মা'আরিফুল হাদীস

আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়

হাদীস নং: ১২০
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
তাহাজ্জুদের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর একটি ব্যাপক অর্থবোধক দু'আ
১২০. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। একদা আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে তাহাজ্জুদের সালাত অন্তে নিম্নরূপ দু'আ করতে শুনতে পেলাম: "হে আল্লাহ! আমি তোমার দরবারে এমন রহমত প্রার্থনা করছি, যদ্বারা আমার হৃদয়কে তোমার হিদায়াত লাভে ধন্য করবে এবং এর দ্বারা আমার সকল ব্যাপার স্যাপারকে সুবিন্যস্ত করবে। এর দ্বারা আমার সকল বিশৃঙ্খলা দূর করবে আমার অসাক্ষাতের সকল ব্যাপার ঠিকঠাক করবে এবং এর রহমতের দ্বারা আমার সাক্ষাতের সকল ব্যাপারকে সমুন্নত করবে। এ রহমতের দ্বারা আমার আমলকে পবিত্র করবে এবং এর দ্বারা আমার অন্তরে আমার জন্যে যা যথার্থ তাই প্রতিভাত করবে এবং এর দ্বারা তুমি আমাকে সকল অনিষ্ট থেকে হিফাযত করবে। হে আল্লাহ! আমাকে এমন ঈমান-একীন দান কর, যার পর কুফরী নেই। এবং এমন রহমত দানে আমাকে ধন্য কর, যদ্বারা আমি দুনিয়া ও আখিরাতের মর্যাদা লাভে সমর্থ হই। হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি ভাগ্যনির্ধারিত সৌভাগ্য ও শহীদদের মর্যাদা, পুণ্যবানদের জীবন এবং শক্রদের বিরুদ্ধে বিজয়।

হে আল্লাহ! আমার প্রয়োজনাদি ও অভাব-অনটন নিয়ে আমি তোমার দরবারে হাযির, যদিও বা আমার বুদ্ধি-বিবেচনা অপর্যাপ্ত এবং আমল ও প্রচেষ্টা দুর্বল। আমি তোমার রহমতের ভিখারী, সুতরাং হে সর্ব ব্যাপারের ফয়সালাকারী এবং অন্তরসমূহের ব্যাধিহারী প্রভু পরোয়ারদিগার! যেভাবে তুমি তোমার কুদরতের দ্বারা একই সাথে প্রবাহিত সমুদ্রের শ্রোত ধারাকে পৃথক পৃথক করে দাও (মিঠা পানি ও লোনা পানি একত্রে মিশ্রিত হয় না।) তেমনি আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে পৃথক রাখ, যা দৃষ্টে মানুষ মৃত্যুকে আহ্বান করবে এবং অনুরূপ কবরের বিপর্যয় থেকে তুমি আমাকে রক্ষা কর! হে আল্লাহ! আমার বুদ্ধি-বিবেচনার যা অতীত এবং আমি যার নিয়ত বা কল্পনাও করতে পারি না, আর প্রার্থনাও যে পর্যন্ত পৌঁছেনি, এমন মঙ্গল যার ওয়াদা তুমি তোমার সৃষ্টির মধ্যকার কারো সাথে করেছো অথবা এমন মঙ্গল যা তুমি তোমার কোন না কোন বান্দাকে দান করেছো, তোমার রহমতের দোহাই, আমি তা-ই তোমার কাছে কামনা-প্রার্থনা করছি হে রাব্বুল আলামীন।

হে সুদৃঢ় সম্পর্কের অধিকারী এবং প্রতিটি ব্যাপারে যথার্থ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী আল্লাহ! কঠোর হুঁশিয়ারী দিবস অর্থাৎ কিয়ামতের দিনের নিরাপত্তা আমি তোমার দরবারে প্রার্থনা করছি এবং প্রার্থনা করছি স্থায়িত্বের দিন তথা কিয়ামতের দিনে জান্নাতের ফয়সালা আমার জন্যে কর। তোমার সেই সব নৈকট্যপ্রাপ্ত ও সর্বদা তোমার হুযুরে হাযির বান্দাদের সাথে যারা রুকু-সাজদাকারী ও প্রতিশ্রুতি পূর্ণকারী। নিঃসন্দেহে তুমি পরম দয়ালু ও প্রেমময়।

তুমি যা ইচ্ছে কর তাই করতে পার। এমন প্রচণ্ড শক্তির তুমি অধিকারী হে আল্লাহ! আমাদেরকে অন্যেদের হিদায়াতের কারণ এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত করে দাও, আমরা যেন নিজেরা বিভ্রান্ত এবং অন্যদেরকে বিভ্রান্তকারী না হই। তোমার বন্ধুদের প্রতি বন্ধু ভাবাপন্ন এবং তোমার শত্রুদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হই। তোমাকে ভালবাসার দরুন তোমার প্রিয়জনের প্রতি যেন অন্তরে ভালবাসা পোষণ করি এবং তোমার বিরুদ্ধাচারীদের প্রতি তোমার প্রতি তারা বিদ্বেষভাবাপন্ন বলে আমরাও তাদের প্রতি বিদ্বিষ্ট হই।

হে আল্লাহ! এই আমার দু'আ আর কবুল করা হচ্ছে তোমার কাজ। এই আমার যৎকিঞ্চিৎ প্রচেষ্টা আর ভরসা তোমারই উপর। হে আল্লাহ! আমার হৃদয়কে জ্যোতির্ময় করে দাও! আমার কবরে নূর দান কর! আমার সম্মুখে নূর দান কর। আমার পেছনে নূর দান কর। আমার ডানে নূর দান কর। আমার বামে নূর দান কর। আমার উপরে নূর দান কর। আমার নীচে নূর সৃষ্টি কর। আমার কানে নূর সৃষ্টি কর। আমার চোখে নূর দাও। আমার চুলে চুলে নূর দাও। আমার চর্মে নূর দাও। আমার গোশতে নূর দাও!। আমার রক্তে নূর দান কর! আমার অস্থিতে নূর দান কর! আমার নূরকে তুমি বৃদ্ধি করে দাও। আমাকে নূর দান কর এবং নূরকে আমার চিরসঙ্গী করে দাও। পাক পবিত্র সেই সত্তা, যিনি ইযযত ও সম্ভ্রমের চাদরে নিজেকে আবৃত করেছেন। পাক-পবিত্র সেই সত্তা, যিনি সম্ভ্রম ও মর্যাদার পোশাক পরিধান করেছেন। পাক-পবিত্র সেই সত্তা, যিনি প্রবল প্রতাপ ও সম্মানের অধিকারী। (তিরমিযী)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ لَيْلَةً حِينَ فَرَغَ مِنْ صَلاَتِهِ: اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ رَحْمَةً مِنْ عِنْدِكَ تَهْدِي بِهَا قَلْبِي، وَتَجْمَعُ بِهَا أَمْرِي، وَتَلُمُّ بِهَا شَعَثِي، وَتُصْلِحُ بِهَا غَائِبِي، وَتَرْفَعُ بِهَا شَاهِدِي، وَتُزَكِّي بِهَا عَمَلِي، وَتُلْهِمُنِي بِهَا رُشْدِي، وَتَرُدُّ بِهَا أُلْفَتِي، وَتَعْصِمُنِي بِهَا مِنْ كُلِّ سُوءٍ، اللَّهُمَّ أَعْطِنِي إِيمَانًا وَيَقِينًا لَيْسَ بَعْدَهُ كُفْرٌ، وَرَحْمَةً أَنَالُ بِهَا شَرَفَ كَرَامَتِكَ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الفَوْزَ فِي الْقَضَاءِ، وَنُزُلَ الشُّهَدَاءِ، وَعَيْشَ السُّعَدَاءِ، وَالنَّصْرَ عَلَى الأَعْدَاءِ، اللَّهُمَّ إِنِّي أُنْزِلُ بِكَ حَاجَتِي، وَإِنْ قَصُرَ رَأْيِي وَضَعُفَ عَمَلِي، افْتَقَرْتُ إِلَى رَحْمَتِكَ، فَأَسْأَلُكَ يَا قَاضِيَ الأُمُورِ، وَيَا شَافِيَ الصُّدُورِ، كَمَا تُجِيرُ بَيْنَ البُحُورِ أَنْ تُجِيرَنِي مِنْ عَذَابِ السَّعِيرِ، وَمِنْ دَعْوَةِ الثُّبُورِ، وَمِنْ فِتْنَةِ القُبُورِ، اللَّهُمَّ مَا قَصُرَ عَنْهُ رَأْيِي، وَلَمْ تَبْلُغْهُ نِيَّتِي، وَلَمْ تَبْلُغْهُ مَسْأَلَتِي مِنْ خَيْرٍ وَعَدْتَهُ أَحَدًا مِنْ خَلْقِكَ، أَوْ خَيْرٍ أَنْتَ مُعْطِيهِ أَحَدًا مِنْ عِبَادِكَ، فَإِنِّي أَرْغَبُ إِلَيْكَ فِيهِ، وَأَسْأَلُكَهُ بِرَحْمَتِكَ رَبَّ العَالَمِينَ، اللَّهُمَّ ذَا الحَبْلِ الشَّدِيدِ، وَالأَمْرِ الرَّشِيدِ، أَسْأَلُكَ الأَمْنَ يَوْمَ الوَعِيدِ، وَالجَنَّةَ يَوْمَ الخُلُودِ، مَعَ الْمُقَرَّبِينَ الشُّهُودِ الرُّكَّعِ، السُّجُودِ الْمُوفِينَ بِالعُهُودِ، إِنَّكَ رَحِيمٌ وَدُودٌ، وإِنَّكَ تَفْعَلُ مَا تُرِيدُ، اللَّهُمَّ اجْعَلْنَا هَادِينَ مُهْتَدِينَ، غَيْرَ ضَالِّينَ وَلاَ مُضِلِّينَ، سِلْمًا لأَوْلِيَائِكَ، وَعَدُوًّا لأَعْدَائِكَ، نُحِبُّ بِحُبِّكَ مَنْ أَحَبَّكَ، وَنُعَادِي بِعَدَاوَتِكَ مَنْ خَالَفَكَ، اللَّهُمَّ هَذَا الدُّعَاءُ وَعَلَيْكَ الإِجَابَةُ، وَهَذَا الجُهْدُ وَعَلَيْكَ التُّكْلاَنُ، اللَّهُمَّ اجْعَلْ لِي نُورًا فِي قَلْبِي، وَنُورًا فِي قَبْرِي، وَنُورًا مِنْ بَيْنِ يَدَيَّ، وَنُورًا مِنْ خَلْفِي، وَنُورًا عَنْ يَمِينِي، وَنُورًا عَنْ شِمَالِي، وَنُورًا مِنْ فَوْقِي، وَنُورًا مِنْ تَحْتِي، وَنُورًا فِي سَمْعِي، وَنُورًا فِي بَصَرِي، وَنُورًا فِي شَعْرِي، وَنُورًا فِي بَشَرِي، وَنُورًا فِي لَحْمِي، وَنُورًا فِي دَمِي، وَنُورًا فِي عِظَامِي، اللَّهُمَّ أَعْظِمْ لِي نُورًا، وَأَعْطِنِي نُورًا، وَاجْعَلْ لِي نُورًا، سُبْحَانَ الَّذِي تَعَطَّفَ العِزَّ وَقَالَ بِهِ، سُبْحَانَ الَّذِي لَبِسَ الْمَجْدَ وَتَكَرَّمَ بِهِ، سُبْحَانَ الَّذِي لاَ يَنْبَغِي التَّسْبِيحُ إِلاَّ لَهُ، سُبْحَانَ ذِي الفَضْلِ وَالنِّعَمِ، سُبْحَانَ ذِي الْمَجْدِ وَالكَرَمِ، سُبْحَانَ ذِي الجَلاَلِ وَالإِكْرَامِ. (رواه الترمذى)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

সুবহানাল্লাহ! কত উচ্চ মার্গের এবং কতই না ব্যাপক অর্থপূর্ণ এ দু'আটি! (ইতিপূর্বে উল্লেখিত দু'আগুলির দ্বারাও) এ দু'আটি থেকে আন্দাজ করা চলে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর বিচিত্র শান ও তার গুণাবলী সম্পর্কে কী গভীর মা'রিফাত ও ইলমের অধিকারী ছিলেন! বান্দার সবচাইতে বড় শান আবদিয়তের কী উচ্চ মার্গে তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন, তার কিছুটা আঁচ করা যায় এ থেকে। বিশ্বজাহানের সাইয়েদ বা নেতা ও রাব্বুল আলামীনের সর্বাধিক প্রিয়ভাজন হওয়া সত্ত্বেও তিনি যে তার রহমতের কতটুকু কাঙাল নিজেকে মনে করতেন, তারও পূর্ণ অভিব্যক্তি ঘটেছে এ দু'আসমূহে। কী অপূর্ব বিনয় ও দীনতা সহকারে তিনি দু'আ করতেন, দু'আর সময় তাঁর অন্তরে কী গভীর আকুতি থাকতো এবং আল্লাহ তা'আলা মানবীয় প্রয়োজনের কী গভীর অনুভূতি তার অন্তরে প্রদান করেছিলেন, এ দু'আসমূহে তার অভিব্যক্তি ঘটেছে।

আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের প্রতি যেরূপ দয়াময়, প্রেমময় ও বদান্যশীল, সেদিকে লক্ষ্য রেখে এটাও অনুমান করা যায় যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এসব দু'আর প্রতিটি বাক্যের দ্বারা তাঁর রহমতের দরিয়ায় কিরূপ ঢেউ খেলে থাকবে এবং তাঁর কাছে তা কতই না প্রিয়বোধ হয়ে থাকবে।

ইতিপূর্বেই বলা হয়েছে, হুযুর ﷺ-এর এ দু'আগুলো হচ্ছে তাঁর মহত্তম উত্তরাধিকার। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে এ মহান উত্তরাধিকারের মূল্যমান অনুধাবন করে এর পূর্ণ অংশ লাভের তাওফীক দান করুন!
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান