মা'আরিফুল হাদীস

আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়

হাদীস নং: ৭১
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
এ পর্যন্ত যে সত্তরটি হাদীস লিখিত হয়েছে তা যিকরুল্লাহ এবং কুরআন মজীদ তিলাওয়াত সংক্রান্ত ছিল। তারপর আসছে ঐসব হাদীস, যেগুলোর সম্পর্ক দু'আর সাথে। তাতে এমন হাদীসও আছে, যাতে দু'আর মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে আবার এমন হাদীসও আছে, যেগুলোতে দু'আ সম্পর্কে নির্দেশনা রয়েছে। এমন হাদীসও আছে, যেগুলোতে হুযুর ﷺ আল্লাহর দরবারে যে সব দু'আ করেছেন, সেগুলো সংরক্ষিত করে পেশ করা হয়েছে, যা উম্মতের জন্যে তাঁর মহত্তম উত্তরাধিকার।
সর্বশেষে ইস্তিগফার ও দুরূদ শরীফ সংক্রান্ত হাদীসসমূহ সন্নিবেশিত করা হয়েছে।

দু'আ
আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে যে সমস্ত পূর্ণতা, কৃতিত্ব ও বৈশিষ্ট্য দানে ধন্য করেছেন, তন্মধ্যে সবচাইতে বড় বৈশিষ্ট্য ও পূর্ণতা হচ্ছে 'আবদিয়তে কামেলা' বা পূর্ণ আবদিয়তের মকাম।

আবদিয়ত কি? আল্লাহ তা'আলার দরবারে পরম বিনয় ও দীনতা, গোলামী, মাথা কুটা, অক্ষমতা ও মুখাপেক্ষিতার পরিপূর্ণ বহিঃ প্রকাশ এবং এ বিশ্বাস অন্তরে পোষণ করা যে, সবকিছু একমাত্র তাঁরই ক্ষমতা ও ইখাতিয়ারাধীন, তাঁর দ্বারের ফকীরী ও মিসকীনী এ সবের সমাহার হচ্ছে মাকামে আবদিয়াত। এটা হচ্ছে সকল মকামের উপরের মকাম। আর নিঃসন্দেহে হযরত মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ ﷺ এ গুলোর দিক থেকে আল্লাহ তা'আলার গোটা সৃষ্টি জাতের মধ্যে সবচাইতে কামিল এবং সবচাইতে ঊর্ধ্বে সমাসীন ব্যক্তিত্ব। আর এজন্যেই তিনি সৃষ্টির সেরা সবচাইতে গরিয়ান মহিয়ান পুরুষ।

নিয়ম হচ্ছে এই যে, প্রতিটি বস্তু তার উদ্দেশ্যের নিরিখে পূর্ণ বা অপূর্ণ বিবেচিত হয়ে থাকে। উদাহরণ স্বরূপ ঘোড়ার কথাই ধরা যাক, যে উদ্দেশ্যে তা সৃষ্টি করা হয়েছে, অর্থাৎ আরোহণ ও দ্রুতগমন, সেটা কতটা সফল বা সঠিক; তা এ নিরিখেই বিবেচিত হবে। অনুরূপ গাভী বা মহিষ এর লক্ষ্য হচ্ছে দুগ্ধদান। তার মূল্যমান এ নিরিখেই সাব্যস্ত হবে। অনুরূপ অন্য সব কিছু। মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য তার সৃষ্টিকর্তা নিজে বলে দিয়েছেন, তা হচ্ছে আবদিয়াত ও ইবাদত।

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُوْنَ .
(মানব ও জিন জাতিকে আমি কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।)

তাই সর্বাধিক পূর্ণ ও উচ্চমর্যাদার অধিকারী হবেন তিনিই, যিনি এ ব্যাপারে সবচাইতে পূর্ণতা ও কৃতিত্বের অধিকারী। সুতরাং সাইয়িদিনা হযরত মুহাম্মদ ﷺ যেহেতু আবদিয়াতের পূর্ণতায় সবার শীর্ষ স্থানীয়, তাই সমস্ত সৃষ্ট জগতের মধ্যে তিনি সেরা ও সর্বাধিক মর্যাদা সম্পন্ন। এ জন্যেই কুরআন শরীফের যেখানে যেখানে তাঁর বৈশিষ্ট্য ও কামালাত এবং তাঁর প্রতি আল্লাহ তা'আলার খাস খাস ইনামের উল্লেখ করা হয়েছে, সে সব স্থানে সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী হিসাবে তাঁকে আবদ অভিধায় অভিহিত করা হয়েছে। মি'রাজ প্রসঙ্গে সূরা ইসরায় বলা হয়েছে:

سُبْحَانَ الَّذِيْ أَسْرٰى بِعَبْدِهِ .......

তার ঐ মি'রাজেরই শেষ পর্যায়ের বর্ণনা প্রসঙ্গে সূরা নজমে বলা হয়েছে:

تَبَارَكَ الَّذِيْ نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلٰى عَبْدِهِ

সূরা কাহফে আছেঃ

اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِيْ أَنْزَلَ عَلٰى عَبْدِهِ الْكِتَابَ

মোদ্দা কথা, বান্দার মকামসমূহের মধ্যে আবদিয়াতের মকাম হচ্ছে সবার উপরে। হযরত মুহাম্মাদ ﷺ হচ্ছেন এ মকামের ইমাম। অর্থাৎ বিশেষ গুণে গুণান্বিত সকলের মধ্যে তিনি রয়েছেন সর্বাগ্রে। আর দু'আ যেহেতু আবদিয়তেরই মণি ও বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ; তাই আল্লাহর তা'আলার দরবারে দু'আর সময় (যদি প্রকৃতই তা দু'আ হয়) বান্দার যাহির ও বাতিন আবদিয়াতের মধ্যে নিমজ্জমান থাকে। এজন্যে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সমস্ত হাল ও সিফাতের মধ্যে সবচাইতে প্রবল হাল ও সিফাত হচ্ছে দু'আর হাল ও সিফাত আর উম্মত তাঁর মাধ্যমে আধ্যাত্মিক সম্পদের যে বিশাল ও বহুমূল্য ভাণ্ডার লাভ করেছে তন্মধ্যে সর্বাধিক মূল্যবান ভাণ্ডার হচ্ছে এ দু'আর ভাণ্ডার যা বিভিন্ন সময় ও প্রেক্ষিতে তিনি তাঁর মাওলার দরবারে করেছেন; অথবা যার শিক্ষা তিনি তাঁর উম্মতকে দিয়েছেন।

এর মধ্যে কিছু দু'আ এমন, যা কোন বিশেষ অবস্থা, প্রেক্ষিত ও বিশেষ উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনের সাথে সম্পৃক্ত আর অধিকাংশ দু'আগুলোর মূল্যমান ও ফায়দার একটি বাস্তব দিক হচ্ছে এই যে, এগুলোর দ্বারা দু'আর নিয়ম-পদ্ধতি জানা যায় এবং এ ব্যাপারে এমনি নির্দেশনা পাওয়া যায় যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এর অপর ইলমী ও আধ্যাত্মিক দিক হচ্ছে এই যে, এগুলোর দ্বারা আঁচ করা যায় যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রূহে পাক আল্লাহ তা'আলার সাথে কত ঘনিষ্ঠভাবে নিবিষ্ট ছিল এবং সে সম্পর্ক কত সার্বক্ষণিক ও অন্তরঙ্গ ছিল। তাঁর অন্তরকে আল্লাহ তা'আলার জালাল ও জামাল যে কী পরিমাণ আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, নিজের এবং গোটা বিশ্বের দীনতা-হীনতা এবং মালিকুল মুলকের কুদরতে কামেলা এবং সর্বব্যাপী রহমত এবং তাঁর রবুবিয়াতের প্রতি তাঁর প্রত্যয় যে কত দৃঢ় ছিল, তা ফুটে উঠেছে এসব দু'আর মধ্যে, যেন এটা তাঁর গায়েব নয়- প্রত্যক্ষ দর্শন। হাদীস ভাণ্ডারে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যে শত শত দু'আ সংরক্ষিত রয়েছে, তাতে একটু গভীর ভাবে দৃষ্টিপাত ও মনোনিবেশ করলে দেখা যাবে এ দু'আ গুলোর প্রত্যেকটিই মারিফতে ইলাহীর এক একটি স্মারক স্তম্ভ এবং তাঁর রূহানী কামালিয়তে আল্লাহর সাথে তার নিবিড় অন্তরঙ্গতার প্রমাণবহ। এদিক থেকে দেখলে তাঁর প্রতিটি দু'আ একা একটি মু'জিযা স্বরূপ। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওআলা আলিহি ও বারিক ও সাল্লিম।

এ দীন লেখকের একটা নিয়ম হচ্ছে, যখন কোন শিক্ষিত অমুসলিম ভদ্রলোকের কাছে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পরিচিতি তুলে ধরার সুযোগ হয়, তখন আমি তাঁর কয়েকটি দু'আ অবশ্যই তাঁকে শুনিয়ে দেই। শতকরা প্রায় একশ ভাগ ক্ষেত্রেই এ ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে ঐ শ্রেণীর ভদ্রলোকেরা সবচাইতে বেশি প্রভাবান্বিত হন এই দু'আ দ্বারা। আল্লাহকে চেনার ও তাঁর সাথে নিবিড় সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি যে এক সফল পুরুষ, এ ব্যাপারে তারপর তাদের কোন সন্দেহ থাকে না।

এ ভূমিকার পর এমন কয়েকখানি হাদীস পাঠ করুন, যে গুলোতে রাসূলুল্লাহ ﷺ দু'আ করার প্রতি উৎসহ দিয়েছেন এবং এগুলোর বরকত বয়ান করেছেন, দু'আর আদব বর্ণনা করেছেন অথবা এ ব্যাপারে কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। তারপর এক বিশেষ তরতীব অনুসারে সে সব হাদীস লিখিত হবে, যেগুলোতে সে সব দু'আর উল্লেখ রয়েছে, যা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রেক্ষিতে তিনি আল্লাহ তা'আলার দরবারে পেশ করেছেন অথবা উম্মতকে তিনি যেগুলোর শিক্ষা দিয়েছেন।

দু'আর মর্যাদা ও মাহাত্ম্য
৭১. হযরত নু'মান ইব্‌ন বশীর (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, দু'আ নিজেই ইবাদত। তারপর তিনি এর সনদ স্বরূপ আয়াতখানা তিলাওয়াত করলেন: وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِيْ الخ
(তোমাদের প্রতি পালকের ফরমান: তোমরা আমার কাছে দু'আ ও যাচ্ঞা প্রার্থনা কর, আমি কবূল করবো এবং দান করবো। যারা আমার ইবাদত থেকে দম্ভভরে মুখ ফিরিয়ে নেবে তাদেরকে লাঞ্ছিত-অপদস্থ হয়ে অচিরেই জাহান্নামে যেতে হবে।) -(মুসনাদে আহমদ, তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজা)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ» ، ثُمَّ قَرَأَ: {وَقَالَ رَبُّكُمْ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ} (رواه احمد والترمذى وابوداؤد والنسائى وابن ماجه)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আসল হাদীস কেবল এতটুকু, দু'আ নিজেই ইবাদত। সম্ভবত হুযুর ﷺ-এর এ বাণীর অভীষ্ট লক্ষ্য হচ্ছে এই যে, কেউ যেন এরূপ না ভাবে যে, বান্দা যেমন তার যরূরত বা প্রয়োজন পূরণ করার জন্যে অন্য দশটা চেষ্টা-তদবীর করে থাকে, দু'আও সেরূপ একটা চেষ্টা মাত্র। সে তার চেষ্টার ফল পেয়ে গেল। আর যদি কবুল না হয় তা হলে তার সে চেষ্টা বিফলে গেল। বরং দু'আ হচ্ছে সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন ধাচের ব্যাপার। আর তা হচ্ছে তা উদ্দেশ্য সিদ্ধির একটি উসীলা বা মাধ্যম হওয়া সত্ত্বেও নিজেও একটি ইবাদত। আর এ হিসাবে তা তার একটি পবিত্র আমলও বটে যার ফল সে অবশ্যই আখিরাতে লাভ করবে।

যে আয়াতখানা তিনি সনদ স্বরূপ তিলাওয়াত করছেন তার দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ নিজেই ইবাদত। পরবর্তী হাদীসে দু'আকে ইবাদতের মগজ বা সার নির্যাস স্বরূপ বলা হয়েছে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান