মা'আরিফুল হাদীস

হজ্ব অধ্যায়

হাদীস নং: ১৬৯
হজ্ব অধ্যায়
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিদায় হজ্ব
১৬৯. হযরত আবূ বাকরা সাকাফী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) (বিদায় হজ্বে) ১০ই যিলহজ্ব আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন। এতে তিনি বললেন: বছর ঘুরেফিরে তার ঐ অবস্থায় ফিরে এসেছে, যে অবস্থায় আসমান-যমীন সৃষ্টি করার সময় ছিল। বছর বার মাসেই হয়, এগুলোর মধ্যে চারটি মাস বিশেষভাবে সম্মানিত। তিনটি মাস একাধারে যিলকদ, যিলহজ্ব ও মুহাররম। আর চতুর্থটি হচ্ছে ঐ রজব মাস, যা জ মাদাল উখরা ও শা'বানের মাঝে থাকে এবং মুযার গোত্রের লোকেরা যার অধিক সম্মান করে থাকে।

তারপর তিনি বললেন: বল তো, এটা কোন্ মাস? আমরা নিবেদন করলাম, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। এ সময় তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। এমনকি আমরা মনে করলাম যে, তিনি এ মাসের অন্য কোন নাম দিয়ে দেবেন। এবার তিনি বললেন, এটা কি যিলহজ্ব মাস নয়? আমরা আরয করলাম, নিঃসন্দেহে এটা যিলহজ্ব মাস। তারপর বললেন, তোমরা বল তো এটা কোন্ শহর? আমরা আরয করলাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। এমনকি আমরা মনে করলাম যে, তিনি এর অন্য কোন নাম দিয়ে দেবেন। তিনি তখন বললেন, এটা কি বালদাহ (মক্কা শহর) নয়? আমরা আরয করলাম, হ্যাঁ, তাই। তারপর বললেনঃ বল তো, এটা কোন্ দিন? আমরা উত্তর দিলাম, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। এসময় তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। এমনকি আমরা ধারণা করলাম যে, তিনি এর অন্য কোন নাম দিয়ে দেবেন। তিনি তখন বললেন: এটা কি কুরবানীর দিন নয়? আমরা আরয করলাম, হ্যাঁ, আজ কুরবানীর দিন। তারপর তিনি বললেনঃ তোমাদের জীবন, তোমাদের সম্পদ ও তোমাদের সম্ভ্রম তোমাদের উপর হারাম, (অর্থাৎ, তোমাদের কারও জন্য এটা জায়েয নয় যে, সে কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করবে অথবা কারও সম্পদ ও সম্ভ্রমের উপর হস্তক্ষেপ করবে। এগুলো তোমাদের উপর সবসময়ের জন্যই হারাম।) যেমন আজকের এ দিনে, এ পবিত্র শহরে ও এ পবিত্র মাসে কাউকে হত্যা করা ও তার সম্পদ ও সম্ভ্রমহানি করা তোমরা হারাম মনে করে থাক। তারপর তিনি বললেন: তোমরা শীঘ্রই তোমাদের প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাত করবে এবং তিনি তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করবেন। সাবধান! তোমরা আমার পর বিপথগামী হয়ে গিয়ে একে অন্যের জীবননাশ করতে যেয়ো না। (তারপর বললেন:) আমি কি আল্লাহর পয়গাম তোমাদেরকে পৌঁছে দিয়েছি? উপস্থিত সবাই বললেন, হ্যাঁ, আপনি আমাদেরকে আল্লাহর পয়গাম পৌঁছে দিয়েছেন। তারপর তিনি বললেনঃ হে আল্লাহ্! তুমি সাক্ষী থাক। (তারপর উপস্থিত লোকদেরকে বললেনঃ) যারা এখানে উপস্থিত তারা যেন অনুপস্থিত লোকদেরকে আমার কথা পৌঁছে দেয়। কেননা, অনেক এমন ব্যক্তি রয়েছে, যাকে পরে পৌঁছানো হয়, সে আসল শ্রোতা থেকেও অধিক উপলব্ধিকারী ও সংরক্ষণকারী হয়ে থাকে (এবং সে এলমের আমানতের হক বেশী আদায় করে।) -বুখারী, মুসলিম
کتاب الحج
عَنْ أَبِي بَكَرَةَ قَالَ : خَطَبَنَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ النَّحْرِ "إِنَّ الزَّمَانَ اسْتَدَارَ كَهَيْئَةِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ ، السَّنَةُ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ : ثَلاَثَةٌ مُتَوَالِيَاتٌ : ذُو القَعْدَةِ ، وَذُو الحِجَّةِ ، وَالمُحَرَّمُ ، وَرَجَبُ مُضَرَ ، الَّذِي بَيْنَ جُمَادَى وَشَعْبَانَ ، وَقَالَ أَيُّ شَهْرٍ هَذَا " ، فَقُلْنَا : اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ ، فَسَكَتَ حَتَّى ظَنَنَّا أَنَّهُ سَيُسَمِّيهِ بِغَيْرِ اسْمِهِ ، قَالَ : « أَلَيْسَ ذَا الحِجَّةِ » ، قُلْنَا : بَلَى ، قَالَ : « أَيُّ بَلَدٍ هَذَا » . قُلْنَا : اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ ، فَسَكَتَ حَتَّى ظَنَنَّا أَنَّهُ سَيُسَمِّيهِ بِغَيْرِ اسْمِهِ ، قَالَ : « أَلَيْسَ البَلْدَةَ » . قُلْنَا : بَلَى ، قَالَ : « فَأَيُّ يَوْمٍ هَذَا » . قُلْنَا : اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ ، فَسَكَتَ حَتَّى ظَنَنَّا أَنَّهُ سَيُسَمِّيهِ بِغَيْرِ اسْمِهِ ، قَالَ : « أَلَيْسَ يَوْمَ النَّحْرِ » . قُلْنَا : بَلَى ، قَالَ : " فَإِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ ، وَأَعْرَاضَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامٌ ، كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا ، فِي شَهْرِكُمْ هَذَا ، وَسَتَلْقَوْنَ رَبَّكُمْ ، فَيَسْأَلُكُمْ عَنْ أَعْمَالِكُمْ ، أَلاَ فَلاَ تَرْجِعُوا بَعْدِي ضُلَّالًا ، يَضْرِبُ بَعْضُكُمْ رِقَابَ بَعْضٍ ، أَلاَ أَلَا هَلْ بَلَّغْتُ؟ قَالُوْا نَعَمْ قَالَ اللَّهُمَّ اشْهَدْ فَلْيُبَلِّغِ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ ، فَرُبَّ مُبَلَّغٍ أَوْعَى مِنْ سَامِعٍ" (رواه البخارى ومسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর এ ভাষণের শুরু অংশে যমানা ও বছরের ঘুরেফিরে তার প্রাথমিক ও আসল অবস্থানে ফিরে আসার যে কথা বলা হয়েছে, এর অর্থ ও মর্ম বুঝার জন্য একথাটি জেনে নেওয়া জরুরী যে, জাহিলিয়্যাত যুগে আরববাসীদের একটি ভ্রান্ত নীতি এও ছিল যে, তারা নিজেদের বিশেষ স্বার্থে কখনো কখনো বছর তের মাসের বানিয়ে নিত এবং এর জন্য একটি মাসকে দু'বার গণনা করত। এর অনিবার্য ফল এই ছিল যে, মাসের হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণ ভুল ও বাস্তবতার বিপরীত হয়ে গিয়েছিল। এ জন্য হজ্ব-যা তাদের হিসাবে যিলহজ্বে অনুষ্ঠিত হত, আসলে যিলহজ্ব মাসে হত না। কিন্তু জাহিলিয়্যাতের দীর্ঘ কাল পরিক্রমার পর এমন হয়ে গেল যে, ঐসব আরববাসীদের হিসাবে উদাহরণত যা মুহাররম মাস ছিল, সেটাই প্রকৃত আসমানী হিসাবেও মুহাররম মাস ছিল। এভাবে তাদের হিসাব অনুযায়ী যা যিলহজ্ব মাস ছিল, সেটাই প্রকৃত আসমানী হিসাব অনুযায়ী যিলহজ্ব মাস ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর খুতবার শুরুতে একথাটিই বলেছেন এবং তিনি এভাবে বাতলে দিলেন যে, এই যে যিলহজ্ব মাস, যাতে এ হজ্ব আদায় হচ্ছে, এটা প্রকৃত আসমানী হিসাবেও যিলহজ্ব মাস, আর বছর বার মাসেই হয় এবং আগামীতে এ প্রকৃত ও আসল নিয়মই চলবে।

খুতবার শেষে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজ উম্মতকে বিশেষ ওসিয়ত ও দিকনির্দেশনা এই দিয়েছেন যে, তোমরা আমার পরে পরস্পর মারামারি-কাটাকাটি ও গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে যেয়ো না। যদি এমনটি হয়, তাহলে এটা হবে চরম গোমরাহীর কথা। এ ভাষণেরই কোন কোন বর্ণনায় " ضلالاً " এর স্থলে " کفارا " শব্দ এসেছে- যার অর্থ এই হবে যে, পরস্পর মারামারি ও গৃহযুদ্ধ ইসলামের উদ্দেশ্য ও এর প্রাণবস্তুর বিপরীত কাফেরসূলভ একটি রীতি। যদি উম্মত এতে লিপ্ত হয়ে যায়, তাহলে মনে করতে হবে যে, তারা ইসলামী নীতির স্থলে কাফেরসূলভ কর্মনীতি অবলম্বন করে নিয়েছে।

হুযুর (ﷺ) উম্মতকে এ সতর্কবাণী অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে শুনিয়েছিলেন। খুব সম্ভব এর কারণ এই ছিল যে, তিনি কোন না কোন পর্যায়ে একথা জানতে পেরেছিলেন যে, শয়তান এ উম্মতের বিভিন্ন শ্রেণীকে পরস্পর ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত করতে এবং এক দলকে অপর দলের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে অনেকটা সফল হবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মা'আরিফুল হাদীস - হাদীস নং ১৬৯ | মুসলিম বাংলা