মা'আরিফুল হাদীস

আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়

হাদীস নং: ১০৩
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দু'আসমূহ
দু'আ সম্পর্কে যে সমস্ত হাদীস এ পর্যন্ত আলোচিত বা উল্লেখিত হয়েছে সেগুলোতে হয় দু'আ সম্পর্কে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে অথবা দু'আর মাহাত্ম্য ও বরকতসমূহের বর্ণনা রয়েছে, অথবা দু'আর আদব এবং এ সংক্রান্ত হিদায়াত এবং কবুলিয়তের আনুসঙ্গিক ব্যাপারাদি বর্ণনা করা হয়েছে। এগুলো ছিল উপক্রমনিকাস্বরূপ। এবার রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আসল দু'আসমূহ এবং তাঁর অন্তরের আকৃতি ভরা সেই সব মুনাজাত যা তিনি তাঁর প্রভুর দরবারে করেছেন এবং যা তাঁর মা'রিফতের মাকাম এবং হৃদয়-মনের অবস্থা আঁচ করার সম্ভাব্য সর্বোত্তম ওসীলাস্বরূপ এবং উম্মতের জন্যে এটা তাঁর মহোত্তম উত্তরাধিকার স্বরূপ। এগুলোকে হাদীস ভাণ্ডারের চিরহরিৎ ডালিস্বরূপ বললে মোটেই অত্যুক্তি হবে না। নবী করীম ﷺ-এর এ দু'আসমূহকে তিন অংশে ভাগ করা যায়।

প্রথমত ঐসমস্ত দু'আ, যা কোন বিশেষ দিনক্ষণের জন্যে খাস। যেমন ঊষালগ্নের দু'আ, সান্ধ্যকালীন দু'আ, শয়নকালীন দু'আ, গাত্রোত্থানকালীন দু'আ, ঝড়ঝঞ্ঝা বা বর্ষণকালীন দু'আ, বিপদাপদ বা উৎকণ্ঠাকালীন দু'আ ইত্যাদি ইত্যাদি।

দ্বিতীয়ত ঐসব দু'আ যা সাধারণভাবে পঠিতব্য, কোন বিশেষ দিন-ক্ষণের সাথে সেগুলোর কোন সম্পর্ক নেই। এগুলো সাধারণত অত্যন্ত ব্যাপক অর্থবোধক হয়ে থাকে।

তৃতীয়ত ঐসব দু'আ, যা নবী করীম ﷺ সালাতে বা সালাত থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে অর্থাৎ সালাতের সালাম ফিরানোর পর আল্লাহর দরবারে করতেন। এখানে এই তৃতীয়োক্ত ধরনের অর্থাৎ সালাত সংশ্লিষ্ট দু'আগুলো সর্বপ্রথম লিখিত হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলা রাসূলে মকবুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ও সাল্লামের এ মহামূল্যবান ও মাহাত্ম্যপূর্ণ উত্তরাধিকারের যথাযোগ্য মর্যাদা দান এবং এগুলো থেকে যথাযথভাবে উপকৃত হওয়ার পূর্ণ তাওফীক আমাদেরকে দান করুন।

সালাতে এবং সালাতের পর পড়ার দু'আসমূহ

তাকবীরে তাহরীমার পরের প্রারম্ভিক দু'আ
১০৩. হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সালাত শুরু করতেন তখন সর্বপ্রথম তাকবীর (মানে আল্লাহু আকবার) বলতেন (যাকে তাকবীরে তাহরীমা বলা হয়ে থাকে।) তার পর আল্লাহ তা'আলার দরবারে এরূপ আরয করতেন:

إِنَّ صَلٰوتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِيْ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِينَ لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَالِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِيْنَ اللّٰهُمَّ اهْدِنِي لَأَحْسَنِ الْأَعْمَالِ وَالْأَخْلَاقِ لَا يَهْدِيْ لِأَحْسَنِهَا إِلَّا أَنْتَ وَقَنِيْ سَيِّئَ الْأَعْمَالِ وَسَيِّئَ الْأَخْلَاقِ وَلَا يَقِيْ سَيِّئَهَا إِلَّا أَنْتَ.

নিঃসন্দেহে আমার সালাত (নামায) আমার ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ আল্লাহ্ রাব্বুল 'আলামীনের জন্যে উৎসর্গীকৃত। যাঁর কোন শরীক নেই। আর আমি এরই জন্যে নির্দেশিত আর আমি সর্বপ্রথম তাঁরই আনুগত্যকারী। হে আল্লাহ! আমাকে সর্বোত্তম আমল ও আখলাকের হিদায়াত দান কর। আর সর্বোত্তম আমল ও আখলাকের হিদায়াত তুমি ছাড়া আর কেউই দিতে পারেনা। আর আমাকে তুমি মন্দ আমল ও আখলাক থেকে রক্ষা কর আর মন্দ আমল ও আখলাক থেকে হিফাযত করতে পার একমাত্র তুমিই। -(সুনানে নাসায়ী)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ جَابِرٍ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا اسْتَفْتَحَ الصَّلَاةَ كَبَّرَ، ثُمَّ قَالَ: «إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ. اَللَّهُمَّ اهْدِنِي لِأَحْسَنِ الْأَعْمَالِ وَأَحْسَنِ الْأَخْلَاقِ لَا يَهْدِي لِأَحْسَنِهَا إِلَّا أَنْتَ، وَقِنِي سَيِّئَ الْأَعْمَالِ وَسَيِّئَ الْأَخْلَاقِ لَا يَقِي سَيِّئَهَا إِلَّا أَنْتَ» (رواه النسائى)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ দু'আর সূচনাতেই যথোচিতভাবে আল্লাহর একত্বের সাক্ষ্যের সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলার দরবারে নিজের দাসত্ব ও কাকুতি-মিনতি এবং একান্ত আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার একরার-অঙ্গীকার ও অভিব্যক্তি রয়েছে। সর্বশেষে আল্লাহ তা'আলার নিকট উত্তম আমল-আখলাকের হিদায়াতের তাওফীক এবং মন্দ আমল-আখলাক থেকে হিফাযতের প্রার্থনা রয়েছে। আসলে এই হিদায়াত ও হিফাযতের মধ্যেই মানুষের সৌভাগ্য ও সাফল্যের সবকিছু নির্ভর করে।

মা'আরিফুল হাদীস তৃতীয় খণ্ডের (মূল উর্দু কিতাবের) ৩২৬-৩৪০ পৃষ্ঠায় হযরত আলী (রা) বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীস সহীহ্ মুসলিম এর বরাতে বর্ণিত হয়েছে। তাতে তাকবীরে তাহরীমার পর এই উদ্বোধনী দু'আটি বিস্তৃততর আকারে উল্লেখিত হয়েছে। আর সে বর্ধিত অংশগুলো অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। এছাড়া তাতে উদ্বোধনী দু'আ ছাড়াও রুকু, কাওমা, সাজদা, জালসা এবং শেষ বৈঠকের খাস খাস দু'আসমূহও উল্লেখিত হয়েছে। নিঃসন্দেহে সালাতের দু'আসমূহের এটি একখানা দীর্ঘ ও ব্যাপক হাদীস। তার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে এ কথাও বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এ জাতীয় দু'আসমূহ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি রাতের বেলা নফল সালাতে পড়তেন। হযরত আলী (রা) এ হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সালাতের যে দু'আসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন, তাতে তাঁর সালাত-কালীন বাতেনী হালতের প্রতিচ্ছবি যতদূর প্রত্যক্ষ করা সম্ভব, তা প্রত্যক্ষ করা যায়। হাদীসখানা অতি দীর্ঘ হওয়ায় এখানে তার পুনরুক্তি করা গেল না। উৎসাহী পাঠকগণ মা'আরিফুল হাদীসের তৃতীয় খণ্ডে তা পাঠ করে নেবেন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান