মহিলাদের হায়েজ, নেফাস অবস্থায় লাইলাতুল কদরের আমল
প্রশ্নঃ ১৪৪৫৮৮. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, মেয়েরা রমযান মাসের শেষ দশকে হায়েজ অবস্থায় কীভাবে ইবাদত করতে পারবে?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
*হায়েজ বা নেফাস অবস্থায় লাইলাতুল কদর: বঞ্চিত হওয়ার ভয় নেই*
অনেক নারী মনে করেন হায়েজ বা নেফাস শুরু হলে তারা লাইলাতুল কদরের মহাসৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হবেন। কিন্তু ইসলামের বিধান অনুযায়ী, হায়েজ বা নেফাস চলাকালীন নামাজ-রোজা বন্ধ থাকলেও ইবাদতের দরজা বন্ধ হয় না।
* হাদিস শরিফে এসেছে, রমজানের শেষ দশকে রাসুলুল্লাহ (সা.) কোমর বেঁধে ইবাদতে নামতেন এবং পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন।
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ أَحْيَا اللَّيْلَ وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ وَجَدَّ وَشَدَّ الْمِئْزَرَ .
রমযানের শেষ দশক শুরু হওয়ার সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সারা রাত জেগে থাকতেন ও নিজ পরিবারের সদস্যদের ঘুম থেকে জাগাতেন এবং তিনি নিজেও ইবাদতের জন্য জোর প্রস্তুতি নিতেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নংঃ ১১৭৪)
* ওলামায়ে কেরামগণ এর ব্যাখ্যা করেছেন, ইবাদত ও আনুগত্যের মাধ্যমে রাতকে জীবন্ত রাখা।
নামাজ, জিকির এবং কুরআন তিলাওয়াতের সমন্বয়ই হলো রাত জাগরণ। তাই নামাজ ও তিলাওয়াত ছাড়াও অন্যান্য জিকির ও ইবাদতে পুরো রাত কাটানোর মাধ্যমেও রাত জাগরণ করা যায়।
* মাসিক অবস্থায় একজন নারীর করণীয় ইবাদত
মূলত ইবাদত হচ্ছে আল্লাহ ও তার রাসুলের আদেশ ও নিষেধ পুংখানরুপে আদায় করা। যেহেতু শরিয়তের নির্দেশে আপনি নামাজ পড়ছেন না, তাই নামাজ না পড়াই তখন আপনার জন্য বড় ইবাদত।
* তবে সওয়াব হাসিলের জন্য আপনি নিচের কাজগুলো করতে পারেন:
* তওবা ও ইস্তিগফার: এই রাতটি ক্ষমা পাওয়ার রাত। তাই বেশি বেশি 'আসতাগফিরুল্লাহ' এবং 'সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার' পড়ুন।
সাইয়্যেদুল ইস্তিগফা,
اَللّٰهُمَّ أَنْتَ رَبِّيْ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِيْ وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلٰى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوْءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوْءُ لَكَ بِذَنْبِيْ فَاغْفِرْ لِي ْ فَإِنَّهٗ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ إِلَّا أَنْتَ
উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা আনতা রব্বী লা-ইলাহা ইল্লা আনতা খালাক্কতানী ওয়া আনা আ’বদুকা ওয়া আনা আ’লা- আ’হ্দিকা ওয়া ও’য়াদিকা মাসতাত্ব’তু আ’উযুবিকা মিন শার্রি মা ছা’নাতু আবূ-উলাকা বিনি’মাতিকা আ’লাইয়্যা ওয়া আবূ-উলাকা বিযানবী ফাগ্ফির্লী ফাইন্নাহু- লা-ইয়াগফিরুয্যুনূবা ইল্লা- আনতা।
উপকারিতাঃ
হযরত সাদ্দাদ ইবনে আওস (রাযি) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী কারীম (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি দিলের একিনের সাথে দিনের যে কোন অংশে এই কালিমাগুলো পড়েছে এবং সেইদিন সন্ধ্যার পূর্বে তার মৃত্যু হয়ে গিয়েছে সে জান্নাতীদের মধ্য থেকে হবে। এমনিভাবে যদি কেউ দিলের একিনের সাথে রাত্রের কোন অংশে এই কালিমাগুলো পড়েছে এবং সকাল হওয়ার পূর্বে তার মৃত্যু হয়ে গিয়েছে সে জান্নাতীদের মধ্য হতে হবে।
মাসনুন দোয়া: রাসুল (সা.) আয়েশা (রা.)-কে কদরের রাতে এই দু’আ বলতে শিখিয়েছেন —
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা ইন্নাকা ‘আফুউয়ুন তুহিব্বুল ‘আফওয়া ফা‘ফু ‘আন্নী।
অর্থঃ হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি অতি ক্ষমাশীল, ক্ষমাকে পছন্দ করেন। সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।
হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّهَا قَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ إِنْ وَافَقْتُ لَيْلَةَ الْقَدْرِ مَا أَدْعُو; قَالَ تَقُولِينَ اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
আয়েশা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! বলুন তো, যদি আমি লায়লাতুল কাদর পেয়ে যাই, তাহলে কি দু'আ করবো ? তিনি বললেন তুমি বলবে : اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي ইয়া আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল ক্ষমাকে ভালোবাসেন। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করুন। (সুনানে ইবনে মাজা, হাদীস নংঃ ৩৮৫০)
* জিকির-আজকার: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার এবং 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহই সহ অন্যান্য জিকির-আজকা বা তাসবিহ পাঠ করা।
* কুরআন শ্রবণ ও অনুবাদ পড়া: সরাসরি স্পর্শ না করে তিলাওয়াত শোনা, অর্থ পড়া এবং কুরআনের তাফসির নিয়ে চিন্তা করা।
* দান-সদকাহ: কদরের রাতে দান করার সওয়াব হাজার মাসের চেয়েও বেশি। তাই বেশি বেশি দান-সদকাহ করা।
* অন্যান্য নেক আমল যা হায়েজ অবস্থায় করার অনুমতি আছে সেই সবগুলোও আমল আপনি করতে পারেন।
হায়েজ অবস্থায় কি কি আমল করা যায় তা নিম্নে রেফারেন্সে দেওয়া হলো।
https://muslimbangla.com/masail/28434
উল্লেখ্য, নারীরা যেহেতু ওজরের কারণে নামাজ ও তিলাওয়াত করতে পারছেন না, তাই তাদের জন্য নামাজের পরিবর্তে জিকির ও দু’আই হলো সর্বোত্তম আমল। আল্লাহ তা’আলা বান্দার অন্তরের আকুতি দেখেন।
হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে,
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " إِنَّ اللَّهَ لاَ يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ " .
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক চাল-চলন ও বিত্ত-বৈভবের প্রতি নযর করেন না; বরং তিনি নযর করেন তোমাদের অন্তর প্রতি। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নংঃ ২৫৬৪-৩)
* তাই আপনার মন যদি ইবাদতের জন্য ব্যাকুল থাকে, তবে ইনশাআল্লাহ আপনি পূর্ণ সওয়াবই পাবেন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, দারুল কুরআন আল ইসলামিয়া মাদ্রাসা
মুহাম্মদপুর, ঢাকা
রেফারেন্স উত্তর :
প্রশ্নঃ ২৮৪৩৪. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে যে জিকির আজগার করা হয় ওই জিকির গুলো হায়েয অবস্থায় সবসময় করা যাবে কি?? হায়েয অবস্থায় কোন জিকির গুলো করা যাবে জানাবেন,,, অগ্রিম জাঝাকল্লহ খাইরন
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
হায়েয অবস্থায় নামাজ রোযা ও কুরআন শরীফ তিলাওয়াত ব্যতীত অন্যান্য আমল করতে কোন বাধা নেই।
আপনি অন্যান্য দিনের আমলগুলো হায়েয অবস্থায় করে যেতে পারবেন বরং এটাই উত্তম হবে।। এছাড়াও হায়েয অবস্থায় অনেক আমল করা যায় যেমন,
১) যত খুশি যিকির করা যায়।
২) যত খুশি ইস্তেগফার করা যায়।
৩) জাহান্নামের ভয়াবহতা নিয়ে গভীর চিন্তা করা যায়। [কারণ হায়েজ অবস্থায় সময় বেশি পাওয়া যায়]
৪) জান্নাত নিয়ে গভীর চিন্তার সাগরে ডুবে থাকা যায়।
৫) অতিমাত্রায় দুরুদ পাঠ করা যায়।
৬) দোয়া কবুলের সময়গুলোতে বেশি বেশি দোয়া করা যায়।
৭) রাতের শেষাংশে অল্প সময়ের জন্য উঠে আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা যায়।
৮) সবথেকে বড় কথা, অতিমাত্রায় দোয়া, দুরুদ- যিকির, ইস্তেগফার পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় এবং নেকির পাল্লা ভারি করা যায় যা নাজাতের পথ।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া মুহাম্মাদিয়া আরবিয়া মোহাম্মদপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন