আল মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ

৮- তালাক ও আনুষঙ্গিক অধ্যায়

হাদীস নং: ৫৫৫
- তালাক ও আনুষঙ্গিক অধ্যায়
সুন্নত তালাকের বর্ণনা।
৫৫৫। আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর যুগে নিজ স্ত্রীকে হায়েয চলাকালে এক তালাক দেন। উমার (রাযিঃ) এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর কাছে মাসআলা জিজ্ঞেস করেন। তিনি বলেনঃ “তুমি তাকে নির্দেশ দাও, সে যেন তার স্ত্রীকে ফেরত নেয় এবং হায়েয থেকে পাক হওয়া পর্যন্ত তাকে রেখে দেয়। অতঃপর পুনরায় হায়েয আসার পর তা থেকে পাক হবে। অতঃপর সে ইচ্ছা করলে তাকে স্ত্রী হিসাবে রাখবে অথবা সঙ্গম করার পূর্বে তালাক দিবে। এভাবে ইদ্দাত পালনের সুযোগ রেখে আল্লাহ তাআলা স্ত্রীদের তালাক দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।**
ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, আমরা এ হাদীস অনুযায়ী আমল করি ।
كتاب الطلاق
أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، أَخْبَرَنَا نَافِعٌ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، أَنَّهُ طَلَّقَ امْرَأَتَهُ وَهِيَ حَائِضٌ فِي عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَسَأَلَ عُمَرُ عَنْ ذَلِكَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: «مُرْهُ فَلْيُرَاجِعْهَا، ثُمَّ يُمْسِكْهَا حَتَّى تَطْهُرَ ثُمَّ تَحِيضَ، ثُمَّ تَطْهُرَ، ثُمَّ إنْ شَاءَ أَمْسَكَهَا بَعْدُ، وَإِنْ شَاءَ طَلَّقَهَا قَبْلَ أَنْ يَمَسَّهَا فَتِلْكَ الْعِدَّةُ الَّتِي أَمَرَ اللَّهُ أَنْ تُطَلَّقَ لَهَا النِّسَاءُ» ، قَالَ مُحَمَّدٌ: وَبِهَذَا نَأْخُذُ

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

** 'তালাক' শব্দের আভিধানিক অর্থ 'ছেড়ে দেয়া’, ‘বন্ধনমুক্ত করা।' ইসলামী আইনের পরিভাষায় এর অর্থ হচ্ছে 'স্ত্রীকে বিবাহ-বন্ধন থেকে মুক্ত করে দেয়া।' আল্লাহ তাআলা যেসব জিনিস বৈধ করেছেন, তালাক হলো তার মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণ্য বৈধ বিষয় । রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ আল্লাহ তাআলা তালাকের তুলনায় অধিক ঘৃণ্য কোন জিনিস হালাল করেননি” (আবু দাউদ)। “সমস্ত হালাল জিনিসের মধ্যে মহান আল্লাহর নিকট সর্বাধিক ঘৃণ্য জিনিস হচ্ছে তালাক" (আবু দাউদ)।
ইসলামী শরীআতে তালাক দেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে একটি অপরিহার্য ও নিরুপায়ের উপায় হিসাবে। তাই যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনার পর এর প্রয়োগ করতে হবে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হলে বিভিন্ন পন্থায় তার সংশোধন করার চেষ্টা করতে হবে। এমনকি উভয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনবোধে সালিশও নিযুক্ত করা যেতে পারে, কুরআনে যার সরাসরি প্রস্তাব রয়েছে (সূরা নিসাঃ ৩৫)। তারাও যদি দেখে যে, উভয়ের একত্রে বসবাসের আর কোন সুযোগ নেই, কেবল তখনই তালাকের পথ বেছে নেয়া যেতে পারে। তাও একই সময় তিন তালাক দিয়ে একই আয়াতে দাম্পত্য সম্পর্ক ছিন্ন করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে তিন মাসে তিন তালাক অথবা মাত্র এক তালাক দিয়ে ইদ্দাত পালনের জন্য রেখে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এর মধ্যেও যদি মিলমিশের একটা পথ সৃষ্টি হয়ে যায়। কিন্তু অধিকাংশ লোক তালাকের সুষ্ঠু পন্থা সম্পর্কে অবহিত নয়। অনেকেই রাগের মাথায় স্ত্রীর মুখে একই সময় তিন তালাক ছুড়ে মেরে সর্বশেষ সুযোগটুকুও হাতছাড়া করে ফেলে। অতঃপর এর মারাত্মক পরিণতি সামনে উপস্থিত দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মুফতীদের কাছে গিয়ে মিথ্যা ও ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয় এবং বৈধ স্ত্রীকে অবৈধ করে হারাম পন্থায় ঘর-সংসার করে। এজন্য বিষয়টির একটি বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন।
হানাফী মাযহাবমতে তালাক তিন প্রকার। যথা আহসান (احسن), হাসান (حسن) ও বিদঈ (بدعى) সর্বোত্তম, উত্তম এবং গর্হিত। সর্বোত্তম পন্থায় তালাক এই যে, স্বামী তার স্ত্রীকে এমন তুহরে এক তালাক দিবে যাতে সহবাস হয়নি, অতঃপর ইদ্দাত অতিবাহিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করবে। উত্তম পন্থার তালাক এই যে, প্রতি তুহরে এক তালাক দিবে। তিন তুহরে তিন তালাক দেয়াও সুন্নাতের পরিপন্থী নয়। কিন্তু মাত্র এক তালাক দিয়ে ইদ্দাত পূর্ণ করার সুযোগ দেয়াই উত্তম। বিদঈ বা বিদআতী তালাক হচ্ছে, একই সময় তিন তালাক দেয়া অথবা একই তুহরে আলাদা আলাদা সময়ে তিন তালাক দেয়া অথবা হায়েয অবস্থায় তালাক দেয়া। যে স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করা হয়েছে এবং যার মাসিক ঋতু হয়, তার সম্পর্কে এই বিধান।
এই তিন প্রকারের তালাক আবার ভিন্ন ভিন্ন তিন নামে অভিহিতঃ রিজঈ ( প্রত্যাহারযোগ্য) তালাক, বায়েন তালাক ও মুগাল্লাযা তালাক। যে পন্থায় তালাক দেয়ার পর স্ত্রীকে পুনর্বিবাহ ছাড়াই ফিরিয়ে নেয়া যায় তাকে রিজঈ তালাক বলে। যে তালাকের পর স্ত্রীকে পুনর্বিবাহ না করে ফেরত নেয়া যায় না তাকে বায়েন তালাক বলে। যে পন্থায় তালাক দেয়ার পর স্ত্রীর অন্য স্বামী গ্রহণ ছাড়া প্রথম স্বামী তাকে পুনরায় বিবাহ করতে পারে না তাকে মুগাল্লাযা তালাক বলে। বিদঈ ও মুগাল্লাযা প্রায় একই ধরনের তালাক। তিন তালাকের মাধ্যমেই এরূপ তালাক হয়ে থাকে, তা একসাথে দেয়া হোক অথবা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে।
যে স্ত্রীর সাথে সহবাস হয়নি তাকে তুহর অথবা হায়েয, যে কোন অবস্থায় তালাক দেয়া সুন্নাত বিরোধী নয়। যে স্ত্রীর সাথে সহবাস হয়েছে কিন্তু হায়েয হওয়া বন্ধ হয়ে গেছে, তাকে সহবাস করার পরও তালাক দেয়া যেতে পারে। কেননা তার গর্ভবতী হওয়ার আশংকা নাই ।
অনুরূপভাবে যে স্ত্রীর এখনো মাসিক ঋতু শুরু হয়নি, তাকেও সঙ্গম করার পর তালাক দেয়া যেতে পারে। কেননা তারও গর্ভবতী হওয়ার আশংকা নেই।
অনুরূপভাবে যে স্ত্রী গর্ভাবস্থায় আছে তাকেও সঙ্গম করার পর তালাক দেয়া যেতে পারে। কেননা সে যে গর্ভবতী তা পূর্বেই জানা গেছে।
কিন্তু এই চার প্রকার স্ত্রীকে তালাক দেয়ার সুন্নাত নিয়ম হচ্ছে, এক মাস পর পর এক তালাক দেয়া। আরও সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে, কেবলমাত্র এক তালাক দিয়ে রেখে দেয়া এবং ইদ্দাত অতিবাহিত হওয়ার অপেক্ষা করা (হিদায়া, ফাতহুল কাদীর, উমদাতুল কারী, আহকামুল কুরআন- আবু বাকর জাসসাস)।
এই তিন প্রকার তালাকের মধ্যে ফলাফল ও পরিণতির দিক থেকেও পার্থক্য আছে। সর্বোত্তম বা উত্তম পন্থায় তালাক দিলে ইদ্দাতকালের মধ্যে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়া যায়। ফিরিয়ে নেয়ার নিয়মও খুব সহজ। ফিরিয়ে নেয়ার নিয়াতে ইদ্দাতকালের মধ্যে স্ত্রীর সাথে সহবাস করলে বা তাকে চুমা দিলে অথবা 'তোমাকে ফেরত নিলাম' বললেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়, পুনর্বিবাহের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু ইদ্দাত শেষ হয়ে যাবার পর পুনর্বিবাহের প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ এক তালাক অথবা দুই তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দাত শেষ হয়ে যাবার পর তালাকদাতা স্বামী এবং তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী পারস্পরিক সমঝোতা ও সম্মতির ভিত্তিতে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। এজন্য মাঝখানে স্ত্রীলোকটির দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণেরও (তাহলীল) প্রয়োজন নেই এবং বিবাহ অনুষ্ঠানের জন্য মৌলভী ডাকারও দরকার নাই। স্বামী-স্ত্রী দু'জনে ঈজাব-কবুলের মাধ্যমে সহজেই পুনর্বিবাহে আবদ্ধ হতে পারে।
কিন্তু স্বামী যদি স্ত্রীকে তিন তালাক দেয়, তাহলে তাকে ইদ্দাতকালের মধ্যেও ফিরিয়ে নেয়ার সুযোগ থাকে না এবং তাদের পুনর্বিবাহের ব্যাপারটিও অত্যন্ত জটিল হয়ে যায়। এক্ষেত্রে স্ত্রীকে দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করতে হয়। এই দ্বিতীয় স্বামীও যদি কোন কারণে তাকে তালাক দেয় অথবা মৃত্যুবরণ করে, তাহলে (এই দ্বিতীয় স্বামীর সাথে সম্পর্কিত) ইদ্দাত শেষ হওয়ার পর সে সম্পূর্ণ নতুনভাবে বিবাহ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রথম স্বামীর ঘরে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয় স্বামী যদি তাকে তালাক না দেয়, তাহলে এই স্ত্রী আর প্রথম স্বামীর ঘরে ফিরে আসতে পারবে না।
আমাদের দেশের লোকেরা কেবল তালাকের এই তৃতীয় এবং জটিলতম নিয়মটিই জানে। তাদের ধারণা, কেবল তিন তালাকের মাধ্যমেই বিবাহ বন্ধন ছিন্ন করা যেতে পারে। তারা এটা জানে না যে, তিন তালাকের মাধ্যমে তারা যে উদ্দেশ্য সাধন করতে চাচ্ছে, তা এক অথবা দুই তালাকের মাধ্যমেও অর্জিত হতে পারে। অর্থাৎ এক অথবা দুই তালাকের পর ইদ্দাত অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে বিবাহ বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়, যেভাবে তিন তালাক দেয়ার সাথে সাথে বিবাহ বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়। বরং এক অথবা দুই তালাকের ক্ষেত্রে ইচ্ছা করলে স্ত্রীকে যতো সহজে বিবাহ বন্ধনে ফিরিয়ে আনার সুযোগ অবশিষ্ট থাকে, তিন তালাকের ক্ষেত্রে সেই সর্বশেষ সুযোগটুকুও হাতছাড়া হয়ে যায় ।
একই সময় তিন তালাক দিলে চার মাযহাবের ইমামদের মত অনুযায়ী স্ত্রী তিন তালাকই হয়ে যাবে এবং বিবাহ বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ -কে জানানো হলো, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একই সময় তিন তালাক দিয়েছে। তিনি একথা শুনে রাগান্বিত হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেনঃ

ايلعب بكتاب الله وانا بين أظهركم

“আমি তোমাদের মাঝে বর্তমান থাকা অবস্থায়ই কি এই লোকটি আল্লাহর কিতাব নিয়ে তামাশা করছে!"
তাঁর অসন্তোষের মাত্রা দেখে এক ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি তাকে হত্যা করবো না (নাসাঈ)?
হযরত উবাদা (রা)-র পিতা নিজ স্ত্রীকে এক হাজার তালাক দিলে তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর কাছে গিয়ে তাঁকে একথা জানান। নবী ﷺ বলেনঃ “মাত্র তিন তালাকেই তার স্ত্রী তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তার সাথে সাথে হয়েছে আল্লাহর অবাধ্যাচরণ। অবশিষ্ট ৯৯৭ টি তালাক যুলুম ও সীমা লংঘনের নিদর্শন হিসেবে রয়ে গেছে। আল্লাহ চাইলে এজন্য তাকে শাস্তিও দিতে পারেন অথবা ক্ষমাও করতে পারেন” (মুসনাদে আবদুর রাযযাক)।
দারু কুতনী ও ইবনে আবু শাইবার গ্রন্থে ইবনে উমার (রা)-র ঘটনা সম্পর্কে উল্লেখ আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন তাকে নিজের স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেন, তখন তিনি জিজ্ঞেস করেন, আমি যদি তাকে তিন তালাক দিতাম, তবুও কি তাকে ফিরিয়ে নিতে পারতাম? জবাবে নবী ﷺ বলেনঃ "না, তা পারতে না। সে তোমার থেকে বায়েন তালাক হয়ে যেতো এবং একাজে গুনাহ হতো।” অপর এক বর্ণনায় এর ভাষা হচ্ছেঃ “তুমি যদি তাই করতে তাহলে তুমি তোমার প্রভুর নাফরমানী করে বসতে এবং তোমার স্ত্রী তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো।"
এ পর্যায়ে সাহাবীদের থেকে যেসব ফতোয়া বর্ণিত হয়েছে, তাও রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর নির্দেশের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)-কে বললো, আমি আমার স্ত্রীকে আট তালাক দিয়েছি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এব্যাপারে তোমাকে কি ফতোয়া দেয়া হয়েছে? সে বললো, আমাকে ফতোয়া দেয়া হয়েছে যে, আমার স্ত্রী আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তিনি বলেন, তারা সত্যই বলেছেন, ব্যাপারটা এরকমই যেমন তারা বলেছেন (মুওয়াত্তা ইমাম মালেক)। আলকামা (র) থেকে বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি ইবনে মাসউদ (রা)-কে বললো, আমি আমার স্ত্রীকে ৯৯টি তালাক দিয়েছি। তিনি বলেন, মাত্র তিনটি তালাকই স্ত্রীকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। অবশিষ্ট তালাকগুলো সবই সীমালংঘনমূলক কাজের নিদর্শন (মুসনাদে আবদুর রাযযাক)। ওয়াকী ইবনুল জারাহ (র) নিজের সুনান গ্রন্থে হযরত উছমান (রা) ও হযরত আলী (রা)-র এই মত উল্লেখ করেছেন।
মুজাহিদ (র) বলেন, আমি ইবনে আব্বাস (রা)-র কাছে বসা ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে তাকে বলবো, আমি আমার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে বসেছি। তা শুনে তিনি নীরব রইলেন। আমি মনে করলাম, তিনি হয়ত তার স্ত্রীকে ফেরত দিতে চাইবেন। অতঃপর তিনি বলেন, তুমি তোমার প্রভুর নাফরমানী করেছো এবং তোমার স্ত্রী তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে (আবু দাউদ, ইবনে জারীর)। এক ব্যক্তি নিজ স্ত্রীকে এক শত তালাক দেয়ার পর ইবনে আব্বাস (রা)-র কাছে ফতোয়া জিজ্ঞেস করে। তিনি বলেন, তিন তালাকেই তোমার স্ত্রী তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অবশিষ্ট ৯৭টি তালাক দ্বারা তুমি আল্লাহর আয়াতের সাথে তামাশা করেছো (মুওয়াত্তা ইমাম মালেক, তাফসীরে ইবনে জারীর)। এক ব্যক্তি সঙ্গমের পূর্বেই নিজ স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে বসে, অতঃপর তাকে পুনরায় ফেরত নিতে চায়। সে ফতোয়া জানার জন্য ইবনে আব্বাস (রা) এবং আবু হুরায়রা (রা)-র কাছে আসে। তারা উভয়ে বলেন, তোমার জন্য যে সুযোগ ছিলো তা তুমি নিজেই হাতছাড়া করে ফেলেছো (আবু দাউদ, মুওয়াত্তা ইমাম মালেক)।
আল্লামা যামাখশারী (র) লিখেছেন, নিজ স্ত্রীকে একসাথে তিন তালাক দিয়ে যে ব্যক্তিই হযরত উমার (রা)-র কাছে আসতো, তিনি তাকে বেত্রাঘাত করতেন এবং তার দেয়া তালাকগুলো কার্যকর করতেন (তাফসীরে কাশাফ)।
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (র) এবং অপর কয়েকজন তাবিঈ বলেন, যে ব্যক্তি সুন্নাত বিরোধী নিয়মে হায়েয অবস্থায় তালাক দিবে অথবা একই সাথে তিন তালাক দিবে তার তালাক আদৌ কার্যকর হবে না। ইমামিয়া (শিয়া) মাযহাব এই মত পোষণ করে।
তাঊস ও ইকরিমা (র) বলেন, একই সময় তিন তালাক দেয়া হলে কেবলমাত্র এক তালাক কার্যকর হবে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র) এই মত সমর্থন করেছেন। যাহিরী (আহলে হাদীস) মাযহাবেরও এই মত। তাদের মতের ভিত্তি হচ্ছে নিম্নোক্ত বর্ণনাঃ “আবুস সাহবাআ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)-কে বলেন, আপনি কি জানেন না রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর যুগে, আবু বাকর (রা)-র খেলাফতকালে এবং উমার (রা)-র খেলাফতের প্রথমভাগে একত্রে তিন তালাক দেয়া হলে তা এক তালাক গণ্য হতো? তিনি জবাবে বলেন, হ্যাঁ” (বুখারী, মুসলিম)। অপর এক বর্ণনায় ইবনে আব্বাস (রা)-র কথাটি এভাবে উল্লেখিত হয়েছেঃ "রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর যুগে, আবু বাকর (রা)-র যুগে এবং উমার (রা)-র খেলাফতের প্রথম দু’বছর একত্রে তিন তালাক দেয়া হলে তাকে এক তালাক গণ্য করা হতো। পরে হযরত উমার (রা) বলেন, লোকেরা এমন একটি ব্যাপারে তাড়াহুড়া করতে লাগছে যে সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ তাদের জন্য রাখা হয়েছিলো। অতএব আমরা এখন তাদের এ পদক্ষেপকে কার্যকর করবো না কেন? সুতরাং তিনি তা কার্যকর করেন"(মুসলিম, আবু দাউদ, মুসনাদে আহমাদ)।
কিন্তু আমাদের কাছে এই মতটি কয়েকটি কারণে গ্রহণযোগ্য নয়ঃ
(এক) আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, ইবনে আব্বাস (রা)-র নিজের ফতোয়া তার এই বর্ণনার পরিপন্থী। একই বিষয়ে কোন সাহাবীর মত এবং কর্মনীতির মধ্যে বৈপরীত্য দেখা গেলে তার কর্মনীতি গৃহীত হয়।
(দুই) এই মতটি নবী ﷺ এবং বিশিষ্ট সাহাবাদের সূত্রে বর্ণিত হাদীসসমূহের পরিপন্থী। এসব হাদীসে উল্লেখ আছে যে, একই সময় তিন তালাক দিলে তা তিন তালাকই গণ্য হবে এবং বিবাহ বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাবে।
(তিন) স্বয়ং ইবনে আব্বাস (রা)-র বক্তব্য থেকেও জানা যায়, হযরত উমার (রা) সাহাবীদের মিলিত বৈঠকেই একত্রে দেয়া তিন তালাককে তিন তালাক হিসাবেই কার্যকর করার কথা ঘোষণা করেছেন। কোন সাহাবী এর বিরোধিতা করেছেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায় না। এখন এটা কি ধারণা করা যায় যে, হযরত উমার (রা) কোন ব্যাপারে সুন্নাতের পরিপন্থী সিদ্ধান্ত করে থাকবেন? আর সমস্ত সাহাবা (রা) নীরবে তা মেনে নিয়ে থাকবেন?
ইদ্দাতঃ স্বামী তালাক দিবার পর অথবা স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর জন্য যে সময়সীমা পর্যন্ত অন্য লোককে পুনর্বিবাহ করা নিষিদ্ধ তাকে ইদ্দাত বলে। যে স্ত্রীলোকের নিয়মিত হায়েয হয়, তার ইদ্দাত তিনটি মাসকি ঋতু শেষ হওয়া পর্যন্ত (সূরা বাকারাঃ ২২৮)। যে নারীর এখনো হায়েয শুরু হয়নি অথবা বয়োবৃদ্ধির কারণে হায়েয হওয়া বন্ধ হয়ে গেছে তার ইদ্দাত তিন মাস এবং গর্ভবতী স্ত্রীলোকের ইদ্দাত সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত (সূরা তালাকের ৪ নম্বর আয়াত দ্রষ্টব্য)। এক বা দুই তালাকের ক্ষেত্রে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্য ছাড়া ইদ্দাত চলাকালে তার সাথে সঙ্গম করা নিষিদ্ধ। আর তিন তালাকের ক্ষেত্রে তো বিবাহ বন্ধনই একবারে ছিন্ন হয়ে যায়। অতএব সহবাসের প্রশ্নই উঠে না। বিবাহের পর সহবাসের পূর্বেই স্ত্রীকে তালাক দিলে তাকে কোনরূপ ইদ্দাত পালন করতে হয় না (সূরা আহযাবঃ ৪৯)। বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়ার পরপরই সে স্বামী গ্রহণ করতে পারে (অনুবাদক)।
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)