আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২৩. অধ্যায়ঃ তাওবা ও যুহদ

হাদীস নং: ৪৮৬৮
অধ্যায়ঃ তাওবা ও যুহদ
দারিদ্র্যও স্বল্পসামগ্রীর প্রতি উৎসাহ প্রদান এবং ফকীর-মিসকীন ও দুর্বলদের মর্যাদা এবং তাদেরকে ভালবাসা ও তাদের সাথে উঠাবসা করা
৪৮৬৮. তাঁরই সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, মসজিদের সবচেয়ে ধনী লোকটির দিকে তাকাও। তিনি বলেন, আমি তাকালাম। দেখি, একটি উন্নতমানের আলোয়ান রয়েছে। আমি বললাম, এ লোকটিই। আবু যার (রা) বলেনঃ তিনি (পুনরায়) আমাকে বললেন, তুমি মসজিদের সবচেয়ে দরিদ্র লোকটির প্রতি তাকাও। আমি তাকালাম। দেখি এক ব্যক্তির গায়ে জীর্ণবস্তু। আবূ যার (রা) বলেনঃ আমি বললাম, এ লোকটিই। আবু যার (রা) বলেন: তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: অবশ্যি এই ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে ঐ লোকটির মত পৃথিবী ভরা লোকের চেয়ে উত্তম।
(আহমাদ হাদীসটি এরূপ কতগুলো সনদে বর্ণনা করেছেন, যেগুলোর সকল বাবী সহীহ হাদীসের ক্ষেত্রে নির্ভযোগ্য। ইবন হিব্বান তাঁর 'সহীহ' কিতাবে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন।)
كتاب التوبة والزهد
التَّرْغِيب فِي الْفقر وَقلة ذَات الْيَد وَمَا جَاءَ فِي فضل الْفُقَرَاء وَالْمَسَاكِين وَالْمُسْتَضْعَفِينَ وحبهم ومجالستهم
4868- وَعنهُ رَضِي الله عَنهُ قَالَ قَالَ لي رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم انْظُر أرفع رجل فِي الْمَسْجِد قَالَ فَنَظَرت فَإِذا رجل عَلَيْهِ حلَّة قلت هَذَا قَالَ قَالَ لي انْظُر أوضع رجل فِي الْمَسْجِد قَالَ فَنَظَرت فَإِذا رجل عَلَيْهِ أَخْلَاق قَالَ قلت هَذَا قَالَ فَقَالَ رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم لهَذَا عِنْد الله خير يَوْم الْقِيَامَة من ملْء الأَرْض مثل هَذَا

رَوَاهُ أَحْمد بأسانيد رواتها مُحْتَج بهم فِي الصَّحِيح وَابْن حبَان فِي صَحِيحه

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দীনদারিতে অনগ্রসর এক অভিজাত ব্যক্তির সঙ্গে দীনদারিতে অগ্রগামী কিন্তু সামাজিক দৃষ্টিতে গুরুত্বহীন এমন এক ব্যক্তির তুলনা করে জানাচ্ছেন যে, এই গুরুত্বহীন ব্যক্তি ওই অভিজাত ব্যক্তির মত দুনিয়াভরা মানুষ অপেক্ষাও উত্তম।

আলোচ্য হাদীছে উভয়ের অবস্থা কেমন ছিল স্পষ্টভাবেই তার উল্লেখ আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সম্পর্কে হযরত আবূ যার্ রাযি.র কাছে তার অভিমত জানতে চেয়েছিলেন।

বোঝা গেল, দুনিয়ার অর্থবিত্ত ও ঠাটবাট আল্লাহ তা'আলার কাছে কোনও মূল্য রাখে না। দুনিয়ার জীবনই তো ধোঁকা প্রবঞ্চনার আধার। আল্লাহ তা'আলা বলেন وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ‘পার্থিব জীবন তো প্রতারণার উপকরণ ছাড়া কিছুই নয়। ২৪৮
সুতরাং দুনিয়াবী প্রতিষ্ঠাও প্রতারণাই বটে। প্রকৃত জীবন তো আখেরাতের জীবন। আল্লাহ তা'আলা বলেন وَإِنَّ الدَّارَ الْآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ ‘বস্তুত আখেরাতের জীবনই প্রকৃত জীবন।২৪৯
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তো শ্লোগানই ছিল اللهم لا عيش إلا عيش الآخرة হে আল্লাহ! আখেরাতের জীবন ছাড়া নেই জীবন।২৫০
প্রকৃত জীবন যখন আখেরাতের জীবন, তখন সেই জীবনের প্রতিষ্ঠাই কাম্য। হযরত জু'আইল রাযি. সেই চেষ্টা করেছিলেন। সে কারণেই তাঁর এ মর্যাদা। যারা সে চেষ্টা থেকে বিমুখ থাকে, পার্থিব দিক থেকে তারা যতই প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন দীনদারদের সঙ্গে তারা তুলনায় আসতে পারে না। সুতরাং কেউ অতি সাধারণ স্তরের বলে তাকে হেলা করো না। সমাজদৃষ্টিতে এমন বহু তুচ্ছ লোক আছে, আল্লাহর কাছে যাদের মর্যাদা দুনিয়ার বহু মান্যগণ্য লোকের চেয়ে অনেক বেশি। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ হাদীছ দ্বারা ওইসকল লোকের উচ্চমর্যাদার প্রতি তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন, বাহ্যচোখে যারা হীন হলেও অদৃশ্য তাকওয়ায় তাদের অন্তর পরিপূর্ণ। যে কারণে তারা আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাকেও তার সন্ধানী হতে উদ্বুদ্ধ করছেন। আর গাফেল দুনিয়াদারগণ যা নিয়ে মত্ত আছে এবং আখেরাতে মুক্তিলাভের মিথ্যা আশায় নিজেকে প্রতারিত করছে, তুমিও যাতে তাতে বিভোর না হয়ে পড়, সে ব্যাপারে তোমাকে সাবধান করছেন। তিনি তোমাকে অবহিত করছেন যে, সত্যিকারের সম্মান ও মর্যাদা তাকওয়ার মধ্যেই নিহিত, দুনিয়ার ধন-সম্পদ এবং পদ ও ক্ষমতার মধ্যে নয়।
প্রকাশ থাকে যে, ওই ব্যক্তিকে শ্রেষ্ঠ সাব্যস্ত করার দ্বারা এ কথা প্রমাণ হয়ে যায় না যে, দুনিয়ার সমস্ত গরীব সমস্ত ধনীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কোনও গরীব অপর কোনও ধনী বা গরীবের উপর শ্রেষ্ঠ সাব্যস্ত হয় তখনই, যখন সে তাকওয়া পরহেযগারীতে তাদের চেয়ে অগ্রগামী থাকে। তাকওয়াই আসল জিনিস, যা দ্বারা আল্লাহ তা'আলার কাছে মর্যাদা লাভ হয়। এ সম্পদ যার মধ্যে যতবেশি থাকবে আল্লাহ তাআলার কাছে তার মর্যাদাও ততবেশি হবে, তাতে সে দুনিয়ায় যত গরীব ও যত বিত্তহীনই হোক না কেন।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. দীনদারী ও তাকওয়াবিহীন নেতৃত্ব আল্লাহ তা'আলার কাছে কোনও মর্যাদা রাখে না। কাজেই কোনও মুমিনের সেরকম নেতৃত্ব কামনা করা উচিত নয়।

খ. অন্তরে তাকওয়া না থাকলে পার্থিব অর্থবিত্ত মানুষকে প্রকৃত মর্যাদা দিতে পারে না। সুতরাং অর্থবিত্তের মধ্যে মর্যাদা খোঁজা মুমিনের কাজ হতে পারে না।

গ. কোনও ব্যক্তি যতই গরীব হোক না কেন, দীন ও ঈমানে পরিপক্ক হলে ইসলাম তার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে। কাজেই এরূপ ব্যক্তিকে হেলা করতে নেই।

ঘ. সামাজিক সম্মান ও মর্যাদা পেয়ে কারও ধোঁকায় পড়া উচিত নয়। দীনদারীতে অগ্রগামী না হলে এ মর্যাদা মূল্যহীন।

ঙ. এ হাদীছ আমাদেরকে দুনিয়ার মোহে মুগ্ধ না থেকে আখেরাতের সাফল্য যার উপর নির্ভরশীল সেই তাকওয়া পরহেযগারিতে অগ্রগামী থাকার উৎসাহ যোগায়। আমাদের উচিত অন্তরে পরিপূর্ণরূপে সে উৎসাহ লালন করা।

২৪৮. সূরা আলে ইমরান (৩), আয়াত নং ১৮৫

২৪৯. সূরা আনকাবূত (২৯), আয়াত নং ৬৪

২৫০. সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ২৯৬১; সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ১৮০৫
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান