মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

৯- কুরআনের ফাযাঈল অধ্যায়

হাদীস নং: ২১০৯
- কুরআনের ফাযাঈল অধ্যায়
কোরআনের শিক্ষা ও তেলাওয়াতের মহিমা:
প্রথম অনুচ্ছেদ
২১০৯। হযরত ওসমান (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন: তোমাদের মধ্যে সে-ই শ্রেষ্ঠ, যে কোরআন শিক্ষা করে ও উহা শিক্ষা দেয়। -বুখারী
كتاب فضائل القرآن
كتاب فَضَائِل الْقُرْآن :
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ
عَنْ عُثْمَانَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خَيْرُكُمْ من تعلم الْقُرْآن وَعلمه» . رَوَاهُ البُخَارِيّ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

১. কোরআনের মহিমা পর্ব

কোরআন (قرآن) শব্দের অর্থঃ একত্রিকরণ, মিলান অথবা ইহা কেরাআত (قراءت) শব্দ হইতে উদ্ভুত যাহার অর্থ পাঠ করা। শরীঅতে ইহার অর্থঃ মোহাম্মদ মোস্তফা (ﷺ) আল্লাহর পক্ষ হইতে ওহীয়ে জলী বা প্রকাশ্য ওহী মারফত যাহা লাভ করিয়াছেন এবং যাহা নামাযে পাঠ করার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে তাহা।
কোরআনে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ, আশ্বাস-ভীতি এবং সূরা ও আয়াতসমূহকে একত্র করা হইয়াছে অথবা উহা বারবার নামাযে পাঠ করা হয়—ইহাই এই নামের তাৎপর্য।
কোরআনের মহিমা অর্থ এখানে কোরআন শিক্ষাকরণ, শিক্ষা দান এবং উহার তেলাওয়াত ও উহার মর্মানুযায়ী কার্যকরণের মহিমাকেই বুঝান হইয়াছে। এ ছাড়া ইহাতে প্রসঙ্গক্রমে কোরআন পাকের হেফাযত ও লিপিবদ্ধকরণ সম্পর্কীয় হাদীসসমূহেরও সমাবেশ করা হইয়াছে।
কোরআন পাকের কোন অংশ কোন অংশ হইতে উত্তম কি না এ ব্যাপারে ওলামাদের মধ্যে মতভেদ দৃষ্ট হয়। কাহারও মতে—যেহেতু কোরআনের সকল অংশই আল্লাহর বাণী, অতএব, উহার সকল অংশই সমান; কিন্তু ওলামা সাধারণের মতে উহার কোন কোন অংশ কোন কোন অংশ হইতে উত্তম। সূরা এখলাসের মর্ম যে সূরা লাহাব অপেক্ষা উত্তম ইহাতে কোন সন্দেহ নাই।


কোরআনের শিক্ষা ও তেলাওয়াতের মহিমা

কোরআনে রহিয়াছেঃ
"যাহারা আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত (আবৃত্তি) করে, নামায কায়েম করে এবং দান করে আমি যাহা তাহাদিগকে উপজীবিকারূপে দান করিয়াছি তাহা হইতে গোপনে ও প্রকাশ্যে নিশ্চয়, তাহারা এমন এক বাণিজ্য করিতেছে যাহা কখনও ক্ষতিগ্রস্ত হইবে না। —অনুবাদক

২. এ হাদীছটিতে মুমিনদের মধ্যে যারা নিজেরা কুরআন শেখে ও অন্যদেরকে শেখায়, তাদেরকে সকলের শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। হাদীছটি সহীহ। তার মানে এটা নিশ্চিতভাবেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা। সুতরাং কতইনা সৌভাগ্যবান তারা, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা কুরআন শিক্ষা করার ও অন্যদেরকে শিক্ষা দেওয়ার তাওফীক দিয়েছেন। কেননা হাদীছটির ঘোষণা অনুযায়ী তারা উম্মতের শ্রেষ্ঠতম লোক।

উল্লেখ্য, কুরআন শিক্ষা করা ও শিক্ষা দেওয়া কথাটি ব্যাপক অর্থবোধক। এর মধ্যে কুরআনের পাঠ শেখা ও শেখানো, আয়াতের অর্থ শেখা ও শেখানো, এর ব্যাখ্যা ও মর্মবাণী শেখা ও শেখানো সবই রয়েছে। কুরআনের পাঠ শেখা ও শেখানো হলো কুরআন শিক্ষার প্রথম স্তর। এটা বুনিয়াদ। এর চূড়ান্ত স্তর হলো ব্যাখ্যা ও মর্মবাণী শেখা ও শেখানো। এটাই কুরআন নাযিলের মূল উদ্দেশ্য। পাঠ শিক্ষা হলো এ মূল উদ্দেশ্য অর্জনের উপায় বা অসিলা। উদ্দেশ্য যেহেতু অতি মহৎ, তাই পাঠ শিক্ষারও যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। সে কারণেই এর প্রত্যেক হরফ পড়ার দ্বারা একেকটি করে নেকী পাওয়া যায়, যা দশ গুণে বৃদ্ধি করা হয়। কুরআন শিক্ষার প্রতিটি ধাপই শ্রেষ্ঠ কাজ। তবে কুরআনের বার্তা ও মর্মবাণী যেহেতু মূল লক্ষ্যবস্তু, তাই তার শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাদান হবে শ্রেষ্ঠতম কাজ। যারা এ কাজে মশগুল থাকে, তারা শ্রেষ্ঠদের মধ্যেও সর্বশ্রেষ্ঠ।

বলাবাহুল্য, তারা শ্রেষ্ঠ হবে কেবল তখনই, যখন তাদের এ আমল কেবল আল্লাহ তা'আলাকে খুশি করার জন্যই হবে। কেননা সহীহ নিয়ত ছাড়া কোনও সৎকর্মই আল্লাহ তা'আলার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং হাদীছে সতর্ক করা হয়েছে যে-

وَرَجُلٌ تَعَلَّمَ الْعِلْمَ ، وَعَلَّمَهُ وَقَرَأَ الْقُرْآنَ، فَأْتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا ، قَالَ: فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ: تَعَلَّمْتُ الْعِلْمَ ، وَعَلَّمْتُهُ وَقَرَأْتُ فِيكَ الْقُرْآنَ، قَالَ: كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ تَعَلَّمْتَ الْعِلْمَ لِيُقَالَ: عَالِمٌ ، وَقَرَأْتَ الْقُرْآنَ لِيُقَالَ: هُوَ قَارِي، فَقَدْ قِيلَ، ثُمَّ أَمَرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ.

এবং ওই ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হবে, যে ইলম শিখেছে, অন্যকে তা শিখিয়েছে এবং কুরআন পড়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাকে নিজ নি'আমতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। তার তা মনে পড়বে। আল্লাহ বলবেন, তুমি এ ক্ষেত্রে কী আমল করেছ? সে বলবে, আমি ইলম শিখেছি, অন্যকে শিখিয়েছি ও তোমার উদ্দেশ্যে কুরআন পড়েছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি তো ইলম শিখেছিলে এজন্য যে, তোমাকে আলেম বলা হবে। আর কুরআন শিখেছিলে এই উদ্দেশ্যে যে, তোমাকে কারী বলা হবে। তা বলা হয়েছে। অতঃপর আল্লাহর আদেশে তাকে উলটোমুখে টেনে-হ্যাঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সহীহ মুসলিম: ১৯০৫; সুনানে নাসাঈ ৩১৩৭; মুসনাদে আহমাদ: ৮২৫৯; হাকিম, আল মুসতাদরাক: ২৫২৪; মুসনাদে ইসহাক ইবন রাহুয়াহ : ৩০৯)

কুরআন নাযিলের প্রকৃত লক্ষ্যবস্তু জীবনগঠন। অর্থাৎ মানুষ কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন গড়বে। কাজেই শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা লাভ করার জন্য আমল করা শর্ত। যারা কুরআনের পঠন-পাঠনে মশগুল থাকে, কিন্তু কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন গড়ার চেষ্টা করে না. তারা কিছুতেই উম্মতের শ্রেষ্ঠ লোক বলে গণ্য হতে পারে না।

যেসকল ইহুদী আলেম তাওরাত গ্রন্থ পড়ত, কিন্তু সে অনুযায়ী আমল করত না, তাদের সম্পর্কে কী কঠোর নিন্দাবাক্যই না কুরআন মাজীদে উচ্চারিত হয়েছে! আল্লাহ তা'আলা বলেন-

مَثَلُ الَّذِينَ حُمِّلُوا التَّوْرَاةَ ثُمَّ لَمْ يَحْمِلُوهَا كَمَثَلِ الْحِمَارِ يَحْمِلُ أَسْفَارًا

যাদের উপর তাওরাতের ভার অর্পণ করা হয়েছিল, অতঃপর তারা সে ভার বহন করেনি, তাদের দৃষ্টান্ত হলো গাধা, যে বহু কিতাব বয়ে রেখেছে। (সূরা জুমু'আ, আয়াত ৫)

মোটকথা, আমলের চেষ্টা ও সহীহ নিয়তের শর্তে কুরআন মাজীদ নিজে শেখা ও অন্যকে শেখানো সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ। এ কাজ যারা করে, তারা শ্রেষ্ঠতম মানুষ। এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেওয়া সনদ। এর দাবি হলো তাঁর উম্মত কুরআনের শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। আর যারা এ মহান কাজে মশগুল থাকে, অন্যরা তাদেরকে সর্বোচ্চ মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখবে। এ হাদীছটির বর্ণনাকারী হযরত উছমান রাযি. নিজে এর একজন শ্রেষ্ঠ অনুসারী ছিলেন। তিনি ছিলেন কুরআনের হাফেজ ও সংকলক। তিনি মুসলিম জাহানের সর্বত্র কুরআন শিক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। নিজে তিলাওয়াতও করতেন অনেক বেশি। তিনি প্রতিদিন সম্পূর্ণ কুরআন একবার পড়তেন। তাঁর সূত্রে এ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন আবূ আব্দুর রহমান সুলামী। তিনি কূফার মসজিদে দীর্ঘ ৪০ বছর কুরআন শিক্ষাদানের কাজে মশগুল থেকেছেন। তিনি বলতেন, এ হাদীছটিই আমাকে আমার এ স্থানে বসিয়েছে। অর্থাৎ হাদীছটিতে বর্ণিত ফযীলত অর্জনের লক্ষ্যেই আমি এখানে বসে মানুষকে কুরআন শেখাচ্ছি। প্রসিদ্ধ সাত কিরাআতের ইমাম নাফে' ইবন আব্দুর রহমান মাদানী রহ. ৭০ বছরেরও অধিক কাল কুরআন শেখানোর কাজে নিবেদিত থেকেছেন। ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাসে উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ সর্বদাই এ কাজকে মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখেছেন এবং নিজেরা অতীব গুরুত্বের সঙ্গে এ কাজে সময় দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকেও এর তাওফীক দান করুন।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য গভীর আগ্রহের সঙ্গে নিজে কুরআন শেখা এবং সাধ্যমতো অন্যকে শেখানো।

খ. যারা নিজেরা কুরআন শেখে, অতঃপর অন্যদেরকে শেখানোর কাজে মশগুল থাকে, তাদেরকে সর্বোচ্চ মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখা উচিত।

গ. মানুষ যাতে আগ্রহের সঙ্গে কুরআনের পঠন-পাঠনের কাজ গ্রহণ করে, সেজন্য তাদেরকে উৎসাহ দেওয়া উচিত এবং উৎসাহব্যঞ্জক এ হাদীছটি খুব বেশি প্রচার করা উচিত।
২. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান