নিজ জিহ্বার পুরোপুরি হেফাজত না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকওয়ার হক আদায় করতে পারবে না।
কেউ বলেন, এ আয়াতে সর্বোচ্চ স্তরের তাকওয়া অবলম্বনের হুকুম দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বান্দা সমস্ত মাখলুকের মহব্বত থেকে নিজ অন্তকরণকে মুক্ত ও ছিন্ন করে আল্লাহর স্মরণ ও ভালোবাসায় এমনভাবে নিমজ্জিত থাকবে যে, মুহূর্তের জন্যও তা থেকে গাফেল হবে না।
কোনও কোনও বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, এ আয়াত নাযিল হলে সাহাবায়ে কিরামের কাছে বিষয়টা একটু কঠিন মনে হয়েছিল। তাই তাঁরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আরয করেছিলেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটা কার পক্ষে সম্ভব? তখন এই আয়াত নাযিল হয়-
فَاتَّقُوا اللهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ
"সুতরাং তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করে চলো।'
তখন তাঁদের অন্তরের ভার লাঘব হয় এবং ব্যাপারটা তাঁদের কাছে সহজসাধ্য মনে হয়।

দুই নং আয়াত
فَاتَّقُوا اللهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ
অর্থ : সুতরাং তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করে চলো।

ব্যাখ্যা
এ আয়াত দ্বারা উপরের আয়াতের ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বোঝানো হচ্ছে যে, আল্লাহকে যথার্থ ভয় করার এক অর্থ তো মহামহিম আল্লাহর শান মোতাবেক ভয় করা। সেরকম ভয় করা কোনও মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। প্রথম আয়াত দ্বারা সে অর্থ বোঝার অবকাশ ছিল। সেজন্যই সাহাবায়ে কিরাম প্রশ্ন করেছিলেন। এ আয়াতে বলে দেওয়া হয়েছে, আল্লাহকে যেভাবে ভয় করা উচিত সেভাবে ভয় করার মানে আল্লাহর শান মোতাবেক ভয় করা নয়; বরং তোমাদের সাধ্য অনুযায়ী ভয় করা। অর্থাৎ বান্দার পক্ষে আল্লাহকে যতটুকু ভয় করা সম্ভব ততটুকু ভয় করে চলাই যথার্থ তাকওয়া। তার মানে বান্দা নিজসাধ্য মোতাবেক আল্লাহকে ভয় করলে ধরে নেওয়া হবে সে আল্লাহর শান মোতাবেক তাকে ভয় করেছে। এটা বান্দার প্রতি আল্লাহ তাআলার কত বড়ই না মেহেরবানী যে, তিনি দুর্বল বান্দার সীমিত শক্তির তাকওয়াকে তাঁর নিজ শান মোতাবেক তাকওয়া হিসেবে গ্রহণ করে নেন। এজন্য বান্দার উচিত মনেপ্রাণে শোকর আদায় করা। সে শোকর তখনই আদায় হবে, যখন বান্দা আল্লাহ তাআলা যা-কিছু আদেশ করেছেন, নিজ শক্তি-সামর্থ্য অনুযায়ী তা পালন করবে এবং তিনি যা-কিছু নিষেধ করেছেন, নিজ সাধ্য অনুযায়ী তা থেকে বিরত থাকবে। প্রকৃতপক্ষে শরীআতের কোনও হুকুমই সাধ্যের অতীত নয়। বান্দার পক্ষে পালন করা সম্ভব নয় এমন কোনও আদেশ বা নিষেধ তাকে করা হয়নি। ইরশাদ হয়েছে-
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
"আল্লাহ কাউকে তার ক্ষমতার বাইরে কোনও হুকুম দেন না।"
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে-
وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ
“তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের প্রতি কোনও সংকীর্ণতা আরোপ করেননি।”
আরও ইরশাদ হয়েছে-
يُرِيدُ اللهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ
"আল্লাহ তোমাদের পক্ষে যা সহজ সেটাই চান, তোমাদের জন্য জটিলতা চান না।"
মোটকথা, শরীআতের প্রতিটি বিধানই এমন, যা বান্দার পক্ষে পালন করা সম্ভব। তা পালন করার ক্ষমতা বান্দার আছে। এবং সহজও বটে। অর্থাৎ তা পালনে বান্দার সর্বশক্তি নিয়োগের দরকার হয় না। স্বাভাবিক শক্তি-ক্ষমতা ব্যবহার দ্বারাই তা পালন করা যায়। নামায, রোযাসহ যে কোনও বিধানের প্রতি দৃষ্টি দিলে বিষয়টা সহজেই বুঝে আসে। তারপর আবার ওযর অজুহাতের প্রতিও লক্ষ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সুস্থকালে কোনও বিধান যেভাবে পালন করতে হয়, ওযর অবস্থায় যে ঠিক সেভাবেই তা পালন করতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা ইসলামে নেই। বরং তখন যেভাবে পালন করা সম্ভব সেভাবেই পালন করবে। তাতেই সে সুস্থতাকালে বিধানটি যেভাবে পরিপূর্ণরূপে আদায় করতে পারত, সেভাবে আদায় করার ছওয়াব পেয়ে যাবে। যেমন নামাযের বিষয়টা মনে করুন। ওযরের কারণে যে ব্যক্তি দাড়িয়ে পড়তে পারে না, সে বসে পড়লেও নামাযের বিধান পালনকারীরূপে গণ্য হবে এবং দাঁড়িয়ে পড়ার সমান ছওয়াব পাবে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রাযি.-কে লক্ষ্য করে বলেন, দাঁড়িয়ে নামায পড়বে। যদি তা না পার, বসে পড়বে। আর যদি তাও না পার, তবে শুয়ে পড়বে।
অন্যান্য বিধানসমূহের ব্যাপারও এরকমই। ওযর অবস্থায় যেভাবে পালন করা সম্ভব সেভাবে পালনের সুযোগ রাখা হয়েছে। যদি সেভাবেও পালন করা না হয়, তবে বিধান অমান্যকারী সাব্যস্ত হবে। এ আয়াতে সে কথাই বলা হয়েছে যে, আল্লাহকে ভয় কর তোমাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব। অর্থাৎ শরীআতের যে হুকুম তোমাদের পক্ষে যেভাবে পালন করা সম্ভব, সেভাবে পালন করতে অবহেলা করো না। সেভাবে পালন করলেই ধরে নেওয়া হবে তোমরা আল্লাহকে যথার্থ ভয় করেছ।

তিন নং আয়াত
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا
অর্থ : 'হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্য-সঠিক কথা বল।'

ব্যাখ্যা
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা মু'মিনদেরকে দু'টি বিষয়ের আদেশ দিয়েছেন। (ক) তাকওয়া অবলম্বন করা ও (খ) সত্য-সঠিক কথা বলা।
সত্য-সঠিক কথার অর্থ
সত্য-সঠিক কথা বলতে এমন কথাকে বোঝায়, যা বাস্তবসম্মত হয় এবং স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী হয়। কথা বাস্তবসম্মত না হলে তা মিথ্যা হয়। আর স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী না হলে তা বাস্তবিকপক্ষে সত্য হলেও ভুল প্রয়োগের ফলে বেঠিক হয়ে যায়। তাই কথা বলার সময় দু'টি বিষয়ই লক্ষণীয়। সতর্ক থাকতে হবে যাতে তা অসত্য ও অবাস্তব কথা না হয় এবং লক্ষ রাখতে হবে যাতে স্থান-কাল-পাত্র মোতাবেক হয়। কুরআন ও হাদীছে স্থান-কাল-পাত্র লক্ষ করে কথা বলার বিশেষ তাকীদ করা হয়েছে। কেননা সেদিকে লক্ষ না রাখলে সত্য কথাও নিষ্ফল হয়ে যায়। বস্তুত প্রত্যেক কথারই একটা উপযুক্ত স্থান থাকে। থাকে উপযুক্ত কাল ও উপযুক্ত পাত্র। সেদিকে লক্ষ না রাখলে কথা কেবল নিষ্ফলই হয় না, অনেক সময় উল্টো ফলও হয়। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষ বিশেষ কথা সাধারণভাবে সকলের সামনে না বলে বিশিষ্ট সাহাবীদেরকেই বলতেন, যাতে তা দ্বারা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি না হয়। হযরত আলী রাযি. বলেন, মানুষের সাথে কথা বল তাদের আকল-বুদ্ধি অনুপাতে। তোমরা কি চাও আল্লাহ ও তার রাসূলকে অবিশ্বাস করা হোক? অর্থাৎ হাদীছের যে বিষয়টা কোনও ব্যক্তির বোধবুদ্ধির অতীত হয়, তবে সে বিষয়টা তার সামনে না বলাই বাঞ্ছনীয়। কেননা বুঝতে না পারার দরুন সে তা অস্বীকার করে বসবে। তাতে অস্বীকার করা হবে কুরআন ও হাদীছ। এ অস্বীকৃতির দরুন তার যে গুনাহ হবে, তার জন্য বক্তাকেই দায়ী থাকতে হবে। কারণ সে কথাটি বিবেচনাবোধের সাথে বলেনি।
সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ এবং উপদেশ-নসীহত করার ক্ষেত্রে এ বিষয়টা বিশেষভাবে লক্ষ রাখা উচিত। কারও দ্বারা গোপনে একাকী ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে গেলে তাকে জনসম্মুখে তিরষ্কার করা সমীচীন নয়। কেউ গাড়ি ধরার জন্য ছুটছে, রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছে বা এরকম অন্য কোনও ব্যস্ততার ভেতর আছে, এ অবস্থায় তাকে উপদেশ দান করা নিতান্তই ভুল। পিতামাতা, গুরুজন ও বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তির দ্বারা ভুল-ত্রুটি হয়ে গেলে সেজন্য তাঁকে শক্ত ভাষায় সতর্ক করা যায় না। বিশেষত পিতামাতার ক্ষেত্রে তো শক্ত ভাষার ব্যবহার কঠিন অপরাধ। তাদের উপদেশদান করতে হয় তাদের মর্যাদা রক্ষা করে এবং তা করতে হয় নম্র-কোমল ভাষায়।
মোটকথা নিজ কথাকে যেমন অশ্লীলতা, পরনিন্দা, গালমন্দ, শিরক, বিদআত, মিথ্যাচার প্রভৃতি থেকে হেফাজত করা জরুরি, তেমনি জরুরি শরীআতসম্মত কথাকে স্থান-কাল-পাত্রের বিবেচনাবোধ ছাড়া যত্রতত্র বলা হতেও বিরত থাকা। এ উভয় শর্ত রক্ষার সাথে যে কথা বলা হবে, সেটাই সত্য-সঠিক কথা এবং এ আয়াতে তাকওয়ার হুকুম দানের পর এরূপ কথা বলারই আদেশ করা হয়েছে।
তাকওয়ার সাথে সত্য-সঠিক কথার সম্পর্ক
প্রশ্ন হতে পারে, তাকওয়ার হুকুম দানের পর বিশেষভাবে সত্য সঠিক কথা বলার হুকুম দেওয়ার কারণ কী? কারণ এই যে, মানুষ তাকওয়া পরিপন্থী কাজ বেশির ভাগ মুখের দ্বারাই করে থাকে। বলা হয়ে থাকে, জিহ্বা আকারে অনেক ছোট কিন্তু সে অপরাধ করে অনেক বড় বড়। এক হাদীছে আছে- "প্রতিদিন মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জিহ্বাকে লক্ষ্য করে বলে, তুমি আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। তুমি সোজা থাকলে আমরাও সোজা থাকব, আর তুমি বেঁকে গেলে আমরাও বেঁকে যাব"। অনেক সময় মুখ কোনও বেফাঁস কথা বলে বসে। আর তার অশুভ পরিণাম থেকে বাঁচার জন্য অন্যসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকেও ব্যবহার করা হতে থাকে। কিন্তু শেষরক্ষা হয় না। কথাটির জন্য ধরা পড়তে হয় এবং কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হয়। কথা বলে কেবল মুখ, কিন্তু তার দায় ভোগ করতে হয় গোটা শরীরকে। এজন্যই কথা বলার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। এজন্যই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীছে বলেন-
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে, নয়তো চুপ থাকে।”
আরও ইরশাদ হয়েছে-
إنَّ الصَّدَقَ يَهْدِي إلى البروإن البر يَهْدِي إلى الجنة، وإنَّ الرَّجُلَ لَيَصْدُقُ حَتَّى يُكتب عِنْدَ اللهِ صِدِّيقًا، وَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إلى الفُجُوْرِ وَ إِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ، وَ إِنَّ الرَّجُل ليكذب حتى يُكتب عِندَ اللهِ كَذَابًا.
"সত্যবাদিতা নেককাজের পথ দেখায়। আর নেককাজ জান্নাতে পৌঁছায়। ব্যক্তি সত্যকথা বলতে থাকে। এমনকি একসময় সে আল্লাহর কাছে 'সিদ্দীক' নামে লিখিত (অভিহিত) হয়। অন্যদিকে মিথ্যাবাদিতা পাপাচারের পথ দেখায়। আর পাপাচার জাহান্নামে পৌঁছায়। ব্যক্তি মিথ্যাচার করতে থাকে। অবশেষে আল্লাহর কাছে সে 'কায্যাব' (মহামিথ্যুক) নামে লিখিত (অভিহিত) হয়।
এ হাদীছ জানাচ্ছে সততা ও সত্যবাদিতা অবলম্বন করে চললে সবরকম নেককাজ করার তাওফীক লাভ হয়। আর মিথ্যাচারে লিপ্ত থাকার পরিণাম হয় যাবতীয় পাপকর্মে জড়িয়ে পড়া। আর তাকওয়া বলা হয় শরীআত মোতাবেক চলা তথা সর্বপ্রকার পাপকর্ম থেকে বিরত থেকে সৎকর্মে মশগুল থাকাকে। তো যে ব্যক্তি তাকওয়ার সাথে জীবনযাপন করতে চাবে, তার কর্তব্য হবে মুখের হেফাজত করা তথা সত্য-সঠিক কথা বলতে সচেষ্ট থাকা। এ কারণেই আয়াতে তাকওয়া অবলম্বনের হুকুম দেওয়ার পর সত্য-সঠিক কথা বলতে আদেশ করা হয়েছে। যেন বলা হয়েছে, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, বিশেষত কথা বলার ক্ষেত্রে। যখনই কোনও কথা বলবে, আল্লাহর দিকে তাকিয়ে বলবে, যাতে জবানের পুরোপুরি হেফাজত করতে সক্ষম হও এবং সত্য সঠিক কথা বলতে পার।
যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করবে এবং সত্য সঠিক কথা বলতে সচেষ্ট থাকবে, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তার জন্য দু'টি পুরস্কার ঘোষিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে—
يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ
“তাহলে আল্লাহ তোমাদের কার্যাবলী শুধরে দেবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন।” আহযাব: ৭১
সুবহানাল্লাহ! কত বড় পুরস্কার। আল্লাহ তাআলা কার্যাবলী শুধরে দেবেন অর্থাৎ এতদিন যে সমস্ত ভুল-ত্রুটি করা হত, সেগুলো শোধরানোর তাওফীক দান করবেন। ফলে আর ভুল-ত্রুটি হবে না। যাবতীয় কাজ শরীআত মোতাবেক সম্পন্ন করা যাবে। আর তিনি পাপরাশি মাফ করবেন। অর্থাৎ অতীতে তাকওয়ার পথে না চলার কারণে এবং জবানের হেফাজত না করার কারণে যেসব গুনাহ হয়ে গেছে, তিনি তা মাফ করে দেবেন। সেইসংগে এখনও কোনো পাপকর্ম হয়ে গেলে সে ব্যাপারেও তাওবার তাওফীক দান করবেন। বস্তুত বান্দার পক্ষে আল্লাহর কাছে ক্ষমা পাওয়ার চেয়ে বড় কোনও পুরস্কার হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলের জীবনের যাবতীয় পাপ ক্ষমা করে দিন - আমীন। -

চার নং আয়াত
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجَانَ وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
অর্থ : যে-কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার জন্য সংকট থেকে উত্তরণের কোনও পথ তৈরি করে দেবেন। এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিযিক দান করবেন, যা তার ধারণার বাইরে। তালাক ২-৩

ব্যাখ্যা
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে চলে ও জীবনের সব ক্ষেত্রে শরীআতের আদেশ-নিষেধ অনুসরণ করে, আল্লাহ তাআলা তার জীবনযাপন সহজ করে দেন এবং তাকে সকল সংকট থেকে মুক্তি দান করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর মুত্তাকী বান্দাকে বিপদের মধ্যে ফেলে রাখেন না। জীবনের যে ক্ষেত্রেই তার সংকট দেখা দেয়, তাকওয়ার বদৌলতে তা থেকে তাকে মুক্তি দিয়ে দেন। আল্লাহভীরু বান্দার পক্ষে এটা কতই না আশ্বাসবাণী! সে যদি কখনও কোনও বিপদে পড়ে, তবে অস্থির হওয়ার কোনও কারণ নেই। তার কর্তব্য নিজ তাকওয়া ও আল্লাহভীরুতা বজায় রাখা। তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাকে সে বিপদ থেকে উদ্ধার করবেনই। হয় বাহ্যিকভাবেই আশুমুক্তি দান করবেন। নয়তো তার অন্তরে হিম্মত ও অবিচলতা দান করবেন। ফলে আখিরাতের ছওয়াবের আশায় সে বিপদে ধৈর্যধারণ করবে এবং অন্তরে স্বস্তিবোধ করবে। এটাও এক প্রকার মুক্তিলাভ। আত্মিক মুক্তিলাভ।
তাকওয়া অবলম্বনের ফায়দা
যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তারা যে বিপদ-আপদে আল্লাহ তাআলার সাহায্য পায়, হাদীছ গ্রন্থসমূহে এর বহু উদাহরণ আছে। তাছাড়া বুযুর্গানে দীনের জীবনেও এর বহু নজির আছে। হাদীছ গ্রন্থসমূহে ওই ঘটনা তো প্রসিদ্ধ, যাতে তিন ব্যক্তি একটি পাহাড়ের গুহায় আটকা পড়েছিল। সে অবস্থায় তাদের প্রত্যেকে তাকওয়াভিত্তিক যে আমল করেছিল, তার অছিলায় আল্লাহ তাআলার কাছে দু'আয় লিপ্ত হয়। ফলে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে সে সংকট থেকে মুক্তিদান করেন। অনুরূপ আমরাও যদি আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করে চলি, তবে অবশ্যই ভরসা রাখতে পারি যে, তিনি যে-কোনও সংকটে আমাদের সাহায্য করবেন এবং যে-কোনও বিপদে মুক্তিদান করবেন।
এখানে দ্বিতীয় আশ্বাসবাণী শোনানো হয়েছে যে, তাকওয়া অবলম্বন করলে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে অকল্পনীয়ভাবে রিযিক দান করবেন। সাধারণত মানুষ জীবিকার ক্ষেত্রে খুবই ত্বরাপ্রবণ। একটু অর্থসংকট হলেই সে সত্য-সঠিক পথ থেকে টলে যায়। সামান্য কষ্টেই হারাম উপার্জনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এমনিভাবে কেউ যদি হারাম উপার্জনে লিপ্ত থাকে, তবে সহজে তা ছাড়তে পারে না। তার ভয় এটা ছেড়ে দিলে উপার্জনের উপায় কী হবে? অপেক্ষায় থাকে, যদি কখনও হালাল উপার্জনের সুযোগ হয় তবে এ হারাম পন্থা ছেড়ে দেবে। এভাবে বছরের পর বছর গড়াতে থাকে। হারাম পন্থা আর পরিত্যাগ করা হয় না। এ আয়াত বলছে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে চলবে, আল্লাহ তাআলা তাকে তার ধারণার বাইরে জীবিকা দান করবেন।
সুতরাং ওহে মু'মিন মুত্তাকী! তুমি নিশ্চিত ভরসা রাখতে পার যে, অবৈধ উপার্জন ছেড়ে দিলে তিনি কোনও না কোনও বৈধ উপার্জনের ব্যবস্থা তোমাকে করেই দেবেন। তিনি রায্যাক। সকল সৃষ্টির জীবিকা তিনিই দান করে থাকেন। তুমি তাঁকে ভয় করে অবৈধ পন্থা পরিত্যাগ করবে আর তিনি তোমাকে অনাহারে রাখবেন? কিংবা আল্লাহর ভয়ে তুমি অল্প আয়-রোজগারে ধৈর্যধারণ করবে আর তিনি তোমাকে কষ্টে ফেলে রাখবেন? না, কখনোই নয়। তুমি ধৈর্যধারণ করতে পারলে তিনি তোমার রোজগারে বরকত দান করবেন। তোমার জন্য প্রাচুর্যের দুয়ার খুলে দেবেন। তুমি তাঁর উপর ভরসা রেখে হারাম উপার্জন ছেড়ে দিলে অবশ্যই তোমাকে বৈধ জীবিকা দান করবেন। সুতরাং তাকওয়া অবলম্বন কর। তাঁকে ভয় করে চল। তুমি তোমার কল্পনার বাইরে রিযিক পেয়ে যাবে। তা শীঘ্র হোক বা একটু দেরিতে। তাড়াহুড়া করা চলবে না। বিলম্ব দেখা গেলে তাকে পরীক্ষা মনে করবে। আল্লাহর কাছ থেকে পেতে চাইলে একটু পরীক্ষা তো তিনি করতেই পারেন। সুতরাং আল্লাহর ওয়াদার উপর ভরসা রাখ ও সবর অবলম্বন কর। সবর করলে সে পরীক্ষায়ও তিনি সাহায্য করবেন। অতঃপর দুনিয়ায়ও তোমার অর্থসংকট মোচন হবে এবং আখিরাতেও পাবে মহাপুরস্কার।

পাঁচ নং আয়াত
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانَا يُكَفِر عَنكُمْ سَيَأْتِكُمْ وَيَغْفِرُ لَكُمْ وَالله لو

الْفَضْلِ الْعَظِيمِ
অর্থ : হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহর সঙ্গে তাকওয়ার নীতি অবলম্বন কর, তবে তিনি তোমাদেরকে (সত্য ও মিথ্যার মধ্যে) পার্থক্য করার শক্তি দেবেন, তোমাদের পাপ মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ মহা অনুগ্রহের মালিক। আনফাল ২৯

ব্যাখ্যা
তাকওয়া অবলম্বনের তিনটি পুরস্কার
এ আয়াতে তাকওয়ার তিনটি পুরস্কার ঘোষিত হয়েছে।
প্রথম পুরস্কার : তাকওয়া অবলম্বন করলে আল্লাহ তা'আলা সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করার শক্তি দান করবেন। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শয়তানের কুমন্ত্রণা ও নফসের ওয়াসওয়াসার কারণে অনেক সময় মনে সন্দেহ দেখা দেয়। ফলে কোনও কোনও বিষয়ে অন্তরে বিভ্রম সৃষ্টি হয়। বিষয়টা ন্যায় না অন্যায়, বৈধ না অবৈধ এবং হক না বাতিল, তা বুঝতে কষ্ট হয়। ইদানীং সমাজে নানারকমের ফিতনা বিরাজ করছে। একেকজন দীনের একেকরকম ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হচ্ছে। প্রতিষ্ঠিত সত্য সম্পর্কেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। অনেক লোক তাতে খেই হারিয়ে ফেলে। কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। কিন্তু যারা মু'মিন মুত্তাকী, তারা দিশা হারায় না। আল্লাহ তা'আলা তাদের সাহায্য করেন। তিনি তাদের অন্তর্দৃষ্টি খুলে দেন। মনের ওয়াসওয়াসা দূর করে দেন। ফলে কোনটা হক ও কোনটা বাতিল তা সহজেই নির্ণয় করতে সক্ষম হয়।
তাকওয়া অবলম্বন ও আল্লাহভীতি দ্বারা দীনী জ্ঞান বৃদ্ধি পায় ও দীনের বুঝ-সমঝে গভীরতা আসে। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে না, সে অহরহ পাপকাজে লিপ্ত হয়। পাপকাজ করলে অন্তরে কালো দাগ পড়ে যায়। একপর্যায়ে সম্পূর্ণ অন্তর অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। সে অন্তরে দীনের বুঝ থাকে না। সে বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। এরূপ লোক নেককাজ ও বদকাজের পার্থক্য বুঝতে পারে না। তার কাছে হক-নাহক সমান মনে হয়। ফলে নির্বিচারে যে-কোনও কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। পক্ষান্তরে আল্লাহভীরু লোক পাপকাজ থেকে দূরে থাকে। সে শরীআত মোতাবেক চলার চেষ্টা করে। যতবেশি নেককাজ করে, ততই তার অন্তর আলোকিত হয়। আল্লাহ তা'আলা তার জ্ঞানচক্ষু খুলে দেন। তার দীনের বুঝ বাড়তে থাকে। ফলে তার সামনে হক-বাতিল সুস্পষ্ট হয়ে যায়। এক বর্ণনায় আছে— “যে ব্যক্তি তার জানা বিষয়ে আমল করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে ওই সকল বিষয়ের জ্ঞান দান করেন, যা সে জানত না”। এটাও প্রমাণ করে যে, নেক আমল দ্বারা দীনের জ্ঞান বৃদ্ধি পায়। সুতরাং যে ব্যক্তি দীন সম্পর্কে নিজের জ্ঞান ও বুঝ-সমঝ বাড়াতে চায় এবং সকল বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত থেকে সহীহ শুদ্ধভাবে দীনের উপর চলার সংকল্প রাখে, তার উচিত তাকওয়া অবলম্বন করা ও সকল ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করা।
দ্বিতীয় পুরস্কার : পাপমোচন হওয়া। আগেই বলা হয়েছে তাকওয়া মানে শরীআতের বিধি-নিষেধ মেনে চলা। তো যে ব্যক্তি শরীআতের বিধি-নিষেধ মেনে চলবে, আল্লাহ তাআলা তার গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেবেন। যেমন বিভিন্ন হাদীছে আছে, আল্লাহ তাআলা নামায, রোযা প্রভৃতি ইবাদতের দ্বারা বান্দার পাপরাশি মিটিয়ে দেন। কুরআন মাজীদের অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে-
إِنَّ الْحَسَنتِ يُذْهِبْنَ السَّيَاتِ
“নিশ্চয়ই পুণ্যরাজি পাপরাশিকে মিটিয়ে দেয়।”
নেক আমল দ্বারা যেহেতু পাপ মোচন হয়, তাই এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায় তাকওয়া অবলম্বন করলে আল্লাহ তা'আলা বেশি বেশি নেক আমলেরও তাওফীক দান করেন। নেক আমলের তাওফীক লাভ করাটা অনেক বড় নিআমত। এর দ্বারা দুনিয়ায় শান্তি ও আখিরাতে মুক্তিলাভ হয়। সুতরাং এ নিআমত লাভের আশায় আমাদের প্রত্যেকের উচিত বেশি পরিমাণে তাকওয়ার গুণ অর্জন করা।
তৃতীয় পুরস্কার : আল্লাহর কাছে ক্ষমা লাভ। অর্থাৎ দুনিয়ায় যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করবে ও আল্লাহকে ভয় করে চলবে, আখিরাতে আল্লাহ তা'আলা তাকে তার পাপরাশির জন্য পাকড়াও করবেন না। বরং সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দিয়ে তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন ও জান্নাতে দাখিল করবেন।
আয়াতের শেষে বলা হয়েছে আল্লাহ মহা অনুগ্রহের মালিক। অর্থাৎ তাকওয়া অবলম্বন করলে যে আল্লাহ তা'আলা এ তিনটি পুরস্কার দান করেন, এটা তাঁর পক্ষে কঠিন কিছু নয়। বরং তিনি এত অনুগ্রহশীল যে, চাইলে বান্দাকে দীন-দুনিয়ার অপরিমিত নিআমতে ভরে দিতে পারেন। তাঁর ভাণ্ডারে কোনও কিছুর কমতি নেই। এর দ্বারা বান্দার অন্তরে আশা জাগানো উদ্দেশ্য যে, ওহে বান্দা! তুমি আল্লাহকে ভয় করে চল। তাহলে দীন-দুনিয়ার কোনও সংকট, কোনও অভাব ও কোনও দুঃখ-কষ্ট তোমার থাকবে না। তিনি তাঁর অফুরন্ত ভাণ্ডার থেকে অপরিমিত কল্যাণ তোমাকে দান করবেন।
৬৯। তাকওয়া সম্পর্কিত হাদীছসমূহ;
কে সর্বাপেক্ষা বেশি মর্যাদাবান:

হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশি মর্যাদাবান কে? তিনি বললেন, তাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা মর্যাদাবান সে ব্যক্তি, যে বেশি মুত্তাকী। সাহাবীগণ বললেন, আমরা আপনাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করিনি। তিনি বললেন, তবে আল্লাহর নবী ইউসুফ, যিনি আল্লাহর নবী (হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম)-এর পুত্র, তিনি আল্লাহর নবী (হযরত ইসহাক আলাইহিস সালাম)- এর পুত্র এবং তিনি খলীলুল্লাহ (হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম)-এর পুত্র। তারা বললেন, আমরা আপনাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করিনি। তিনি বললেন, তবে কি তোমরা আমাকে আরব গোত্রসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছ? তাদের মধ্যে যারা জাহিলী যুগে শ্রেষ্ঠ ছিল ইসলামেও তারাই শ্রেষ্ঠ, যদি দীনের জ্ঞান-সমঝ হাসিল করে - বুখারী ও মুসলিম । (বুখারী শরীফ হাদীস নং ৩৩৫৩, মুসলিম শরীফ হাদীস নং ২৩৭৮)
مقدمة الامام النووي
6 - باب في التقوى
69 - فالأول: عن أبي هريرةَ - رضي الله عنه - قَالَ: قِيلَ: يَا رسولَ الله، مَنْ أكرمُ النَّاس؟ قَالَ: «أَتْقَاهُمْ (1)». فقالوا: لَيْسَ عن هَذَا نسألُكَ، قَالَ: «فَيُوسُفُ نَبِيُّ اللهِ [ص:43] ابنُ نَبِيِّ اللهِ ابنِ نَبيِّ اللهِ ابنِ خليلِ اللهِ» (2) قالوا: لَيْسَ عن هَذَا نسألُكَ، قَالَ: «فَعَنْ مَعَادِنِ العَرَبِ (3) تَسْأَلوني؟ خِيَارُهُمْ في الجَاهِليَّةِ خِيَارُهُمْ في الإِسْلامِ إِذَا فقُهُوا». مُتَّفَقٌ عَلَيهِ. (4)
و «فَقُهُوا» بِضم القافِ عَلَى المشهورِ وَحُكِيَ كَسْرُها: أيْ عَلِمُوا أحْكَامَ الشَّرْعِ.
হাদীস নং: ৭০
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ অধ্যায়: ৬ তাকওয়া ও আল্লাহভীতি।
৭০। দুনিয়া পরীক্ষার স্থান:

হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাযি. হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, দুনিয়া মিষ্ট ও মোহনীয়। আর আল্লাহ তোমাদেরকে এখানে স্থলাভিষিক্ত বানিয়েছেন। তিনি দেখতে চান তোমরা কেমন কাজ কর। সুতরাং সতর্ক থাক দুনিয়া সম্পর্কে এবং সতর্ক থাক নারী সম্পর্কে। কেননা বনী ইসরাঈলের প্রথম ফিতনা ছিল নারীঘটিত - মুসলিম। (হাদীস নং ২৭৪২)
مقدمة الامام النووي
6 - باب في التقوى
70 - الثَّاني: عن أبي سعيد الخدري - رضي الله عنه - عن النَّبيّ - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «إنَّ الدُّنْيَا حُلْوَةٌ خَضِرةٌ، وإنَّ اللهَ مُسْتَخْلِفُكُمْ فِيهَا فَيَنْظُرَ كَيفَ تَعْمَلُونَ، فَاتَّقُوا الدُّنْيَا وَاتَّقُوا النِّسَاءَ؛ فإنَّ أَوَّلَ فِتْنَةِ بَنِي إسرائيلَ كَانَتْ في النِّسَاءِ». رواه مسلم. (1)
হাদীস নং: ৭১
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ অধ্যায়: ৬ তাকওয়া ও আল্লাহভীতি।
৭১। একটি মূল্যবান দুআ:

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআ করতেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْهُدَى وَالتَّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنى.
(হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট হিদায়াত, তাকওয়া, চারিত্রিক পবিত্রতা ও অমুখাপেক্ষিতা প্রার্থনা করছি।) - মুসলিম। (হাদীস নং ২৭২১)
مقدمة الامام النووي
6 - باب في التقوى
71 - الثالث: عن ابن مسعودٍ - رضي الله عنه: أنَّ النَّبيّ - صلى الله عليه وسلم - كَانَ يقول: «اللَّهُمَّ إنِّي أَسألُكَ الهُدَى، وَالتُّقَى، وَالعَفَافَ، وَالغِنَى (1)». رواه مسلم. (2)
হাদীস নং: ৭২
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ অধ্যায়: ৬ তাকওয়া ও আল্লাহভীতি।
৭২। ভুল কসমের ক্ষেত্রে করণীয়:

হযরত আবু তারীফ আদী ইবনে হাতিম তাঈ রাযি. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কোনও ব্যাপারে কসম করে, তারপর তা অপেক্ষা অধিকতর তাকওয়ার (আল্লাহভীতির) কোনও কাজ দেখে, সে যেন তাকওয়ার কাজটিই করে - মুসলিম। (হাদীস নং ১৬৫১)
مقدمة الامام النووي
6 - باب في التقوى
72 - الرابع: عن أبي طريفٍ عدِيِّ بن حاتمٍ الطائيِّ - رضي الله عنه - قَالَ: سمعتُ رسولَ الله - صلى الله عليه وسلم - يقول: «مَنْ حَلَفَ عَلَى يَمِينٍ ثُمَّ رَأَى أتْقَى للهِ مِنْهَا فَليَأْتِ التَّقْوَى». رواه مسلم. (1)
হাদীস নং: ৭৩
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ অধ্যায়: ৬ তাকওয়া ও আল্লাহভীতি।
৭৩। জান্নাত লাভের জন্য যে সকল কাজ করা জরুরি:

হযরত আবু উমামা বাহিলী রাযি. বলেন, আমি বিদায় হজ্জে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভাষণ দিতে শুনেছি। তাতে তিনি বলেন, তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে, তোমাদের পাঁচ (ওয়াক্ত) নামায পড়বে, তোমাদের নির্ধারিত (রমযান) মাসের রোযা রাখবে, তোমাদের সম্পদের যাকাত আদায় করবে এবং তোমাদের আমীরদের আনুগত্য করবে। তাহলে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে – তিরমিযী। (হাদীস নং ৬১৬)
ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, এটি একটি 'হাসান সহীহ' হাদীছ।
مقدمة الامام النووي
6 - باب في التقوى
73 - الخامس: عن أبي أُمَامَةَ صُدَيّ بنِ عجلانَ الباهِلِيِّ - رضي الله عنه - قَالَ: سَمِعتُ رسولَ الله - صلى الله عليه وسلم - يَخْطُبُ في حجةِ الوداعِ، فَقَالَ: «اتَّقُوا اللهَ وَصَلُّوا خَمْسَكُمْ، وَصُومُوا شَهْرَكُمْ، وَأَدُّوا زَكَاةَ أَمْوَالِكُمْ، وَأَطِيعُوا أُمَرَاءَكُمْ تَدْخُلُوا جَنَّةَ رَبِّكُمْ». رواه الترمذي، (1) في آخر كتابِ الصلاةِ، وَقالَ: «حديث حسن صحيح».
হাদীস নং: ৭৪
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ইয়াকীন ও তাওয়াক্কুল।


ইয়াকীনের অর্থ ও ব্যাখ্যা

ইয়াকীনের শাব্দিক অর্থ প্রত্যয়। অর্থাৎ সন্দেহমুক্ত জ্ঞান ও নিশ্চয়াত্মক ধারণা। পরিভাষায় ইয়াকীন বলা হয় কোনও বিষয় সম্পর্কে এ বিশ্বাস রাখা যে, তা এই এই রকম এবং তা এরকমই হওয়া সম্ভব, এর বিপরীত হওয়া সম্ভব নয়। কিংবা বলা যায় কোনও বিষয় সম্পর্কে এমন বাস্তবানুগ বিশ্বাসকে ইয়াকীন বলে, যে বিশ্বাস কখনও টলে না।

দীন ও শরী'আত সম্পর্কে কুরআন মাজীদে তিন রকম ইয়াকীনের উল্লেখ পাওয়া যায়ঃ- ১. 'ইলমুল ইয়াকীন, ২. 'আইনুল ইয়াকীন, ৩. ও হাক্কুল ইয়াকীন। এ তিন প্রকার ইয়াকীনের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য আছে। 'ইলমুল ইয়াকীনের সম্পর্ক দুনিয়ার সাথে। কোনও ব্যক্তি দীন ও শরী'আত সম্পর্কিত জ্ঞানলাভের পর যতদিন সে দুনিয়ায় থাকে, ততদিন তার জন্য সে জ্ঞান 'ইলমুল ইয়াকীনের পর্যায়ে থাকে।
তারপর যখন মৃত্যু শুরু হয় এবং পরকালের দৃশ্যাবলি চোখের সামনে চলে আসে, তখন সে 'ইলম 'আইনুল ইয়াকীনে পরিণত হয়। অর্থাৎ চাক্ষুষ প্রত্যয় হয়ে যায়। এতদিন সে গভীর বিশ্বাসের সাথে যা জানত, এখন তার সত্যতা চোখে দেখতে পাচ্ছে।
তারপর যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে, ঈমানদার ব্যক্তি জান্নাতে চলে যাবে,জান্নাতের নি'আমতরাজি ও তার মনোরোম দৃশ্য নিজ চোখে দেখতে পারে, সর্বোপরি আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ হবে, তখন তার জ্ঞান হাক্কুল ইয়াকীন তথা বাস্তব প্রত্যয়ে পরিণত হয়।
মনে করুন- 'কালোজাম। যে ব্যক্তি কালোজাম কোনওদিন দেখেনি, সে যদি বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারে এটা একরকম মিষ্টান্ন দ্রব্য, তবে এ সম্পর্কে তার যে বিশ্বাস অর্জিত হবে তা 'ইলমুল ইয়াকীন'। তারপর সে যদি এটা নিজ চোখে দেখতে পায়, তবে তার বিশ্বাস একধাপ উন্নত হবে। এরূপ বিশ্বাসকে বলা হয় 'আইনুল ইয়াকীন। তারপর সে যদি তা খাওয়ারও সুযোগ পায়, তবে তার বিশ্বাস চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হবে। একে বলা হবে 'হাক্কুল ইয়াকীন'।
দুনিয়ায় 'ইলমুল ইয়াকীন সকল মু'মিনেরই অর্জিত থাকে। এ ব্যাপারে উলামায়ে কিরামের স্থান সবার উপরে। আইনুল ইয়াকীন অর্জিত থাকে বিশেষ শ্রেণির মুমিনদের। তাদেরকে ‘আরেফ বলা হয়, যারা মৃত্যুর জন্য সদা প্রস্তুত থাকে। যেন মৃত্যু তাদের চোখের সামনে। 'হাক্কুল ইয়াকীন অর্জিত হয় সেইসব আওলিয়া কিরামের, যাদের অন্তর সমস্ত মাখলুকাতের ভালোবাসা থেকে ছিন্ন হয়ে এক আল্লাহর 'ইশক ও ভালোবাসায় বিলীন হয়ে যায়।

তাওয়াক্কুলের অর্থ ও ব্যাখ্যা

তাওয়াক্কুল-এর অর্থ নির্ভর করা। বিশেষ অর্থে আল্লাহর প্রতি নির্ভরতাকে তাওয়াক্কুল বলে। পরিভাষায় তাওয়াক্কুল বলা হয় নিজ শক্তি-সামর্থ্য, চেষ্টা ও ব্যবস্থাপনার উপর থেকে নির্ভরশীলতা ছিন্ন করে পরম মনিব আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও শক্তির উপর নির্ভরশীল হওয়াকে। এ সম্পর্কে বিভিন্ন তত্ত্বজ্ঞানী বিভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তবে সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন ইমাম তাবারী রহ.।তিনি বলেন তাওয়াক্কুল অর্থ- আল্লাহর প্রতি নির্ভর করা ও আল্লাহ তা'আলার ফয়সালাই কার্যকর হয় এ বিশ্বাসের সাথে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত মোতাবেক খাদ্য, পানীয় ও জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য আসবাব-উপকরণ অর্জনের চেষ্টা করা এবং শত্রু থেকে আত্মরক্ষায় সচেষ্ট থাকা।
প্রকাশ থাকে যে, তাওয়াক্কুলের স্থান বান্দার অন্তর। আসবাব-উপকরণ অবলম্বন করা বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজ। এটা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থি নয়- যদি অন্তরে আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা দৃঢ় থাকে এবং বিশ্বাস থাকে যে, হবে সেটাই যা আল্লাহর ফয়সালা; আমি চেষ্টা পরিশ্রম করছি কেবল এ কারণে যে, তা করা আল্লাহর হুকুম। আল্লাহর ফয়সালা ছাড়া আমার চেষ্টা পরিশ্রম কোনও সুফল বয়ে আনার ক্ষমতা রাখে না। আবার বিনা চেষ্টা-পরিশ্রমে কোনওকিছু দান করাও আল্লাহর নীতি নয়, যদিও তা দান করার ক্ষমতা আল্লাহ তা'আলার আছে।
সারকথা, তাওয়াক্কুল হচ্ছে আল্লাহর হুকুম মোতাবেক চেষ্টা পরিশ্রম করা এবং তার ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর প্রতি নির্ভর করা। প্রথমটি আল্লাহর আনুগত্য আর দ্বিতীয়টি তাঁর প্রতি ঈমান। তাওয়াক্কুল এ দুইয়ের সমন্বিত রূপ।
চেষ্টা-পরিশ্রম ছাড়া কেবল আল্লাহর প্রতি ভরসা করার নাম তাওয়াক্কুল নয়; বরং এটা আল্লাহর হুকুমের অবাধ্যতা করার নামান্তর। আবার আল্লাহর প্রতি ভরসা না করে কেবল চেষ্টা-পরিশ্রমকেই সবকিছু মনে করা বেঈমানী কাজ। প্রকৃত সত্য এর মাঝখানে। অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি নির্ভরও করতে হবে এবং শরী'আত মোতাবেক চেষ্টাও চালিয়ে যেতে হবে।
একবার এক সাহাবী জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি উটটি ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করব (যে, আল্লাহ তা'আলা এটি হেফাজত করবেন), নাকি আগে বাঁধব তারপর আল্লাহর উপর ভরসা করব? তিনি বললেন, আগে এটি বাঁধ, তারপর আল্লাহর উপর ভরসা কর। এর দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওয়াক্কুল কী তা বুঝিয়ে দিলেন।
হযরত সাহল তুসতারী রহ. বলেন, যে ব্যক্তি চেষ্টা-পরিশ্রমকে আপত্তিকর মনে করে, সে মূলত নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরীকার উপরই আপত্তি করে। আর যে ব্যক্তি তাওয়াক্কুলের উপর আপত্তি করে, সে যেন ঈমানের উপরই আপত্তি তোলে।
হযরত ফুযায়ল ইব্ন 'ইয়ায রহ.-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কেউ যদি নিজ ঘরে বসে থাকে আর মনে করে সে আল্লাহর প্রতি ভরসা করেছে, ফলে তার রিযিক তার কাছে এসে যাবে, তবে কি এটা ঠিক হবে? তিনি বললেন, সে যদি আল্লাহর প্রতি পুরোপুরি আস্থা রেখে এভাবে বসে থাকে, তবে আল্লাহ তার ইচ্ছা অবশ্যই পূরণ করবেন। কিন্তু এটা নিয়ম নয়। আল্লাহর কোনও নবী এমন করেননি। নবীগণ শ্রম খেটেছেন। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও পরিশ্রম করে উপার্জন করেছেন। কাজ করেছেন হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি. ও উমর ফারূক রাযি.। তাঁরা এমন বলেননি যে, আমরা বসে থাকলাম, আল্লাহ আমাদের খাওয়াবেন।
বস্তুত তাওয়াক্কুল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র। আর কামাইরোজগার তাঁর সুন্নত। উভয়টিই অবলম্বন করতে হবে। এর মধ্যেই দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা।


ইয়াকীন ও তাওয়াক্কুল সম্পর্কিত আয়াতসমূহ

এক নং আয়াত

وَلَمَّا رَأَى الْمُؤْمِنُونَ الْأَحْزَابَ قَالُوا هَذَا مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَصَدَقَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَمَا زَادَهُمْ إِلَّا إِيمَانًا وَتَسْلِيمًا (22)

অর্থঃ মুমিনগণ যখন (শত্রুদের) সম্মিলিত বাহিনীকে দেখেছিল, তখন তারা বলেছিল, এটাই সেই বিষয় যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদেরকে দিয়েছিলেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্যই বলেছিলেন। আর এ ঘটনা তাদের ঈমান ও আনুগত্যের চেতনাকে আরও বৃদ্ধি করে দিয়েছিল।.সূরা আহযাব (৩৩), আয়াত ২২

ব্যাখ্যা

এ আয়াতে আহযাবের যুদ্ধকালীন একটি অবস্থা বর্ণিত হয়েছে।আহযাব (احزاب) শব্দটি হিযব (حزب)-এর বহুবচন। হিযব অর্থ দল। আহযাব অর্থ দলসমূহ। এ যুদ্ধে আরবের বিভিন্ন গোত্র একত্র হয়ে মদীনায় হামলা চালিয়েছিল। তাই একে আহযাবের বা সম্মিলিত বাহিনীর যুদ্ধ বলা হয়। এর আরেক নাম খন্দকের যুদ্ধ। খন্দক মানে পরিখা এ যুদ্ধে মদীনা মুনাওয়ারার হেফাজতের জন্য দীর্ঘ পরিখা খনন করা হয়েছিল। এ যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল হিজরী ৫ম সালে। যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ এরকম-

আহযাবের যুদ্ধ

প্রসিদ্ধ ইয়াহুদী গোত্র বনু নাজীরের চক্রান্তে কুরাইশ পৌত্তলিকগণ সিদ্ধান্ত স্থির করেছিল যে, তারা আরবের বিভিন্ন গোত্রকে একাট্টা করে সকলে যৌথভাবে মদীনা মুনাওয়ারায় হামলা চালাবে। সেমতে কুরাইশ গোত্র ছাড়াও বনু গাতফান, বনু আসলাম, বনু মুররা, বনু আশজা', বনু কিনানা ও বনু ফাযারা- গোত্রসমূহ সম্মিলিতভাবে এক বিশাল বাহিনী তৈরি করে ফেলল। তাদের সংখ্যা বারো হাজার থেকে পনেরো হাজার পর্যন্ত বর্ণনা করা হয়ে থাকে। এই বিপুল সশস্ত্র সেনাদল পূর্ণ প্রস্তুতি সহকারে মদীনা মুনাওয়ারার উদ্দেশে যাত্রা করল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংবাদ পাওয়ামাত্র সাহাবায়ে কিরামকে নিয়ে পরামর্শে বসলেন।
হযরত সালমান ফারসী রাযি. পরামর্শ দিলেন, মদীনা মুনাওয়ারার উত্তর দিকে, যে দিক থেকে হানাদার বাহিনী আসতে পারে, একটি গভীর পরিখা খনন করা হোক, যাতে তারা নগরে প্রবেশ করতে সক্ষম না হয়। সুতরাং সমস্ত সাহাবী কাজে লেগে গেলেন।মাত্র ছয় দিনে তারা সাড়ে তিন মাইল দীর্ঘ ও পাঁচ গজ গভীর একটি পরিখা খনন করে ফেললেন।
মুসলিমদের পক্ষে এ যুদ্ধটি পূর্ববর্তী সকল যুদ্ধ অপেক্ষা বেশি কঠিন ছিল। শত্রুসৈন্য ছিল তাদের চার গুণেরও বেশি। এর উপর বাড়তি বিষফোড়াস্বরূপ কুখ্যাত ইয়াহুদী গোত্র বনু কুরাইজা সম্পর্কে খবর পাওয়া গেল, তারা মুসলিমদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করে হানাদারদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। তারা যেহেতু ছিল মুসলিমদের প্রতিবেশী, তাই তাদের দিক থেকে অনিষ্টের আশঙ্কা ছিল অনেক বেশি।
তখন ছিল প্রচণ্ড শীতকাল। খাদ্যসামগ্রীরও ছিল অভাব। এতটা দীর্ঘ পরিখার খননকার্যে দিনরাত ব্যস্ত থাকার দরুন রোজগারেরও কোনও সুযোগ মেলেনি। ফলে খাদ্য সংকট তীব্রাকার ধারণ করল। এ অবস্থায় হানাদার বাহিনী পরিখার কিনারায় এসে শিবির ফেলল। অতঃপর উভয় পক্ষে তীর ও পাথর ছোড়াছুড়ি চলতে থাকল। লাগাতার প্রায় এক মাস এ অবস্থা চলল।
রাত-দিন একটানা পাহারা দিতে দিতে মুজাহিদগণ ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। পরিশেষে এক সময় সুদীর্ঘ এ কঠিন পরীক্ষার অবসান হল আর তা এভাবে যে, আল্লাহ তাআলা হানাদারদের ছাউনির উপর দিয়ে এক হিমশীতল তীব্র ঝড়ো হাওয়া বইয়ে দিলেন। তাতে তাদের তাঁবু ছিঁড়ে গেল, হাড়ি-পাতিল সব ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেল, চুলা নিভে গেল এবং সওয়ারীর পশুগুলো ভয় পেয়ে চারদিকে ছোটাছুটি করতে লাগল । এভাবে তাদের গোটা শিবির তছনছ হয়ে গেল। অগত্যা তাদেরকে অবরোধ ত্যাগ করে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে ফিরে যেতে হল।-তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন
এখানে যে আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে, তা দ্বারা আল্লাহ তা'আলার প্রতি সাহাবায়ে কিরামের গভীর আস্থা ও নির্ভরতার ছবি এঁকে দেওয়া হয়েছে। আরবের শক্তিশালী ও রণকুশলী গোত্রসমূহ তাদের বিরুদ্ধে একাট্টা। তারা মুষ্টিমেয় একটি দল। তাদের রণসামগ্রীও অতি সামান্য। তদুপরি ভেতরে রয়েছে বিশ্বাসঘাতক ইহুদী গোত্রসমূহ। যে- কোনও সময় তারা মদীনায় অবস্থিত অসহায় নারী ও শিশুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও সাহাবীগণ বিন্দুমাত্র হতোদ্যম হননি, তাঁদের ঈমানে কোনও দুর্বলতা দেখা দেয়নি। বরং তারা আল্লাহর প্রতি পরম নির্ভরতা ও ঈমানী বলিষ্ঠতার সাথে উচ্চারণ করেন- “এটাই সেই বিষয় যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদেরকে দিয়েছিলেন”।
কী ছিল সে প্রতিশ্রুতি? উত্তর সূরা বাকারায়। ইরশাদ হয়েছে-

أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُمْ مَثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِنْ قَبْلِكُمْ مَسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ (214)

অর্থঃ (হে মুসলিমগণ!) তোমরা কি মনে করেছ, তোমরা জান্নাতে (এমনিতেই) প্রবেশ করবে, অথচ এখনও পর্যন্ত তোমাদের উপর সেই রকম অবস্থা আসেনি, যেমনটা এসেছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর? তাদেরকে স্পর্শ করেছিল অর্থসংকট ও দুঃখকষ্ট এবং তাদেরকে করা হয়েছিল প্রকম্পিত, এমনকি রাসূল এবং তাঁর ঈমানদার সঙ্গীগণ বলে উঠেছিল, আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? মনে রেখ, আল্লাহর সাহায্য নিকটেই। সূরা বাকারা, আয়াত ২১৪
এর দাবি হচ্ছে মুশরিকদের মত দুঃখকষ্টের সম্মুখীন মুমিনদেরও হতে হবে। সে দুঃখকষ্টে তাদের কর্তব্য হবে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ তাওয়াক্কুল ও চরম ধৈর্যধারণ করা। তা করতে পারলে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় তাদের লাভ হবে। এটাই সেই ওয়াদা, যা আহযাবের যুদ্ধে বাস্তবায়িত হয়েছে আর এ ওয়াদার প্রতিই ইঙ্গিত করে সাহাবায়ে কিরাম বলেছিলেন- “এটাই সেই বিষয় যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদেরকে দিয়েছিলেন। এবং তাঁরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা সত্যই দিয়েছিলেন”। এভাবে সম্মিলিত বাহিনীর অভিযানে সাহাবায়ে কিরামের ঈমান ও আনুগত্য বৃদ্ধি পেল, আল্লাহর প্রতি ইয়াকীন ও তাওয়াক্কুল আরও দৃঢ় হল এবং আল্লাহর ফয়সালায় তারা পূর্ণ সন্তুষ্টি জ্ঞাপন করলেন।
তাদের এ ঈমান, ইয়াকীন ও তাওয়াক্কুল দ্বারা আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি- যখনই কোনও কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন আমরা হই, তখন আমাদের কর্তব্য তাদের থেকে শিক্ষা নিয়ে আল্লাহর প্রতি আস্থাশীল থাকা ও তাঁর দিকে রুজু হওয়া।

দুই নং আয়াত

الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ (173) فَانْقَلَبُوا بِنِعْمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَفَضْلٍ لَمْ يَمْسَسْهُمْ سُوءٌ وَاتَّبَعُوا رِضْوَانَ اللَّهِ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَظِيمٍ (174)

অর্থঃ যাদেরকে লোকে বলেছিল, (মক্কার কাফির) লোকেরা তোমাদের (সাথে যুদ্ধ করার) জন্য (পুনরায়) সেনা সংগ্রহ করেছে, সুতরাং তাদেরকে ভয় কর। তখন এট (এই সংবাদ) তাদের ঈমানের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয় এবং তারা বলে ওঠে, আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি উত্তম কর্মবিধায়ক। পরিণামে তারা আল্লাহর নি‘আমত ও অনুগ্রহ নিয়ে এভাবে ফিরে আসল যে, বিন্দুমাত্র অনিষ্ট তাদের স্পর্শ করেনি এবং তারা আল্লাহ যাতে খুশি হন তার অনুসরণ করেছে। বস্তুত আল্লাহ মহা অনুগ্রহের মালিক।, সূরা আলে-ইমরান, আয়াত ১৭৩-১৭৪

ব্যাখ্যা

এ আয়াতেও সাহাবায়ে কিরামের আল্লাহনির্ভরতা ও অটুট ঈমানের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে ‘হামরাউল আসাদ’ নামক যুদ্ধের প্রতি। যুদ্ধের ঘটনাটি সংক্ষেপে নিরূপ-

‘হামরাউল আসাদ’-এর যুদ্ধ

মক্কার কাফেরগণ উহুদের যুদ্ধ থেকে ফিরে যাওয়ার সময় রাস্তায় এই বলে আক্ষেপ করতে লাগল যে, যুদ্ধে জয়লাভ করা সত্ত্বেও আমরা অহেতুক ফিরে আসলাম। আমরা আরেকটু অগ্রসর হলে তো সমস্ত মুসলিমকেই নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারতাম। এই চিন্তা করে তারা পুনরায় মদীনা মুনাওয়ারার দিকে অগ্রসর হওয়ার ইচ্ছা করল। অন্যদিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্ভবত তাদের এ ইচ্ছা সম্পর্কে অবহিত হয়ে অথবা উহুদ যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের ইচ্ছায় পরদিন ভোরে ঘোষণা করে দিলেন যে, আমরা শত্রুর পশ্চাদ্ধাবনের উদ্দেশ্যে বের হব আর এতে আমাদের সঙ্গে কেবল তারাই যাবে, যারা উহুদের যুদ্ধে শরীক ছিল।
সাহাবায়ে কেরাম যদিও উহুদের যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত ও ক্লান্ত-শ্রান্ত ছিলেন, কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ ডাকে সাড়া দিতে তারা এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। এ আয়াতে তাদের সে আত্মোৎসর্গেরই প্রশংসা করা হয়েছে।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে ‘হামরাউল আসাদ’ নামক স্থানে পৌঁছলে সেখানে বনু খুযাআর এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হয়। তার নাম ছিল মা‘বাদ। কাফির হওয়া সত্ত্বেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি তার সহানুভূতি ছিল। এ সময় মুসলিমদের উদ্যম ও সাহসিকতা তার নজর কাড়ে। অতঃপর সে আরও সামনে অগ্রসর হলে আবু সুফিয়ানসহ অন্যান্য কুরাইশ নেতাদের সাথে তার সাক্ষাৎ হল। তখন সে তাদেরকে মুসলিম সৈন্যদের উদ্দীপনা ও সাহসিকতার কথা জানাল এবং পরামর্শ দিল যে, তাদের উচিত মদীনায় গিয়ে হামলা করার পরিকল্পনা ত্যাগ করে মক্কায় ফিরে যাওয়া। এতে কাফিরদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার হল। ফলে তারা ফিরে চলে গেল। কিন্তু যাওয়ার সময় তারা আবদুল কায়স গোত্রের মদীনাগামী এক কাফেলাকে বলে গেল যে, পথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ হলে যেন জানিয়ে দেয়, আবু সুফিয়ান এক বিশাল বাহিনী সংগ্রহ করেছে এবং সে মুসলিমদের নিপাত করার জন্য মদীনার দিকে এগিয়ে আসছে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করা। সেমতে এ কাফেলা হামরাউল আসাদে পৌঁছে যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাক্ষাৎ পেল তখন তাঁকে এ কথা বলল। কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম তাতে ভয় তো পেলেনই না, উল্টো তাঁরা তাদের ঈমানদীপ্ত সেই কথা শুনিয়ে দিলেন, যা প্রশংসার সাথে এ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।-তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন
তারা বললেন, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তিনি আমাদের রক্ষাকর্তা। তিনিই আমাদের যাবতীয় বিষয়ের ব্যবস্থাপক। তিনি উত্তম আশ্রয়স্থল। আমরা তাঁর প্রতি ভরসা রাখি। আর যে-কেউ আল্লাহর প্রতি ভরসা রাখে, তিনি তার সাহায্য করে থাকেন। এই দৃঢ় ঈমান ও তাওয়াক্কুলের যে সুফল তারা লাভ করেছিলেন, দ্বিতীয় আয়াতে তা বর্ণিত হয়েছে। তারা মদীনা মুনাওয়ারায় ফিরে আসলেন আল্লাহর নি‘আমত ও অনুগ্রহ নিয়ে। অর্থাৎ ফিরে আসলেন সম্পূর্ণ নিরাপদে ও অক্ষত অবস্থায়। সেইসঙ্গে লাভ করলেন আখিরাতের অফুরন্ত ছওয়াব ও প্রতিদান। কাফিরগণ তাদের বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারল না। উপরন্তু তারা লাভ করলেন আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দোজাহানের সফলতা। বস্তুত আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল। যারা তাঁর প্রতি ঈমান ও ভরসা রাখে, তাদের প্রতি তিনি অভাবনীয় অনুগ্রহ করে থাকেন।

তিন নং আয়াত

وَتَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِي لَا يَمُوتُ

অর্থঃ তুমি নির্ভর কর সেই সত্তার উপর, যিনি চিরঞ্জীব, যাঁর মৃত্যু নেই।সূরা ফুরকান, আয়াত ৫৮

ব্যাখ্যা

এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লক্ষ্য করে তাওয়াক্কুলের হুকুম দিয়েছেন। এতে কোনও সন্দেহ নেই যে, তিনি তাওয়াক্কুলের সর্বোচ্চ স্তরে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তা সত্ত্বেও যে তাঁকে তাওয়াক্কুলের হুকুম দেওয়া হয়েছে, এর দ্বারা মূলত উদ্দেশ্য তাঁর উম্মতকে শিক্ষা দান করা।
তাওয়াক্কুলের হুকুমদান প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা তাঁর বিশেষ গুণবাচক নাম الحي- এর উল্লেখ করেছেন। এর অর্থ তিনি চিরঞ্জীব, যার মৃত্যু নেই। তিনি অমর অক্ষয় সত্তা। এর দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, তাওয়াক্কুল ও ভরসা কেবল তাঁর উপরই করা যায়। তিনি ছাড়া আর যা-কিছু আছে সকলেই তাঁর সৃষ্টি। তারা নশ্বর ও মরণশীল। তাদের যাবতীয় শক্তি সামান্য ও সীমাবদ্ধ। এরূপ সীমিত শক্তির মরণশীল সৃষ্টির উপর ভরসা করা মানে নিজের ধ্বংস ডেকে আনা। যে ব্যক্তি দুর্বল সৃষ্টির উপর ভরসা করবে, সে কেবল সময়েরই অপচয় করবে এবং তার চেষ্টা ও পরিশ্রম বৃথা যাবে। বুদ্ধিমান ব্যক্তির উচিত এর থেকে বিরত থাকা এবং এক আল্লাহর উপরই ভরসা করা। আল্লাহ এক অমর অক্ষয় সত্তা। কোনও উত্থান-পতন, পরিবর্তন ও পারিপার্শ্বিকতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। তাঁর উপর যে ভরসা করবে তার কোনও ব্যর্থতা নেই। নেই কোনও পরাজয়। তিনি অতি মমতাভরে ডেকে বলছেন- তুমি ভরসা কর সেই চিরঞ্জীবের প্রতি, যাঁর মৃত্যু নেই।

চার নং আয়াত

وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُوْنَ

অর্থঃ মুমিনগণ যেন আল্লাহর উপরই নির্ভর করে।সূরা ইবরাহীম, আয়াত ১১

ব্যাখ্যা

এ আয়াতেও আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে তাঁর প্রতি ভরসা করার হুকুম দিয়েছেন। মু'মিন বলে সম্বোধন করার পর এ হুকুম দেওয়ার দ্বারা ইশারা পাওয়া যায় যে, তাওয়াক্কুল করা ঈমানের দাবি। আল্লাহর প্রতি যার ঈমান আছে, আসবাব-উপকরণ ও নিজ চেষ্টার উপর সে ভরসা করতে পারে না। কারণ সে জানে আসবাব- উপকরণের কোনও শক্তি নেই। এগুলো আল্লাহরই সৃষ্টি। যিনি এর স্রষ্টা, এতে আছর ও সুফলও তিনিই দান করেন। তিনি না চাইলে আসবাব-উপকরণ দ্বারা কোনও সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং সে তাঁর নির্দেশ মোতাবেক আসবাব-উপকরণের ব্যবহার করবে বটে, কিন্তু ভরসা করবে তাঁরই উপর। অতঃপর তিনি যে ফলাফল দান করেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকবে।

পাঁচ নং আয়াত

فَإِذَا عَرَّمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ

অর্থঃ অতঃপর তুমি যখন (কোনও বিষয়ে) মনস্থির করবে, তখন আল্লাহর উপর নির্ভর করো। সূরা আলে-ইমরান, আয়াত ১৫৯

ব্যাখ্যা

এ আয়াতের আগে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ করার হুকুম দেওয়া হয়েছে। তারপর এ বাক্যে বলা হয়েছে, পরামর্শের পর যখন কোনও বিষয়ে সিদ্ধান্ত স্থির করবে, তখন আল্লাহর উপর ভরসা করে সে সিদ্ধান্ত কার্যকরের চেষ্টা করবে। এর দ্বারা তাওয়াক্কুল সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যায়। প্রথমে পরামর্শ করতে বলা হয়েছে। পরামর্শ করাও এক ধরনের উপকরণ ও এক প্রকার চেষ্টা। তারপর বলা হয়েছে সিদ্ধান্ত মোতাবেক কাজ করবে আল্লাহর প্রতি ভরসার সাথে। এর দ্বারা যেমন নিজ সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করার জরুরত বোঝা গেল, তেমনি আল্লাহর প্রতি ভরসা করারও হুকুম জানা গেল। এমন নয় যে, কেবল আল্লাহর প্রতি ভরসা করলেই চলবে, কোনও চেষ্টা-মেহনতের দরকার নেই। আবার এমনও নয় যে, কেবল চেষ্টাই করবে, নিজ বিদ্যা-বুদ্ধি খাটাবে আর ভাববে এতেই সব হয়ে যাবে, আল্লাহর উপর ভরসার কোনও প্রয়োজন নেই। বরং এ আয়াত চেষ্টা ও ভরসা সমানতালে উভয়টিই আঁকড়ে ধরতে বলছে। এটাই তাওয়াক্কুলের হাকীকত। তাওয়াক্কুলের আদেশ সম্পর্কে আরও প্রচুর আয়াত আছে, যা সুপরিচিত ও সকলের জানা।

তাওয়াক্কুলের ফযীলত সম্পর্কিত আয়াত

এক নং আয়াত

وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ

অর্থঃ যে-কেউ আল্লাহর উপর নির্ভর করে, আল্লাহই তার (কর্মসম্পাদনের) জন্য যথেষ্ট।সূরা তালাক, আয়াত ৩

ব্যাখ্যা

অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তার সমুদয় কাজ পূর্ণ করে দেন। সে যা-কিছু নিয়ে চিন্তিত, তার সুবন্দোবস্ত করে দেন। সবরকম দুশ্চিন্তা থেকে তাকে হেফাজত করেন। তার মানে এ নয় যে, তার পার্থিব কোনও ব্যর্থতা দেখা দেবে না বা তাকে কোনও দুঃখকষ্টের সম্মুখীন হতে হবে না। দুঃখকষ্ট, ব্যর্থতা ও সফলতা আল্লাহ তা'আলা যে প্রাকৃতিক নিয়ম সৃষ্টি করেছেন সে অনুযায়ী হয়ে থাকে। সবকিছু তাকদীরে লিপিবদ্ধ আছে। কখন কী ঘটবে- না ঘটবে তা স্থিরীকৃত আছে। সে অনুযায়ী তা হবেই হবে। তাওয়াক্কুলের দ্বারা তার ব্যতিক্রম হবে এমন নয়। তবে তাওয়াক্কুল করলে আল্লাহ তা'আলা অন্তরে হিম্মত দান করেন ও ধৈর্যধারণের শক্তি যোগান। ফলে বান্দা অন্যান্য লোকের মত ব্যর্থতায় ও বিপদ-আপদে অস্থির হয়ে পড়ে না। বাহ্যিক কষ্টের ভেতরও তার মনে প্রশান্তি বিরাজ করে। চেষ্টা শ্রমের ফলাফল হাসিমুখে গ্রহণ করে নেয়। বাহ্যিক ব্যর্থতাকেও আল্লাহর ফয়সালা মনে করে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়। সে শান্তমনে আল্লাহর অভিমুখী থাকে। এতে করে একই কষ্ট অন্যদের কাছে যত কঠিন মনে হয়, তার কাছে তত কঠিন থাকে না। তার কাছে তুলনামূলক হালকা মনে হয়। সেইসঙ্গে আখিরাতের ছওয়াব ও প্রতিদান তো আছেই। আল্লাহর উপর ভরসা করার কারণে দুনিয়ার কষ্টক্লেশের বিনিময়ে সে আখিরাতে প্রভূত ছওয়াবের অধিকারী হয়।

দুই নং আয়াত

মু'মিনের বিশেষ পাঁচটি গুণ


إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ (2)

অর্থঃ মুমিন তো তারাই, (যাদের সামনে) আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের হৃদয় ভীত হয়, যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ পড়া হয়, তখন তা তাদের ঈমানের উন্নতি সাধন করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের উপর ভরসা করে।সূরা আনফাল, আয়াত ২

ব্যাখ্যা

এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের বিশেষ তিনটি গুণ উল্লেখ করেছেন।
প্রথম গুণ- যখন আল্লাহর কথা স্মরণ হয় বা আল্লাহর কথা উল্লেখ করা হয়, তখন তাদের অন্তরে ভয়ভীতি দেখা দেয়। কেননা মু'মিন ব্যক্তি জানে আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান। বান্দার যাবতীয় অবস্থা তিনি জানেন। প্রত্যেককে আখিরাতে তাঁর সামনে দাঁড়াতে হবে। সবকিছুর হিসাব দিতে হবে। হিসাব ঠিক না হলে তিনি কঠিন শাস্তি দান করবেন। আল্লাহ সম্পর্কে এ কথা জানা থাকার ফলে যখনই তাঁকে স্মরণ হয়, বান্দা তাঁর ভয়ে কেঁপে ওঠে। তখন সে সতর্ক হয়ে যায় এবং যে অবস্থায় বা যে কাজে থাকে, তা আল্লাহর হুকুম মোতাবেক না হলে সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দেয় ও নিজেকে শুধরে নেয়।
দ্বিতীয় গুণ বলা হয়েছে- যখন তাদের সামনে আল্লাহর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ তার ঈমান আরও শক্তিশালী হয় এবং ঈমানের আলোয় তার অন্তর আরও বেশি আলোকিত হয়। কেননা সে বিশ্বাস করে, এ আয়াত আল্লাহর বাণী। ফলে তার বুঝে আসুক বা না-ই আসুক, সর্বাবস্থায় তার সত্যতা সে স্বীকার করে নেয়। অতঃপর তা উপদেশমূলক হলে উপদেশ গ্রহণ করে। তাতে তার আল্লাহপ্রেম আরও উজ্জীবিত হয় এবং আল্লাহর পথে চলতে অধিকতর অনুপ্রাণিত হয়। আর যদি সে আয়াত বিধানমূলক হয়, তবে তাতে যে আদেশ-নিষেধ থাকে, তা পালনে তৎপর হয়। এভাবে ঈমানের পথে তার আরও বেশি অগ্রগতি লাভ হয়।
তৃতীয় গুণ বলা হয়েছে- তারা তাদের প্রতিপালকের উপর ভরসা করে। অর্থাৎ তারা নিজ বিদ্যা-বুদ্ধি ও শক্তি-ক্ষমতার উপর ভরসা করে না এবং কোনও মাখলুকের কাছে আশাবাদী হয় না। বরং নিজেদের যাবতীয় বিষয় আল্লাহর উপর ন্যস্ত করে। কেবল তাঁকেই ভয় পায় এবং তাঁরই কাছে আশা করে।
এর পরের আয়াতে মু'মিনদের আরও দু'টি গুণ উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে- الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلوةَ وَ مِمَّا رَزَقْنَهُمْ يُنفِقُونَ

অর্থঃ তারা নামায কায়েম করে এবং আল্লাহ তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছেন তা থেকে ব্যয় করে।সূরা আনফাল, আয়াত ৩
সর্বমোট এ পাঁচটি গুণ হল। যে সকল মু'মিন এ পাঁচটি গুণের অধিকারী, তাদের সম্পর্কে সবশেষে ঘোষণা হয়েছে-

أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَهُمْ دَرَجَاتٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَمَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ

অর্থঃ এরাই প্রকৃত মুমিন। তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে রয়েছে উচ্চ মর্যাদা, ক্ষমা ও সম্মানজনক রিযিক। সূরা আনফাল, আয়াত ৪
আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে এরূপ মু'মিন হওয়ার তাওফীক দান করুন। তাওয়াক্কুলের ফযীলত সম্পর্কিত আয়াত প্রচুর এবং তা সুবিদিত।
যে সত্তর হাজার মু'মিন বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে
হাদীছ নং : ৭৪

হযরত আব্দুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,উম্মতসমূহকে (স্বপ্নে বা মি‘রাজে) আমার সামনে পেশ করা হল। আমি এক নবীকে দেখলাম তাঁর সঙ্গে রয়েছে ছোট একটি দল। আরেক নবীকে দেখলাম তাঁর সঙ্গে এক-দুইজন লোক। আরেকজন নবীকে দেখলাম তাঁর সাথে কেউ নেই। হঠাৎ আমাকে একটি বিরাট দল দেখানো হল। আমি মনে করলাম নিশ্চয়ই তারা আমার উম্মত। কিন্তু আমাকে বলা হল এ হচ্ছে মূসা ও তাঁর কওম। তবে আপনি আকাশের দিগন্তে লক্ষ করুন। আমি লক্ষ করলাম। দেখি কি এক বিশাল দল! তারপর আবার আমাকে বলা হল আকাশের ওই দিগন্তে লক্ষ করুন। আমি তাকিয়ে দেখি সেখানেও এক বিশাল দল। তারপর আমাকে বলা হল এরা আপনার উম্মত। তাদের সঙ্গে আরও সত্তর হাজার এমন আছে, যারা জান্নাতে প্রবেশ করবে বিনা হিসাবে ও বিনা আযাবে।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম উঠে নিজ ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন সাহাবীগণ ওই সত্তর হাজার সম্পর্কে আলোচনায় লিপ্ত হলেন, যারা বিনা হিসাবে ও বিনা আযাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। কেউ বললেন, তারা সম্ভবত ওই সকল লোক যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচর্য লাভ করেছে। কেউ বললেন, তারা সম্ভবত ওই সকল লোক যারা ইসলামের উপর (অর্থাৎ মুসলিম বাবা-মা'র ঘরে) জন্মগ্রহণ করেছে। ফলে আল্লাহর সঙ্গে কোনওকিছুকে শরীক করেনি। এভাবে তারা আরও বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করলেন। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের কাছে বের হয়ে আসলেন। জিজ্ঞেস করলেন, এতক্ষণ তোমরা কোন্ বিষয়ে আলোচনা করছিলে? তারা তাঁকে জানালেন (কী আলোচনা এতক্ষণ করছিলেন)। তিনি বললেন, তারা ওই সকল লোক যারা নিজেরা ঝাড়ফুঁক করে না, অন্যকে দিয়ে ঝাড়ফুঁক করায় না। কোনওকিছুকে অশুভ লক্ষণ হিসেবে গ্রহণ করে না। এবং তারা তাদের প্রতিপালকের উপর তাওয়াক্কুল করে। তখন হযরত ‘উক্কাশা ইবন মিহসান রাযি. উঠে বললেন, আমার জন্য দু‘আ করুন যেন আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি বললেন, তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত। তারপর আরেকজন উঠে বললেন, আমার জন্য দু‘আ করুন যেন আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি বললেন, ‘উক্কাশা তোমার অগ্রবর্তী হয়ে গেছে। -বুখারী ও মুসলিম।
(সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৫৭০৭: সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ২২০; জামে তিরমিযী, হাদীছ নং ২৪৪৬)
مقدمة الامام النووي
7 - باب في اليقين والتوكل (1)
قَالَ الله تَعَالَى: {وَلَمَّا رَأى الْمُؤْمِنُونَ الأَحْزَابَ قَالُوا هَذَا مَا وَعَدَنَا اللهُ وَرَسُولُهُ وَصَدَقَ اللهُ [ص:44] وَرَسُولُهُ وَمَا زَادَهُمْ إِلاَّ إِيمَانًا وَتَسْلِيمًا} [الأحزاب: 22]، وَقالَ تَعَالَى: {الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ، فَانْقَلَبُوا بِنِعْمَةٍ مِنَ اللهِ وَفَضْلٍ لَمْ يَمْسَسْهُمْ سُوءٌ وَاتَّبَعُوا رِضْوَانَ اللهِ وَاللهُ ذُو فَضْلٍ عَظِيمٍ} [آل عمران:173 - 174]، وَقالَ تَعَالَى: {وَتَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِي لاَ يَمُوتُ} [الفرقان:58]، وَقالَ تَعَالَى: {وَعَلَى اللهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ} [إبراهيم: 11]، وَقالَ تَعَالَى: {فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى الله} [آل عمران: 159]، والآيات في الأمرِ بالتَّوكُّلِ كثيرةٌ معلومةٌ. وَقالَ تَعَالَى: {وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللهِ فَهُوَ حَسْبُهُ} [الطلاق: 3]: أي كافِيهِ. وَقالَ تَعَالَى: {إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ} [الأنفال: 2]، والآيات في فضل التوكل كثيرةٌ معروفةٌ.
74 - فالأول: عن ابن عباس رضي الله عنهما، قَالَ: قَالَ رسولُ الله - صلى الله عليه وسلم: «عُرِضَتْ عَلَيَّ الأُمَمُ، فَرَأيْتُ النَّبيَّ ومَعَهُ الرُّهَيطُ، والنبِيَّ وَمَعَهُ الرَّجُلُ وَالرَّجُلانِ، والنبيَّ لَيْسَ مَعَهُ أَحَدٌ، إِذْ رُفِعَ لي سَوَادٌ عَظيمٌ، فَظَنَنْتُ أَنَّهُمْ أُمَّتِي، فقيلَ لِي: هَذَا مُوسَى وَقَومُهُ، ولكنِ انْظُرْ إِلَى الأُفُقِ، فَنَظَرتُ فَإِذا سَوادٌ عَظِيمٌ، فقيلَ لي: انْظُرْ إِلَى الأفُقِ الآخَرِ، فَإِذَا سَوَادٌ عَظيمٌ، فقيلَ لِي: هذِهِ أُمَّتُكَ، وَمَعَهُمْ سَبْعُونَ (1) ألفًا يَدْخُلُونَ الجَنَّةَ بِغَيرِ حِسَابٍ ولا عَذَابٍ»،
ثُمَّ نَهَضَ فَدخَلَ مَنْزِلَهُ فَخَاضَ النَّاسُ في أُولئكَ الَّذِينَ يَدْخُلُونَ الجَنَّةَ بِغَيْرِ حِسَابٍ ولا عَذَابٍ، فَقَالَ بَعْضُهُمْ: فَلَعَلَّهُمْ الَّذينَ صَحِبوا رسولَ الله - صلى الله عليه وسلم - وَقالَ بعْضُهُمْ: فَلَعَلَّهُمْ الَّذِينَ وُلِدُوا في الإِسْلامِ فَلَمْ يُشْرِكُوا بِالله شَيئًا - وذَكَرُوا أشيَاءَ - فَخَرجَ عَلَيْهِمْ رسولُ الله - صلى الله عليه وسلم - فَقَالَ: «مَا الَّذِي تَخُوضُونَ فِيهِ؟» فَأَخْبَرُوهُ، فقالَ: «هُمُ الَّذِينَ لاَ يَرْقُونَ (2)، [ص:45] وَلا يَسْتَرقُونَ (3)، وَلا يَتَطَيَّرُونَ (4)؛ وعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوكَّلُون» فقامَ عُكَّاشَةُ ابنُ محصنٍ، فَقَالَ: ادْعُ اللهَ أَنْ يَجْعَلني مِنْهُمْ، فَقَالَ: «أنْتَ مِنْهُمْ» ثُمَّ قَامَ رَجُلٌ آخَرُ، فَقَالَ: ادْعُ اللهَ أَنْ يَجْعَلنِي مِنْهُمْ، فَقَالَ: «سَبَقَكَ بِهَا عُكَّاشَةُ». مُتَّفَقٌ عَلَيهِ.
(5)
«الرُّهَيْطُ» بضم الراء تصغير رهط: وهم دون عشرة أنفس، وَ «الأُفقُ» الناحية والجانب. و «عُكَّاشَةُ» بضم العين وتشديد الكاف وبتخفيفها، والتشديد أفصح.
হাদীস নং: ৭৫
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ইয়াকীন ও তাওয়াক্কুল।
ঈমান ও তাওয়াক্কুল সম্পর্কে একটি বিশেষ দু‘আ
হাদীছ নং: ৭৫

হযরত আব্দুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু‘আ করতেন-
«اللَّهُمَّ لَكَ أَسْلَمْتُ، وَبِكَ آمَنْتُ، وَعَليْك تَوَكَّلْتُ، وَإِلَيْكَ أنَبْتُ، وَبِكَ خَاصَمْتُ. اللَّهُمَّ أعُوذُ بعزَّتِكَ؛ لاَ إلهَ إلاَّ أَنْتَ أَنْ تُضِلَّني، أَنْتَ الحَيُّ الَّذِي لاَ تَمُوتُ، وَالجِنُّ والإنْسُ يَمُوتُونَ»
“হে আল্লাহ। আমি তোমারই কাছে আত্মসমর্পণ করেছি, তোমারই প্রতি ঈমান এনেছি, তোমারই উপর ভরসা করেছি, তোমারই অভিমুখী হয়েছি এবং তোমারই সাহায্যে (তোমার শত্রুর বিরুদ্ধে) লড়াই করেছি। হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া কোনও মা‘বুদ নেই। আমি তোমার ক্ষমতার আশ্রয় গ্রহণ করছি, যাতে তুমি আমাকে বিপথগামী না কর। তুমি চিরঞ্জীব, যার কোনও মৃত্যু নেই। জিন্ন ও ইনসান মৃত্যুবরণ করে থাকে।-বুখারী ও মুসলিম।
(এটা মুসলিমের বর্ণনা। ইমাম বুখারী রহ. এটিকে সংক্ষেপে এনেছেন।সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৭৩৮৫, ৭৪৪২, ৭৪৯১; সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ২৭১৭)
مقدمة الامام النووي
7 - باب في اليقين والتوكل
75 - الثاني: عن ابن عباس رضي الله عنهما أيضًا: أنَّ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم - كَانَ يقول: «اللَّهُمَّ لَكَ أَسْلَمْتُ، وَبِكَ آمَنْتُ، وَعَليْك تَوَكَّلْتُ، وَإِلَيْكَ أنَبْتُ، وَبِكَ خَاصَمْتُ. اللَّهُمَّ أعُوذُ بعزَّتِكَ؛ لاَ إلهَ إلاَّ أَنْتَ أَنْ تُضِلَّني، أَنْتَ الحَيُّ الَّذِي لاَ تَمُوتُ، وَالجِنُّ والإنْسُ يَمُوتُونَ». مُتَّفَقٌ عَلَيهِ، (1) وهذا لفظ مسلم واختصره البخاري.
হাদীস নং: ৭৬
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ইয়াকীন ও তাওয়াক্কুল।
حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ -এর ফযীলত
হাদীছ নং : ৭৬

হযরত ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস রাযি. বলেন,
حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
(আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি উত্তম কর্মসম্পাদক) - এ কথাটি হযরত ইবরাহীম আ. বলেছিলেন, যখন তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। এবং এটি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামও বলেছিলেন, যখন লোকে বলেছিল, (মক্কার কাফির) লোকেরা তোমাদের (সাথে যুদ্ধ করার) জন্য (পুনরায়) সেনা সংগ্রহ করেছে, সুতরাং তাদেরকে ভয় কর। তখন এটা (এই সংবাদ) তাদের ঈমানের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয় এবং তারা বলে ওঠে, আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি উত্তম কর্মবিধায়ক। -বুখারী শরীফের অপর এক বর্ণনায় আছে, ইবরাহীম আ.-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তখন তাঁর সর্বশেষ কথা ছিল-
حَسْبِي اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
(আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি উত্তম কর্মসম্পাদনকারী)
(সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৪৫৬৩, ৪৫৬৪)
مقدمة الامام النووي
7 - باب في اليقين والتوكل
76 - الثالث: عن ابن عباس رضي الله عنهما أيضًا، قَالَ: حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الوَكِيلُ، قَالَهَا إِبرَاهيمُ - صلى الله عليه وسلم - حِينَ أُلقِيَ في النَّارِ، وَقَالَها مُحَمَّدٌ - صلى الله عليه وسلم - حِينَ قَالُوا: إنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إيْمانًا وَقَالُوا: حَسْبُنَا الله وَنِعْمَ الوَكيلُ. رواه البخاري. (1)

وفي رواية لَهُ عن ابن عَبَّاسٍ رضي الله عنهما، قَالَ: كَانَ آخر قَول إبْرَاهِيمَ - صلى الله عليه وسلم - حِينَ أُلْقِيَ في النَّارِ: حَسْبِي الله ونِعْمَ الوَكِيلُ.
হাদীস নং: ৭৭
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ইয়াকীন ও তাওয়াক্কুল।
তাওয়াক্কুল করা জান্নাতীদের বৈশিষ্ট্য
হাদীছ নং: ৭৭

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, জান্নাতে প্রবেশ করবে এমনসব লোক, যাদের অন্তর পাখির অন্তরের মত - মুসলিম। (সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ২৮৪০; আহমাদ, হাদীছ নং ৮৩৬৪)
مقدمة الامام النووي
7 - باب في اليقين والتوكل
77 - الرابع: عن أبي هريرةَ - رضي الله عنه - عن النَّبيّ - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «يَدْخُلُ الجَنَّةَ أَقْوامٌ أفْئِدَتُهُمْ مِثلُ أفْئِدَةِ الطَّيرِ». رواه مسلم. (1)
قيل: معناه متوكلون، وقيل: قلوبهم رَقيقَةٌ.
হাদীস নং: ৭৮
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ইয়াকীন ও তাওয়াক্কুল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের আল্লাহনির্ভরতা
হাদীছ নং: ৭৮

হযরত জাবির রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি নাজদ অভিমুখে এক যুদ্ধাভিযানে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সেখান থেকে ফিরে আসেন, তখন তিনিও তাঁর সাথে ফিরে আসেন। তাঁদের দুপুর হল এমন এক উপত্যকায়, যেখানে প্রচুর কাঁটাদার গাছ ছিল। সেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাত্রাবিরতি দিলেন। লোকজন গাছের ছায়া গ্রহণের জন্য ছড়িয়ে পড়ল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটা বাবলা গাছের নিচে নামলেন। তিনি তাঁর তরবারি সে গাছে ঝুলিয়ে রাখলেন। হযরত জাবির রাযি. বলেন, আমরা সকলে একটু ঘুমিয়ে পড়লাম। সহসা শুনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু “আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের ডাকছেন আর তাঁর কাছে এক বেদুঈন। (আমরা তাঁর কাছে গেলে) তিনি বললেন, আমি ঘুমে থাকা অবস্থায় সে আমার উপর আমারই তরবারিটি চালাতে উদ্যত হয়। অমনি আমি জেগে উঠি। দেখি তার হাতে নাঙ্গা তরবারি। সে বলল, আমার হাত থেকে কে তোমাকে রক্ষা করবে? আমি তিনবার বললাম, আল্লাহ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কোনও শাস্তি দিলেন না এবং তিনি বসে পড়লেন। -বুখারী ও মুসলিম। (সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ২৯১০, ২৯১৩, ৪১৩৪, ৪১৩৬; সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ৮৪৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ১৪৩৭৪)
অপর এক বর্ণনায় আছে, হযরত জাবির রাযি. বলেন, আমরা যাতুর রিকা‘র যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ছিলাম। আমরা একটি ছায়াদার গাছের কাছে পৌঁছলে সেটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য ছেড়ে দিলাম। তারপর জনৈক মুশরিক আসল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরবারিটি গাছে ঝুলানো ছিল। সে তরবারিটি নিয়ে খাপমুক্ত করল। তারপর বলল, তুমি কি আমাকে ভয় কর? তিনি বললেন, না। সে বলল, কে তোমাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করবে? তিনি বললেন, আল্লাহ।
আবূ বকর ইসমা‘ঈলী তাঁর ‘সহীহ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন, লোকটি বলল, আমার হাত থেকে কে তোমাকে রক্ষা করবে? তিনি বললেন, আল্লাহ। অমনি তরবারিটি তার হাত থেকে পড়ে গেল। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তরবারিটি নিলেন এবং বললেন, কে তোমাকে আমার হাত থেকে বাঁচাবে? সে বলল, আপনি উত্তম তরবারিধারী হোন। তিনি বললেন, তুমি কি সাক্ষ্য দাও আল্লাহ ছাড়া কোনও মা‘বূদ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল? সে বলল, না। তবে আমি আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না এবং যারা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, সেইসব লোকের সঙ্গেও থাকব না। তিনি তাকে ছেড়ে দিলেন। সে তার সঙ্গীদের কাছে (ফিরে) আসল। তাদের বলল, আমি তোমাদের কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষটির কাছ থেকে এসেছি।
مقدمة الامام النووي
7 - باب في اليقين والتوكل
78 - الخامس: عن جابر - رضي الله عنه: أَنَّهُ غَزَا مَعَ النبي - صلى الله عليه وسلم - قِبلَ نَجْدٍ، فَلَمَّا قَفَلَ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم - قَفَلَ معَهُمْ، فَأَدْرَكَتْهُمُ القَائِلَةُ (1) في وَادٍ كثير العِضَاه، فَنَزَلَ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم - وَتَفَرَّقَ النَّاسُ يَسْتَظِلُّونَ بالشَّجَرِ، وَنَزَلَ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم [ص:46] تَحتَ سَمُرَة فَعَلَّقَ بِهَا سَيفَهُ وَنِمْنَا نَوْمَةً، فَإِذَا رسولُ الله - صلى الله عليه وسلم - يَدْعونَا وَإِذَا عِنْدَهُ أعْرَابِيٌّ، فَقَالَ: «إنَّ هَذَا اخْتَرَطَ عَلَيَّ سَيفِي وَأنَا نَائمٌ فَاسْتَيقَظْتُ وَهُوَ في يَدِهِ صَلتًا، قَالَ: مَنْ يَمْنَعُكَ مِنِّي؟ قُلْتُ: اللهُ - ثلاثًا» وَلَمْ يُعاقِبْهُ وَجَلَسَ. مُتَّفَقٌ عَلَيهِ. (2)
وفي رواية قَالَ جَابرٌ: كُنَّا مَعَ رَسُولِ الله - صلى الله عليه وسلم - بذَاتِ الرِّقَاعِ، فَإِذَا أَتَيْنَا عَلَى شَجَرَةٍ ظَلِيلَةٍ تَرَكْنَاهَا لرسول الله - صلى الله عليه وسلم - فجاء رَجُلٌ مِنَ المُشْركينَ وَسَيفُ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم - معَلَّقٌ بالشَّجَرَةِ فَاخْتَرطَهُ، فَقَالَ: تَخَافُنِي؟ قَالَ: «لاَ» فَقَالَ: فَمَنْ يَمْنَعُكَ مِنِّي؟ قَالَ: «الله».
وفي رواية أبي بكر الإسماعيلي في «صحيحه»، قَالَ: مَنْ يَمْنَعُكَ مِنِّي؟ قَالَ: «اللهُ». قَالَ: فَسَقَطَ السيفُ مِنْ يَدهِ، فَأخَذَ رسولُ الله - صلى الله عليه وسلم - السَّيْفَ، فَقَالَ: «مَنْ يَمْنَعُكَ مني؟». فَقَالَ: كُنْ خَيرَ آخِذٍ. فَقَالَ: «تَشْهَدُ أَنْ لا إلهَ إلاَّ الله وَأَنِّي رَسُول الله؟» قَالَ: لاَ، وَلَكنِّي أُعَاهِدُكَ أَنْ لا أُقَاتِلَكَ، وَلاَ أَكُونَ مَعَ قَومٍ يُقَاتِلُونَكَ، فَخَلَّى سَبيلَهُ، فَأَتَى أصْحَابَهُ، فَقَالَ: جئتُكُمْ مِنْ عنْد خَيْرِ النَّاسِ.
قَولُهُ: «قَفَلَ» أي رجع، وَ «الْعِضَاهُ» الشجر الَّذِي لَهُ شوك، و «السَّمُرَةُ» بفتح السين وضم الميم: الشَّجَرَةُ مِنَ الطَّلْح، وهيَ العِظَامُ مِنْ شَجَرِ العِضَاهِ، وَ «اخْتَرَطَ السَّيْف» أي سلّه وَهُوَ في يدهِ. «صَلْتًا» أي مسلولًا، وَهُوَ بفتحِ الصادِ وضَمِّها.
হাদীস নং: ৭৯
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ইয়াকীন ও তাওয়াক্কুল।
পাখির মত সহজে রিয্ক পেতে চাইলে
হাদীছ নং : ৭৯

হযরত উমর রাযি. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তোমরা যদি আল্লাহ তা'আলার উপর যেমন তাওয়াক্কুল করা উচিত তেমন তাওয়াক্কুল করতে, তবে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে রিযক দিতেন যেমন তিনি পাখিদের রিযক দিয়ে থাকেন। ভোরবেলা খালিপেটে বের হতে, বিকেল বেলা ভরাপেটে ফিরতে।-তিরমিযী।
ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, এটি 'হাসান' স্তরের হাদীস।
(জামে তিরমিযী, হাদীছ নং ২৩৪৪; সুনানে ইবন মাজাহ, হাদীছ নং ৪১৬৪; মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ২০৫)
مقدمة الامام النووي
7 - باب في اليقين والتوكل
79 - السادس: عن عُمَر - رضي الله عنه - قَالَ: سمعتُ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم - يقول: «لَوْ أَنَّكُمْ تَتَوَكَّلُونَ عَلَى اللهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ لَرَزَقَكُمْ كَمَا يَرْزُقُ الطَّيْرَ، تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا». رواه الترمذي، (1) وَقالَ: «حديث حسن».
معناه: تَذْهبُ أَوَّلَ النَّهَارِ خِمَاصًا: أي ضَامِرَةَ البُطُونِ مِنَ الجُوعِ، وَتَرجعُ آخِرَ النَّهَارِ بِطَانًا. أَي مُمْتَلِئَةَ البُطُونِ.
হাদীস নং: ৮০
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ইয়াকীন ও তাওয়াক্কুল।
ঘুমের সময় আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা ও ঘুমের দু‘আ
হাদীছ নং :৮০

হযরত আবূ উমারা বারা’ ইবন ‘আযিব রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, হে অমুক! তুমি যখন তোমার বিছানায় যাবে তখন বলবে-
اللَّهُمَّ أَسْلَمْتُ نَفْسِي إِلَيْكَ، وَوَجَّهْتُ وَجْهِي إِلَيْكَ، وَفَوَّضْتُ أَمْرِي إِلَيْكَ، وَأَلْجَأْتُ ظَهْرِي إِلَيْكَ، رَغْبَةً وَرَهْبَةً إِلَيْكَ، لَا مَلْجَأَ، وَلَا مَنْجَى مِنْكَ إِلَّا إِلَيْكَ، آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ، وَنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ،
হে আল্লাহ! আমি নিজেকে আপনার নিকট সমর্পণ করলাম, আমি নিজ চেহারা আপনার অভিমুখী করলাম, আমি আমার যাবতীয় বিষয় আপনার নিকট ন্যস্ত করলাম এবং আমি আমার পিঠকে আপনার আশ্রয়ে দিলাম- আপনার কাছে আশা ও ভয়ের সাথে। আপনি ছাড়া কোনও আশ্রয়ের জায়গা নেই এবং আপনি ছাড়া নেই নাজাতের কোনও স্থান। আমি ঈমান এনেছি আপনার ওই কিতাবের প্রতি, যা আপনি নাযিল করেছেন এবং আপনার ওই নবীর প্রতি, যাঁকে আপনি পাঠিয়েছেন।'
তুমি যদি (এই দু'আ পড় এবং) ওই রাতেই মারা যাও, তবে তোমার মৃত্যু হবে 'ফিতরাত' অর্থাৎ ইসলামের উপর। আর যদি ভোরে জেগে ওঠ, তবে বিরাট কল্যাণ লাভ করবে। -বুখারী ও মুসলিম
বুখারী ও মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় আছে, হযরত বারা' রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেছেন, তুমি যখন বিছানায় যাবে তখন নামাযের ওযূর মত ওযূ করবে। তারপর ডানকাতে শোবে এবং বলবে- (এ বলে) তিনি উপরের দু'আটি উল্লেখ করলেন। তারপর তিনি বললেন, এটিই যেন হয় তোমার সর্বশেষ কথা।
(সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৬৩১৩, সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ২৭১০ সুনানে আবু দাউদ, হাদীছ নং ৫০৪৬; জামে তিরমিযী, হাদীছ নং ৩৩৯৪)
مقدمة الامام النووي
7 - باب في اليقين والتوكل
80 - السابع: عن أبي عُمَارة البراءِ بن عازب رضي الله عنهما، قَالَ: قَالَ رسولُ الله - صلى الله عليه وسلم: «يَا فُلانُ، إِذَا أَوَيْتَ إِلَى فراشِكَ، فَقُل: اللَّهُمَّ أسْلَمتُ نَفْسي إلَيْكَ، وَوَجَّهتُ وَجْهِي إلَيْكَ، [ص:47] وَفَوَّضتُ أَمْري إلَيْكَ، وَأَلجأْتُ ظَهري إلَيْكَ رَغبَةً وَرَهبَةً إلَيْكَ، لا مَلْجَأ وَلاَ مَنْجَا مِنْكَ إلاَّ إلَيْكَ، آمنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أنْزَلْتَ؛ وَنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ.
فَإِنَّكَ إِنْ مِتَّ مِنْ لَيلَتِكَ مِتَّ عَلَى الفِطْرَةِ، وَإِنْ أصْبَحْتَ أَصَبْتَ خَيرًا» (1) مُتَّفَقٌ عَلَيهِ. (2)
وفي رواية في الصحيحين، عن البراءِ، قَالَ: قَالَ لي رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم: «إِذَا أَتَيْتَ مَضْجِعَكَ فَتَوَضَّأْ وُضُوءكَ للصَّلاةِ، ثُمَّ اضْطَجعْ عَلَى شِقِّكَ الأَيمَنِ، وَقُلْ ... وذَكَرَ نَحْوَهُ ثُمَّ قَالَ: وَاجْعَلْهُنَّ آخِرَ مَا تَقُولُ».