ইতেকাফের নিয়ম
প্রশ্নঃ ১৪১৮৬৪. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, ইতিকাফের নিয়ত, নিয়ম কানুন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চায়।
২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
Raozan
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
ইতিকাফ মুলতঃ তাদের জন্য যারা হ্রিদয়ের গহিনে আল্লাহর সঙ্গে সম্বন্ধের যোগসূত্র মুঠোয় পেতে আগ্রহী। রমজানের শেষ ১০ দিন দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে একান্ত আল্লাহর হয়ে যাওয়ার জন্যই ইতেকাফ। রমজানের শেষ দশকের এই ইতিকাফ সুন্নতে মুয়াক্কাদা কেফায়া। ইবনুল মুনযির তাঁর ‘আল-ইজমা’ নামক গ্রন্থে (পৃষ্ঠা-৫৩) বলেন, وأجمعوا على أن الاعتكاف سنة لا يجب على الناس فرضا إلا أن يوجبه المرء على نفسه نذرا فيجب عليه ”আলেমগণ ইজমা করেছেন যে, ইতিকাফ সুন্নত; ফরয নয়। তবে কেউ যদি মানত করে নিজের উপর ওয়াজিব করে নেয় ওয়াজিব হয়।” ইতিকাফের ফযিলত সম্পর্কে হাদিস শরিফে এসেছে, ১. ইবনে আব্বাস রাযি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ ইতিকাফকারীর ব্যাপারে বলেছেন, هُوَ يَعْكِفُ الذُّنُوبَ ، وَيُجْرَى لَهُ مِنْ الْحَسَنَاتِ كَعَامِلِ الْحَسَنَاتِ كُلِّهَا“ইতিকাফকারী গুনাহকে প্রতিরোধ করেন। ইতিকাফকারীকে সকল নেক আমলকারীর ন্যায় নেকী দেয়া হবে।” (ইবন মাজাহ ১৭৮১) ২. তাবারানী (৭৪২০), হাকিম (৪/২৬৯) ও বায়হাকী (৩/৪২৪) ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে হাদিস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন, مَنِ اعْتَكَفَ يَوْمًا ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللَّهِ جَعَلَ اللَّهُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّارِ ثَلاثَ خَنَادِقَ ، كُلُّ خَنْدَقٍ أَبَعْدُ مِمَّا بَيْنَ الْخافِقَيْنِ “যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একদিন ইতিকাফ করে আল্লাহ্ তার মাঝে ও জাহান্নামের আগুনের মাঝে তিনটি পরিখার দূরত্ব সৃষ্টি করে দেন; যা পূর্ব-পশ্চিমের চেয়েও বেশি দূরত্ব”। দুই. যেহেতু লাইলাতুল কদরের সুমহান ফযিলত রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ خَيۡرٞ مِّنۡ أَلۡفِ شَهۡرٖ “লাইলাতুল কদর হাজার মাস থেকেও উত্তম।” (সূরা কদর ৩) সেহেতু রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর ইতিকাফের মূল লক্ষ্য ছিল- লাইলাতুল কদর পাওয়া। ইমাম মুসলিম (১১৬৭) আবু সাঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ রমজানের প্রথম দশ দিন ইতিকাফ করেছেন। এরপর তিনি মাঝের দশদিন তুর্কী ক্বুব্বাতে (এক ধরণের ছোট তাঁবুতে) ইতিকাফ করেছেন। যে তাবুর দরজার উপর একটি কার্পেট ঝুলানো ছিল। রাবী বলেন, তিনি তাঁর হাত দিয়ে কার্পেটটিকে ক্বুব্বার এক পাশে সরিয়ে দিলেন। এরপর তাঁর মাথা বের করে লোকদের সাথে কথা বললেন। লোকেরা তাঁর কাছে আসল। অতঃপর তিনি বললেন, إِنِّي اعْتَكَفْتُ الْعَشْرَ الأَوَّلَ أَلْتَمِسُ هَذِهِ اللَّيْلَةَ ، ثُمَّ اعْتَكَفْتُ الْعَشْرَ الأَوْسَطَ ، ثُمَّ أُتِيتُ فَقِيلَ لِي : إِنَّهَا فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ ، فَمَنْ أَحَبَّ مِنْكُمْ أَنْ يَعْتَكِفَ فَلْيَعْتَكِفْ ، فَاعْتَكَفَ النَّاسُ مَعَهُ “আমি প্রথম দশদিন ইতিকাফ করেছি- এই রাতের (লাইলাতুল ক্দরের) খোঁজে, এরপর মাঝের দশ দিন ইতিকাফ করেছি। এরপর আমাকে বলা হল, লাইলাতুল কদর শেষ দশকে। সুতরাং আপনাদের মধ্যে যার ইচ্ছা হয় তিনি ইতিকাফ করুন। তখন লোকেরা তাঁর সাথে ইতিকাফ চালিয়ে গেল।” তিন. প্রশ্নকারী দীনি ভাই, সত্যিকার অর্থে ইতিকাফের ইতিবাচক ফলাফল মানুষের জীবনে তাৎক্ষণিকভাবে, এমনকি ইতিকাফের দিনগুলোতে পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া পরবর্তী রমজান পর্যন্ত অনাগত দিনগুলোর উপরেও এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়। আতা আল-খুরাসানি রহ. বলেন, “ইতিকাফকারীর উদাহরণ সে বান্দার মত, যে নিজেকে আল্লাহর সামনে পেশ করে বলছে, হে আল্লাহ যতক্ষণ না তুমি ক্ষমা কর, আমি তোমার দরবার ত্যাগ করব না, হে আমার রব, যতক্ষণ না তুমি আমাকে ক্ষমা কর, আমি তোমার দরবার ত্যাগ করব না”। (শারহুল ইব্ন বাত্তাল আলাল বুখারি: ৪/১৮২) আর এতেকাফের কিছু বিধিবদ্ধ নিয়ম আছে। যেমন, ইতেকাফকারী যদি বিনা প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হয় তাহলে তার এতেকাফ ভঙ্গ হয়ে যায়। আবু দাউদের (২১১৫) হাদিসে আছে, لا يخرج لحاجة إلا لما لا بد منه একান্ত বাধ্য না হলে মসজিদ থেকে বের হবে না। মনে রাখবেন, ইতিকাফ মানে বান্দা সম্পূর্ণ আল্লাহর হয়ে যাওয়া। মসজিদে সঙ্গিদের সঙ্গে গল্প করা, মোবাইলে ফোনালাপ, গোসল করতে বেশি সময় লাগানো এসব ইতিকাফের মেজাজের বরখেলাফ। ইতিকাফে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া দুনিয়ার সবকিছুর চিন্তা থেকে মনকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে। কেবল আল্লাহর ধ্যান-খেয়ালে মগ্ন থাকতে হবে। তবেই ইতিকাফ সম্পূর্ণ হবে বলে আশা করা যায়। পরিশেষে আপনার জন্য একটি হাদিস পেশ করছি– আয়েশা রাযি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَجْتَهِدُ فِى الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مَا لاَ يَجْتَهِدُ فِى غَيْرِهِ”রাসূল ﷺ রমজানের শেষ দশকে (ইবাদত-বন্দেগীতে) যে পরিমাণ পরিশ্রম করতেন অন্য কখনো করতেন না।” (মুসলিম) সুতরাং ইতিকাফের দিনগুলোতে আপনি সেটাই করবেন, যা রাসূল ﷺ করেছেন। নিশ্চয় আল্লাহই তাওফিকদাতা। (২) ---- শবে কদরের জন্য বিশেষ পদ্ধতির কোনো নামায নেই। সব সময় যেভাবে নামায পড়া হয় সেভাবেই পড়বে অর্থাৎ দুই রাকাত করে যত রাকাত সম্ভব হয় আদায় করবে এবং যে সূরা দিয়ে সম্ভব হয় পড়বে। তদ্রূপ অন্যান্য আমলেরও বিশেষ কোনো পন্থা নেই। কুরআন তেলাওয়াত, যিকির-আযকার, দুআ-ইস্তেগফার ইত্যাদি নেক আমল যে পরিমাণ সম্ভব হয় আদায় করবে। তবে নফল নামায দীর্ঘ করা এবং সিজদায় দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করা উচিত, যা কোনো কোনো হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয়। বিভিন্ন বই-পুস্তকে নামাযের যে নির্দিষ্ট নিয়ম-কানূন লেখা আছে অর্থাৎ এত রাকাত হতে হবে, প্রতি রাকাতে এই এই সূরা এতবার পড়তে হবে-এগুলো ঠিক নয়। হাদীস শরীফে এ ধরনের কোনো নিয়ম নেই, এগুলো মানুষের মনগড়া পন্থা। বলাবাহুল্য যে, যে কোনো বই-পুস্তিকায় কোনো কিছু লিখিত থাকলেই তা বিশ্বাস করা উচিত নয়। বিজ্ঞ আলিমদের নিকট থেকে জেনে আমল করা উচিত।শবে কদরের নফল আমলসমূহ, বিশুদ্ধ মতানুসারে একাকী করণীয়। ফরয নামায তো অবশ্যই মসজিদে জামাতের সঙ্গে আদায় করতে হবে। এরপর যা কিছু নফল পড়ার তা নিজ নিজ ঘরে একাকী পড়বে। এসব নফল আমলের জন্য দলে দলে মসজিদে এসে সমবেত হওয়ার প্রমাণ হাদীস শরীফেও নেই আর সাহাবায়ে কেরামের যুগেও এর রেওয়াজ ছিল না।-ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকীম ২/৬৩১-৬৪১; মারাকিল ফালাহ পৃ. ২১৯ তবে কোনো আহ্বান ও ঘোষণা ছাড়া এমনিই কিছু লোক যদি মসজিদে এসে যায় তাহলে প্রত্যেকে নিজ নিজ আমলে মশগুল থাকবে, একে অন্যের আমলে ব্যাঘাত সৃষ্টির কারণ হবে না। (৩) ---- ১.এ পূণ্যময় রজনীতে অবহেলা না করে গুরুত্ব ও ইখলাসের সাথে ইবাদত বন্দেগীতে লেগে থাকা চাই। চাই নফল নামায বা তিলাওয়াত যিকির আযকারে হোক কিংবা দু'আয় মশগুল থাকার মাধ্যমে হোক। ২.নিজের জীবনের পাপরাশির কথা স্মরণ করে আল্লাহ তা'আলার নিকট কাকুতি মিনতি ও রোনাজারীর সাথে তাওবা করা ও ক্ষমা চাওয়া। (সূরা নূহ: ১০) ৩.ইখলাসের সাথে সাওয়াবের আশায় উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে নেক আমলে লিপ্ত থাকা। (বুখারী: হাঃ নং ১৯০১, মুসনাদ আহমাদ: হাঃ নং ১৭১৪৫) ৪.এ রাত্রিতে বেশী বেশী নিম্নোক্ত দু'আটি পড়তে থাকা ---- اللَّهُمَّ إِنَّكَ عُفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي উচ্চারণ : 'আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুয়্যুন; তুহিব্বুল আফওয়া; ফাফু আন্নি।’ অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল; ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিজি, মিশকাত) ৫. উক্ত রাত্রির কিছু অংশ কুরআনে কারীমের তিলাওয়াতে নিমগ্ন থাকা। কিছু অংশে নফল নামায বিশেষ করে সালাতুত তাসবীহ আদায় করা। আর অংশে যিকির আযকার দু'আ মুনাজাত করা। (সূরা আনকাবূত:৪৫ )
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
শফিকুল ইসলাম হাটহাজারী
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিআ মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুর
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিআ মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১