আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২২. অধ্যায়ঃ শিষ্টাচার

হাদীস নং: ৪৩৬৭
অধ্যায়ঃ শিষ্টাচার
কল্যাণকর কথাবার্তা ব্যতীত নীরবতা অবলম্বন করার প্রতি অনুপ্রেরণা এবং অধিক বাক্যালাপের প্রতি ভীতি প্রদর্শন
৪৩৬৭. হযরত মু'আয ইবন জাবাল (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি নবী (ﷺ)-এর সংগে এক সফরে ছিলাম। একদিন সকালে সফর অবস্থায় আমি নবী (ﷺ)-এর কাছাকাছি এসে বললামঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ্। আপনি আমাকে এমন বিষয়ে অবহিত করুন, যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবে। তিনি বলেন: তুমি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন করেছ। আল্লাহ্ যার প্রতি তা সহজ করেন, তার জন্যই তা সহজ হয়। আর সে আমল হচ্ছে এই, তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সংগে কোন বস্তু শরীক করবে না। তুমি সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, রামাযানের সিয়াম পালন করবে এবং বায়তুল্লাহ শরীফে হজ্জ আদায় করবে। এরপর তিনি বলেন: আমি কি তোমাকে কল্যাণের দরজাসমূহ সম্পর্কে অবহিত করব না? আমি বললামঃ জ্বি-হা। ইয়া রাসূলাল্লাহ্। তিনি বলেন, সিয়াম ঢাল স্বরূপ, দান-খয়রাত গুনাহ মোচন করে দেয়, যেরূপ পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়। বান্দার মধ্যরাতের সালাত সালিহীনদের নিদর্শন। এরপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াতটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন:
تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ _____ يَعْمَلُونَ
"তারা শয্যা ত্যাগ করে তাদের প্রতিপালককে ডাকে আশায় ও আশংকায় এবং আমি তাদের যে রিযক দিয়েছি, তা হতে তারা দান করে।" (সূরা সাজদা। ১৬) তারপর তিনি বলেনঃ আমি কি তোমাকে ইসলামের মৌলিক স্তম্ভ সম্পর্কে অবহিত করব না? তা হচ্ছে জিহাদ। পরে তিনি বলেন: আমি কি তোমাকে ইসলামের রক্ষা কবচ সম্পর্কে অবহিত করব না? আমি বললামঃ জ্বি-হা, ইয়া রাসূলাল্লাহ্। তিনি বলেন: তুমি তোমার রসনা নিয়ন্ত্রণ করবে, তিনি একথা বলে নিজ জিহ্বার দিকে ইশারা করেন। আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্। আমরা যা কর্তাবার্তা বলি, সে বিষয়েও কি আমরা আল্লাহর নিকট ধৃত হবো? তিনি বলেনঃ তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক, মানুষ জাহান্নামে অধোমুখী হয়ে অথবা তিনি বলেছেন, নাকের ডগার উপরে নিক্ষিপ্ত হবে কেবলমাত্র রসনার কারণে।
(আহমাদ, তিরমিযী, নাসাঈ ও ইবন মাজা বর্ণিত। তাঁরা সকলে আবু ওয়াইল থেকে, তিনি মু'আয (রা) থেকে বর্ণনা করেন। ইমাম তিরমিযী (র) বলেনঃ হাদীসটি হাসান সহীহ্।
(হাফিয মুনযিরী (র) বলেনঃ আবু ওয়াইল প্রাপ্ত বয়ষ্ক অবস্থায় মু'আয (রা)-এর সাক্ষাৎ লাভ করেন। তার মু'আয (রা) থেকে হাদীস শোনার ব্যাপারে আমার সন্দেহ রয়েছে। কেননা, আবু ওয়াইল কুফায় এবং মু'আয (রা) সিরিয়ায় বসবাস করতেন। আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ।
দারুকুতনী (র) বলেন, উক্ত হাদীসটি শাহর ইবন হাওশাব (র) মু'আয ইব্‌ন জাবাল (রা)-এর বর্ণনাসূত্রে গ্রহণযোগ্য। উক্ত সনদ সহীহ্। তবে হযরত শাহর (র)-এর মু'আয (রা) থেকে শোনার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। উক্ত হাদীসটি বায়হাকী ও অন্যান্যগণ মায়মূন ইব্‌ন আবু শায়বা থেকে, তিনি হযরত মু'আয (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। এই মায়মূন কুফাবাসী একজন বিশ্বস্ত লোক। আমার মনে হয়, তিনি হযরত মু'আয (রা) থেকে শোনেন নি এবং তার সাক্ষ্য পাননি। অথচ হযরত আয়েশা (রা) মু'আয (রা)-এর ত্রিশ বছর পর ইনতিকাল করেন। আমর ইবন আলী (র) বলেনঃ তিনি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর সাহাবীদের নাম নিয়ে হাদীস বর্ণনা করতেন। অথচ আমাদের নিকট তার কোন বিশ্বস্ত সূত্র জানা নেই। তিনি বলতেন আমি শুনেছি। অথচ আমার এ কথা জানা নেই যে, কোন মুহাদ্দিস একথা বলেছেন যে, তিনি সাহাবীদের থেকে শুনেছেন।)
كتاب الأدب
التَّرْغِيب فِي الصمت إِلَّا عَن خير والترهيب من كَثْرَة الْكَلَام
4367- وَعَن معَاذ بن جبل رَضِي الله عَنهُ قَالَ كنت مَعَ النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم فِي سفر فَأَصْبَحت يَوْمًا قَرِيبا مِنْهُ وَنحن نسير فَقلت يَا رَسُول الله أَخْبرنِي بِعَمَل يدخلني الْجنَّة وَيُبَاعِدنِي عَن النَّار قَالَ لقد سَأَلت عَن عَظِيم وَإنَّهُ ليسير على من يسره الله عَلَيْهِ تعبد الله
وَلَا تشرك بِهِ شَيْئا وتقيم الصَّلَاة وتؤتي الزَّكَاة وتصوم رَمَضَان وتحج الْبَيْت ثمَّ قَالَ أَلا أدلك على أَبْوَاب الْخَيْر قلت بلَى يَا رَسُول الله قَالَ الصَّوْم جنَّة وَالصَّدَََقَة تطفىء الْخَطِيئَة كَمَا يطفىء المَاء النَّار وَصَلَاة الرجل فِي جَوف اللَّيْل شعار الصَّالِحين ثمَّ تَلا قَوْله تَتَجَافَى جنُوبهم عَن الْمضَاجِع حَتَّى بلغ يعْملُونَ السَّجْدَة 61 ثمَّ قَالَ أَلا أخْبرك بِرَأْس الْأَمر وعموده وذروة سنامه قلت بلَى يَا رَسُول الله قَالَ رَأس الْأَمر الْإِسْلَام وعموده الصَّلَاة وذروة سنامه الْجِهَاد ثمَّ قَالَ أَلا أخْبرك بملاك ذَلِك كُله
قلت بلَى يَا رَسُول الله قَالَ كف عَلَيْك هَذَا وَأَشَارَ إِلَى لِسَانه قلت يَا نَبِي الله وَإِنَّا لمؤاخذون بِمَا نتكلم بِهِ قَالَ ثكلتك أمك وَهل يكب النَّاس فِي النَّار على وُجُوههم أَو قَالَ على مناخرهم إِلَّا حصائد ألسنتهم

رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ وَابْن مَاجَه كلهم من رِوَايَة أبي وَائِل عَن معَاذ وَقَالَ التِّرْمِذِيّ حَدِيث حسن صَحِيح
قَالَ الْحَافِظ وَأَبُو وَائِل أدْرك معَاذًا بِالسِّنِّ وَفِي سَمَاعه عِنْدِي نظر وَكَانَ أَبُو وَائِل بِالْكُوفَةِ ومعاذ بِالشَّام وَالله أعلم
قَالَ الدَّارَقُطْنِيّ هَذَا الحَدِيث مَعْرُوف من رِوَايَة شهر بن حَوْشَب عَن معَاذ وَهُوَ أشبه بِالصَّوَابِ على اخْتِلَاف علمه فِيهِ كَذَا قَالَ وَشهر مَعَ مَا قيل فِيهِ لم يسمع معَاذًا وَرَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ وَغَيره عَن مَيْمُون بن أبي شيبَة عَن معَاذ وَمَيْمُون هَذَا كُوفِي ثِقَة مَا أرَاهُ سمع من معَاذ بل وَلَا أدْركهُ فَإِن أَبَا دَاوُد قَالَ لم يدْرك مَيْمُون بن أبي شيبَة عَائِشَة وَعَائِشَة تَأَخَّرت بعد معَاذ من نَحْو ثَلَاثِينَ سنة وَقَالَ عَمْرو بن عَليّ كَانَ يحدث عَن أَصْحَاب رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم وَلَيْسَ عندنَا فِي شَيْء مِنْهُ يَقُول سَمِعت وَلم أخبر أَن أحدا يزْعم أَنه سمع من أَصْحَاب النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم

হাদীসের ব্যাখ্যা:

জান্নাতে যাওয়ার জন্য যেসব অবশ্য পালনীয় আমলের উল্লেখ নবী করীম ﷺ করেছেন, তার মধ্যে নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাতের সাথে আল্লাহর ইবাদত করা এবং শিরক থেকে দূরে থাকার কথা রয়েছে। নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাতের উল্লেখ করার পূর্বে পৃথকভাবে আল্লাহর ইবাদত করা এবং শিরক থেকে দূরে থাকার বর্ণনা করা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তাতে বুঝা যাচ্ছে, বর্ণিত চারটি ইবাদত ছাড়াও আরো ইবাদত রয়েছে, যা জান্নাতের জন্য সম্পাদন করা অপরিহার্য। আল্লাহর ইবাদত করা ও তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করা খুবই ব্যাপক বিষয়। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এবং জীবনের সকল পর্যায়ে, মসজিদ থেকে রণাঙ্গন পর্যন্ত যার মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, লেন-দেন, অফিস-আদালত, পার্লামেন্ট শামিল রয়েছে। আল্লাহর ইবাদত করা এবং তাঁর সাথে বা তাঁর গুণ ও এখতিয়ারের সাথে কাউকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শরীক না করা। কোন ব্যক্তি নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাত সম্পাদন করা সত্ত্বেও জীবনের বৃহত্তম এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আল্লাহর গুণ ও এখতিয়ারের সাথে যদি কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা আদর্শকে শরীক করে, তাহলে সে শিরকের দোষে দোষী সাব্যস্ত হবে। তাকে আখিরাতের আদালতে অপমানের বোঝা বহন করতে হবে। অনেক নামধারী মুসলমান আল্লাহর সত্তার সাথে শিরক করাকে অপসন্দ করলেও আল্লাহ জাল্লা-জালালুহুর সিফাত ও এখতিয়ারের সাথে শিরক করার অর্থ মোটেই বুঝে না বা বুঝবার চেষ্টা করে না। আলেম সমাজের উচিত, এ ধরনের লোকের অজ্ঞতা দূর করা। অন্যথায় এসব লোকের অজ্ঞতার অপরাধের জন্য আখিরাতের আদালতে তাদের সাথে আলেমদেরকেও আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

সদকা, রোযা এবং মধ্যরাতের নামায অর্থাৎ তাহাজ্জুদ ও অন্যান্য নফল ইবাদতকে কল্যাণের দরজা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সদকা পাপকে নির্বাপিত করে। সদকার মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের পাপ দূর করে দেন এবং সদকাকারীকে পাক-সাফ থাকার তওফিক দান করেন। রোযা বান্দাকে পাপ থেকে রক্ষা করে। মধ্যরাতের নামাযের খুব ফযীলত রয়েছে। তাহাজ্জুদ গুযার এবং দাতা ব্যক্তির জন্য জান্নাতের মধ্যে এমন সব নিয়ামত রাখা হয়েছে যা দুনিয়ার কোন প্রাণী কখনো দেখেনি।

অতঃপর নবী করীম ﷺ দীনের একটা নক্সা পেশ করেছেন। তাতে ইসলামকে راس الامر বা দীনের প্রধান অংশ বা দীনের মাথা বলা হয়েছে। শরীরের সাথে মাথার যে সম্পর্ক, দীনের সাথে ইসলামেরও সে সম্পর্ক। এখানে ইসলাম বলতে শুধু কালেমা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু পড়ে ইসলাম কবুল করা নয়, বরং ইসলামকে দীন হিসেবে অর্থাৎ জীবনের যাবতীয় দিক ও বিভাগের এবং জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত গোটা জীবনের জন্য একক এবং একমাত্র ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করা বুঝানো হয়েছে। নামাযকে দীনের স্তম্ভ বলা হয়েছে। অপর একটি মশহুর হাদীসে নামাযসহ পাঁচটি জিনিস, যথা: কালেমা শাহাদাত, নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাতকে দীনের স্তম্ভ বলা হয়েছে। যেরূপ স্তম্ভ ছাড়া ইমারত দাঁড়াতে পারে না, সেরূপ বর্ণিত বিষয়সমূহ ছাড়া দীনের কল্পনা করা যায় না। যেরূপ স্তম্ভের নাম ইমারত নয়, সেরূপ নামাযসহ পাঁচটি জিনিসের সমষ্টিও পরিপূর্ণ দীন নয়। যেরূপ ইমারতকে বসবাস উপযোগী করার জন্য দরজা-জানালা, ছাদ, প্রাচীর প্রভৃতির প্রয়োজন হয়, সেরূপ দীনকে পরিপূর্ণ রূপ দান করার জন্য আরো বহু জিনিসের প্রয়োজন হয়। জিহাদকে দীনের বুলন্দ শীর্ষ হিসেবে আখ্যায়িত করে নবী করীম ﷺ দীনের পরিপূর্ণ রূপের উপর আলোকসম্পাত করেছেন। অর্থাৎ দীনকে পরিপূর্ণ রূপ দান করতে হলে, দীনকে অন্য দীনের উপর বিজয়ী করতে হলে জিহাদ অপরিহার্য। দীন ইসলামকে অপর দীনের উপর বিজয়ী করার উদ্দেশ্যে জিহাদ পরিচালনা করা বা জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করার জন্য খিলাফত আলা মিনহাজিন নবুওয়ত বা নবুওয়তের পদ্ধতিতে রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করা অপরিহার্য। এ জন্য যে সংগ্রাম ও সাধনা করা হয়, তা জিহাদের অন্তর্ভুক্ত।

কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের ফল থেকে বান্দা যাতে বঞ্চিত না হয় তার জন্য নবী করীম ﷺ জিহ্বার হিফাযতের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। জিহ্বাকে সংযত না রাখলে বান্দা জীবনব্যাপী বহু সংখ্যক ইবাদত করা সত্ত্বেও কিয়ামতের দিন বিপদের সম্মুখীন হতে পারে। জিহ্বার অপপ্রয়োগ বা অন্যায় প্রয়োগের কারণে মানুষ দোষখে নিক্ষিপ্ত হবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান