আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ
৪. অধ্যায়ঃ পবিত্রতা
হাদীস নং: ২৫৯
অধ্যায়ঃ পবিত্রতা
পোশাক-পরিচ্ছদে প্রস্রাব লাগা এবং পাক না হওয়ার প্রতি ভীতি প্রদর্শন
২৫৯. বুখারী শরীফে ও ইব্ন খুযায়মার 'সহীহ' গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, একদা নবী মক্কা অথবা মদীনার কোন বাগানের পার্শ্ব দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। তিনি দুটি কবরে দু'জন লোকের শাস্তির শব্দ শুনতে পেলেন। নবী (সা) বললেন: নিশ্চয়ই এ দু' কবরে দুই ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। তবে বড় কোন কারণে শান্তি দেওয়া হচ্ছে না। অতঃপর তিনি বললেন, হ্যাঁ, তবে তাদের একজন প্রস্রাবকালে সতর্কতা অবলম্বন করত না এবং অপরজন চোগলখুরী করে বেড়াতো।
ইমাম বুখারী (র) 'প্রস্রাবের সময় সতকর্তা অবলম্বন না করা কবীরা গুনাহ' বিশেষ শিরোনামে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় বিন্যাস করেছেন।
(ইমাম খাত্তাবী (র) বলেন): নবী (সা) এর বাণী : وَمَا يعذبان فِي كَبِير এ অর্থ হল কবরবাসী দুই ব্যক্তিকে এমন কোন কাজের কারণে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না যে কাজ করা তাদের জন্য কঠিন ছিল যদি তারা তা করত। আর তা হল পেশাব থেকে বেঁচে থাকা। এখানে তিনি ধর্মীয় দিক থেকে এ কথা বুঝাননি যে, এ দুটো কাজ করা এবং চোগলখুরী বর্জন করা কবীরা গুনাহ নয়; বরং তা মামুলী ব্যাপার।
[হাফিয আবদুল আযীম (র) বলেনঃ] এরূপ ধারণা করা হতে পারে বলে আশংকা করেই নবী (সা) বলেছেন : হ্যাঁ, তা গুরুতর বটে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
ইমাম বুখারী (র) 'প্রস্রাবের সময় সতকর্তা অবলম্বন না করা কবীরা গুনাহ' বিশেষ শিরোনামে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় বিন্যাস করেছেন।
(ইমাম খাত্তাবী (র) বলেন): নবী (সা) এর বাণী : وَمَا يعذبان فِي كَبِير এ অর্থ হল কবরবাসী দুই ব্যক্তিকে এমন কোন কাজের কারণে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না যে কাজ করা তাদের জন্য কঠিন ছিল যদি তারা তা করত। আর তা হল পেশাব থেকে বেঁচে থাকা। এখানে তিনি ধর্মীয় দিক থেকে এ কথা বুঝাননি যে, এ দুটো কাজ করা এবং চোগলখুরী বর্জন করা কবীরা গুনাহ নয়; বরং তা মামুলী ব্যাপার।
[হাফিয আবদুল আযীম (র) বলেনঃ] এরূপ ধারণা করা হতে পারে বলে আশংকা করেই নবী (সা) বলেছেন : হ্যাঁ, তা গুরুতর বটে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
كتاب الطَّهَارَة
التَّرْهِيب من إِصَابَة الْبَوْل الثَّوْب وَغَيره وَعدم الِاسْتِبْرَاء مِنْهُ
259 - وَفِي رِوَايَة للْبُخَارِيّ وَابْن خُزَيْمَة فِي صَحِيحه أَن النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم مر بحائط من حيطان مَكَّة أَو الْمَدِينَة فَسمع صَوت إنسانين يعذبان فِي قبورهما فَقَالَ النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم إنَّهُمَا ليعذبان وَمَا يعذبان فِي كَبِير ثمَّ قَالَ بلَى كَانَ أَحدهمَا لَا يسْتَتر من بَوْله وَكَانَ الآخر يمشي بالنميمة
الحَدِيث وَبَوَّبَ البُخَارِيّ عَلَيْهِ بَاب من الْكَبَائِر أَن لَا يسْتَتر من بَوْله
قَالَ الْخطابِيّ قَوْله وَمَا يعذبان فِي كَبِير مَعْنَاهُ أَنَّهُمَا لم يعذبا فِي أَمر كَانَ يكبر
عَلَيْهِمَا أَو يشق فعله لَو أَرَادَا أَن يفعلاه وَهُوَ التَّنَزُّه من الْبَوْل وَترك النميمة وَلم يرد أَن الْمعْصِيَة فِي هَاتين الخصلتين لَيست بكبيرة فِي حق الدّين وَأَن الذَّنب فيهمَا هَين سهل
قَالَ الْحَافِظ عبد الْعَظِيم ولخوف توهم مثل هَذَا استدرك فَقَالَ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم بلَى إِنَّه كَبِير
وَالله أعلم
الحَدِيث وَبَوَّبَ البُخَارِيّ عَلَيْهِ بَاب من الْكَبَائِر أَن لَا يسْتَتر من بَوْله
قَالَ الْخطابِيّ قَوْله وَمَا يعذبان فِي كَبِير مَعْنَاهُ أَنَّهُمَا لم يعذبا فِي أَمر كَانَ يكبر
عَلَيْهِمَا أَو يشق فعله لَو أَرَادَا أَن يفعلاه وَهُوَ التَّنَزُّه من الْبَوْل وَترك النميمة وَلم يرد أَن الْمعْصِيَة فِي هَاتين الخصلتين لَيست بكبيرة فِي حق الدّين وَأَن الذَّنب فيهمَا هَين سهل
قَالَ الْحَافِظ عبد الْعَظِيم ولخوف توهم مثل هَذَا استدرك فَقَالَ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم بلَى إِنَّه كَبِير
وَالله أعلم
হাদীসের ব্যাখ্যা:
আল্লাহ্ তা'আলা দুনিয়াতে নবী-রাসূলগণের এমন সব অদৃশ্যের সংবাদ অবহিত করান এবং অদৃশ্য বিষয়ের শব্দ শুনান যা সাধারণ মানুষ চোখে দেখতে পায় না। এবং তাদের কান শুনতেও পায় না। বলাবাহুল্য এটি এ ধরনেরই একটি ঘটনা।
আলোচ্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ কবরে দু'ব্যক্তির শাস্তি হওয়ার কারণ রূপে পৃথক পৃথক গুনাহের বিষয় বর্ণনা করেছেন। এক ব্যক্তি সম্পর্কে বলেছেন: সে চোগলখুরী করে বেড়াত, যা একটি গুরুতর চারিত্রিক অপরাধ। কুরআন মাজীদের এক স্থানে একে কাফির অথবা মুনাফিকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে:
وَلَا تُطِعْ كُلَّ حَلَّافٍ مَهِينٍ . هَمَّازٍ مَشَّاءٍ بِنَمِيمٍ
"যে কথায় কথায় শপথ করে, তুমি তার অনুসরণ করো না, যে লাঞ্ছিত, পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে দেয়।" (৬৮ সূরা কালাম: ১০-১১)
হযরত কা'ব ইবনে আহবার (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহে চোগলখুরীকে সর্বাধিক বড় গুনাহরূপে চিহ্নিত করা হয়েছে, (শায়খ আব্দুল হক দেহলভী (র) কৃত মিশকাত শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থে উদ্ধৃত।)
অপর ব্যক্তির শাস্তির কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন: সে পেশাবের অপবিত্রতা থেকে নিজেকে রক্ষা করত না ও পেশাব থেকে পবিত্রতা অর্জনের ব্যাপারে অসতর্ক থাকত। لا يستتر ولا يستنزه সে পেশাবকালে আড়াল করত না অথবা পবিত্র হত না উভয়ের অর্থ প্রায় একই।
এক বর্ণনায় لا يستبرئ সে পবিত্র হত না শব্দ এসেছে। বলাবাহুল্য, এ শব্দ থেকে জানা যায় যে, প্রস্রাবের অপবিত্রতা বা এ ধরনের অন্য অপবিত্রতা থেকে নিজের শরীর ও পোশাক-পরিচ্ছদ পবিত্র রাখার চেষ্টা করা আল্লাহর নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে গুরুত্ব না দেওয়া এবং অসাবধানতা অবলম্বন কবরে শাস্তিযোগ্য অপরাধ রূপে বিবেচিত।
হাদীসে ইরশাদ হয়েছে: রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি তাজা খেজুরের শাখা আনালেন এবং তা দু'টুকরা করে উভয় কবরে এক টুকরা করে পুঁতে দেন। কোন সাহাবী এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বললেন: "আশা করা যায়, এ টুকরা দু'টি যতদিন তাজা থাকবে, ততদিন পর্যন্ত তাদের কবরে শাস্তি লাঘব করা হবে।
হাদীসের এ অংশের ব্যাখ্যায় কোন কোন ভাষ্যকার বলেছেন: কোন তাজা শাখা যতদিন তাজা থাকে ততদিন তা প্রাণবন্ত থাকে এবং তা আল্লাহর গুণ-কীর্তনে রত থাকে। যেমন কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে:
وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ
"এমন কোন কিছুই নেই যা তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না"। (১৭, সূরা বনী ইসরাঈল: ৪৪)
উল্লিখিত ভাষ্যকারদের মতে, এ হাদীসের ব্যাখ্যা হচ্ছে এরূপঃ "প্রত্যেক বস্তুই আজীবন আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। এরপর যখন এ সব বস্তুর জীবনাবসান ঘটে তখন সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষাণারও পরিসমাপ্তি ঘটে। বলাবাহুল্য, উপরিউক্ত ভাষ্যকারগণ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণীর ব্যাখ্যা এ রূপ করেন: তিনি তাজা খেজুরের শাখা কবরে এ জন্য পুঁতে রাখেন যাতে তার তাসবীহ্ ও তাহমীদ পাঠে শাস্তি খানিকটা লাঘব হয়। খেজুরের শাখা শুকিয়ে যাওয়া পর্যন্ত কবরের শাস্তি হালকা হওয়ার তিনি যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তার ভিত্তি হচ্ছে এই। কিন্তু 'অধিকাংশ ভাষ্যকার এ ব্যাখ্যাকে সঠিক নয় বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ ব্যাখ্যা আমাদের নিকটও ভুল প্রতীয়মান হয়। কেননা প্রত্যেক জ্ঞানবান লোক যদি খানিকটা খতিয়ে দেখেন তবে বুঝতে পারবেন যে রাসূলুল্লাহ ﷺ এ কারণে কবরের উপর তাজা খেজুরের শাখা দু'টুকরা করে পুঁতে দিননি। কারণ তা দু'চার দিনের মধ্যে শুকিয়ে যাবে। ব্যাপারটি যদি তাই হতো, তবে তিনি এমন কিছু পুঁতে দিতেন যা বছরের পর পছর ধরে তাজা থাকত। উল্লিখিত ব্যাখ্যা ভুল হওয়ার দ্বিতীয় প্রমাণ হচ্ছে এই যে, সাহাবায়ে কিরাম যদি অর্থই বুঝতেন তবে সচরাচর তাই করতেন এবং সকল কবরে তাজা ডাল পুঁতে দিতেন বরং বৃক্ষ রোপন রীতিমত প্রথায় পরিণত হয়ে যেত অথচ ব্যাপারটি তা হয়নি।
মোটকথা নবী কারীম ﷺ -এর একাজের উক্ত ব্যাখ্যা নির্ঘাত ভুল। এ সূত্র ধরে সুধি বুযুর্গদের কবরে ফুলের মালা পেশ করার শিরকী প্রথার বৈধতা আবিস্কার করা প্রকৃতপক্ষে ইসলামী ভাবধারার উপর গুরুতর আঘাত স্বরূপ।
তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ এর এ কাজের বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা এই যে, তিনি সংশ্লিষ্ট কবরবাসীর শাস্তি লাঘবের উদ্দেশ্যে আল্লাহর কাছে দু'আ করেন। তারপর যেন এর জবাবে তাঁকে একটি তাজা ডাল দ্বিখণ্ডিত করে কবরে পুঁতে দেয়ার কথা জানানো হয় এবং এও অবহিত করা হয় যে, যতদিন তা তাজা থাকবে ততদিন কবরবাসীর শাস্তি খানিকটা লাঘব করা হবে। সহীহ মুসলিমের শেষ দিকে হযরত জাবির (রা) থেকে একটি দীর্ঘ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এতেও দু'টি কবরের কথা উল্লেখ আছে। তবে এটি একটি পৃথক ঘটনা। উক্ত হাদীসে হযরত জাবির (রা) বলেন: নবী কারীম ﷺ আমাকে এ মর্মে নির্দেশ দেন যে, আমি যেন তাঁর কাছে দু'টি বৃক্ষের দু'টি শাখা কেটে আনি। হযরত জাবির (রা) বলেন, আমি তাঁর নির্দেশ পালন করলাম। তারপর যখন আমি এ বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম তখন তিনি আমাকে বললেন: ওখানে দু'টি কবরে শাস্তি হচ্ছে। আমি তাদের শাস্তি লাঘব করার লক্ষ্যে আল্লাহর কাছে দু'আ করেছি। আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে এ মর্মে ওহী করেন যে, যতদিন তাজা শাখা না শুকাবে ততদিন তাদের শাস্তি হালকা রাখা হবে। এ হাদীস থেকে জানা যায় যে তাজা কোন শাখার মধ্যে শাস্তি প্রতিরোধ করার ক্ষমতা নেই। বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে: আপনার দু'আয় এ সময় পর্যন্ত কবরের শাস্তি হালকা করা হল। সুতরাং বলা চলে, মূল বিষয় ছিল নবী কারীম ﷺ -এর দু'আ এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত কবরে শাস্তি হালকা করার ফয়সালা।
কিছু সংখ্যক ভাষ্যকার নবী কারীম ﷺ যে কবর দু'টির উপর তাজা খেজুর শাখা প্রোথিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন উক্ত কবরবাসীদ্বয় মুসলিম ছিল না অমুসলিম? এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। গ্রহণযোগ্য মত হলো, দু'টি কবরের অধিবাসীই মুসলমান ছিলেন।
এর একটি ইঙ্গিত এ হাদীসেই বিদ্যমান রয়েছে। চোগলখুরী ও পেশাবের ব্যাপারে অসতর্ক থাকার কারণে কবরে শাস্তির কথা বলা হয়েছে। যদি এ কবর দু'টি কোন কাফিরের হতো, তাহলে রাসূলুল্লাহ ﷺ শাস্তির কারণ হিসাবে একথা না বলে তাদের কুফর ও শিরকের কারণে শাস্তির কথা বলতেন। এছাড়াও মুসনাদে আহমাদে উসামা (রা) সূত্রে বর্ণিত, একটি হাদীস থেকে জানা যায় যে, এ কবর দু'টি জান্নাতুল বাকীতে অবস্থিত ছিল। আর তিনি জান্নাতুল বাকী অতিক্রমকালে উক্ত কবর দু'টিতে শাস্তি হওয়ার বিষয় অনুভব করেন। একথা সর্বজন বিদিত যে, মদীনা মুনাওয়ারায় অবস্থিত 'জান্নাতুল বাকী' মুসলমানদেরই কবরস্থান। মোটকথা এসব বিবেচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, উক্ত কবর দু'টি ছিল দু'জন মুসলমানের।
এ হাদীসের বিশেষ শিক্ষা হচ্ছে এই যে, পেশাব পায়খানার অবিত্রতা থেকে পবিত্র থাকার ব্যাপারে সযত্ন দৃষ্টি রাখা চাই এবং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শরীর ও কাপড় চোপড় পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে পূর্ণ সচেষ্ট থাকা জরুরী। চোগলখুরীর মত বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড থেকেও নিজেকে রক্ষা করা একান্ত প্রয়োজন। অন্যথায় দু'টি ব্যাপারে অসতর্কতার কারণে কবরে শাস্তি ভোগ করতে হতে পারে। আল্লাহ আমাদের হিফাযত করুন।
আলোচ্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ কবরে দু'ব্যক্তির শাস্তি হওয়ার কারণ রূপে পৃথক পৃথক গুনাহের বিষয় বর্ণনা করেছেন। এক ব্যক্তি সম্পর্কে বলেছেন: সে চোগলখুরী করে বেড়াত, যা একটি গুরুতর চারিত্রিক অপরাধ। কুরআন মাজীদের এক স্থানে একে কাফির অথবা মুনাফিকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে:
وَلَا تُطِعْ كُلَّ حَلَّافٍ مَهِينٍ . هَمَّازٍ مَشَّاءٍ بِنَمِيمٍ
"যে কথায় কথায় শপথ করে, তুমি তার অনুসরণ করো না, যে লাঞ্ছিত, পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে দেয়।" (৬৮ সূরা কালাম: ১০-১১)
হযরত কা'ব ইবনে আহবার (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহে চোগলখুরীকে সর্বাধিক বড় গুনাহরূপে চিহ্নিত করা হয়েছে, (শায়খ আব্দুল হক দেহলভী (র) কৃত মিশকাত শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থে উদ্ধৃত।)
অপর ব্যক্তির শাস্তির কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন: সে পেশাবের অপবিত্রতা থেকে নিজেকে রক্ষা করত না ও পেশাব থেকে পবিত্রতা অর্জনের ব্যাপারে অসতর্ক থাকত। لا يستتر ولا يستنزه সে পেশাবকালে আড়াল করত না অথবা পবিত্র হত না উভয়ের অর্থ প্রায় একই।
এক বর্ণনায় لا يستبرئ সে পবিত্র হত না শব্দ এসেছে। বলাবাহুল্য, এ শব্দ থেকে জানা যায় যে, প্রস্রাবের অপবিত্রতা বা এ ধরনের অন্য অপবিত্রতা থেকে নিজের শরীর ও পোশাক-পরিচ্ছদ পবিত্র রাখার চেষ্টা করা আল্লাহর নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে গুরুত্ব না দেওয়া এবং অসাবধানতা অবলম্বন কবরে শাস্তিযোগ্য অপরাধ রূপে বিবেচিত।
হাদীসে ইরশাদ হয়েছে: রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি তাজা খেজুরের শাখা আনালেন এবং তা দু'টুকরা করে উভয় কবরে এক টুকরা করে পুঁতে দেন। কোন সাহাবী এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বললেন: "আশা করা যায়, এ টুকরা দু'টি যতদিন তাজা থাকবে, ততদিন পর্যন্ত তাদের কবরে শাস্তি লাঘব করা হবে।
হাদীসের এ অংশের ব্যাখ্যায় কোন কোন ভাষ্যকার বলেছেন: কোন তাজা শাখা যতদিন তাজা থাকে ততদিন তা প্রাণবন্ত থাকে এবং তা আল্লাহর গুণ-কীর্তনে রত থাকে। যেমন কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে:
وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ
"এমন কোন কিছুই নেই যা তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না"। (১৭, সূরা বনী ইসরাঈল: ৪৪)
উল্লিখিত ভাষ্যকারদের মতে, এ হাদীসের ব্যাখ্যা হচ্ছে এরূপঃ "প্রত্যেক বস্তুই আজীবন আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। এরপর যখন এ সব বস্তুর জীবনাবসান ঘটে তখন সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষাণারও পরিসমাপ্তি ঘটে। বলাবাহুল্য, উপরিউক্ত ভাষ্যকারগণ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণীর ব্যাখ্যা এ রূপ করেন: তিনি তাজা খেজুরের শাখা কবরে এ জন্য পুঁতে রাখেন যাতে তার তাসবীহ্ ও তাহমীদ পাঠে শাস্তি খানিকটা লাঘব হয়। খেজুরের শাখা শুকিয়ে যাওয়া পর্যন্ত কবরের শাস্তি হালকা হওয়ার তিনি যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তার ভিত্তি হচ্ছে এই। কিন্তু 'অধিকাংশ ভাষ্যকার এ ব্যাখ্যাকে সঠিক নয় বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ ব্যাখ্যা আমাদের নিকটও ভুল প্রতীয়মান হয়। কেননা প্রত্যেক জ্ঞানবান লোক যদি খানিকটা খতিয়ে দেখেন তবে বুঝতে পারবেন যে রাসূলুল্লাহ ﷺ এ কারণে কবরের উপর তাজা খেজুরের শাখা দু'টুকরা করে পুঁতে দিননি। কারণ তা দু'চার দিনের মধ্যে শুকিয়ে যাবে। ব্যাপারটি যদি তাই হতো, তবে তিনি এমন কিছু পুঁতে দিতেন যা বছরের পর পছর ধরে তাজা থাকত। উল্লিখিত ব্যাখ্যা ভুল হওয়ার দ্বিতীয় প্রমাণ হচ্ছে এই যে, সাহাবায়ে কিরাম যদি অর্থই বুঝতেন তবে সচরাচর তাই করতেন এবং সকল কবরে তাজা ডাল পুঁতে দিতেন বরং বৃক্ষ রোপন রীতিমত প্রথায় পরিণত হয়ে যেত অথচ ব্যাপারটি তা হয়নি।
মোটকথা নবী কারীম ﷺ -এর একাজের উক্ত ব্যাখ্যা নির্ঘাত ভুল। এ সূত্র ধরে সুধি বুযুর্গদের কবরে ফুলের মালা পেশ করার শিরকী প্রথার বৈধতা আবিস্কার করা প্রকৃতপক্ষে ইসলামী ভাবধারার উপর গুরুতর আঘাত স্বরূপ।
তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ এর এ কাজের বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা এই যে, তিনি সংশ্লিষ্ট কবরবাসীর শাস্তি লাঘবের উদ্দেশ্যে আল্লাহর কাছে দু'আ করেন। তারপর যেন এর জবাবে তাঁকে একটি তাজা ডাল দ্বিখণ্ডিত করে কবরে পুঁতে দেয়ার কথা জানানো হয় এবং এও অবহিত করা হয় যে, যতদিন তা তাজা থাকবে ততদিন কবরবাসীর শাস্তি খানিকটা লাঘব করা হবে। সহীহ মুসলিমের শেষ দিকে হযরত জাবির (রা) থেকে একটি দীর্ঘ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এতেও দু'টি কবরের কথা উল্লেখ আছে। তবে এটি একটি পৃথক ঘটনা। উক্ত হাদীসে হযরত জাবির (রা) বলেন: নবী কারীম ﷺ আমাকে এ মর্মে নির্দেশ দেন যে, আমি যেন তাঁর কাছে দু'টি বৃক্ষের দু'টি শাখা কেটে আনি। হযরত জাবির (রা) বলেন, আমি তাঁর নির্দেশ পালন করলাম। তারপর যখন আমি এ বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম তখন তিনি আমাকে বললেন: ওখানে দু'টি কবরে শাস্তি হচ্ছে। আমি তাদের শাস্তি লাঘব করার লক্ষ্যে আল্লাহর কাছে দু'আ করেছি। আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে এ মর্মে ওহী করেন যে, যতদিন তাজা শাখা না শুকাবে ততদিন তাদের শাস্তি হালকা রাখা হবে। এ হাদীস থেকে জানা যায় যে তাজা কোন শাখার মধ্যে শাস্তি প্রতিরোধ করার ক্ষমতা নেই। বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে: আপনার দু'আয় এ সময় পর্যন্ত কবরের শাস্তি হালকা করা হল। সুতরাং বলা চলে, মূল বিষয় ছিল নবী কারীম ﷺ -এর দু'আ এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত কবরে শাস্তি হালকা করার ফয়সালা।
কিছু সংখ্যক ভাষ্যকার নবী কারীম ﷺ যে কবর দু'টির উপর তাজা খেজুর শাখা প্রোথিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন উক্ত কবরবাসীদ্বয় মুসলিম ছিল না অমুসলিম? এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। গ্রহণযোগ্য মত হলো, দু'টি কবরের অধিবাসীই মুসলমান ছিলেন।
এর একটি ইঙ্গিত এ হাদীসেই বিদ্যমান রয়েছে। চোগলখুরী ও পেশাবের ব্যাপারে অসতর্ক থাকার কারণে কবরে শাস্তির কথা বলা হয়েছে। যদি এ কবর দু'টি কোন কাফিরের হতো, তাহলে রাসূলুল্লাহ ﷺ শাস্তির কারণ হিসাবে একথা না বলে তাদের কুফর ও শিরকের কারণে শাস্তির কথা বলতেন। এছাড়াও মুসনাদে আহমাদে উসামা (রা) সূত্রে বর্ণিত, একটি হাদীস থেকে জানা যায় যে, এ কবর দু'টি জান্নাতুল বাকীতে অবস্থিত ছিল। আর তিনি জান্নাতুল বাকী অতিক্রমকালে উক্ত কবর দু'টিতে শাস্তি হওয়ার বিষয় অনুভব করেন। একথা সর্বজন বিদিত যে, মদীনা মুনাওয়ারায় অবস্থিত 'জান্নাতুল বাকী' মুসলমানদেরই কবরস্থান। মোটকথা এসব বিবেচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, উক্ত কবর দু'টি ছিল দু'জন মুসলমানের।
এ হাদীসের বিশেষ শিক্ষা হচ্ছে এই যে, পেশাব পায়খানার অবিত্রতা থেকে পবিত্র থাকার ব্যাপারে সযত্ন দৃষ্টি রাখা চাই এবং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শরীর ও কাপড় চোপড় পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে পূর্ণ সচেষ্ট থাকা জরুরী। চোগলখুরীর মত বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড থেকেও নিজেকে রক্ষা করা একান্ত প্রয়োজন। অন্যথায় দু'টি ব্যাপারে অসতর্কতার কারণে কবরে শাস্তি ভোগ করতে হতে পারে। আল্লাহ আমাদের হিফাযত করুন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)