রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ
رياض الصالحين من كلام سيد المرسلين
৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা - এর পরিচ্ছেদসমূহ
মোট হাদীস ৫১ টি
হাদীস নং: ১০৩১
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ ওযূর ফযীলত: পবিত্রতার গুরুত্ব
১০৩১. হযরত আবূ মালিক আল-আশ'আরী রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ২২৩; জামে তিরমিযী: ৩৫১৭; সুনানে ইবন মাজাহ: ২৮০; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা ৩৭; সুনানে দারিমী: ৬৭৯: তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ৩৪২৪; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা ১৮৫; শু'আবুল ঈমান ১২; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১৪৮)
এটি একটি দীর্ঘ হাদীছের অংশ। হাদীছটি 'সবর' অধ্যায়ে পূর্ণাঙ্গরূপে গত হয়েছে। আলোচ্য অধ্যায়ে হযরত আমর ইবন আবাসা রাযি. বর্ণিত একটি হাদীছও উল্লেখযোগ্য। সে হাদীছটি 'আশা' অধ্যায়ের শেষদিকে গত হয়েছে (হাদীছ নং ৪৩৮)। সেটি অনেকগুলো কল্যাণকর উপদেশমূলক বাক্য সংবলিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সারগর্ভ এক হাদীছ।
এটি একটি দীর্ঘ হাদীছের অংশ। হাদীছটি 'সবর' অধ্যায়ে পূর্ণাঙ্গরূপে গত হয়েছে। আলোচ্য অধ্যায়ে হযরত আমর ইবন আবাসা রাযি. বর্ণিত একটি হাদীছও উল্লেখযোগ্য। সে হাদীছটি 'আশা' অধ্যায়ের শেষদিকে গত হয়েছে (হাদীছ নং ৪৩৮)। সেটি অনেকগুলো কল্যাণকর উপদেশমূলক বাক্য সংবলিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সারগর্ভ এক হাদীছ।
كتاب الفضائل
باب فضل الوضوء
1031 - وعن أَبي مالك الأشعري - رضي الله عنه - قَالَ: قَالَ رسول الله - صلى الله عليه وسلم: «الطُّهُورُ شَطْرُ الإيمَانِ». رواه مسلم. (1)
وَقَدْ سبق بطوله في باب الصبر، وفي البابِ حديث عمرو بن عَبَسَة - رضي الله عنه - السابق (2) في آخر باب الرَّجَاءِ، وَهُوَ حديث عظيم؛ مشتمل عَلَى جمل من الخيرات.
وَقَدْ سبق بطوله في باب الصبر، وفي البابِ حديث عمرو بن عَبَسَة - رضي الله عنه - السابق (2) في آخر باب الرَّجَاءِ، وَهُوَ حديث عظيم؛ مشتمل عَلَى جمل من الخيرات.
হাদীস নং: ১০৩২
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ ওযূর ফযীলত: ওযূর দু'আ ও তার ফযীলত
১০৩২. হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই ওযূ করে এবং সে ওযূ করে পরিপূর্ণরূপে, তারপর বলে- أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُه (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই। তিনি এক, তাঁর কোনও শরীক নেই। এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল), তার জন্য জান্নাতের আটও দরজা খুলে দেওয়া হয়। সে তার যেটি দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ২৩৪; সুনানে আবু দাউদ: ১৬৯; সুনানে ইবন মাজাহ: ৪১৯; সহীহ ইবন খুযায়মা: ২২২; সহীহ ইবন হিব্বান: ১০৫০; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৩৬৮)
তিরমিযীর বর্ণনায় (দু'আটিতে) অতিরিক্ত আছে- اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ (হে আল্লাহ! আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং যারা উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন)। (জামে' তিরমিযী: ৫৫; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৪৮৯৫)
তিরমিযীর বর্ণনায় (দু'আটিতে) অতিরিক্ত আছে- اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ (হে আল্লাহ! আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং যারা উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন)। (জামে' তিরমিযী: ৫৫; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৪৮৯৫)
كتاب الفضائل
باب فضل الوضوء
1032 - وعن عمر بن الخطاب - رضي الله عنه - عن النبيِّ - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «مَا مِنْكُمْ مِنْ أحَدٍ يَتَوَضَّأُ فَيُبْلغُ - أَوْ فَيُسْبِغُ - الوُضُوءَ، ثُمَّ يقول: أشهَدُ أَنْ لا إلهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، وَأشْهَدُ أنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ؛ إِلاَّ فُتِحَتْ لَهُ أَبْوَابُ الجَنَّةِ الثَّمَانِيَةُ يَدْخُلُ مِنْ أَيِّهَا شَاءَ». رواه مسلم. (1)
وزاد الترمذي: «اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ، وَاجْعَلْنِي مِنَ المُتَطَهِّرِينَ».
وزاد الترمذي: «اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ، وَاجْعَلْنِي مِنَ المُتَطَهِّرِينَ».
হাদীস নং: ১০৩৩
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ আযানের ফযীলত
আযানের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ
الأَذَان (আযান) শব্দের অর্থ ঘোষণা, আহ্বান। শাব্দিক অর্থ হিসেবে যে-কোনও ডাক ও ঘোষণার জন্যই শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন কা'বাঘর নির্মাণের পর মানুষকে হজ্জের জন্য আহ্বান জানানোর যে হুকুম আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে দিয়েছিলেন, কুরআন মাজীদে তা এভাবে বর্ণিত হয়েছে-
وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ
'এবং মানুষের মধ্যে হজ্জের ঘোষণা দাও। (সূরা হজ্জ, আয়াত ২৭)
মক্কাবিজয়ের পর হিজরী ৯ম সনে হজ্জের সময় মুশরিকদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সে ঘোষণা সম্পর্কেও কুরআন মাজীদে আযান শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَأَذَانٌ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى النَّاسِ يَوْمَ الْحَجِّ الْأَكْبَرِ أَنَّ اللَّهَ بَرِيءٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ ۙ وَرَسُولُهُ
'বড় হজ্জের দিন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ হতে সমস্ত মানুষের জন্য ঘোষণা করা যাচ্ছে যে, আল্লাহ মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন এবং তাঁর রাসূলও। সূরা তাওবা, আয়াত ৩
তবে ইসলামী পরিভাষায় সাধারণত আযান বলা হয় নামাযের জন্য সুনির্দিষ্ট শব্দে আহ্বান জানানোকে। কাজেই আযান বললে মুসলিম মাত্রই বুঝতে পারে যে, এটা ওই ঘোষণার নাম, যা পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে জামাতে শামিল হওয়ার জন্য দেওয়া হয়ে থাকে। এ আযান অত্যন্ত সারগর্ভ। এটা ইসলামের নিদর্শন। এটা সমুচ্চ শব্দে আল্লাহ তা'আলার যিকির। এটা ইসলামের মৌলিক আকীদা-বিশ্বাসের ঘোষণা। এটা মানুষের দোজাহানের সাফল্যের পথনির্দেশ।
আযানের সূচনা
শুরুতে নামাযের জন্য ডাকার এ ব্যবস্থা ছিল না। মক্কা মুকাররামায় তো প্রকাশ্যে জামাতে নামায পড়ার সুযোগই ছিল না। তাই তখন আযানেরও প্রয়োজন হয়নি। এর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে মদীনা মুনাউওয়ারায়। এখানে প্রথমে মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাযও জামাতের সঙ্গে পড়া শুরু হয়। কিন্তু সবাই যাতে একসঙ্গে মিলিত হয়ে নামায পড়তে পারে, সেজন্য ডাকার কোনও ব্যবস্থা না থাকায় সাহাবায়ে কেরামের বেশ সমস্যা হতো। তারা অনুমান করে মসজিদে আসতেন। তাতে অনেকেরই জামাত ছুটে যেত। বিষয়টা নিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন। তিনি সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে পরামর্শে বসেন। এ নিয়ে একেকজন একেক মত দিচ্ছিলেন। কেউ বলছিলেন নামাযের সময় আগুন জ্বালানো হোক। তা দেখে সবাই বুঝতে পারবে জামাতের সময় হয়ে গেছে। কিন্তু অগ্নিপূজারীরা এ ব্যবস্থা অবলম্বন করত বলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রস্তাব গ্রহণ করলেন না। কেউ বললেন শিঙা বাজানো হোক। কিন্তু এটা ছিল ইহুদিদের রীতি। তাই এ প্রস্তাবও বাতিল হয়ে যায়। কেউ বললেন ঘণ্টা বাজানো হোক। কিন্তু খ্রিষ্টানদের রীতি হওয়ায় এ প্রস্তাবও গৃহীত হলো না। ফলে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া গেল না। সাহাবায়ে কেরাম এ নিয়ে ভাবতে থাকলেন।
বিখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি.-ও বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। রাতের বেলা এ চিন্তার ভেতরই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। স্বপ্নে দেখেন সবুজ পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তি কোথাও যাচ্ছে। তার হাতে একটি ঘণ্টা। তিনি তার কাছ থেকে সে ঘণ্টাটি নিতে চাইলেন। লোকটি এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এর দ্বারা আমরা মানুষকে নামাযের জন্য ডাকব। সে ব্যক্তি বলল, আমি কি তোমাকে এর চেয়ে উৎকৃষ্ট কিছু শিখিয়ে দেব? এ বলে সেই ব্যক্তি হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি.-কে আযানের বাক্যগুলো শিখিয়ে দিলেন। পরদিন ভোরবেলা হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তাঁর স্বপ্নের বৃত্তান্ত পেশ করলেন। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই এটি একটি সত্য স্বপ্ন। অনুরূপ স্বপ্ন দেখেছিলেন হযরত উমর ফারূক রাযি.-ও। কিন্তু তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তা জানানোর আগেই হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি. তাঁর স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করেছিলেন। আরও একাধিক সাহাবী সম্পর্কে জানা যায় যে, তারাও একইরকম স্বপ্ন দেখেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ স্বপ্নকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে নির্দেশনারূপে গণ্য করলেন। তিনি স্বপ্নের বাক্যগুলোকে নামাযের ডাকরূপে অনুমোদন করলেন। তারপর হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি.-কে বললেন, বিলালকে বাক্যগুলো শিখিয়ে দাও। তিনি শিখিয়ে দিলেন। হযরত বিলাল রাযি. ছিলেন সুউচ্চ আওয়াজ ও সুন্দর সুরের অধিকারী। তিনি একটি উঁচু স্থানে উঠে বাক্যগুলো উচ্চারণ করলেন। এভাবে এ সুন্দর বাক্যগুলো দ্বারা জামাতের জন্য ডাকার নিয়ম চালু হলো। হযরত বিলাল রাযি. ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের সর্বপ্রথম মুআযযিন।
আযানের শব্দাবলি, অর্থ ও তাৎপর্য
ইসলামের এ আযান-ব্যবস্থা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যান্য ধর্মের ব্যবস্থা অর্থহীন কোনও আওয়াজমাত্র, যেমন ঘণ্টা পেটানো বা শিঙা বাজানো। কোনও ধর্মে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু এর কোনও ব্যবস্থাই কোনও গভীর ভাব ও তাৎপর্য বহন করে না। ইসলামের ব্যবস্থা অভিনব ও নিগূঢ় মর্মবাহী। এতে সুনির্দিষ্ট কিছু বাক্য আছে, যা সংক্ষেপে পূর্ণ ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে।
আযানের প্রথম বাক্য হলো الله أكبرُ। এর দ্বারা সর্বপ্রথম নামায যার জন্য পড়া হয় সেই আল্লাহর প্রভুত্ব ও মহত্ব ঘোষণা করা হয়। বোঝানো উদ্দেশ্য যে, নামায ও অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগী মানুষের নিজ কল্যাণার্থেই করা জরুরি। এতে আল্লাহর নিজের কোনও উপকার নেই। তিনি এমনই মহামহিম সত্তা যে, কারও ইবাদত-উপাসনায় তাঁর কোনও প্রয়োজন নেই এবং তা করা না করায় তাঁর প্রভুত্বে কিছুমাত্র হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে না, ঘটার অবকাশও নেই। কেননা الله أَكْبَرُ 'আল্লাহ মহান, তিনি যাবতীয় প্রয়োজন ও কমতির ঊর্ধ্বে'। এটা এক পরম সত্য। এ সত্যের প্রতি দৃঢ়তা জ্ঞাপনের জন্য বাক্যটি দু'বার উচ্চারণ করা হয়।
দ্বিতীয় বাক্য হলো- أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلَّا الله (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই)। অর্থাৎ ইবাদত-বন্দেগীর উপযুক্ত কেবল আল্লাহ তা'আলাই। এতে তাঁর কোনও শরীক নেই। এই তাওহীদী বিশ্বাসই ইসলামের মূলমন্ত্র। এরই উপর দাঁড়িয়ে আছে ইসলামের মহাপ্রাসাদ।
তৃতীয় বাক্য হলো- أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের এ সাক্ষ্যদানের মাধ্যমে জানানো হয় যে, আল্লাহ তা'আলার কাছে ইবাদত-বন্দেগীর সেই পন্থাই গ্রহণযোগ্য, যা তিনি তাঁর এ মহান রাসূলের মাধ্যমে মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন। সুতরাং হে মানুষ! তোমরা তাঁর দাওয়াতে সাড়া দাও এবং তাঁর শেখানো পদ্ধতিতে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করো, বিশেষত এই মুহূর্তে এসে নামাযের জামাতে শামিল হও।
চতুর্থ পর্যায়ে আযান যেই জন্য দেওয়া হচ্ছে সেই শ্রেষ্ঠতম ইবাদত নামাযে আসার জন্য ডাক দেওয়া হয়। বলা হয় حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ (তোমরা নামাযে এসো)।
পঞ্চম বাক্যে রয়েছে নামায ও অন্যান্য ইবাদতের তাৎপর্যের দিকে ইঙ্গিত। বলা হয়- حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ (এসা সফলতার দিকে)। নামায ও অন্যান্য ইবাদতেই মানুষের প্রকৃত সফলতা নিহিত। এর দ্বারা আখিরাতের প্রতিও ইশারা হয়ে গেছে। কেননা চূড়ান্ত সফলতা হচ্ছে আখিরাতের মুক্তিলাভ। যা ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে। ব্যাপকার্থে ইবাদত হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার যাবতীয় আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। লৌকিক জীবনের সবকিছুই তার অন্তর্গত। তা মেনে চলার দ্বারা আখিরাতের মুক্তি তো বটেই, পার্থিব জীবনের মুক্তি ও সফলতাও অর্জিত হয়। সুতরাং বিশেষভাবে দুনিয়া বা আখিরাত কোনও একটির সাথে যুক্ত না করে সাধারণভাবে 'এসো সফলতার দিকে' বলে দোজাহানের সফলতা নিশ্চিত হয় যে দীনে ইসলাম দ্বারা, তা আঁকড়ে ধরার ডাক দেওয়া হয়েছে।
সবশেষে মৌল বিশ্বাসে জোর সৃষ্টির লক্ষ্যে পুনরায় আল্লাহর মহিমা ও তাওহীদের বাণী ঘোষণা দ্বারা আযান শেষ করা হয়। কাজেই নামাযের আযান কেবল নামাযের ডাকই নয়; বরং এটা দীনে ইসলামের প্রতি উদাত্ত আহ্বান। প্রতিদিন পাঁচবার মুআযযিন তার সুউচ্চ ধ্বনিতে ইসলামের মৌলবাণী ঘোষণার মাধ্যমে অমুসলিমের সামনে ঈমানের দাওয়াত পেশ করে এবং মুসলিম মন-মানসে ঈমানের মর্মবাণীকে উজ্জীবিত করে তোলে।
আযানের মাহাত্ম্য
আযান ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। যে জনপদে আযান হয়, আযান সে জনপদবাসীর মুসলিম হওয়ার পরিচয় বহন করে। তাই তার বাসিন্দাদের একান্ত কর্তব্য আযানের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া এবং পাঁচও ওয়াক্তে যাতে আযান হয়, তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কেননা এ আযান তাদের জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তার গ্যারান্টি। অর্থাৎ মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী যখন কোনও এলাকায় আযানের ধ্বনি শুনবে, তখন তারা সেখানকার বাসিন্দাদের মুসলিম গণ্য করে তাদের উপর অভিযান চালানো হতে বিরত থাকবে। তাছাড়া ইসলামের পরিচয় বহনকারী গৌরবজনক এ ঘোষণা থেকে কোনও মুসলিম জনপদ বঞ্চিত থাকবে, তা কীভাবে মেনে নেওয়া যেতে পারে? এটা আযানের বিপুল খায়র ও বারাকাত থেকেও তাদের বঞ্চিত থাকার কারণ বটে।
আযান সারা জাহানের জন্যই আল্লাহ তা'আলার এক বিশেষ নি'আমত। সারা বিশ্ব ঘুরেফিরে প্রতি মুহূর্তে এর কল্যাণে সিক্ত হতে থাকে। কেননা নামাযের ওয়াক্তসমূহ সূর্য পরিক্রমণের সাথে যুক্ত হওয়ায় ইসলামের এই সোচ্চার ডাকও বিশ্বভ্রমণ করে বেড়ায়। ফলে এ ডাক প্রতি মুহূর্তে কোথাও না কোথাও ধ্বনিত হতে থাকে। যিনি এ জগৎ সৃষ্টি করেছেন, প্রতি মুহূর্তে তাঁর নাম কোথাও না কোথাও উচ্চারিত হতে থাকে। ইসলাম সারা বিশ্বের দীন হওয়ায় সারা বিশ্ব সর্বক্ষণ তাঁর নামের ধ্বনিতে মুখর থাকে। সেইসঙ্গে সারা বিশ্বের সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান নামের বরকতও এ বিশ্ব লাভ করতে থাকে প্রতিটি মুহূর্তে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন-
وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ
'এবং আমি তোমার কল্যাণে তোমার চর্চাকে উচ্চমর্যাদা দান করেছি। (সূরা ইনশিরাহ, আয়াত ৪)
আযান এ আয়াতের বাস্তব চিত্র। মোটকথা আযানের মাধ্যমে আল্লাহর তাওহীদ ও মুহাম্মাদী রিসালাতের ঘোষণা অনুক্ষণ নিখিল বিশ্বের এক নিরবচ্ছিন্ন ব্যঞ্জনা হয়ে থাকে।
সাধারণভাবে সকল ওয়াক্তের জন্যই একই রকম বাক্যে আযান দেওয়া হয়। কেবল ফজরের আযানে حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ -এর পর দু'বার অতিরিক্ত বলা হয়- الصَّلَاةُ خَيْرٌ مِّنَ النَّوْمِ (ঘুম অপেক্ষা নামায শ্রেষ্ঠ)। এর দ্বারা ক্ষণিকের আরাম ও অলসতা ঝেড়ে ফেলে নামাযের প্রতি উৎসাহ জোগানো উদ্দেশ্য, যাতে মানুষ এই ক্ষণিকের আরাম-আয়েশের বদলে আখিরাতের স্থায়ী অনন্ত সুখ-শান্তি লাভ করতে পারে।
আযানের সম্পর্ক নামাযের ওয়াক্তের সঙ্গে। কাজেই আযান প্রত্যেক ওয়াক্তের দাবি। তাই প্রত্যেক নামাযের আযান দিতে হয় নামাযের ওয়াক্ত হলে পরে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে নামাযের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। আল্লাহর দরবারে আমার হাজির হওয়ার সময় এসে গেছে। আমাকে এজন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। কাজেই ওয়াক্ত হওয়ার আগে দিলে সে আযান শুদ্ধ হয় না। কেননা তাতে আযানের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। জামা'আত শুরু হওয়ার এতটুকু আগে আযান দেওয়া চাই, যাতে আযান শুনে মানুষ ওযূ-ইস্তিঞ্জাসহ নামাযের প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ পায়।
তারপর জামা'আত শুরু হওয়ার প্রাক্কালে আরও একবার নামাযের জন্য ডাক দেওয়া হয়। এ ডাককে ইকামত বলে। ইকামতের বাক্যসমূহ আযানেরই অনুরূপ। কেবল حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ -এর পর দু'বার قَدْ قَامَتِ الصَّلَاةُ 'নামায শুরু হয়ে গেছে' অতিরিক্ত বলতে হয়।
আযান ও ইকামত উভয়টিই 'সুন্নতে মুআক্কাদা'। শ্রোতার কর্তব্য এতে সাড়া দিয়ে জামা'আতে হাজির হওয়া। সেইসঙ্গে মৌখিক উত্তর দেওয়াও মুস্তাহাব। অর্থাৎ মুআযযিন আযান-ইকামতে যেসব শব্দ উচ্চারণ করে, শ্রোতাও হুবহু তাই উচ্চারণ করবে। শুধু حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ ও حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ - এর স্থানে বলবে -لا حَوْلَ وَ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِالله (আল্লাহর সাহায্য ছাড়া সৎকাজ করা ও অসৎকাজ থেকে বিরত থাকা কারও পক্ষে সম্ভব নয়)।
আযান দেওয়ার ফযীলত
আযানের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ
الأَذَان (আযান) শব্দের অর্থ ঘোষণা, আহ্বান। শাব্দিক অর্থ হিসেবে যে-কোনও ডাক ও ঘোষণার জন্যই শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন কা'বাঘর নির্মাণের পর মানুষকে হজ্জের জন্য আহ্বান জানানোর যে হুকুম আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে দিয়েছিলেন, কুরআন মাজীদে তা এভাবে বর্ণিত হয়েছে-
وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ
'এবং মানুষের মধ্যে হজ্জের ঘোষণা দাও। (সূরা হজ্জ, আয়াত ২৭)
মক্কাবিজয়ের পর হিজরী ৯ম সনে হজ্জের সময় মুশরিকদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সে ঘোষণা সম্পর্কেও কুরআন মাজীদে আযান শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَأَذَانٌ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى النَّاسِ يَوْمَ الْحَجِّ الْأَكْبَرِ أَنَّ اللَّهَ بَرِيءٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ ۙ وَرَسُولُهُ
'বড় হজ্জের দিন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ হতে সমস্ত মানুষের জন্য ঘোষণা করা যাচ্ছে যে, আল্লাহ মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন এবং তাঁর রাসূলও। সূরা তাওবা, আয়াত ৩
তবে ইসলামী পরিভাষায় সাধারণত আযান বলা হয় নামাযের জন্য সুনির্দিষ্ট শব্দে আহ্বান জানানোকে। কাজেই আযান বললে মুসলিম মাত্রই বুঝতে পারে যে, এটা ওই ঘোষণার নাম, যা পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে জামাতে শামিল হওয়ার জন্য দেওয়া হয়ে থাকে। এ আযান অত্যন্ত সারগর্ভ। এটা ইসলামের নিদর্শন। এটা সমুচ্চ শব্দে আল্লাহ তা'আলার যিকির। এটা ইসলামের মৌলিক আকীদা-বিশ্বাসের ঘোষণা। এটা মানুষের দোজাহানের সাফল্যের পথনির্দেশ।
আযানের সূচনা
শুরুতে নামাযের জন্য ডাকার এ ব্যবস্থা ছিল না। মক্কা মুকাররামায় তো প্রকাশ্যে জামাতে নামায পড়ার সুযোগই ছিল না। তাই তখন আযানেরও প্রয়োজন হয়নি। এর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে মদীনা মুনাউওয়ারায়। এখানে প্রথমে মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাযও জামাতের সঙ্গে পড়া শুরু হয়। কিন্তু সবাই যাতে একসঙ্গে মিলিত হয়ে নামায পড়তে পারে, সেজন্য ডাকার কোনও ব্যবস্থা না থাকায় সাহাবায়ে কেরামের বেশ সমস্যা হতো। তারা অনুমান করে মসজিদে আসতেন। তাতে অনেকেরই জামাত ছুটে যেত। বিষয়টা নিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন। তিনি সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে পরামর্শে বসেন। এ নিয়ে একেকজন একেক মত দিচ্ছিলেন। কেউ বলছিলেন নামাযের সময় আগুন জ্বালানো হোক। তা দেখে সবাই বুঝতে পারবে জামাতের সময় হয়ে গেছে। কিন্তু অগ্নিপূজারীরা এ ব্যবস্থা অবলম্বন করত বলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রস্তাব গ্রহণ করলেন না। কেউ বললেন শিঙা বাজানো হোক। কিন্তু এটা ছিল ইহুদিদের রীতি। তাই এ প্রস্তাবও বাতিল হয়ে যায়। কেউ বললেন ঘণ্টা বাজানো হোক। কিন্তু খ্রিষ্টানদের রীতি হওয়ায় এ প্রস্তাবও গৃহীত হলো না। ফলে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া গেল না। সাহাবায়ে কেরাম এ নিয়ে ভাবতে থাকলেন।
বিখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি.-ও বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। রাতের বেলা এ চিন্তার ভেতরই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। স্বপ্নে দেখেন সবুজ পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তি কোথাও যাচ্ছে। তার হাতে একটি ঘণ্টা। তিনি তার কাছ থেকে সে ঘণ্টাটি নিতে চাইলেন। লোকটি এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এর দ্বারা আমরা মানুষকে নামাযের জন্য ডাকব। সে ব্যক্তি বলল, আমি কি তোমাকে এর চেয়ে উৎকৃষ্ট কিছু শিখিয়ে দেব? এ বলে সেই ব্যক্তি হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি.-কে আযানের বাক্যগুলো শিখিয়ে দিলেন। পরদিন ভোরবেলা হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তাঁর স্বপ্নের বৃত্তান্ত পেশ করলেন। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই এটি একটি সত্য স্বপ্ন। অনুরূপ স্বপ্ন দেখেছিলেন হযরত উমর ফারূক রাযি.-ও। কিন্তু তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তা জানানোর আগেই হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি. তাঁর স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করেছিলেন। আরও একাধিক সাহাবী সম্পর্কে জানা যায় যে, তারাও একইরকম স্বপ্ন দেখেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ স্বপ্নকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে নির্দেশনারূপে গণ্য করলেন। তিনি স্বপ্নের বাক্যগুলোকে নামাযের ডাকরূপে অনুমোদন করলেন। তারপর হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ রাযি.-কে বললেন, বিলালকে বাক্যগুলো শিখিয়ে দাও। তিনি শিখিয়ে দিলেন। হযরত বিলাল রাযি. ছিলেন সুউচ্চ আওয়াজ ও সুন্দর সুরের অধিকারী। তিনি একটি উঁচু স্থানে উঠে বাক্যগুলো উচ্চারণ করলেন। এভাবে এ সুন্দর বাক্যগুলো দ্বারা জামাতের জন্য ডাকার নিয়ম চালু হলো। হযরত বিলাল রাযি. ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের সর্বপ্রথম মুআযযিন।
আযানের শব্দাবলি, অর্থ ও তাৎপর্য
ইসলামের এ আযান-ব্যবস্থা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যান্য ধর্মের ব্যবস্থা অর্থহীন কোনও আওয়াজমাত্র, যেমন ঘণ্টা পেটানো বা শিঙা বাজানো। কোনও ধর্মে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু এর কোনও ব্যবস্থাই কোনও গভীর ভাব ও তাৎপর্য বহন করে না। ইসলামের ব্যবস্থা অভিনব ও নিগূঢ় মর্মবাহী। এতে সুনির্দিষ্ট কিছু বাক্য আছে, যা সংক্ষেপে পূর্ণ ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে।
আযানের প্রথম বাক্য হলো الله أكبرُ। এর দ্বারা সর্বপ্রথম নামায যার জন্য পড়া হয় সেই আল্লাহর প্রভুত্ব ও মহত্ব ঘোষণা করা হয়। বোঝানো উদ্দেশ্য যে, নামায ও অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগী মানুষের নিজ কল্যাণার্থেই করা জরুরি। এতে আল্লাহর নিজের কোনও উপকার নেই। তিনি এমনই মহামহিম সত্তা যে, কারও ইবাদত-উপাসনায় তাঁর কোনও প্রয়োজন নেই এবং তা করা না করায় তাঁর প্রভুত্বে কিছুমাত্র হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে না, ঘটার অবকাশও নেই। কেননা الله أَكْبَرُ 'আল্লাহ মহান, তিনি যাবতীয় প্রয়োজন ও কমতির ঊর্ধ্বে'। এটা এক পরম সত্য। এ সত্যের প্রতি দৃঢ়তা জ্ঞাপনের জন্য বাক্যটি দু'বার উচ্চারণ করা হয়।
দ্বিতীয় বাক্য হলো- أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلَّا الله (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই)। অর্থাৎ ইবাদত-বন্দেগীর উপযুক্ত কেবল আল্লাহ তা'আলাই। এতে তাঁর কোনও শরীক নেই। এই তাওহীদী বিশ্বাসই ইসলামের মূলমন্ত্র। এরই উপর দাঁড়িয়ে আছে ইসলামের মহাপ্রাসাদ।
তৃতীয় বাক্য হলো- أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের এ সাক্ষ্যদানের মাধ্যমে জানানো হয় যে, আল্লাহ তা'আলার কাছে ইবাদত-বন্দেগীর সেই পন্থাই গ্রহণযোগ্য, যা তিনি তাঁর এ মহান রাসূলের মাধ্যমে মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন। সুতরাং হে মানুষ! তোমরা তাঁর দাওয়াতে সাড়া দাও এবং তাঁর শেখানো পদ্ধতিতে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করো, বিশেষত এই মুহূর্তে এসে নামাযের জামাতে শামিল হও।
চতুর্থ পর্যায়ে আযান যেই জন্য দেওয়া হচ্ছে সেই শ্রেষ্ঠতম ইবাদত নামাযে আসার জন্য ডাক দেওয়া হয়। বলা হয় حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ (তোমরা নামাযে এসো)।
পঞ্চম বাক্যে রয়েছে নামায ও অন্যান্য ইবাদতের তাৎপর্যের দিকে ইঙ্গিত। বলা হয়- حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ (এসা সফলতার দিকে)। নামায ও অন্যান্য ইবাদতেই মানুষের প্রকৃত সফলতা নিহিত। এর দ্বারা আখিরাতের প্রতিও ইশারা হয়ে গেছে। কেননা চূড়ান্ত সফলতা হচ্ছে আখিরাতের মুক্তিলাভ। যা ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে। ব্যাপকার্থে ইবাদত হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার যাবতীয় আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। লৌকিক জীবনের সবকিছুই তার অন্তর্গত। তা মেনে চলার দ্বারা আখিরাতের মুক্তি তো বটেই, পার্থিব জীবনের মুক্তি ও সফলতাও অর্জিত হয়। সুতরাং বিশেষভাবে দুনিয়া বা আখিরাত কোনও একটির সাথে যুক্ত না করে সাধারণভাবে 'এসো সফলতার দিকে' বলে দোজাহানের সফলতা নিশ্চিত হয় যে দীনে ইসলাম দ্বারা, তা আঁকড়ে ধরার ডাক দেওয়া হয়েছে।
সবশেষে মৌল বিশ্বাসে জোর সৃষ্টির লক্ষ্যে পুনরায় আল্লাহর মহিমা ও তাওহীদের বাণী ঘোষণা দ্বারা আযান শেষ করা হয়। কাজেই নামাযের আযান কেবল নামাযের ডাকই নয়; বরং এটা দীনে ইসলামের প্রতি উদাত্ত আহ্বান। প্রতিদিন পাঁচবার মুআযযিন তার সুউচ্চ ধ্বনিতে ইসলামের মৌলবাণী ঘোষণার মাধ্যমে অমুসলিমের সামনে ঈমানের দাওয়াত পেশ করে এবং মুসলিম মন-মানসে ঈমানের মর্মবাণীকে উজ্জীবিত করে তোলে।
আযানের মাহাত্ম্য
আযান ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। যে জনপদে আযান হয়, আযান সে জনপদবাসীর মুসলিম হওয়ার পরিচয় বহন করে। তাই তার বাসিন্দাদের একান্ত কর্তব্য আযানের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া এবং পাঁচও ওয়াক্তে যাতে আযান হয়, তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কেননা এ আযান তাদের জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তার গ্যারান্টি। অর্থাৎ মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী যখন কোনও এলাকায় আযানের ধ্বনি শুনবে, তখন তারা সেখানকার বাসিন্দাদের মুসলিম গণ্য করে তাদের উপর অভিযান চালানো হতে বিরত থাকবে। তাছাড়া ইসলামের পরিচয় বহনকারী গৌরবজনক এ ঘোষণা থেকে কোনও মুসলিম জনপদ বঞ্চিত থাকবে, তা কীভাবে মেনে নেওয়া যেতে পারে? এটা আযানের বিপুল খায়র ও বারাকাত থেকেও তাদের বঞ্চিত থাকার কারণ বটে।
আযান সারা জাহানের জন্যই আল্লাহ তা'আলার এক বিশেষ নি'আমত। সারা বিশ্ব ঘুরেফিরে প্রতি মুহূর্তে এর কল্যাণে সিক্ত হতে থাকে। কেননা নামাযের ওয়াক্তসমূহ সূর্য পরিক্রমণের সাথে যুক্ত হওয়ায় ইসলামের এই সোচ্চার ডাকও বিশ্বভ্রমণ করে বেড়ায়। ফলে এ ডাক প্রতি মুহূর্তে কোথাও না কোথাও ধ্বনিত হতে থাকে। যিনি এ জগৎ সৃষ্টি করেছেন, প্রতি মুহূর্তে তাঁর নাম কোথাও না কোথাও উচ্চারিত হতে থাকে। ইসলাম সারা বিশ্বের দীন হওয়ায় সারা বিশ্ব সর্বক্ষণ তাঁর নামের ধ্বনিতে মুখর থাকে। সেইসঙ্গে সারা বিশ্বের সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান নামের বরকতও এ বিশ্ব লাভ করতে থাকে প্রতিটি মুহূর্তে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন-
وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ
'এবং আমি তোমার কল্যাণে তোমার চর্চাকে উচ্চমর্যাদা দান করেছি। (সূরা ইনশিরাহ, আয়াত ৪)
আযান এ আয়াতের বাস্তব চিত্র। মোটকথা আযানের মাধ্যমে আল্লাহর তাওহীদ ও মুহাম্মাদী রিসালাতের ঘোষণা অনুক্ষণ নিখিল বিশ্বের এক নিরবচ্ছিন্ন ব্যঞ্জনা হয়ে থাকে।
সাধারণভাবে সকল ওয়াক্তের জন্যই একই রকম বাক্যে আযান দেওয়া হয়। কেবল ফজরের আযানে حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ -এর পর দু'বার অতিরিক্ত বলা হয়- الصَّلَاةُ خَيْرٌ مِّنَ النَّوْمِ (ঘুম অপেক্ষা নামায শ্রেষ্ঠ)। এর দ্বারা ক্ষণিকের আরাম ও অলসতা ঝেড়ে ফেলে নামাযের প্রতি উৎসাহ জোগানো উদ্দেশ্য, যাতে মানুষ এই ক্ষণিকের আরাম-আয়েশের বদলে আখিরাতের স্থায়ী অনন্ত সুখ-শান্তি লাভ করতে পারে।
আযানের সম্পর্ক নামাযের ওয়াক্তের সঙ্গে। কাজেই আযান প্রত্যেক ওয়াক্তের দাবি। তাই প্রত্যেক নামাযের আযান দিতে হয় নামাযের ওয়াক্ত হলে পরে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে নামাযের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। আল্লাহর দরবারে আমার হাজির হওয়ার সময় এসে গেছে। আমাকে এজন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। কাজেই ওয়াক্ত হওয়ার আগে দিলে সে আযান শুদ্ধ হয় না। কেননা তাতে আযানের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। জামা'আত শুরু হওয়ার এতটুকু আগে আযান দেওয়া চাই, যাতে আযান শুনে মানুষ ওযূ-ইস্তিঞ্জাসহ নামাযের প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ পায়।
তারপর জামা'আত শুরু হওয়ার প্রাক্কালে আরও একবার নামাযের জন্য ডাক দেওয়া হয়। এ ডাককে ইকামত বলে। ইকামতের বাক্যসমূহ আযানেরই অনুরূপ। কেবল حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ -এর পর দু'বার قَدْ قَامَتِ الصَّلَاةُ 'নামায শুরু হয়ে গেছে' অতিরিক্ত বলতে হয়।
আযান ও ইকামত উভয়টিই 'সুন্নতে মুআক্কাদা'। শ্রোতার কর্তব্য এতে সাড়া দিয়ে জামা'আতে হাজির হওয়া। সেইসঙ্গে মৌখিক উত্তর দেওয়াও মুস্তাহাব। অর্থাৎ মুআযযিন আযান-ইকামতে যেসব শব্দ উচ্চারণ করে, শ্রোতাও হুবহু তাই উচ্চারণ করবে। শুধু حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ ও حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ - এর স্থানে বলবে -لا حَوْلَ وَ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِالله (আল্লাহর সাহায্য ছাড়া সৎকাজ করা ও অসৎকাজ থেকে বিরত থাকা কারও পক্ষে সম্ভব নয়)।
আযান দেওয়ার ফযীলত
১০৩৩. হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, লোকে যদি জানত আযান দেওয়ায় ও প্রথম কাতারে কী (ফযীলত) আছে আর লটারি ধরা ছাড়া তা লাভের কোনও সুযোগ না পেত, তবে অবশ্যই সেজন্য লটারি ধরত। এমনিভাবে তারা যদি জানত নামাযে আগে আগে আসার মধ্যে কী আছে, তবে তারা সেজন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো। আর তারা যদি জানত ইশা ও ফজরের নামাযে কী আছে, তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তাতে আসত। -বুখারী ও মুসলিম। (সহীহ বুখারী: ৬১৫; সহীহ মুসলিম: ৪৩৭; সুনানে নাসাঈ ৫৪০; মুসনাদে আহমাদ: ৭২২৬; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ২০০৭; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা। ২০১২)
كتاب الفضائل
باب فضل الأذان
1033 - عن أَبي هريرة - رضي الله عنه: أنَّ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «لَوْ يَعْلَمُ النَّاسُ مَا في النِّدَاءِ والصَّفِ الأَوَّلِ، ثُمَّ لَمْ يَجِدُوا إِلاَّ أَنْ يَسْتَهِمُوا عَلَيْهِ لاسْتَهَمُوا عَلَيْهِ، ولو يَعْلَمُونَ مَا فِي التَّهْجِيرِ لاَسْتَبَقُوا إِلَيْهِ، وَلَوْ يَعْلَمُونَ مَا فِي العَتَمَةِ (1) وَالصُّبْحِ لأَتَوْهُمَا وَلَوْ حَبْوًا». متفقٌ عَلَيْهِ. (2)
«الاسْتِهَامُ»: الاقْتِرَاعُ، وَ «التَّهْجِيرُ»: التَّبْكِيرُ إِلَى الصَّلاةِ.
«الاسْتِهَامُ»: الاقْتِرَاعُ، وَ «التَّهْجِيرُ»: التَّبْكِيرُ إِلَى الصَّلاةِ.
হাদীস নং: ১০৩৪
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ মুআযযিনের মর্যাদা
১০৩৪. হযরত মু'আবিয়া রাযি. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন মুআযযিনদের গর্দান সর্বাপেক্ষা উঁচু হবে।-মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ৩৮৭; সুনানে ইবন মাজাহ ৭২৫; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ১৮৬১। মুসনাদে ইসহাক ইবন রাহুয়াহ: ১৫১; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার: ২০৮; সহীহ ইবন হিব্বান: ১৬৬৯; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ৭৩৬; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ২০৩৭)
كتاب الفضائل
باب فضل الأذان
1034 - وعن معاوية - رضي الله عنه - قَالَ: سَمِعْتُ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يقولُ: «المُؤَذِّنُونَ أطْوَلُ النَّاسِ أعْناقًا يَوْمَ القِيَامَةِ». رواه مسلم. (1)
হাদীস নং: ১০৩৫
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ আযানের ফযীলত: মুআযযিনের পক্ষে তার আযানের শব্দ শ্রবণকারী সকলের সাক্ষ্যদান
১০৩৫. আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুর রহমান ইবন আবী সা'সা'আ থেকে বর্ণিত যে, হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি. তাকে বললেন, আমি দেখছি তুমি ছাগল ও পল্লি ভালোবাস। সুতরাং তুমি যখন তোমার ছাগলপালের সঙ্গে কিংবা পল্লিতে থাকবে আর এ অবস্থায় আযান দেবে, তখন আযানে তোমার আওয়াজ উঁচু করবে। কেননা মুআযযিনের আযান যতদূর পৌঁছায়, ততদূর পর্যন্ত যত জিন, মানুষ ও অন্য কোনওকিছু তা শুনতে পায়, তারা সকলেই কিয়ামতের দিন তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। আবূ সা'ঈদ রাযি. বলেন, আমি এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে শুনেছি। -বুখারী। (সহীহ বুখারী: ৬০৯; সুনানে নাসাঈ ৬৪৪; সহীহ ইবন হিব্বান ১৬৬১; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৮৬০; সহীহ ইবন খুযায়মা ৩৮৯; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৩১৩১)
كتاب الفضائل
باب فضل الأذان
1035 - وعن عبدِ الله بن عبدِ الرَّحْمانِ بن أَبي صَعصعة: أنَّ أَبَا سَعيد الخدريَّ - رضي الله عنه - قَالَ لَهُ: «إنِّي أرَاكَ تُحبُّ الغَنَمَ وَالبَادِيَةَ فَإذَا كُنْتَ في غَنَمِك - أَوْ بَادِيتِكَ - فَأذَّنْتَ للصَّلاَةِ، فَارْفَعْ صَوْتَكَ بِالنِّدَاءِ، فَإنَّهُ لا يَسْمَعُ مَدَى صَوْتِ المُؤذِّنِ جِنٌّ، وَلاَ إنْسٌ، وَلاَ شَيْءٌ، إِلاَّ شَهِدَ لَهُ يَومَ القِيَامَةِ» قَالَ أَبُو سَعيدٍ: سمعتُهُ مِنْ رَسولِ الله - صلى الله عليه وسلم. رواه البخاري. (1)
হাদীস নং: ১০৩৬
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ আযানের ফযীলত: আযানের আওয়াজে শয়তানের পলায়ন
১০৩৬. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন নামাযের জন্য আযান দেওয়া হয়, তখন শয়তান সশব্দে বায়ু ত্যাগ করতে করতে পালায়, যাতে আযানের আওয়াজ শুনতে না পায়। তারপর যখন আযান শেষ হয়ে যায়, ফিরে আসে। তারপর যখন নামাযের জন্য ইকামত দেওয়া হয়, তখনও পালায়। যখন ইকামত শেষ হয়ে যায়, আবার ফিরে আসে এবং মানুষের মনে ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করতে থাকে আর যা তার মনে থাকে না সে সম্পর্কে বলে, অমুক বিষয়টা মনে করো, অমুক বিষয়টা মনে করো। ফলে লোকটার এমন অবস্থা হয়ে যায় যে, সে কত রাকাত পড়েছে বলতে পারে না। -বুখারী ও মুসলিম। (সহীহ বুখারী: ৬০৮; সহীহ মুসলিম: ৩৮৯। সুনানে আবু দাউদ। ৫১৬: সুনানে নাসাঈ। ৬৭০; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২৩৭৪; মুসনাদে আহমাদ ৮১২১; সহীহ ইবন খুযায়মা: ৩৯২; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার: ২৫০৭; সুনানে দারা কুতনী: ১৪০৪)
كتاب الفضائل
باب فضل الأذان
1036 - وعن أَبي هريرة - رضي الله عنه - قَالَ: قَالَ رسول الله - صلى الله عليه وسلم: «إِذَا نُودِيَ بالصَّلاَةِ، أدْبَرَ الشَّيْطَانُ، وَلَهُ ضُرَاطٌ حَتَّى لاَ يَسْمَعَ التَّأذِينَ، فَإذَا قُضِيَ النِّدَاءُ أقْبَلَ، حَتَّى إِذَا ثُوِّبَ للصَّلاةِ أدْبَرَ، حَتَّى إِذَا قُضِيَ التَّثْوِيبُ أقْبَلَ، حَتَّى يَخْطِرَ بَيْنَ المَرْءِ وَنَفْسِهِ، يَقُولُ: اذْكُرْ كَذَا واذكر كَذَا - لِمَا لَمْ يَذْكُر مِنْ قَبْلُ - حَتَّى يَظَلَّ الرَّجُلُ مَا يَدْرِي كَمْ صَلَّى». متفقٌ عَلَيْهِ. (1)
«التَّثْوِيبُ»: الإقَامَةُ.
«التَّثْوِيبُ»: الإقَامَةُ.
হাদীস নং: ১০৩৭
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ আযানের ফযীলত: আযানের জবাবে যা বলবে
১০৩৭. হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস রাযি. থেকে বর্ণিত যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন, তোমরা যখন আযান শোন, তখন মুআযযিন যা বলে অনুরূপ বলো। তারপর আমার প্রতি দরূদ পড়ো। কেননা যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরূদ পড়ে, আল্লাহ তার প্রতি তার বদলে দশবার রহমত নাযিল করেন। তারপর আমার জন্য আল্লাহর কাছে অসিলা প্রার্থনা করো। অসিলা হলো জান্নাতে এমন একটি স্থান, যা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল এক বান্দার জন্যই উপযোগী। আমি আশা করি সে আমিই। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার জন্য অসিলা প্রার্থনা করবে, তার জন্য শাফা'আত অবধারিত হয়ে যাবে। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ৩৮৩: সুনানে আবু দাউদ: ৫২৩; সুনানে নাসাঈ ৬৭৮; সহীহ ইবন খুযায়মা: ৪১৮; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার ৮৭৮; মুসনাদে আহমাদ: ৬৫৬৯; সহীহ ইবন হিব্বান: ১৬৯২; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৯৩৩৫; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৯৩১)
كتاب الفضائل
باب فضل الأذان
1037 - وعن عبدِ الله بن عمرو بن العاص رضي الله عنهما: أنّه سمع رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يقول: «إِذَا سَمِعْتُمُ النداء فَقُولُوا مِثْلَ مَا يَقُولُ، ثُمَّ صَلُّوا عَلَيَّ؛ فَإنَّه مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلاَةً صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا، ثُمَّ سَلُوا اللهَ لِيَ الوَسِيلَةَ؛ فَإنَّهَا مَنْزِلَةٌ في الجَنَّةِ لاَ تَنْبَغِي إِلاَّ لِعَبْدٍ مِنْ عِبَادِ اللهِ وَأرْجُو أَنْ أكونَ أنَا هُوَ، فَمَنْ سَألَ لِيَ الوَسِيلَةَ حَلَّتْ لَهُ الشَّفَاعَةُ». رواه مسلم. (1)
হাদীস নং: ১০৩৮
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ আযানের ফযীলত: আযানের জবাবে যা বলবে
১০৩৮. হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা যখন আযান শোন, তখন মুআযযিন যা বলে অনুরূপ বলো। -বুখারী ও মুসলিম। (সহীহ বুখারী: ৬১১; সহীহ মুসলিম: ৩৮৩; সুনানে ইবন মাজাহ: ৭২০; মুসনাদুল বাযযার: ৬৬৭৮; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২৩৫৭; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ১৮৪২)
كتاب الفضائل
باب فضل الأذان
1038 - وعن أَبي سعيد الخدري - رضي الله عنه: أنَّ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «إِذَا سَمِعْتُمُ النِّدَاءَ، فَقُولُوا كَمَا يَقُولُ المُؤذِّنُ». متفقٌ عَلَيْهِ. (1)
হাদীস নং: ১০৩৯
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ আযানের ফযীলত: আযানের দু'আ
১০৩৯. হযরত জাবির রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আযান শুনে বলবে- اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ (হে আল্লাহ! এই পূর্ণাঙ্গ আহ্বান ও আসন্ন নামাযের প্রতিপালক! আপনি মুহাম্মাদকে দান করুন অসিলা ও শ্রেষ্ঠত্ব। এবং তাঁকে পৌঁছে দিন সেই প্রশংসিত স্থানে, যার ওয়াদা আপনি করেছেন), কিয়ামতের দিন তার জন্য আমার শাফাআত ওয়াজিব হয়ে যাবে। -বুখারী। (সহীহ বুখারী: ৬১৪; সুনানে আবু দাউদ: ৫২৯; সুনানে নাসাঈ ৬৮০; জামে তিরমিযী: ২১১: সুনানে ইবন মাজাহ ৭২০; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ১৯১১; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২৩৬৫; সহীহ ইবন খুযায়মা: ৪২০; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার ৮৯৫; সহীহ ইবন হিব্বান: ১৬৮৯)
كتاب الفضائل
باب فضل الأذان
1039 - وعن جابر - رضي الله عنه: أنَّ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «مَنْ قَالَ حِيْنَ يَسْمَعُ النِّدَاءَ: اللَّهُمَّ رَبَّ هذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ، وَالصَّلاَةِ القَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّدًا الوَسِيلَةَ، وَالفَضِيلَةَ، وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ، حَلَّتْ لَهُ شَفَاعَتي يَوْمَ القِيَامَةِ». رواه البخاري. (1)
হাদীস নং: ১০৪০
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ আযানের ফযীলত: আযানের আরেকটি দুআ
১০৪০. হযরত সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি মুআযযিনের আযান শুনে বলবে-
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ ، رَضِيتُ بِاللهِ رَبًّا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا ، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا
(আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনও শরীক নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। আমি এতে সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ রব্ব, মুহাম্মাদ আমার রাসূল এবং ইসলাম আমার দীন), তার পাপরাশি ক্ষমা করে দেওয়া হবে। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ৩৮৬; সুনানে আবু দাউদ: ৫২৫; সুনানে নাসাঈ ৬৭৯; জামে তিরমিযী: ২১০; সুনানে ইবন মাজাহ ৭২০; মুসনাদে আহমাদ: ১৫৬৫; মুসনাদুল বাযযার: ১১৩০: মুসনাদে আবু ইয়া'লা ৭২২; সহীহ ইবন খুযায়মা ৪২১; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার: ৮৯১)
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ ، رَضِيتُ بِاللهِ رَبًّا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا ، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا
(আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনও শরীক নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। আমি এতে সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ রব্ব, মুহাম্মাদ আমার রাসূল এবং ইসলাম আমার দীন), তার পাপরাশি ক্ষমা করে দেওয়া হবে। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ৩৮৬; সুনানে আবু দাউদ: ৫২৫; সুনানে নাসাঈ ৬৭৯; জামে তিরমিযী: ২১০; সুনানে ইবন মাজাহ ৭২০; মুসনাদে আহমাদ: ১৫৬৫; মুসনাদুল বাযযার: ১১৩০: মুসনাদে আবু ইয়া'লা ৭২২; সহীহ ইবন খুযায়মা ৪২১; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার: ৮৯১)
كتاب الفضائل
باب فضل الأذان
1040 - وعن سعدِ بن أَبي وقَّاصٍ - رضي الله عنه - عن النبي - صلى الله عليه وسلم - أنَّه قَالَ: «مَنْ قَالَ حِيْنَ يَسْمَعُ المُؤَذِّنَ: أشْهَدُ أَنْ لاَ إلَه إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، وَأنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، رَضِيتُ بِاللهِ رَبًّا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا، وَبِالإسْلامِ دِينًا، غُفِرَ لَهُ ذَنْبُهُ». رواه مسلم. (1)
হাদীস নং: ১০৪১
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ আযানের ফযীলত: আযান ও ইকামতের মাঝখানে দুআ কবুল হওয়া
১০৪১. হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আযান ও ইকামতের মাঝখানের দুআ প্রত্যাখ্যান করা হয় না। -আবু দাউদ ও তিরমিযী। (সুনানে আবু দাউদ: ৫২১; জামে তিরমিযী: ২১২; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৯৮১২; মুসনাদে আবু দাউদ তয়ালিসী: ২২২০; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ১৯০৯; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বী: ৮৪৬৫; মুসনাদুল বাযযার ৬৫১১; মুসনাদে আবু ইয়া'লা: ৩৬৭৯; সহীহ ইবন খুযায়মা: ৬২৫)
كتاب الفضائل
باب فضل الأذان
1041 - وعن أنس - رضي الله عنه - قَالَ: قَالَ رسول الله - صلى الله عليه وسلم: «الدُّعَاءُ لاَ يُرَدُّ بَيْنَ الأَذَانِ وَالإقَامَةِ». رواه أَبُو داود والترمذي، (1) وقال: «حديث حسن».