মা'আরিফুল হাদীস
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
হাদীস নং: ১৬৬
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
সফরে গমন ও প্রত্যাগমনকালীন দু'আ সমূহ
দেশ থেকে যারা প্রবাসে যায়, পদে পদে তাদের সম্মুখে থাকে নানা সঙ্কট, নানা সম্ভাবনা। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাই সফরে যাত্রাকালীন দু'আ-কালাম শিক্ষা দিয়েছেন, যা মানুষের আল্লাহর দরবারে নিবেদন করা উচিত। সাথে সাথে সফর যাত্রীর স্মরণ করা উচিত সেই মহা সফরের কথা, যা একদিন পরকালের দিকে তাকে অবশ্যই করতে হবে, যাতে করে সেই নিশ্চিত সফরের প্রস্তুতি গ্রহণে সে গাফলতি না করে।
দেশ থেকে যারা প্রবাসে যায়, পদে পদে তাদের সম্মুখে থাকে নানা সঙ্কট, নানা সম্ভাবনা। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাই সফরে যাত্রাকালীন দু'আ-কালাম শিক্ষা দিয়েছেন, যা মানুষের আল্লাহর দরবারে নিবেদন করা উচিত। সাথে সাথে সফর যাত্রীর স্মরণ করা উচিত সেই মহা সফরের কথা, যা একদিন পরকালের দিকে তাকে অবশ্যই করতে হবে, যাতে করে সেই নিশ্চিত সফরের প্রস্তুতি গ্রহণে সে গাফলতি না করে।
১৬৬. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চিরাচরিত অভ্যাস ছিল, তিনি যখন সফরে যাত্রা করতেন, তখন তাঁর উটের উপর আরোহণ করেই তিনি প্রথমে তিনবার 'আল্লাহু আকবার' বলতেন, তারপর এরূপ দু'আ করতেন:
سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ . اَللّٰهُمَّ إِنَّا نَسْئَلُكَ فِي سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى وَمِنَ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى اَللّٰهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا وَأَطْوِ لَنَا بُعْدَهُ اَللّٰهُمَّ اَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ فِي الْأَهْلِ اَللّٰهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ وَكَآبَةِ الْمَنْظَرِ وَسُوءِ الْمُنْقَلَبِ فِي الْأَهْلِ وَالْمَالِ
"পবিত্র সেই মহান সত্তা, যিনি আমাদের এ বাহনকে আমাদের জন্যে বশীভূত করে দিয়েছেন অথচ আমাদের কোন ক্ষমতা ছিল না যে, আমরা তাকে বশীভূত ও নিয়ন্ত্রণাধীন করি।
آئِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ
এবং শেষ পর্যন্ত আমরা আমাদের প্রতিপালকের দিকেই প্রত্যাবর্তিত হবো। হে আল্লাহ! আমাদের এ সফরে আমরা তোমার কাছে মঙ্গল ও তাকওয়া প্রার্থনা করছি। আর এমন আমল প্রার্থনা করছি, যাতে তুমি সন্তুষ্ট থাক। হে আল্লাহ! আমাদের এ সফরকে তুমি সহজসাধ্য করে দাও! তার দূরত্বকে তুমি তোমার কুদরতের দ্বারা সঙ্কুচিত করে দাও। হে আল্লাহ! সফরে তুমিই সাথী এবং আমাদের অনুপস্থিতিতে তুমিই আমাদের বাড়িঘরের তত্ত্বাবধান ও হিফাযতকারী (এ ব্যাপারেও আমাদের ভরসাস্থল একমাত্র তুমিই।) হে আল্লাহ! তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি সফরের কষ্ট ও অবসাদ থেকে এবং সফরে বিভীষিকাপূর্ণ দৃশ্য দর্শন থেকে এবং সফর থেকে ফিরে পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদের ক্ষতি দর্শন থেকে।" আর তিনি যখন সফর থেকে ফিরে আসতেন, তখনো আল্লাহর দরবারে এ দু'আটি করতেন এবং তার সাথে আরো বলতেন: "আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, আমরা তওবাকারী, আল্লাহর ইবাদতকারী বান্দা এবং আমাদের প্রতিপালকের আমরা প্রশংসা ও স্তব-স্তুতিকারী।”
-(সহীহ মুসলিম)
سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ . اَللّٰهُمَّ إِنَّا نَسْئَلُكَ فِي سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى وَمِنَ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى اَللّٰهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا وَأَطْوِ لَنَا بُعْدَهُ اَللّٰهُمَّ اَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ فِي الْأَهْلِ اَللّٰهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ وَكَآبَةِ الْمَنْظَرِ وَسُوءِ الْمُنْقَلَبِ فِي الْأَهْلِ وَالْمَالِ
"পবিত্র সেই মহান সত্তা, যিনি আমাদের এ বাহনকে আমাদের জন্যে বশীভূত করে দিয়েছেন অথচ আমাদের কোন ক্ষমতা ছিল না যে, আমরা তাকে বশীভূত ও নিয়ন্ত্রণাধীন করি।
آئِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ
এবং শেষ পর্যন্ত আমরা আমাদের প্রতিপালকের দিকেই প্রত্যাবর্তিত হবো। হে আল্লাহ! আমাদের এ সফরে আমরা তোমার কাছে মঙ্গল ও তাকওয়া প্রার্থনা করছি। আর এমন আমল প্রার্থনা করছি, যাতে তুমি সন্তুষ্ট থাক। হে আল্লাহ! আমাদের এ সফরকে তুমি সহজসাধ্য করে দাও! তার দূরত্বকে তুমি তোমার কুদরতের দ্বারা সঙ্কুচিত করে দাও। হে আল্লাহ! সফরে তুমিই সাথী এবং আমাদের অনুপস্থিতিতে তুমিই আমাদের বাড়িঘরের তত্ত্বাবধান ও হিফাযতকারী (এ ব্যাপারেও আমাদের ভরসাস্থল একমাত্র তুমিই।) হে আল্লাহ! তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি সফরের কষ্ট ও অবসাদ থেকে এবং সফরে বিভীষিকাপূর্ণ দৃশ্য দর্শন থেকে এবং সফর থেকে ফিরে পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদের ক্ষতি দর্শন থেকে।" আর তিনি যখন সফর থেকে ফিরে আসতেন, তখনো আল্লাহর দরবারে এ দু'আটি করতেন এবং তার সাথে আরো বলতেন: "আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, আমরা তওবাকারী, আল্লাহর ইবাদতকারী বান্দা এবং আমাদের প্রতিপালকের আমরা প্রশংসা ও স্তব-স্তুতিকারী।”
-(সহীহ মুসলিম)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ إِذَا اسْتَوَى عَلَى بَعِيرِهِ خَارِجًا إِلَى سَفَرٍ، كَبَّرَ ثَلَاثًا، ثُمَّ قَالَ: «سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا، وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ، وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ، اللهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ فِي سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى، وَمِنَ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى، اللهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا، وَاطْوِ عَنَّا بُعْدَهُ، اللهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ، وَالْخَلِيفَةُ فِي الْأَهْلِ، اللهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ، وَكَآبَةِ الْمَنْظَرِ، وَسُوءِ الْمُنْقَلَبِ فِي الْمَالِ وَالْأَهْلِ»، وَإِذَا رَجَعَ قَالَهُنَّ وَزَادَ فِيهِنَّ: «آيِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ» (رواه مسلم)
হাদীসের ব্যাখ্যা:
এ দু'আটির প্রতিটি অংশ তার মধ্যে বিরাট ভাব ও অর্থ ধারণ করছে।
প্রথম যে কথাটি হাদীসে বলা হয়েছে, তা হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ উটে আরোহণ করেই সর্বপ্রথম তিনবার 'আল্লাহু আকবার' বলতেন। সে যুগে বিশেষত উটের মত বাহনে আরোহণের পর আরোহীর মনে একটা অহমিকা ও আত্মম্ভরিতার ওসওয়াসা উদ্রেক হওয়াটা ছিল স্বাভাবিক। দর্শকের মনেও তার সম্পর্কে একটা উচ্চ ধারণা ও সমীহবোধ জেগে উঠতে পারতো। (কেননা, উট ছিল তখনকার অভিজাত বাহন ও মর্যাদার প্রতীক।) রাসূলুল্লাহ ﷺ তিনবার 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি দিয়ে তার উপর তিনটি কার্যকরী আঘাত করতেন। নিজের মনকে এবং দর্শকদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতেন যে, মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের প্রকৃত মালিক হচ্ছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তারপর তিনি বলতেন:
سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ
"পবিত্র ও মহান সেই সত্তা, যিনি এ বাহনকে আমাদের জন্যে বশীভূত করে দিয়েছেন; নতুবা আমাদের সাধ্য ছিল না যে, এতবড় একটা প্রাণীকে বশীভূত করে ফেলি এবং নিজ খেয়াল-খুশি মত যেদিকে ইচ্ছে চালিয়ে নেই। এ বাক্যটির মধ্যে একথার স্পষ্ট স্বীকারোক্তি রয়েছে যে, এ বাহনটিকে আমাদের বশীভূত ও নিয়ন্ত্রণাধীন করে দেয়াটা একান্তই তাঁরই দয়া ও দান। এটা আমাদের নিজেদের কোন কৃতিত্ব নয়। তারপর তিনি বলতেন:
وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ
অর্থাৎ যেভাবে আজ এ সফরে যাত্রা করছি, তেমনি একদিন এ দুনিয়া থেকেও সফর করে আমাদেরকে আমাদের মহান প্রভু পরোয়ারদিগারের পানে যাত্রা করে চলে যেতে হবে যা আমাদের আসল মকসুদ এবং চরম মঞ্জিলে মকসুদ। সে সফরটাই হবে আসল সফর এবং সে চিন্তা-ভাবনা থেকে বান্দার কখনো গাফেল বা উদাসীন থাকা উচিত নয়।
তারপর সর্বপ্রথম তিনি দু'আ করতেন:
“হে আল্লাহ! এ সফরে আমাকে তুমি এমন নেকি ও পরহেজগারীপূর্ণ আমলের তাওফীক দান করো, যা তোমার সন্তুষ্টির কারণ হতে পারে।"
নিঃসন্দেহে আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী মানুষের সবচাইতে বড় চাওয়া পাওয়া এটাই। এজন্যে তার সর্বপ্রথম দু'আ এটা হওয়াই বাঞ্ছনীয়। তারপর তিনি সফর সহজসাধ্য ও সংক্ষিপ্ত হওয়ার দু'আ করতেন। তারপর আল্লাহর দরবারে আরয করতেনঃ
اَللّٰهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ فِي الْأَهْلِ وَالْمَالِ
“হে আল্লাহ! তুমিই সফরে আমার প্রকৃত সাথী এবং তোমার মদদ ও সাহচর্যের উপর আমার ভরসা। আর বাড়িতে যে পরিবার-পরিজন ও ধনসম্পদ আমি রেখে লাচ্ছি, তার দেখা-শোনা ও রক্ষার ব্যাপারেও আমি একান্তই তোমারই প্রতি নির্ভরশীল।
এসব ইতিবাচক প্রার্থনার পর তিনি সফরের ক্লেশ-কাতরতা এবং সফরে বা প্রত্যাবর্তনকালে কোন অবাঞ্ছিত দৃশ্য দর্শন থেকে আল্লাহর দরবারে পানাহ চাইতেন যার মোদ্দা কথা হচ্ছে, হে আল্লাহ! আমার এ সফরেও যেন আমি তোমার রহমত ও আনুকূল্য লাভ করি আর ফিরে এসেও যেন সবকিছু ঠিকঠাক দেখতে পাই।
হাদীসের শেষাংশে আছে, যখন বাড়িতে ফেরৎ আসার জন্যে তিনি আবার যাত্রা শুরু করতেন, তখন আল্লাহর দরবারে পুনরায় তিনি উক্ত দু'আটি করতেন। সাথে সাথে আরো বলতেন:
آئِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ
অর্থাৎ “এবার আমরা ফিরে চলেছি। নিজেদের ভুল-ভ্রান্তি-অপরাধ থেকে তওবা করছি। আমরা আমাদের মালিক ও প্রভু-পরোয়ারদিগারের ইবাদত এবং স্তব-স্তুতি করছি।" একটু ভেবে দেখুন তো, সফরের সময় সওয়ারীতে আরোহণকালেই যেখানে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হৃদয়-মনের এ অবস্থা হতো, যা এ শব্দমালার আকারে তাঁর যবান মুবারকে জারী থাকতো, সেখানে নির্জনে নিভৃতে তাঁর অবস্থাটা কী হতে পারে।
কত ভাগ্যবান সে উম্মত, যাদের কাছে তাদের নবীর উত্তরাধিকাররূপে এমন অমূল্য রত্নভাণ্ডার সংরক্ষিত রয়েছে। আর কতই না দুর্ভাবনার কারণ সে উম্মতের ভাগ্যবিড়ম্বনা ও বঞ্চনা, যার শতকরা ৯৯ জন বা তার চাইতেও অধিক সংখ্যক লোক সে সম্পর্কে কোন খবরই রাখে না বা তা দ্বারা উপকৃত হওয়া থেকে বঞ্চিতই থাকে।
প্রথম যে কথাটি হাদীসে বলা হয়েছে, তা হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ উটে আরোহণ করেই সর্বপ্রথম তিনবার 'আল্লাহু আকবার' বলতেন। সে যুগে বিশেষত উটের মত বাহনে আরোহণের পর আরোহীর মনে একটা অহমিকা ও আত্মম্ভরিতার ওসওয়াসা উদ্রেক হওয়াটা ছিল স্বাভাবিক। দর্শকের মনেও তার সম্পর্কে একটা উচ্চ ধারণা ও সমীহবোধ জেগে উঠতে পারতো। (কেননা, উট ছিল তখনকার অভিজাত বাহন ও মর্যাদার প্রতীক।) রাসূলুল্লাহ ﷺ তিনবার 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি দিয়ে তার উপর তিনটি কার্যকরী আঘাত করতেন। নিজের মনকে এবং দর্শকদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতেন যে, মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের প্রকৃত মালিক হচ্ছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তারপর তিনি বলতেন:
سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ
"পবিত্র ও মহান সেই সত্তা, যিনি এ বাহনকে আমাদের জন্যে বশীভূত করে দিয়েছেন; নতুবা আমাদের সাধ্য ছিল না যে, এতবড় একটা প্রাণীকে বশীভূত করে ফেলি এবং নিজ খেয়াল-খুশি মত যেদিকে ইচ্ছে চালিয়ে নেই। এ বাক্যটির মধ্যে একথার স্পষ্ট স্বীকারোক্তি রয়েছে যে, এ বাহনটিকে আমাদের বশীভূত ও নিয়ন্ত্রণাধীন করে দেয়াটা একান্তই তাঁরই দয়া ও দান। এটা আমাদের নিজেদের কোন কৃতিত্ব নয়। তারপর তিনি বলতেন:
وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ
অর্থাৎ যেভাবে আজ এ সফরে যাত্রা করছি, তেমনি একদিন এ দুনিয়া থেকেও সফর করে আমাদেরকে আমাদের মহান প্রভু পরোয়ারদিগারের পানে যাত্রা করে চলে যেতে হবে যা আমাদের আসল মকসুদ এবং চরম মঞ্জিলে মকসুদ। সে সফরটাই হবে আসল সফর এবং সে চিন্তা-ভাবনা থেকে বান্দার কখনো গাফেল বা উদাসীন থাকা উচিত নয়।
তারপর সর্বপ্রথম তিনি দু'আ করতেন:
“হে আল্লাহ! এ সফরে আমাকে তুমি এমন নেকি ও পরহেজগারীপূর্ণ আমলের তাওফীক দান করো, যা তোমার সন্তুষ্টির কারণ হতে পারে।"
নিঃসন্দেহে আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী মানুষের সবচাইতে বড় চাওয়া পাওয়া এটাই। এজন্যে তার সর্বপ্রথম দু'আ এটা হওয়াই বাঞ্ছনীয়। তারপর তিনি সফর সহজসাধ্য ও সংক্ষিপ্ত হওয়ার দু'আ করতেন। তারপর আল্লাহর দরবারে আরয করতেনঃ
اَللّٰهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ فِي الْأَهْلِ وَالْمَالِ
“হে আল্লাহ! তুমিই সফরে আমার প্রকৃত সাথী এবং তোমার মদদ ও সাহচর্যের উপর আমার ভরসা। আর বাড়িতে যে পরিবার-পরিজন ও ধনসম্পদ আমি রেখে লাচ্ছি, তার দেখা-শোনা ও রক্ষার ব্যাপারেও আমি একান্তই তোমারই প্রতি নির্ভরশীল।
এসব ইতিবাচক প্রার্থনার পর তিনি সফরের ক্লেশ-কাতরতা এবং সফরে বা প্রত্যাবর্তনকালে কোন অবাঞ্ছিত দৃশ্য দর্শন থেকে আল্লাহর দরবারে পানাহ চাইতেন যার মোদ্দা কথা হচ্ছে, হে আল্লাহ! আমার এ সফরেও যেন আমি তোমার রহমত ও আনুকূল্য লাভ করি আর ফিরে এসেও যেন সবকিছু ঠিকঠাক দেখতে পাই।
হাদীসের শেষাংশে আছে, যখন বাড়িতে ফেরৎ আসার জন্যে তিনি আবার যাত্রা শুরু করতেন, তখন আল্লাহর দরবারে পুনরায় তিনি উক্ত দু'আটি করতেন। সাথে সাথে আরো বলতেন:
آئِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ
অর্থাৎ “এবার আমরা ফিরে চলেছি। নিজেদের ভুল-ভ্রান্তি-অপরাধ থেকে তওবা করছি। আমরা আমাদের মালিক ও প্রভু-পরোয়ারদিগারের ইবাদত এবং স্তব-স্তুতি করছি।" একটু ভেবে দেখুন তো, সফরের সময় সওয়ারীতে আরোহণকালেই যেখানে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হৃদয়-মনের এ অবস্থা হতো, যা এ শব্দমালার আকারে তাঁর যবান মুবারকে জারী থাকতো, সেখানে নির্জনে নিভৃতে তাঁর অবস্থাটা কী হতে পারে।
কত ভাগ্যবান সে উম্মত, যাদের কাছে তাদের নবীর উত্তরাধিকাররূপে এমন অমূল্য রত্নভাণ্ডার সংরক্ষিত রয়েছে। আর কতই না দুর্ভাবনার কারণ সে উম্মতের ভাগ্যবিড়ম্বনা ও বঞ্চনা, যার শতকরা ৯৯ জন বা তার চাইতেও অধিক সংখ্যক লোক সে সম্পর্কে কোন খবরই রাখে না বা তা দ্বারা উপকৃত হওয়া থেকে বঞ্চিতই থাকে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)