আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ
১৩. অধ্যায়ঃ কুরআন পাঠ
হাদীস নং: ২২৪৬
অধ্যায়ঃ কুরআন পাঠ
সূরা ফাতিহা পাঠের প্রতি উৎসাহদান এবং এর ফযীলত প্রসঙ্গ
২২৪৬. হযরত আবু সাঈদ ইবনুল মু'আল্লা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একদিন মসজিদে সালাতরত ছিলাম, এমন সময় রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) আমাকে ডাকলেন। কিন্তু আমি কোন জবাব দিলাম না। একটু পরেই আমি তাঁর কাছে আসলাম এবং বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ। আমি সালাতে রত ছিলাম। তিনি বললেন, আল্লাহ কি একথা বলেন নি? "তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের ডাকে সাড়া দাও যখন তাঁরা তোমাদেরকে ডাকেন।" তারপর রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বললেন, তুমি মসজিদ থেকে বের হওয়ার পূর্বেই আমি তোমাকে কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরাটি শিখিয়ে দেব। তারপর তিনি আমার হাত ধরলেন। আমরা যখন বের হতে উদ্যত হলাম, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ। আপনি তো বলেছেনঃঃ যে, আমি তোমাকে কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরাটি শিক্ষা দেব। তিনি বললেন, আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন। এটি হচ্ছে বার বার পঠিত আয়াত-সপ্তক। আর মহান কুরআন, যা আমাকে দেয়া হয়েছে।
(হাদীসটি বুখারী আবু দাউদ, নাসাঈ ও ইবন মাজাহ বর্ণনা করেছেন।)
(হাদীসটি বুখারী আবু দাউদ, নাসাঈ ও ইবন মাজাহ বর্ণনা করেছেন।)
كتاب قِرَاءَة الْقُرْآن
التَّرْغِيب فِي قِرَاءَة سُورَة الْفَاتِحَة وَمَا جَاءَ فِي فَضلهَا
2246 - عَن أبي سعيد بن الْمُعَلَّى رَضِي الله عَنهُ قَالَ كنت أُصَلِّي بِالْمَسْجِدِ فدعاني رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم فَلم أجبه ثمَّ أَتَيْته فَقلت يَا رَسُول الله إِنِّي كنت أُصَلِّي فَقَالَ ألم يقل الله تَعَالَى {اسْتجِيبُوا لله وَلِلرَّسُولِ إِذا دعَاكُمْ} الْأَنْفَال 42 ثمَّ قَالَ لأعلمنك سُورَة هِيَ أعظم سُورَة فِي الْقُرْآن قبل أَن تخرج من الْمَسْجِد فَأخذ بيَدي فَلَمَّا أردنَا أَن نخرج قلت يَا رَسُول الله إِنَّك قلت لأعلمنك أعظم سُورَة فِي الْقُرْآن
قَالَ الْحَمد لله رب الْعَالمين هِيَ السَّبع المثاني وَالْقُرْآن الْعَظِيم الَّذِي أُوتِيتهُ
رَوَاهُ البُخَارِيّ وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ وَابْن مَاجَه
قَالَ الْحَمد لله رب الْعَالمين هِيَ السَّبع المثاني وَالْقُرْآن الْعَظِيم الَّذِي أُوتِيتهُ
رَوَاهُ البُخَارِيّ وَأَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ وَابْن مَاجَه
হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):
قَالَ الْحَافِظ أَبُو سعيد هَذَا لَا يعرف اسْمه وَقيل اسْمه رَافع بن أَوْس وَقيل الْحَارِث بن نفيع بن الْمُعَلَّى وَرجحه أَبُو عمر النمري وَقيل غير ذَلِك وَالله أعلم
হাদীসের ব্যাখ্যা:
সূরা ফাতিহার শিক্ষাদানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আকর্ষণীয় পন্থা
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবূ সা'ঈদ ইবনুল মু'আল্লাকে কুরআন মাজীদের শ্রেষ্ঠতম সূরাটি শেখানোর আগ্রহ প্রকাশ করলেন প্রশ্ন আকারে। বললেন, তোমাকে কি শেখাব না? এর দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল সূরাটি শেখার প্রতি তাঁর অন্তরে উৎসাহ সৃষ্টি করা। সেইসঙ্গে এ কথাও বলেছিলেন যে, তোমাকে শেখাব মসজিদ থেকে বের হওয়ার আগে। বোঝানো উদ্দেশ্য কোনও উৎকৃষ্ট বিষয় শেখাতে দেরি না করাই বাঞ্ছনীয়। প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে কেন শেখালেন না? উত্তর হলো, এক তো প্রশ্ন করার দ্বারা হযরত আবূ সা'ঈদ রাযি.-এর অন্তরে কৌতূহল সৃষ্টি করা হয়েছে, দ্বিতীয়ত সামান্য বিলম্ব করাটা ছিল বিষয়টি শেখার জন্য তাঁকে একাগ্রচিত্ত ও পরিপূর্ণরূপে প্রস্তুত করে তোলার চেষ্টা। এটাও শিক্ষাদানের একটি পদ্ধতি। শিক্ষার বিষয়বস্তুর প্রতি শিক্ষার্থীকে কৌতূহলী করা এবং সেজন্য তার মন-মস্তিষ্ক প্রস্তুত করে তোলার ব্যবস্থা নেওয়াও শিক্ষকের যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচায়ক।
তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাত ধরলেন এবং সামনের দিকে চলতে থাকলেন। হাত ধরাটা শিক্ষার্থীর প্রতি আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় শিষ্যবর্গ তথা সাহাবায়ে কেরামের প্রতি কতটা আন্তরিক ছিলেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
যা হোক, তাঁরা সামনের দিকে চলতে থাকলেন। দরজার কাছে পৌঁছে গেলেন। প্রায় বেরই হয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত বিষয়টা শেখানো হয়নি। হযরত আবু সা'ঈদ রাযি.-এর কৌতূহল আর অপেক্ষা মানছিল না। শেষে তিনি বলেই বসলেন-
يَا رَسُولَ اللهِ ، إِنَّكَ قُلْتَ: لَأُعَلِّمَنَّكَ أَعْظَمَ سُوْرَةٍ فِي الْقُرْآنِ
(ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি বলেছিলেন কুরআন মাজীদের শ্রেষ্ঠ সূরাটি আমি তোমাকে অবশ্যই শেখাব)। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয়তো এরই অপেক্ষা করছিলেন। তিনি হয়তো চাচ্ছিলেন তাঁর শিক্ষার্থীর জানার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে উঠুক। তা মুখেও ব্যক্ত করুক। পরিশেষে যখন সেরকমই হলো, তখন তিনি বিষয়টা তাঁকে শিক্ষাদান করলেন এবং কোন সূরাটি কুরআন মাজীদের শ্রেষ্ঠ সূরা, তা শেখালেন। বললেন-
الْحَمْدُ للهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ، هِيَ السَّبْعُ الْمَثَانِي وَالْقُرْآنُ الْعَظِيمُ الَّذِي أُوتِيتُهُ
(“আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন"- এটি এমন সাত আয়াতবিশিষ্ট সূরা, যা বারবার পড়া হয় এবং এটি মহান কুরআন, যা আমাকে দেওয়া হয়েছে)। অর্থাৎ সেটি হলো সূরা ফাতিহা।
এখানে প্রশ্ন হতে পারে, হযরত আবূ সা'ঈদ ইবনুল মু'আল্লা রাযি. সূরা ফাতিহা তো আগে থেকেই জানতেন, কেননা তিনি এর আগে বহু নামায পড়েছেন, সূরা ফাতিহা ছাড়া তো নামায হয় না, কাজেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে তাঁকে এ সূরাটি শেখানোর কথা বললেন, এর কী অর্থ?
উত্তর হলো, এর দ্বারা মূলত সূরা ফাতিহার পাঠ শেখানো বোঝানো হয়নি। বোঝানো উদ্দেশ্য এ সূরার গুরুত্ব ও ফযীলত। হযরত আবু সা'ঈদ ইবনুল মু'আল্লা রাযি. নিঃসন্দেহে সূরাটি আগে থেকেই জানতেন এবং নামাযে পড়তেনও। কিন্তু এটি যে কত গুরুত্বপূর্ণ সূরা তা তাঁর জানা ছিল না। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সেটাই শেখানোর কথা বলেছেন এবং শিক্ষাও তাই দিয়েছেন। বলেছেন যে, এটি কুরআন মাজীদের শ্রেষ্ঠ সূরা। এটা এমন সাত আয়াতবিশিষ্ট সূরা, যা বারবার পড়তে হয় এবং সংক্ষিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও এ সূরাটি সারা কুরআনের সারবস্তু। তাই এর নাম মহান কুরআন।
সূরা ফাতিহার বিভিন্ন নাম : 'আস-সাবউল মাছানী'-এর ব্যাখ্যা
সূরা ফাতিহাকে 'সূরাতুল হাম্দ' (প্রশংসামূলক সূরা)-ও বলা হয়। এর আরেক নাম 'উম্মুল কুরআন' (কুরআনের মূল)। এছাড়াও সূরাটির বিভিন্ন নাম আছে, যেমন 'আল-ফাতিহা', 'ফাতিহাতুল কিতাব', 'উম্মুল কিতাব', 'আল-ওয়াফিয়া', 'আল-কাফিয়া', 'আশ-শিফা', 'আশ-শাফিয়া', 'সূরাতুস সালাঃ', 'সূরাতুদ দুআ' ইত্যাদি। ফাতিহা অর্থ সূচনা, উন্মোচনকারী। এ সূরাটি দ্বারা কুরআন মাজীদের বিন্যাসের সূচনা হয়েছে। ধারাবাহিক কুরআন তিলাওয়াতের সূচনা এ সূরার দ্বারা হয়। কুরআন খুললে প্রথমেই এ সূরাটি আসে। যেন এ সূরা বদ্ধ কুরআনের উন্মোচনকারী। তাই এর নাম ফাতিহা বা সূরা ফাতিহা। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদীছে সূরাটির আরও দু'টি নাম উল্লেখ করেছেন। তার একটি হলো اَلسَّبْعُ الْمَثَانِي (আস সাব'উল মাছানী)। অর্থাৎ এমন সাত আয়াত, যার পুনরাবৃত্তি হয়। الْمَثَانِي শব্দের উৎপত্তি হয় تَثْنِيَةٌ থেকে। অর্থ- পুনরাবৃত্তি করা। হযরত ইবন উমর রাযি. বলেন, সূরা ফাতিহা হলো আস-সাব'উল মাছানী। কারণ নামাযের প্রত্যেক রাকাতে এ সূরার পুনরাবৃত্তি হয়। অর্থাৎ প্রথম রাকাতে পড়ার পর দ্বিতীয় রাকাতেও পড়া হয়। নামায চার রাকাত হলে চারও রাকাতে পড়া হয়।
অনেকের মতে এ সূরাটি দু'বার নাযিল হয়েছে। একবার মক্কা মুকাররামায়, আরেকবার মদীনা মুনাউওয়ারায়। নাযিলের দিক থেকে পুনরাবৃত্তি হওয়ায় সূরাটির নাম আস-সাব'উল মাছানী।
تَثْنِيَةٌ এর এক অর্থ দুই ভাগ করা। এ সূরাটির বিষয়বস্তু দুই ভাগে বিভক্ত। এর প্রথম অংশ আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা। দ্বিতীয় অংশ দুআ। তাই এর নাম মাছানী। অর্থাৎ দুই ভাগ সংবলিত সূরা। প্রসিদ্ধ একটি হাদীছে কুদসীতেও সূরাটিকে দু'ভাগ করা হয়েছে। হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
قَالَ اللَّهُ تَعَالَى قَسَمْتُ الصَّلاَةَ بَيْنِي وَبَيْنَ عَبْدِي نِصْفَيْنِ وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ فَإِذَا قَالَ الْعَبْدُ ( الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ) . قَالَ اللَّهُ تَعَالَى حَمِدَنِي عَبْدِي وَإِذَا قَالَ ( الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ) . قَالَ اللَّهُ تَعَالَى أَثْنَى عَلَىَّ عَبْدِي . وَإِذَا قَالَ ( مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ) . قَالَ مَجَّدَنِي عَبْدِي – وَقَالَ مَرَّةً فَوَّضَ إِلَىَّ عَبْدِي – فَإِذَا قَالَ ( إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ) . قَالَ هَذَا بَيْنِي وَبَيْنَ عَبْدِي وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ . فَإِذَا قَالَ ( اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ * صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلاَ الضَّالِّينَ) . قَالَ هَذَا لِعَبْدِي وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ
'আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমি নামাযকে (অর্থাৎ সূরা ফাতিহাকে) আমার ও আমার বান্দার মাঝখানে দু'ভাগে ভাগ করেছি। আমার বান্দা তাই পাবে, যা সে প্রার্থনা করে। বান্দা যখন বলে الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِين (সমস্ত প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর), আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে। বান্দা যখন বলে الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (দয়াময় পরম দয়ালু), আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার গুণগান করেছে। যখন সে বলে مَلِكِ يَوْمِ الدِّينِ (কর্মফল দিবসের মালিক), তিনি বলেন, আমার বান্দা আমার মহিমা ঘোষণা করেছে। অপর এক বর্ণনায় আছে, আমার বান্দা তার বিষয় আমার উপর ন্যস্ত করেছে। সে যখন বলে إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ (আমরা আপনারই ইবাদত করি, আপনারই কাছে সাহায্য চাই), তিনি বলেন, এটা আমার ও আমার বান্দার মাঝখানে অর্ধাধি। আমার বান্দা তাই পাবে, যা সে চায়। যখন সে বলে اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِم وَلَا الضَّالِّينَ (আমাদেরকে পরিচালিত করুন সরল পথে। আপনি যাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, তাদের পথে। যারা অভিশপ্ত এবং যারা পথভ্রষ্ট, তাদের পথে নয়), তিনি বলেন, এটা আমার বান্দার জন্য। আমার বান্দা যা চায়, সে তাই পাবে।' (সহীহ মুসলিম: ৩৯৫; জামে' তিরমিযী: ২৯৫৩; সুনানে নাসাঈ: ৯০৯; সুনানে ইবন মাজাহ : ৩৭৮৫; মুসনাদে আহমাদ: ৭৮২৪; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ২৭৬৮; মুসনাদুল বাযযার: ৮৭৭৯; সহীহ ইবন খুযায়মা ৫০২; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার ৫৪১১: সহীহ ইবন হিব্বান: ৭৭৬)
الْمَثَانِي শব্দটির উৎপত্তি ثَنَاءٌ থেকেও হতে পারে। এর অর্থ প্রশংসা করা। এ সূরাটির শুরুতে আল্লাহ তা'আলার জবরদস্ত প্রশংসা রয়েছে। তাই এর নাম মাছানী। এ প্রশংসার কারণে এ সূরাটিকে 'সূরাতুছ ছানা' বা প্রশংসার সূরাও বলা হয়।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরাটির দ্বিতীয় নাম বলেছেন-الْقُرْآنُ الْعَظِيمُ (আল-কুরআনুল আযীম)। অর্থাৎ মহান কুরআন। উলামায়ে কেরাম এ নামের ব্যাখ্যা করেছেন এরূপ যে, আল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহের যাবতীয় ইলম কুরআন মাজীদে গচ্ছিত রেখেছেন। তারপর মৌলিকভাবে সমগ্র কুরআনের ইলম সূরা ফাতিহায় নিহিত রয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহার ব্যাখ্যা ভালোভাবে জানতে পারবে, সে যেন সমগ্র কুরআনের ব্যাখ্যাই জেনে ফেলল।
হযরত আলী রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, আমি যদি সূরা ফাতিহার ব্যাখ্যা করি আর তা দ্বারা সত্তরটির ভাগ পূর্ণ করতে চাই, তবে তা করতে পারব। বস্তুত আকীদা-বিশ্বাস ও ইবাদত-বন্দেগী সংক্রান্ত যাবতীয় বিধান মৌলিক আকারে এ সূরায় নিহিত রয়েছে। এতে স্থান পেয়েছে দুনিয়া ও আখিরাত এবং মহাবিশ্বের কুলমাখলুকাত। কাজেই কেউ যদি তার সারাটা জীবনও এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে থাকে, তাও করতে পারবে; তার জীবন ফুরিয়ে যাবে, কিন্তু ব্যাখ্যা শেষ হবে না।
সূরা ফাতিহা যে কারণে কুরআন মাজীদের শ্রেষ্ঠতম সূরা
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরা ফাতিহাকে কুরআনের শ্রেষ্ঠতম সূরা সাব্যস্ত করেছেন। এর কারণ কুরআন মাজীদে যত জ্ঞান-তত্ত্বের সমাহার ঘটেছে, মৌলিকভাবে তার সবটাই সূরা ফাতিহার মধ্যে রয়েছে। তাই এর এক নাম 'উম্মুল কুরআন'-ও বটে। অর্থাৎ কুরআন মাজীদের মূল। কুরআন মাজীদের শিক্ষা মৌলিকভাবে দু'প্রকার। (ক) আকীদা-বিশ্বাস; (খ) ইবাদত-বন্দেগী। সূরা ফাতিহার শুরুর তিন আয়াতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মূল আকীদা-বিশ্বাস অর্থাৎ তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাতের বিষয়বস্তু রয়েছে। ইবাদত-বন্দেগী দুই প্রকার। প্রত্যক্ষ ইবাদত ও পরোক্ষ ইবাদত। প্রত্যক্ষ ইবাদত হলো নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, যিকির, তিলাওয়াত, দান-খয়রাত ইত্যাদি।
দুনিয়ার যাবতীয় কাজ শরীয়তসম্মতভাবে যদি আল্লাহ তা'আলাকে রাজি-খুশির জন্য করা হয়, তবে তাও পরোক্ষভাবে ইবাদতে পরিণত হয়। সে হিসেবে মুসলিম জীবনের সকল কাজকর্ম ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এই যাবতীয় ইবাদতের শিক্ষা রয়েছে ইসলামী শরীয়তের মধ্যে, যাকে সিরাতুল মুস্তাকীম বা সরল পথ বলা হয়। সারা কুরআন-হাদীছের ভেতর সিরাতুল মুস্তাকীমের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। সূরা ফাতিহার ৪ ও ৫ নং আয়াতে সংক্ষেপে এ যাবতীয় বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে।
যারা সিরাতুল মুস্তাকীমের উপর চলে, তারা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে পুরস্কারপ্রাপ্ত হয়। নবী-রাসূল, সিদ্দীকীন, শুহাদা ও সালিহীন- এ চারও স্তরের লোক আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে পুরস্কারপ্রাপ্ত। কুরআন মাজীদে এর বিস্তারিত বিবরণ আছে। তাদের অনুসরণ করার দ্বারা সরল পথে চলা সহজ হয়। ৬ নং আয়াতের সারমর্ম এটাই।
যারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তাদের পথ পরিহার করা একান্ত কর্তব্য। যারা তা পরিহার করে না, তারাও বিপথগামী হয়ে যায়। ইহুদী ও নাসারা সম্প্রদায় সরল পথ থেকে বিচ্যুত। তারা পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্ত। তাদের সম্পর্কে কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে বিস্তারিত আলোচনা আছে। সরল পথের প্রত্যাশীকে অবশ্যই তাদের পথ পরিহার করতে হবে। ৭ নং আয়াতের সারমর্ম এটাই। এভাবে সারা কুরআনের সারসংক্ষেপ সূরা ফাতিহার মধ্যে এসে গেছে। তাই এ সূরাকে কুরআন মাজীদের শ্রেষ্ঠতম সূরা সাব্যস্ত করা হয়েছে। এমন সারগর্ভ সূরা পূর্বের কোনও আসমানী কিতাবে ছিল না।
সূরা ও আয়াতসমূহের বিন্যাস আল্লাহপ্রদত্ত
এ গুরুত্বের কারণেই হয়তো সূরাটিকে কুরআন মাজীদের শুরুতে স্থান দেওয়া হয়েছে, যদিও নাযিলের দিক থেকে এটি সর্বপ্রথম নয়। কেননা সর্বপ্রথম নাযিল হয়েছে সূরা 'আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত। তারপর সূরা মুদ্দাছছির। তারপর সূরা ফাতিহা। কুরআন মাজীদের বিন্যাস নাযিলের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী হয়নি। এর বিন্যাস আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে প্রদত্ত। যখন কোনও আয়াত নাযিল হতো, হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালামের ইশারায় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাতিব (লিপিকর) সাহাবীদেরকে বলে দিতেন, সে আয়াতটি কোন সূরার কোথায় স্থান দিতে হবে। এমনিভাবে কোনও সূরা নাযিল হলেও বলে দেওয়া হতো সে সূরাটি কোন সূরার পরে বা আগে রাখতে হবে।
প্রতি রমাযানে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জিবরীল আলাইহিস সালামকে তাঁর শেখানো বিন্যাস অনুযায়ী কুরআন পড়ে শোনাতেন। সর্বশেষ রমাযানে তিনি সম্পূর্ণ কুরআন তাঁকে পড়ে শোনান। বিখ্যাত কাতিব সাহাবী হযরত যায়দ ইবন ছাবিত রাযি.-ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তো সর্বশেষ সে রমাযানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে ধারাবাহিকতায় কুরআন তিলাওয়াত করেছিলেন, সে অনুযায়ী কুরআন মাজীদ লিপিবদ্ধ করা হয়। সুতরাং কুরআন মাজীদের বিন্যাস সাহাবায়ে কেরামের নিজেদের পক্ষ হতে করা হয়নি; বরং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ হতেই তারা তা লাভ করেছিল। এভাবে কুরআন মাজীদের আয়াত ও সূরা উভয়ের বিন্যাস আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে প্রাপ্ত।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. সূরা ফাতিহা কুরআন মাজীদের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরা।
খ. সূরা ফাতিহার আরও বিভিন্ন নাম আছে, যেমন আস-সাব'উল মাছানী, আল কুরআনুল আযীম ইত্যাদি।
গ. কোনও বিষয়ে শিক্ষার্থীর কৌতূহল সৃষ্টির জন্য সে উক্ত বিষয়টি জানতে চায় কি না, এ প্রশ্ন করা শিক্ষাকে মনোজ্ঞ করে তোলার একটি উত্তম কৌশল।
ঘ. কোনও বিষয়ে শিক্ষাদানকালে শিক্ষার্থীর হাত ধরার দ্বারা যেমন সে বিষয়ের গুরুত্ব প্রকাশ পায়, তেমনি তা দ্বারা জ্ঞান আহরণের প্রতি শিক্ষার্থীর মনোযোগও বৃদ্ধি পায়।
চ. শিক্ষার্থীর হাত ধরার দ্বারা তার প্রতি শিক্ষকের আন্তরিকতা প্রকাশ পায়।
ছ. শিক্ষার্থীর হাত ধরাটা শিক্ষকের বিনয়-গুণেরও নিদর্শন।
জ. গুরুত্বপূর্ণ কোনও বিষয় হঠাৎ করে না শিখিয়ে শিক্ষার্থীকে সে বিষয়ে কৌতূহলী করে তোলার পর শিক্ষাদান করলে তা স্মরণ রাখা এবং অন্তরে রেখাপাত করার পক্ষে বেশি সহায়ক হয়।
ঝ. কোনও বিষয়ে জানার প্রতি শিক্ষার্থীর অন্তরে কৌতূহল ও আগ্রহ থাকা জরুরি।
ঞ. যে বিষয়ে জানা নেই, তা জানার লক্ষ্যে প্রশ্ন করা উচিত। প্রশ্ন করার দ্বারা জ্ঞাতব্য বিষয়ের প্রতি শিক্ষার্থীর আগ্রহ প্রকাশ পায়।
ট. উসতায কোনও বিষয় শেখানোর ওয়াদা করার পর যদি শেখাতে বিলম্ব করেন কিংবা ভুলে যান, তবে ছাত্র তাকে তা স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।
ঠ. সূরা ফাতিহা অতীব গুরুত্বপূর্ণ সূরা। আমরা নামাযে, নামাযের বাইরে খুব ধ্যান ও ভক্তির সঙ্গে এ সূরা পাঠ করব।
ড. আয়াতের সংখ্যা হিসেবে এ সূরাটির নামকরণ করা হয়েছে আস-সাব'উল মাছানী। এক হাদীছে প্রত্যেক আয়াত পড়ার পর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে কী জবাব দেওয়া হয় তাও বর্ণিত হয়েছে। তাই নামাযে সূরাটির সাত আয়াত সাত দমে পড়া উত্তম।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবূ সা'ঈদ ইবনুল মু'আল্লাকে কুরআন মাজীদের শ্রেষ্ঠতম সূরাটি শেখানোর আগ্রহ প্রকাশ করলেন প্রশ্ন আকারে। বললেন, তোমাকে কি শেখাব না? এর দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল সূরাটি শেখার প্রতি তাঁর অন্তরে উৎসাহ সৃষ্টি করা। সেইসঙ্গে এ কথাও বলেছিলেন যে, তোমাকে শেখাব মসজিদ থেকে বের হওয়ার আগে। বোঝানো উদ্দেশ্য কোনও উৎকৃষ্ট বিষয় শেখাতে দেরি না করাই বাঞ্ছনীয়। প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে কেন শেখালেন না? উত্তর হলো, এক তো প্রশ্ন করার দ্বারা হযরত আবূ সা'ঈদ রাযি.-এর অন্তরে কৌতূহল সৃষ্টি করা হয়েছে, দ্বিতীয়ত সামান্য বিলম্ব করাটা ছিল বিষয়টি শেখার জন্য তাঁকে একাগ্রচিত্ত ও পরিপূর্ণরূপে প্রস্তুত করে তোলার চেষ্টা। এটাও শিক্ষাদানের একটি পদ্ধতি। শিক্ষার বিষয়বস্তুর প্রতি শিক্ষার্থীকে কৌতূহলী করা এবং সেজন্য তার মন-মস্তিষ্ক প্রস্তুত করে তোলার ব্যবস্থা নেওয়াও শিক্ষকের যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচায়ক।
তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাত ধরলেন এবং সামনের দিকে চলতে থাকলেন। হাত ধরাটা শিক্ষার্থীর প্রতি আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় শিষ্যবর্গ তথা সাহাবায়ে কেরামের প্রতি কতটা আন্তরিক ছিলেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
যা হোক, তাঁরা সামনের দিকে চলতে থাকলেন। দরজার কাছে পৌঁছে গেলেন। প্রায় বেরই হয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত বিষয়টা শেখানো হয়নি। হযরত আবু সা'ঈদ রাযি.-এর কৌতূহল আর অপেক্ষা মানছিল না। শেষে তিনি বলেই বসলেন-
يَا رَسُولَ اللهِ ، إِنَّكَ قُلْتَ: لَأُعَلِّمَنَّكَ أَعْظَمَ سُوْرَةٍ فِي الْقُرْآنِ
(ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি বলেছিলেন কুরআন মাজীদের শ্রেষ্ঠ সূরাটি আমি তোমাকে অবশ্যই শেখাব)। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয়তো এরই অপেক্ষা করছিলেন। তিনি হয়তো চাচ্ছিলেন তাঁর শিক্ষার্থীর জানার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে উঠুক। তা মুখেও ব্যক্ত করুক। পরিশেষে যখন সেরকমই হলো, তখন তিনি বিষয়টা তাঁকে শিক্ষাদান করলেন এবং কোন সূরাটি কুরআন মাজীদের শ্রেষ্ঠ সূরা, তা শেখালেন। বললেন-
الْحَمْدُ للهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ، هِيَ السَّبْعُ الْمَثَانِي وَالْقُرْآنُ الْعَظِيمُ الَّذِي أُوتِيتُهُ
(“আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন"- এটি এমন সাত আয়াতবিশিষ্ট সূরা, যা বারবার পড়া হয় এবং এটি মহান কুরআন, যা আমাকে দেওয়া হয়েছে)। অর্থাৎ সেটি হলো সূরা ফাতিহা।
এখানে প্রশ্ন হতে পারে, হযরত আবূ সা'ঈদ ইবনুল মু'আল্লা রাযি. সূরা ফাতিহা তো আগে থেকেই জানতেন, কেননা তিনি এর আগে বহু নামায পড়েছেন, সূরা ফাতিহা ছাড়া তো নামায হয় না, কাজেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে তাঁকে এ সূরাটি শেখানোর কথা বললেন, এর কী অর্থ?
উত্তর হলো, এর দ্বারা মূলত সূরা ফাতিহার পাঠ শেখানো বোঝানো হয়নি। বোঝানো উদ্দেশ্য এ সূরার গুরুত্ব ও ফযীলত। হযরত আবু সা'ঈদ ইবনুল মু'আল্লা রাযি. নিঃসন্দেহে সূরাটি আগে থেকেই জানতেন এবং নামাযে পড়তেনও। কিন্তু এটি যে কত গুরুত্বপূর্ণ সূরা তা তাঁর জানা ছিল না। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সেটাই শেখানোর কথা বলেছেন এবং শিক্ষাও তাই দিয়েছেন। বলেছেন যে, এটি কুরআন মাজীদের শ্রেষ্ঠ সূরা। এটা এমন সাত আয়াতবিশিষ্ট সূরা, যা বারবার পড়তে হয় এবং সংক্ষিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও এ সূরাটি সারা কুরআনের সারবস্তু। তাই এর নাম মহান কুরআন।
সূরা ফাতিহার বিভিন্ন নাম : 'আস-সাবউল মাছানী'-এর ব্যাখ্যা
সূরা ফাতিহাকে 'সূরাতুল হাম্দ' (প্রশংসামূলক সূরা)-ও বলা হয়। এর আরেক নাম 'উম্মুল কুরআন' (কুরআনের মূল)। এছাড়াও সূরাটির বিভিন্ন নাম আছে, যেমন 'আল-ফাতিহা', 'ফাতিহাতুল কিতাব', 'উম্মুল কিতাব', 'আল-ওয়াফিয়া', 'আল-কাফিয়া', 'আশ-শিফা', 'আশ-শাফিয়া', 'সূরাতুস সালাঃ', 'সূরাতুদ দুআ' ইত্যাদি। ফাতিহা অর্থ সূচনা, উন্মোচনকারী। এ সূরাটি দ্বারা কুরআন মাজীদের বিন্যাসের সূচনা হয়েছে। ধারাবাহিক কুরআন তিলাওয়াতের সূচনা এ সূরার দ্বারা হয়। কুরআন খুললে প্রথমেই এ সূরাটি আসে। যেন এ সূরা বদ্ধ কুরআনের উন্মোচনকারী। তাই এর নাম ফাতিহা বা সূরা ফাতিহা। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদীছে সূরাটির আরও দু'টি নাম উল্লেখ করেছেন। তার একটি হলো اَلسَّبْعُ الْمَثَانِي (আস সাব'উল মাছানী)। অর্থাৎ এমন সাত আয়াত, যার পুনরাবৃত্তি হয়। الْمَثَانِي শব্দের উৎপত্তি হয় تَثْنِيَةٌ থেকে। অর্থ- পুনরাবৃত্তি করা। হযরত ইবন উমর রাযি. বলেন, সূরা ফাতিহা হলো আস-সাব'উল মাছানী। কারণ নামাযের প্রত্যেক রাকাতে এ সূরার পুনরাবৃত্তি হয়। অর্থাৎ প্রথম রাকাতে পড়ার পর দ্বিতীয় রাকাতেও পড়া হয়। নামায চার রাকাত হলে চারও রাকাতে পড়া হয়।
অনেকের মতে এ সূরাটি দু'বার নাযিল হয়েছে। একবার মক্কা মুকাররামায়, আরেকবার মদীনা মুনাউওয়ারায়। নাযিলের দিক থেকে পুনরাবৃত্তি হওয়ায় সূরাটির নাম আস-সাব'উল মাছানী।
تَثْنِيَةٌ এর এক অর্থ দুই ভাগ করা। এ সূরাটির বিষয়বস্তু দুই ভাগে বিভক্ত। এর প্রথম অংশ আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা। দ্বিতীয় অংশ দুআ। তাই এর নাম মাছানী। অর্থাৎ দুই ভাগ সংবলিত সূরা। প্রসিদ্ধ একটি হাদীছে কুদসীতেও সূরাটিকে দু'ভাগ করা হয়েছে। হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
قَالَ اللَّهُ تَعَالَى قَسَمْتُ الصَّلاَةَ بَيْنِي وَبَيْنَ عَبْدِي نِصْفَيْنِ وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ فَإِذَا قَالَ الْعَبْدُ ( الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ) . قَالَ اللَّهُ تَعَالَى حَمِدَنِي عَبْدِي وَإِذَا قَالَ ( الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ) . قَالَ اللَّهُ تَعَالَى أَثْنَى عَلَىَّ عَبْدِي . وَإِذَا قَالَ ( مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ) . قَالَ مَجَّدَنِي عَبْدِي – وَقَالَ مَرَّةً فَوَّضَ إِلَىَّ عَبْدِي – فَإِذَا قَالَ ( إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ) . قَالَ هَذَا بَيْنِي وَبَيْنَ عَبْدِي وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ . فَإِذَا قَالَ ( اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ * صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلاَ الضَّالِّينَ) . قَالَ هَذَا لِعَبْدِي وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ
'আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমি নামাযকে (অর্থাৎ সূরা ফাতিহাকে) আমার ও আমার বান্দার মাঝখানে দু'ভাগে ভাগ করেছি। আমার বান্দা তাই পাবে, যা সে প্রার্থনা করে। বান্দা যখন বলে الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِين (সমস্ত প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর), আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে। বান্দা যখন বলে الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (দয়াময় পরম দয়ালু), আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার গুণগান করেছে। যখন সে বলে مَلِكِ يَوْمِ الدِّينِ (কর্মফল দিবসের মালিক), তিনি বলেন, আমার বান্দা আমার মহিমা ঘোষণা করেছে। অপর এক বর্ণনায় আছে, আমার বান্দা তার বিষয় আমার উপর ন্যস্ত করেছে। সে যখন বলে إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ (আমরা আপনারই ইবাদত করি, আপনারই কাছে সাহায্য চাই), তিনি বলেন, এটা আমার ও আমার বান্দার মাঝখানে অর্ধাধি। আমার বান্দা তাই পাবে, যা সে চায়। যখন সে বলে اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِم وَلَا الضَّالِّينَ (আমাদেরকে পরিচালিত করুন সরল পথে। আপনি যাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, তাদের পথে। যারা অভিশপ্ত এবং যারা পথভ্রষ্ট, তাদের পথে নয়), তিনি বলেন, এটা আমার বান্দার জন্য। আমার বান্দা যা চায়, সে তাই পাবে।' (সহীহ মুসলিম: ৩৯৫; জামে' তিরমিযী: ২৯৫৩; সুনানে নাসাঈ: ৯০৯; সুনানে ইবন মাজাহ : ৩৭৮৫; মুসনাদে আহমাদ: ৭৮২৪; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ২৭৬৮; মুসনাদুল বাযযার: ৮৭৭৯; সহীহ ইবন খুযায়মা ৫০২; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার ৫৪১১: সহীহ ইবন হিব্বান: ৭৭৬)
الْمَثَانِي শব্দটির উৎপত্তি ثَنَاءٌ থেকেও হতে পারে। এর অর্থ প্রশংসা করা। এ সূরাটির শুরুতে আল্লাহ তা'আলার জবরদস্ত প্রশংসা রয়েছে। তাই এর নাম মাছানী। এ প্রশংসার কারণে এ সূরাটিকে 'সূরাতুছ ছানা' বা প্রশংসার সূরাও বলা হয়।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরাটির দ্বিতীয় নাম বলেছেন-الْقُرْآنُ الْعَظِيمُ (আল-কুরআনুল আযীম)। অর্থাৎ মহান কুরআন। উলামায়ে কেরাম এ নামের ব্যাখ্যা করেছেন এরূপ যে, আল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহের যাবতীয় ইলম কুরআন মাজীদে গচ্ছিত রেখেছেন। তারপর মৌলিকভাবে সমগ্র কুরআনের ইলম সূরা ফাতিহায় নিহিত রয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহার ব্যাখ্যা ভালোভাবে জানতে পারবে, সে যেন সমগ্র কুরআনের ব্যাখ্যাই জেনে ফেলল।
হযরত আলী রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, আমি যদি সূরা ফাতিহার ব্যাখ্যা করি আর তা দ্বারা সত্তরটির ভাগ পূর্ণ করতে চাই, তবে তা করতে পারব। বস্তুত আকীদা-বিশ্বাস ও ইবাদত-বন্দেগী সংক্রান্ত যাবতীয় বিধান মৌলিক আকারে এ সূরায় নিহিত রয়েছে। এতে স্থান পেয়েছে দুনিয়া ও আখিরাত এবং মহাবিশ্বের কুলমাখলুকাত। কাজেই কেউ যদি তার সারাটা জীবনও এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে থাকে, তাও করতে পারবে; তার জীবন ফুরিয়ে যাবে, কিন্তু ব্যাখ্যা শেষ হবে না।
সূরা ফাতিহা যে কারণে কুরআন মাজীদের শ্রেষ্ঠতম সূরা
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরা ফাতিহাকে কুরআনের শ্রেষ্ঠতম সূরা সাব্যস্ত করেছেন। এর কারণ কুরআন মাজীদে যত জ্ঞান-তত্ত্বের সমাহার ঘটেছে, মৌলিকভাবে তার সবটাই সূরা ফাতিহার মধ্যে রয়েছে। তাই এর এক নাম 'উম্মুল কুরআন'-ও বটে। অর্থাৎ কুরআন মাজীদের মূল। কুরআন মাজীদের শিক্ষা মৌলিকভাবে দু'প্রকার। (ক) আকীদা-বিশ্বাস; (খ) ইবাদত-বন্দেগী। সূরা ফাতিহার শুরুর তিন আয়াতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মূল আকীদা-বিশ্বাস অর্থাৎ তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাতের বিষয়বস্তু রয়েছে। ইবাদত-বন্দেগী দুই প্রকার। প্রত্যক্ষ ইবাদত ও পরোক্ষ ইবাদত। প্রত্যক্ষ ইবাদত হলো নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, যিকির, তিলাওয়াত, দান-খয়রাত ইত্যাদি।
দুনিয়ার যাবতীয় কাজ শরীয়তসম্মতভাবে যদি আল্লাহ তা'আলাকে রাজি-খুশির জন্য করা হয়, তবে তাও পরোক্ষভাবে ইবাদতে পরিণত হয়। সে হিসেবে মুসলিম জীবনের সকল কাজকর্ম ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এই যাবতীয় ইবাদতের শিক্ষা রয়েছে ইসলামী শরীয়তের মধ্যে, যাকে সিরাতুল মুস্তাকীম বা সরল পথ বলা হয়। সারা কুরআন-হাদীছের ভেতর সিরাতুল মুস্তাকীমের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। সূরা ফাতিহার ৪ ও ৫ নং আয়াতে সংক্ষেপে এ যাবতীয় বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে।
যারা সিরাতুল মুস্তাকীমের উপর চলে, তারা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে পুরস্কারপ্রাপ্ত হয়। নবী-রাসূল, সিদ্দীকীন, শুহাদা ও সালিহীন- এ চারও স্তরের লোক আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে পুরস্কারপ্রাপ্ত। কুরআন মাজীদে এর বিস্তারিত বিবরণ আছে। তাদের অনুসরণ করার দ্বারা সরল পথে চলা সহজ হয়। ৬ নং আয়াতের সারমর্ম এটাই।
যারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তাদের পথ পরিহার করা একান্ত কর্তব্য। যারা তা পরিহার করে না, তারাও বিপথগামী হয়ে যায়। ইহুদী ও নাসারা সম্প্রদায় সরল পথ থেকে বিচ্যুত। তারা পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্ত। তাদের সম্পর্কে কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে বিস্তারিত আলোচনা আছে। সরল পথের প্রত্যাশীকে অবশ্যই তাদের পথ পরিহার করতে হবে। ৭ নং আয়াতের সারমর্ম এটাই। এভাবে সারা কুরআনের সারসংক্ষেপ সূরা ফাতিহার মধ্যে এসে গেছে। তাই এ সূরাকে কুরআন মাজীদের শ্রেষ্ঠতম সূরা সাব্যস্ত করা হয়েছে। এমন সারগর্ভ সূরা পূর্বের কোনও আসমানী কিতাবে ছিল না।
সূরা ও আয়াতসমূহের বিন্যাস আল্লাহপ্রদত্ত
এ গুরুত্বের কারণেই হয়তো সূরাটিকে কুরআন মাজীদের শুরুতে স্থান দেওয়া হয়েছে, যদিও নাযিলের দিক থেকে এটি সর্বপ্রথম নয়। কেননা সর্বপ্রথম নাযিল হয়েছে সূরা 'আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত। তারপর সূরা মুদ্দাছছির। তারপর সূরা ফাতিহা। কুরআন মাজীদের বিন্যাস নাযিলের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী হয়নি। এর বিন্যাস আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে প্রদত্ত। যখন কোনও আয়াত নাযিল হতো, হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালামের ইশারায় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাতিব (লিপিকর) সাহাবীদেরকে বলে দিতেন, সে আয়াতটি কোন সূরার কোথায় স্থান দিতে হবে। এমনিভাবে কোনও সূরা নাযিল হলেও বলে দেওয়া হতো সে সূরাটি কোন সূরার পরে বা আগে রাখতে হবে।
প্রতি রমাযানে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জিবরীল আলাইহিস সালামকে তাঁর শেখানো বিন্যাস অনুযায়ী কুরআন পড়ে শোনাতেন। সর্বশেষ রমাযানে তিনি সম্পূর্ণ কুরআন তাঁকে পড়ে শোনান। বিখ্যাত কাতিব সাহাবী হযরত যায়দ ইবন ছাবিত রাযি.-ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তো সর্বশেষ সে রমাযানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে ধারাবাহিকতায় কুরআন তিলাওয়াত করেছিলেন, সে অনুযায়ী কুরআন মাজীদ লিপিবদ্ধ করা হয়। সুতরাং কুরআন মাজীদের বিন্যাস সাহাবায়ে কেরামের নিজেদের পক্ষ হতে করা হয়নি; বরং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ হতেই তারা তা লাভ করেছিল। এভাবে কুরআন মাজীদের আয়াত ও সূরা উভয়ের বিন্যাস আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে প্রাপ্ত।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. সূরা ফাতিহা কুরআন মাজীদের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরা।
খ. সূরা ফাতিহার আরও বিভিন্ন নাম আছে, যেমন আস-সাব'উল মাছানী, আল কুরআনুল আযীম ইত্যাদি।
গ. কোনও বিষয়ে শিক্ষার্থীর কৌতূহল সৃষ্টির জন্য সে উক্ত বিষয়টি জানতে চায় কি না, এ প্রশ্ন করা শিক্ষাকে মনোজ্ঞ করে তোলার একটি উত্তম কৌশল।
ঘ. কোনও বিষয়ে শিক্ষাদানকালে শিক্ষার্থীর হাত ধরার দ্বারা যেমন সে বিষয়ের গুরুত্ব প্রকাশ পায়, তেমনি তা দ্বারা জ্ঞান আহরণের প্রতি শিক্ষার্থীর মনোযোগও বৃদ্ধি পায়।
চ. শিক্ষার্থীর হাত ধরার দ্বারা তার প্রতি শিক্ষকের আন্তরিকতা প্রকাশ পায়।
ছ. শিক্ষার্থীর হাত ধরাটা শিক্ষকের বিনয়-গুণেরও নিদর্শন।
জ. গুরুত্বপূর্ণ কোনও বিষয় হঠাৎ করে না শিখিয়ে শিক্ষার্থীকে সে বিষয়ে কৌতূহলী করে তোলার পর শিক্ষাদান করলে তা স্মরণ রাখা এবং অন্তরে রেখাপাত করার পক্ষে বেশি সহায়ক হয়।
ঝ. কোনও বিষয়ে জানার প্রতি শিক্ষার্থীর অন্তরে কৌতূহল ও আগ্রহ থাকা জরুরি।
ঞ. যে বিষয়ে জানা নেই, তা জানার লক্ষ্যে প্রশ্ন করা উচিত। প্রশ্ন করার দ্বারা জ্ঞাতব্য বিষয়ের প্রতি শিক্ষার্থীর আগ্রহ প্রকাশ পায়।
ট. উসতায কোনও বিষয় শেখানোর ওয়াদা করার পর যদি শেখাতে বিলম্ব করেন কিংবা ভুলে যান, তবে ছাত্র তাকে তা স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।
ঠ. সূরা ফাতিহা অতীব গুরুত্বপূর্ণ সূরা। আমরা নামাযে, নামাযের বাইরে খুব ধ্যান ও ভক্তির সঙ্গে এ সূরা পাঠ করব।
ড. আয়াতের সংখ্যা হিসেবে এ সূরাটির নামকরণ করা হয়েছে আস-সাব'উল মাছানী। এক হাদীছে প্রত্যেক আয়াত পড়ার পর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে কী জবাব দেওয়া হয় তাও বর্ণিত হয়েছে। তাই নামাযে সূরাটির সাত আয়াত সাত দমে পড়া উত্তম।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)