আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২. কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ

হাদীস নং: ৭৯
কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ
সুন্নত বর্জন, বিদআত অবলম্বন এবং প্রবৃত্তি পূজার প্রতি ভীতি প্রদর্শন
৭৯. হযরত মু'আবিয়া (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে বললেন, সাবধান! তোমাদের পূর্বেকার আহলে কিতাবগণ বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল, আর এ উম্মত অচিরেই তিহাত্তর দলে বিভক্ত হবে। এদের বাহাত্তর দল হবে জাহান্নামী এবং একদল হবে জান্নাতী, আর তারা হল (কুরআন-সুন্নাহর পাবন্দ) আল-জামা'আত।
(ইমাম আহমদ ও আবূ দাউদ হাদীসটি রিওয়ায়াত করেছেন। আবূ দাউদের বর্ণনায় অতিরিক্ত বর্ণিত আছে, "আমার উম্মাতের মধ্য থেকে এমন অনেক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হবে, কুপ্রবৃত্তি তাদের মধ্যে এমনভাবে প্রসারিত হবে যেমনিভাবে কুকুরের বিষ দংশিত ব্যক্তির শিরা-উপশিরায় এবং রক্ত-মাংসে ছড়িয়ে পড়ে।") [খাত্তাবী (র) বলেনঃ] এটা একটা রোগ, কুকুরে দংশন করলে যা দংশিতের মধ্যে ছড়ায়। কুকুরের মধ্যে তার নির্দশন এই যে, কুকুরের দুই চোখ লাল হয়ে যায়, সব সময় তার লেজ দুই পায়ের মধ্যস্থলে ঢুকে যেতে থাকে। সে মানুষ দেখলেই তার প্রতি ধাবিত হয়।
كتاب السنة
التَّرْهِيب من ترك السّنة وارتكاب الْبدع والأهواء
79 - وَعَن مُعَاوِيَة رَضِي الله عَنهُ قَالَ قَامَ فِينَا رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم فَقَالَ أَلا إِن من كَانَ قبلكُمْ من أهل الْكتاب افْتَرَقُوا على ثِنْتَيْنِ وَسبعين مِلَّة وَإِن هَذِه الْأمة ستفرق على ثَلَاث وَسبعين ثِنْتَانِ وَسَبْعُونَ فِي النَّار وَوَاحِدَة فِي الْجنَّة وَهِي الْجَمَاعَة
رَوَاهُ أَحْمد وَأَبُو دَاوُد وَزَاد فِي رِوَايَة وَإنَّهُ ليخرج فِي أمتِي أَقوام تتجارى بهم الْأَهْوَاء كَمَا يتجارى الْكَلْب بِصَاحِبِهِ لَا يبْقى مِنْهُ عرق وَلَا مفصل إِلَّا دخله
قَوْله الْكَلْب بِفَتْح الْكَاف وَاللَّام
قَالَ الْخطابِيّ هُوَ دَاء يعرض للْإنْسَان من عضة الْكَلْب الْكَلْب قَالَ وعلامة ذَلِك فِي الْكَلْب أَن تحمر عَيناهُ وَلَا يزَال يدْخل ذَنبه بَين رجلَيْهِ فَإِذا رأى إنْسَانا ساوره

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আলোচ্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা কিছু বলেছেন, তা কেবল এক ভবিষ্যতবাণী নয় বরং উম্মতের জন্য অনেক বড় সংবাদ। উদ্দেশ্য এই যে, উম্মত সেই আকাইদ ও চিন্তাধারা এবং সেই পথে দৃঢ় থাকার প্রতি চিন্তা ও লক্ষ্য রাখবে যার ওপর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবা কিরাম ছিলেন। নাজাত ও জান্নাত তাঁদেরই জন্যে।
এই শ্রেণী নিজেদের জন্য أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ -এর শিরোনাম গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবা জামা'আতের তরীকার সাথে সম্পৃক্তকারীগণ।

দ্বিতীয়ত আলোচ্য হাদীসে যে বাহাত্তর ফির্কা সম্বন্ধে বলা হয়েছে كُلُّهُمْ فِي النَّارِ নির্দিষ্টভাবে সবাইকে চিহ্নিত করা যায় না। বস্তুত যাদের দীনী চিন্তাধারা ও আকীদাগত পথ হচ্ছে مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي এর সাথে মৌলিক ভাবে ভিন্ন, তারা ঐ সব ফিরক্বার অন্তর্ভুক্ত। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যেমন যায়দিয়া, মু'তাযিলা, জাহমিয়া। আর আমাদের যুগের হাদীস অস্বীকারকারীগণ এবং সেই বিদ'আতীগণ যাদের আকীদার অনিষ্টতা কুফর পর্যন্ত পৌছেনি।

এস্থলে এ কথা প্রণিধানযোগ্য যে, সে সব ব্যক্তি এরূপ আকীদা গ্রহণ করেছে যার ফলে তারা ইসলামের গণ্ডি থেকেই বের হয়ে গেছে, যেমন অতীতে মুসাইলমা কায্যাব ইত্যাদি নবুওতের দাবিদারদেরকে নবী স্বীকৃতি দানকারীরা কিংবা আমাদের যুগের কাদিয়ানী সম্প্রদায়। সুতরাং এরূপ লোক উম্মতের গণ্ডি থেকেই বের হয়ে গেছে। এজন্য তারা এই বাহাত্তর ফিরক্বার অন্তর্ভুক্ত নয়। এই বাহাত্তর ফিরক্বার অন্তর্ভুক্ত তারা যারা উম্মতের গণ্ডির মধ্যে রয়েছে। কিন্তু তারা مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي এর পথ থেকে সরে আকীদাগত ভিন্ন মতবাদ ও দীনী চিন্তা ধারা গ্রহণ করেছে। তবে দীনের আবশ্যকীয় বিষয়ালির মধ্যে কোন বিষয় অস্বীকার কিংবা এমন কোন আকীদা গ্রহণ করেনি, যে কারণে ইসলাম ও উম্মতের গণ্ডি থেকেই নির্গত হয়ে গেছে। তাদের ব্যাপারে যা বলা হয়েছে كُلُّهُمْ فِي النار (তারা সবাই জাহান্নামে যাবে) এর উদ্দেশ্য এই যে, আকীদার ভ্রষ্টতা ও গোমরাহীর কারণে জাহান্নামের শাস্তির যোগ্য হবে। এভাবে مَا أَنا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي এর সাথে সম্পৃক্ততা রক্ষাকারীগণ তিহাত্তরতম ফিরকার জান্নাতী হওয়ার অর্থ এই যে, তাঁরা নিজেদের আকীদাগত দৃঢ়তার কারণে নাজাত ও জান্নাতের যোগ্য হবে। বস্তুত হাদীসে যে تفرق (বিভিন্ন ফিরক্কায় বিভক্ত হওয়ার) উল্লেখ করা হয়েছে আমলের পাপপুণ্য ও ভাল মন্দের সাথে এর সম্পর্ক নেই। ফিরকাবাজীর সম্পর্ক আকাইদ ও চিন্তাধারার সাথে। আমলের কারণে সওয়াব কিংবা আযাবের যোগ্য হওয়াও সত্য। তবে এর সাথে আলোচ্য হাদীসের কোন সম্পর্ক নেই।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান