মা'আরিফুল হাদীস

আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়

হাদীস নং: ২৯৯
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উল্লেখ কালে দরূদের ব্যাপারে গাফেল ব্যক্তিদের বঞ্চনা
২৯৯. হযরত কা'আব ইব্‌ন উজরা আনসারী (রা) থেকে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে নিকটে ভিড়ে বসার জন্যে বললেন, নিকটে এসো। আমরা তাঁর নিকটে ভিড়ে বসলাম। তিনি (তাঁর বক্তব্য উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে) মিম্বরের প্রথম সিঁড়িতে কদম রেখেই বললেন: আমীন। তারপর দ্বিতীয় সিঁড়িতে কদম রেখেও বললেন আমীন। তারপর তৃতীয় সিঁড়িতে কদম রাখলেন এবং বললেন, আমীন।
তারপর যখন ভাষণ অন্তে মিম্বর থেকে নেমে আসলেন তখন আমরা আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজ আমরা এমন কিছু শুনলাম যা ইতিপূর্বে কখনো শুনিনি। (অর্থাৎ মিম্বরের প্রত্যেক সিঁড়িতে কদম রাখার সময় আমীন বলাটা)।
জবাবে তিনি বললেন, আমি যখন মিম্বরের প্রথম সিঁড়িতে কদম রাখলাম, তখন জিবরাইল আমীন এসে বললেন:
بَعُدَ مَنْ أَدْرَكَ رَمَضَانَ فَلَمْ يُغْفَرْ لَهُ
-"ঐ ব্যক্তি ধ্বংস হোক, আল্লাহর রহমত থেকে দূর হোক, যে রমযান মাস পেলো, অথচ তাকে ক্ষমা করা হলো না।" তখন আমিও বললাম: আমীন! (অর্থাৎ তাই হোক) তারপর যখন দ্বিতীয় সিঁড়িতে কদম রাখলাম, তখন তিনি পুনরায়
بَعُدَ مَنْ ذُكِرْتَ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيْكَ
-"ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি, যার সম্মুখে আপনার প্রসঙ্গ উঠলো, সে আপনার প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করলো না। আমিও বললাম: আমীন! (তাই হোক!) অতঃপর আমি যখন তৃতীয় সিঁড়িতে কদম রাখলাম তখন জিবরাইল বলে উঠলেন:
بَعُدَ مَنْ أَدْرَكَ أَبَوَيْهِ الْكِبَرُ أَوْ أَحَدَهُمَا فَلَمْ يَدْخُلِ الْجَنَّةَ
-ধ্বংস হোক সে হতভাগা ব্যক্তি, যার সম্মুখে তার পিতামাতা উভয়েই বা তাদের কোন একজন বার্ধক্যে উপনীত হলো, অথচ সে তাদের খিদমত ও সন্তুষ্টির মাধ্যমে বেহেশতে প্রবেশের উপযুক্ত হতে পারলো না। আমি বললাম: আমীন! (তাই হোক!)
- (মুস্তাদরাকে হাকিম)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ كَعْبِ بْنِ عُجْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " احْضُرُوا فَحَضَرْنَا، فَلَمَّا ارْتَقَى الدَرَجَةَ قَالَ: " آمِينَ "، فَلَمَّا ارْتَقَى الدَّرَجَةَ الثَّانِيَةَ قَالَ: " آمِينَ "، فَلَمَّا ارْتَقَى الدَّرَجَةَ الثَّالِثَةَ قَالَ: " آمِينَ "، فَلَمَّا فَرَغَ نَزَلَ مِنَ الْمِنْبَرِ قَالَ: فَقُلْنَا له يَا رَسُولَ اللهِ سَمِعْنَا الْيَوْمَ مِنْكَ شَيْئًا مَا كُنَّا نَسْمَعُهُ فَقَالَ: " إِنَّ جِبْرِيلَ عَرْضَ لِي فَقَالَ: بَعُدَ مَنْ أَدْرَكَ رَمَضَانَ فَلَمْ يُغْفَرْ لَهُ فَقُلْتُ: آمِينَ فَلَمَّا رَقِيتُ الثَّانِيَةَ قَالَ: بَعُدَ مَنْ ذُكِرْتَ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيْكَ فَقُلْتُ: آمِينَ، فَلَمَّا رَقِيتُ الثَّالِثَةَ قَالَ: بَعُدَ مَنْ أَدْرَكَ اَبَوَيْهِ الْكِبَرَ عِنْدَهُ أَوْ أَحَدُهُمَا، فلَمْ يُدْخِلِ الْجَنَّةَ فَقُلْتُ: آمِينَ " (رواه الحاكم فى المستدرك وقال صحيح الاسناد)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীসের বক্তব্য পূর্ববর্তী হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত হাদীসের বক্তব্যের প্রায় সমার্থক। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, এ হাদীসে বদদু'আকারী হচ্ছে জিবরাইল (আ), আর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর প্রতিটি বদদু'আ সমর্থনে আমীন উচ্চারণকারী। হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালামের বদদু'আ ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আমীন বলা সংক্রান্ত এ ঘটনাটি শাব্দিক তারতম্যের সাথে হযরত কা'আব ইব্‌ন উজরা (রা), ছাড়াও হযরত ইবনে আব্বাস (রা), হযরত আনাস (রা), হযরত জাবির ইবনে সামুরা (রা)' হযরত মালিক ইবনে হুয়াররিস (রা) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন হারিছ (রা) থেকেও বর্ণিত হয়েছে, যা হাদীসের বিভিন্ন কিতাবে স্থান পেয়েছে। এসব রিওয়ায়াতের কোন কোনটিতে একথাও আছে যে, হযরত জিবরাইল বদদু'আ করে করে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে 'আমীন' বলার জন্যে নিজেই বলে দিচ্ছিলেন। তারপরই রাসূলুল্লাহ ﷺ 'আমীন' বলছিলেন।

উপরোক্ত হাদীসসমূহে উক্ত ভিন্ন ধরনের অপরাধীদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালামের বদদু'আরূপে তাঁদের যে গভীর অসন্তুষ্টি প্রকাশ পেয়েছে, এটা আসলে উক্ত তিন ধরনের অপরাধীদের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোরতম সতর্কবাণী স্বরূপ। উপরন্তু আরো জানা গেল যে, হুযুর ﷺ-এর আল্লাহর মাহবুবিয়তের কারণে ফিরিশতা জগতে এবং ঊর্ধ্বজগতে মাহবুবিয়ত ও মর্যাদার এত উচ্চ আসনে তিনি সমাসীন যে, যে ব্যক্তি তাঁর হক আদায়ে এতটুকু পরান্মুখ বা উদাসীন যে তার উল্লেখ শুনেও তাঁর প্রতি দরূদ আদায়ে গাফলতি করে, তার প্রতি সমস্ত ঊর্ধ্বজগতের ইমাম ও প্রতিনিধি হযরত জিবরাইলের অন্তর থেকে এরূপ কঠোর বদদু'আ বের হয় এবং সাথে সাথে এর উপর তিনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র মুখ দিয়ে 'আমীন' বলিয়ে নিচ্ছেন!
আল্লাহ তা'আলা এ জাতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে হিফাযত করুন! হুযুর ﷺ-এর হক উপলব্ধি করার এবং সাথে সাথে তা আদায়ের তাওফীকও দান করুন!

এ সব হাদীসের ভিত্তিতে ফেকাহ শাস্ত্রবিদগণ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয় তখন সে প্রসঙ্গ উত্থাপনকারী এবং শ্রবণকারী উভয়ের উপরেই তাঁর প্রতি দরূদ প্রেরণ ওয়াজিব হয়ে যায়- যেমনটি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান