আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২২. অধ্যায়ঃ শিষ্টাচার

হাদীস নং: ৪৪৩০
অধ্যায়ঃ শিষ্টাচার
বিনয়ী হওয়ার প্রতি অনুপ্রেরণা এবং অহংকার ও আত্ম প্রশংসায় পঞ্চমুখ এবং আত্মম্ভরিতার প্রতি ভীতি প্রদর্শন
৪৪৩০. হযরত হারিসা ইবন ওয়াহব (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ্ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছিঃ আমি কি তোমাদের জাহান্নামীদের ব্যাপারে অবহিত করব? তারা হল। নির্দয় অন্তরের অধিকারী, রুক্ষভাষী এবং অহংকারী।
(বুখারী ও মুসলিম বর্ণিত।
العتل - নির্দয় অন্তরের অধিকারী।
الجواظ - সম্পদ ব্যয়ে কৃপণ ব্যক্তি। কারো কারো মতে চাল চলনে অহংকারী, কারো কারো মতে, বেটে অথবা স্থল পেটের অধিকারী।)
كتاب الأدب
التَّرْغِيب فِي التَّوَاضُع والترهيب من الْكبر وَالْعجب والافتخار
4430- وَعَن حَارِثَة بن وهب رَضِي الله عَنهُ قَالَ سَمِعت رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم يَقُول أَلا أخْبركُم بِأَهْل النَّار كل عتل جواظ مستكبر

رَوَاهُ البُخَارِيّ وَمُسلم
العتل بِضَم الْعين وَالتَّاء وَتَشْديد اللَّام هُوَ الغليظ الجافي
والجواظ بِفَتْح الْجِيم وَتَشْديد الْوَاو وبالظاء الْمُعْجَمَة هُوَ الجموع المنوع وَقيل الضخم المختال فِي مشيته وَقيل الْقصير البطين

হাদীসের ব্যাখ্যা:

জাহান্নামীদের কিছু বৈশিষ্ট্য

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাহান্নামীদের পরিচয় দান করেন- كل عتل جواظ مستكبر (তারা হচ্ছে প্রত্যেক রূঢ়, উদ্যত, অহংকারী ব্যক্তি)। ইমাম নববী রহ. عتل -এর অর্থ করেছেন কঠোর-কঠিনপ্রাণ। তিনি جواظ -এর অর্থ করেছেন, এমন ব্যক্তি, যে ধন-সম্পদ খুব সঞ্চয় করে কিন্তু তা থেকে গরীব-দুঃখীকে কিছু দেয় না । তিনি বলেন, কারও মতে এর অর্থ মোটাতাজা শরীরের এমন লোক, যে দর্পিত ভঙ্গিতে চলাফেরা করে। কেউ বলেন, খাটো ভুঁড়িওয়ালা লোক।
শব্দদু'টির এছাড়া আরও ব্যাখ্যা আছে। যেমন কেউ বলেন, عتل অর্থ কাফের। দাউদী রহ. বলেন, মোটাতাজা শরীরের এমন লোক, যার ঘাড় মোটা ও পেট বড়। হারাবী রহ. বলেন, এমন ব্যক্তি, যে ধন-সম্পদ খুব সঞ্চয় করে কিন্তু তা থেকে গরীব দুঃখীকে কিছু দেয় না। আবার কেউ বলেন, খাঁটো দেহের স্থূলোদর ব্যক্তি। কারও মতে, এমন লোক, যে খুব বেশি পানাহার করে ও অন্যদের উপর জুলুম-অত্যাচার চালায়। কারও মতে এর অর্থ অত্যধিক কলহ-বিবাদকারী ও হীন স্বভাববিশিষ্ট। আবার কেউ বলেন, এমন কঠোর-কঠিন চরিত্রের লোক, যে ভালো কিছু মানতে চায় না। শব্দটির ব্যাখ্যা সম্পর্কে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি উত্তরে বলেন-

هو الشديد الخلق المصحح، الأكول الشروب، الواجد للطعام والشراب، الظلوم للناس، رحيب الجوف

‘পরিপুষ্ট, শক্ত-সমর্থ, সুস্থ-সবল লোক, যে খুব বেশি পানাহার করে, পানাহার সামগ্রী যার হস্তগত, মানুষের প্রতি জুলুম-অত্যাচারকারী ও স্থূলোদর ব্যক্তি।২৪৩
جواظ -এর অর্থ ইমাম নববী রহ. যা বলেছেন, বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থে এর সমর্থনে হাদীছও উদ্ধৃত হয়েছে। হযরত ইবন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীছে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এর অর্থ কী? তিনি বলেন, এমন লোক, যে খুব অর্থ-সম্পদ জমা করে, কিন্তু সে কৃপণ, তা থেকে কাউকে কিছু দেয় না।
ইমাম খাত্তাবী ও জাওহারী রহ. শব্দটির অর্থ করেছেন স্থূলদেহী ও চালচলনে অহংকারী। নেহায়া গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, এর অর্থ খাটো, লোভাতুর ও স্থূলোদর, পেট ভরে খাওয়া ছাড়া যার অন্য কোনও চিন্তা নেই।
এ শব্দদু'টির যেসকল অর্থ বর্ণিত হয়েছে তা সবই নিন্দনীয় স্বভাবের পরিচায়ক। এর কোনওটিই ইসলাম পসন্দ করে না। বিভিন্ন হাদীছে এর নিন্দা জানানো হয়েছে ও মুমিনদেরকে এর ব্যাপারে সাবধান করা হয়েছে। যেমন হাদীছ দ্বারা জানা যায়, কঠোর-কঠিন স্বভাবের লোক আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত থাকে। লোভ-লালসাবশে অর্থ সঞ্চয় করা এবং তা থেকে গরীব-দুঃখীকে কিছু না দেওয়া কাফের-মুনাফিকের স্বভাব। অহংকারী ও দর্পিত স্বভাবের লোক জান্নাতে যাবে না। ভোগ-বিলাসিতায় মেতে থাকার কারণে মোটাতাজা হয়ে যাওয়াটা আখেরাতবিমুখিতার লক্ষণ। তর্কপ্রবণতা ও সত্যগ্রহণে অস্বীকৃতি ছিল ঘোর কাফেরদের খাসলাত। কুরআন মাজীদে এর তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। আলোচ্য হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ শব্দদু'টির উল্লেখ করে আমাদের সাবধান করেছেন যে, এর দ্বারা যে নিন্দনীয় স্বভাব বোঝানো হয়ে থাকে তা থেকে তোমরা দূরে থাকবে। কেননা এ স্বভাবের লোক জাহান্নামে যাবে।
এ হাদীছে জাহান্নামীদের যে স্বভাব উল্লেখ করা হয়েছে তা দ্বারা এ কথা বোঝানো উদ্দেশ্য নয় যে, কেবল এই স্বভাবের লোকেরাই জাহান্নামে যাবে, এছাড়া আর কেউ যাবে না। বরং বোঝানো উদ্দেশ্য হচ্ছে, যেসকল অসৎগুণের কারণে জাহান্নামে যাবে, এগুলোও তার অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও এমন অনেক মন্দ স্বভাব আছে, যা মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। তাই সেসব গুণের ব্যাপারেও মুমিনদের সচেতন থাকা অবশ্যকর্তব্য।
এ হাদীছে জাহান্নামীদের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে যে, তারা অর্থাৎ অহংকারী। অহংকার অত্যন্ত নিন্দনীয় স্বভাব। এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন لا يدخل الجنة من كان في قلبه مثقال ذرة من كبر ‘যার অন্তরে কণা পরিমাণ অহংকার আছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
প্রশ্ন হচ্ছে, অহংকার কী? অনেকে সুন্দর পোশাক পরা, ভালো খাওয়া-দাওয়া করা ও পরিপাটি চলাফেরাকে অহংকার মনে করে থাকে। এ ধারণা ঠিক নয়। জীবনমাণে আপন সামর্থ্যের প্রকাশ দূষণীয় নয়; বরং ক্ষেত্রবিশেষে তা কাম্যও। আল্লাহ তাআলা যাকে যে সামর্থ্য দান করেছেন, কাজকর্মে তা প্রকাশ করা শোকরেরও অন্তর্ভুক্ত। এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন إن الله يحب أن يرى أثر نعمته على عبده “আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার উপর নিজ নিআমতের প্রকাশ দেখতে পসন্দ করেন।
চালচলন ও বেশভূষায় সামর্থ্যের প্রকাশ দোষের হয় তখনই, যখন তুলনামূলক কম সামর্থ্যবানকে হেয়জ্ঞান করা হয়। সেটা অহংকারের মধ্যে পড়ে। সুতরাং উল্লিখিত হাদীছটি শুনে এক সাহাবী বলেছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোনও কোনও মানুষ এমন আছে, যে ভালো জামা-জুতা পসন্দ করে, সুন্দর হয়ে চলাটা তার প্রিয়। এর উত্তরে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন যে, আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য পসন্দ করেন। অর্থাৎ তুমি যা বলছ তা অহংকার নয়। তারপর তিনি অহংকারের সংজ্ঞা দান করলেন যে الكبر بطر الحق وغمط الناس ‘অহংকার হচ্ছে সত্য প্রত্যাখ্যান করা ও মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা।
এর দ্বারা অহংকার কী তা বোঝা গেল। সুতরাং কোনও বিষয় নিয়ে কারও সঙ্গে মতভিন্নতা দেখা দিলে বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা চাই কার মত সত্য ও সঠিক। যদি স্পষ্ট হয়ে যায় প্রতিপক্ষের মত সঠিক, তবে সে যে-ই হোক না কেন তা মেনে নেওয়া চাই। সে গরীব, শিক্ষা-দীক্ষায় কম বা সামাজিক অবস্থান নিচে, সে তুলনায় আমি উপরে, এ জাতীয় চিন্তাভাবনার কারণে যদি তার মত মেনে নিতে কুণ্ঠাবোধ হয়, তবে নিঃসন্দেহে তা অহংকার। এমনিভাবে কাউকে কোনওদিক থেকে নিজের চেয়ে কম মনে হলে সে কারণে তাকে তুচ্ছ করা হলে তা অহংকার বটে। আর আলোচ্য হাদীছ দ্বারা যখন জানা গেল অহংকার জাহান্নামীদের বৈশিষ্ট্য, তখন অবশ্যই এ জাতীয় আচরণ পরিহার করে চলতে হবে। এটাই এ হাদীছের দাবি।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. এ হাদীছ দ্বারা ধারণা পাওয়া যায় যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের লক্ষ্যবস্তু ছিল উম্মতকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানো ও তাদেরকে জান্নাতের জন্য প্রস্তুত করা।

খ. চলাফেরায় দর্পিতভঙ্গি অত্যন্ত নিন্দনীয়। চলাফেরায় বিনয়ভঙ্গি বজায় রাখাই প্রকৃত মুমিনের শান।

গ. মুমিনদের চেষ্টা করা উচিত অন্তরে কঠোরতার পরিবর্তে নম্রতা ও দয়ামায়া সৃষ্টির চেষ্টা করা।

ঘ. কিছুতেই অর্থবিত্তের মোহে পড়তে নেই। নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী দান-খয়রাত করা উচিত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান