আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২৩. অধ্যায়ঃ তাওবা ও যুহদ

হাদীস নং: ৪৯৮৯
অধ্যায়ঃ তাওবা ও যুহদ
দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি ও দুনিয়ার স্বল্পতায় তুষ্ট থাকার জন্য উৎসাহ দান এবং দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা ও তজ্জন্য প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ব্যাপারে সতর্কীকরণ এবং পানাহার ও লেবাস পোষাক ইত্যাদিতে নবী (ﷺ)-এর জীবন-যাপন পদ্ধতি সম্পর্কিত কতিপয় হাদীস
৪৯৮৯. হযরত উরওয়া সূত্রে আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলতেন, হে আমার ভগ্নিপুত্র। আল্লাহর কসম, এক একটি নতুন চাঁদ করে দু'মাসে তিনটি নতুন চাঁদ দেখতাম, অথচ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ঘরগুলোতে আগুন জ্বলত না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে খালা আম্মা। তবে আপনাদের জীবিকা নির্বাহ হতো কিভাবে? তিনি বললেনঃ দু'টি কাল বস্তু তথা খেজুর ও পানি। হাঁ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কিছু আনসারী প্রতিবেশী ছিলেন। তাদের দুধের উটনী ছিল। তাঁরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্য কিছু কিছু দুধ পাঠাতেন। সে দুধ তিনি আমাদেরকেও পান করাতেন।
(বুখারী ও মুসলিম (র) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।)
كتاب التوبة والزهد
التَّرْغِيب فِي الزّهْد فِي الدُّنْيَا والاكتفاء مِنْهَا بِالْقَلِيلِ والترهيب من حبها وَالتَّكَاثُر فِيهَا والتنافس وَبَعض مَا جَاءَ فِي عَيْش النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم فِي المأكل والملبس وَالْمشْرَب وَنَحْو ذَلِك
4989- وَعَن عُرْوَة عَن عَائِشَة رَضِي الله عَنْهَا أَنَّهَا كَانَت تَقول وَالله يَا ابْن أُخْتِي إِن
كُنَّا لنَنْظُر إِلَى الْهلَال ثمَّ الْهلَال ثمَّ الْهلَال ثَلَاثَة أهلة فِي شَهْرَيْن وَمَا أوقد فِي أَبْيَات رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم نَار
قلت يَا خَالَة فَمَا كَانَ يعيشكم قَالَت الأسودان التَّمْر وَالْمَاء إِلَّا أَنه قد كَانَ لرَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم جيران من الْأَنْصَار وَكَانَت لَهُم منايح فَكَانُوا يرسلون إِلَى رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم من أَلْبَانهَا فيسقيناه

رَوَاهُ البُخَارِيّ وَمُسلم

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আম্মাজান আয়েশা সিদ্দীকা রাযি. থেকে এ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন তাঁর ভাগিনা উরওয়া রহ, তাঁর বড় বোন হযরত আসমা রাযি.-এর পুত্র। তিনি একজন বিশিষ্ট তাবি'ঈ। আম্মাজান রাযি, তাঁর কাছে অভাব-অনটনের বর্ণনা প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন যে, পরপর তিন চাঁদ অর্থাৎ দু'মাস এভাবে কাটত যে, আমাদের কারও চুলায় আগুন জ্বলত না। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যখন ওফাত হয়, তখন তাঁর ৯ জন স্ত্রী জীবিত ছিলেন। তাঁদের কারও ঘরেই রান্না হতো না। কারণ রান্না করার মত কিছু থাকত না।

আম্মাজান রাযি. এ কথা বলছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের অনেক পরে। এটা কোনও অভিযোগ নয়। বরং ভাগিনাকে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনপদ্ধতি শিক্ষা দিচ্ছেন। তাঁকে তাঁর জীবনবোধ সম্পর্কে অবহিত করছেন যে, দুনিয়ার প্রতি কেমন নিরাসক্ত তিনি ছিলেন।

উরওয়া রহ, জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে খালাম্মা কী খেয়ে আপনাদের জীবন কাটত? তিনি বললেন- الأسودان التمر والماء (কালো দুই বস্তু- খেজুর ও পানি)। খেজুর ও পানিকে একত্রে দুই কালো বস্তু বলা হয়েছে। খেজুর কালো হয় বটে, বিশেষত আজওয়া খেজুর, কিন্তু পানি তো কালো নয়। তাহলে একসঙ্গে দু'টোকে কালো বলা হল কেন? আসলে এটা আরবী ভাষারীতি। একসঙ্গে দুই বস্তুর উল্লেখ করতে গিয়ে একটির জন্য ব্যবহৃত শব্দ বা একটির নাম অপরটির জন্যও ব্যবহার করা হয় এবং একসঙ্গে দু'টোকে সেই এক শব্দে বা এক নামে উল্লেখ করা হয়। যেমন বলা হয় قمرين (চাঁদদ্বয়) অর্থাৎ চন্দ্র ও সূর্য। এমনিভাবে عمرين (উমরদ্বয়) অর্থাৎ হযরত আবু বকর রাযি. ও হযরত উমর রাযি.।

তো খেজুর ও পানিই ছিল নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবারবর্গের নিয়মিত খাবার। ব্যতিক্রম হতো কেবল তখন, যখন প্রতিবেশীদের কাছ থেকে কিছু আসত। সে সম্পর্কে আম্মাজান আয়েশা সিদ্দীকা রাযি. বলেন
إلا أنه قد كان لرسول الله ﷺ جيران من الأنصار، وكانت لهم منائح ، وكانوا يرسلون إلى رسول الله ﷺ من ألبانها فيسقينا
(অবশ্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কতিপয় আনসার প্রতিবেশী ছিল। তাদের দুধের উটনী ছিল। তারা তার দুধ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পাঠাত। তিনি আমাদেরকে তা পান করাতেন)। এভাবে তাঁদের মাঝেমধ্যে দুধ পান করা হতো। তা না হলে খেজুর ও পানি খেয়েই তাঁদের দিন কাটত মাসের পর মাস। এমনই ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজের দৈনন্দিন খাবারের অবস্থা, আর এভাবেই তিনি তাঁর পূতঃপবিত্র স্ত্রীদের নিয়ে চলেছেন। তাঁদেরও ছিল অসামান্য ধৈর্য; বরং ছিল আপন জীবনমানের উপর পরিতৃপ্তি ও পরিতুষ্টি। ফলে তাঁরা পরবর্তীকালের মুসলিমসাধারণের জন্য আদর্শ হয়ে আছেন। বৈষয়িক ও চারিত্রিক দিক থেকে একজন মুসলিম নারীর কেমন হতে হয়, তার সর্বোৎকৃষ্ট শিক্ষা কেবল তাঁদের জীবনেই পাওয়া যায়।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. জীবনের কষ্ট-ক্লেশের কথা অভিযোগরূপে না হয়ে যদি অন্যের শিক্ষাদানের জন্য প্রকাশ করা হয়, তবে তাতে কোনও দোষ নেই। বরং এরূপ প্রয়োজনে তা প্রকাশের অবকাশ রয়েছে।

খ. নবী-জীবনের কষ্ট-ক্লেশ ও কৃচ্ছতার মধ্যে আমাদের জন্য রয়েছে অনেক বড় সান্ত্বনা ও শোকরগুযারীর সবক।

গ. প্রতিবেশীদের মধ্যে হাদিয়া বিনিময় করা সুন্নত। বিশেষত কোনও প্রতিবেশী যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তাকে হাদিয়া দেওয়াই চাই।

ঘ. বুযুর্গ ও আল্লাহওয়ালা প্রতিবেশীকে হাদিয়া দেওয়া খায়র ও বরকতের কারণ।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান