দানের চেয়েও করজে হাসানা উত্তম আমল
প্রশ্নঃ ১৪৮৮৫৩. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, ইসলামে টাকা ধার দেওয়া ফজিলত ও দান করার চেয়ে উত্তম??
৩০ এপ্রিল, ২০২৬
ঢাকা ১২১২
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রিয় প্রশ্নকারী দ্বীনি ভাই! আপনি সঠিক শুনেছেন।
করজে হাসানা বর্তমান যুগে সুদভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থার বিপরীতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ ও নেক আমল। আজকের সমাজে যখন সর্বত্র সুদের লেনদেন ছড়িয়ে পড়েছে এবং মানুষ বাধ্য হয়ে সুদের জালে আবদ্ধ হচ্ছে, তখন করজে হাসানা হতে পারে একটি পবিত্র ও কার্যকর বিকল্প।
বাস্তবতা হলো, সমাজে করজে হাসানার প্রচলন যত কমে যাচ্ছে, ততই সুদভিত্তিক ঋণের বিস্তার বাড়ছে। মানুষ যখন প্রয়োজনের সময় সুদবিহীন সহযোগিতা পায় না, তখন বাধ্য হয়ে সুদের পথেই ঝুঁকে পড়ে। ফলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই ধীরে ধীরে একটি গুনাহভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যায়।
হাদীস থেকে জানা যায় যে, করজে হাসানার সওয়াব অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ দান-সদকার চেয়েও বেশি। কারণ দান সাধারণত এমন ব্যক্তিকেই দেওয়া হয়, যে অভাবগ্রস্ত; কিন্তু ঋণ চায় সেই ব্যক্তি, যার বাস্তব প্রয়োজন আছে, সে তার প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য কামনা করে। তাই করজে হাসানার মাধ্যমে মানুষের প্রয়োজন পূরণ হয় সম্মান বজায় রেখে, যা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ।
অতএব, সমাজে সুদের বিস্তার রোধ করতে এবং পারস্পরিক সহমর্মিতা জাগ্রত করতে করজে হাসানার চর্চা পুনরুজ্জীবিত করা অত্যন্ত জরুরি। এটি শুধু একটি আর্থিক সহায়তা নয়; বরং একটি মহান ইবাদত, যা দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ বয়ে আনে।
হাজতনমন্দ ও প্রয়োজনমন্দ ব্যক্তিকে ঋণ প্রদান করা মূলত তার সাহায্য করা। হাদিস থেকে জানা যায় যে, এর সওয়াব অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ সদকার চেয়েও বেশি। একইভাবে হাদিসে ঋণের মাধ্যমে কারো সাথে সহযোগিতা করার ব্যাপারে বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।
কিন্তু বর্তমানে করজে হাসানা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, ঋণ সময়মতো পরিশোধ না করা। অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি ঋণ পরিশোধ করার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিলম্ব করে, তা জুলুম।” (বুখারী,২২৪২)
অন্য হাদিসে ঋণগ্রহীতাকে সময় দেওয়ারও বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি কোনো অসচ্ছল ব্যক্তিকে সময় দেয়, সে প্রতিদিন সদকার সওয়াব পায়; আর নির্ধারিত সময়ের পরও যদি সময় দেয়, তবে প্রতিদিন দ্বিগুণ সওয়াব পায়।” (ইবনে মাজাহ, ২৪১৮)
অতএব, ঋণগ্রহীতার উচিত সময়মতো ঋণ পরিশোধ করা এবং ঋণদাতার উচিত সহনশীলতা অবলম্বন করা, তাহলেই সমাজে করজে হাসানার এই গুরুত্বপূর্ণ আমল পুনরুজ্জীবিত হবে।
দানের চেয়েও করজে হাসানা উত্তম হওয়া বিষয়ে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
১. সুনানে তিরমিযিতে আসছে:
عن البراء قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: " مَنْ مَنَحَ مَنِيحَةَ لَبَنٍ أَوْ وَرِقٍ أَوْ هَدَى زُقَاقًا كَانَ لَهُ مِثْلُ عِتْقِ رَقَبَةٍ "
অনুবাদ: বারা ইবনে আযিব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, কেউ যদি দুধের জন্য মিনহা [১] প্রদান করে বা কাউকে অর্থঋণ দেয় বা পথ হারা লোককে পথ দেখিয়ে দেয় তবে একটি গোলাম আযাদ করার মত সাওয়াব তার হবে।
[১] উট বা বকরী ইত্যাদির মালিকানা নিজের রেখে এর দুধ পান করার জন্য কাউকে তা দিয়ে দেওয়া। (সুনান তিরমিযী, হাদীস: ১৯৫৭ )
২. মুসনাদে আহমদে এসেছে:
’’ عَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ كَانَ لَهُ عَلَى رَجُلٍ حَقٌّ، فَمَنْ أَخَّرَهُ كَانَ لَهُ بِكُلِّ يَوْمٍ صَدَقَةٌ‘‘. (رواه احمد)
অনুবাদ: হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলিয়াছেনঃ যে ব্যক্তির প্রাপ্য থাকে অপর কাহারও উপর, সে যদি খাতককে কিছু দিনের সময় দান করে, তবে প্রতিদিনের বিনিময়ে সদকা বা দান-খয়রাত করার সওয়াব তাহার লাভ হইবে।(মুসনাদে আহমদ, হাদীস: ১৯১৩১ ; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস: ২৯২৭)
৩. হাশিয়াতুস সিন্দি আলা সুনান ইবনে মাজাহ (2/81):
"حدثنا محمد بن خلف العسقلاني حدثنا يعلى حدثنا سليمان بن يسير عن قيس بن رومي قال: كان سليمان بن أذنان يقرض علقمة ألف درهم إلى عطائه فلما خرج عطاؤه تقاضاها منه واشتد عليه فقضاه، فكأن علقمة غضب فمكث أشهرًا، ثم أتاه فقال: أقرضني ألف درهم إلى عطائي، قال: نعم و كرامة يا أم عتبة هلمي تلك الخريطة المختومة التي عندك فجاءت بها، فقال: أما والله إنها لدراهمك التي قضيتني ما حركت منها درهمًا واحدًا، قال: فللّٰه أبوك ما حملك على ما فعلت بي، قال: ما سمعت منك، قال: ما سمعت مني؟ قال: سمعتك تذكر «عن ابن مسعود أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: ما من مسلم يقرض مسلمًا قرضًا مرتين إلا كان كصدقتها مرةً، قال: كذلك أنبأني ابن مسعود»."
অনুবাদ: হযরত কায়স ইবনে রূমী বলেন, সুলায়মান ইবনে আযনান হযরত আলকামাহকে তার ভাতা পাওয়া পর্যন্ত এক হাজার দিরহাম ঋণ দিয়েছিলেন। যখন তার ভাতা বের হলো, তখন সুলায়মান ঋণ পরিশোধের দাবি করলেন এবং কিছুটা কঠোরতাও করলেন, ফলে আলকামাহ তা পরিশোধ করে দিলেন। এতে মনে হলো আলকামাহ অসন্তুষ্ট হয়েছেন। এরপর কয়েক মাস অতিবাহিত হলো। পরে তিনি সুলায়মানের কাছে এসে বললেন: আমার ভাতা পাওয়া পর্যন্ত আমাকে আবার এক হাজার দিরহাম ঋণ দিন। তিনি বললেন: হ্যাঁ, অবশ্যই—সম্মান ও আনন্দের সাথে। হে উম্মু উতবা! তোমার কাছে যে সিলমোহর করা থলে আছে তা নিয়ে আসো। তিনি নিয়ে এলে তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! এগুলোই তোমার সেই দিরহাম, যা তুমি আমাকে দিয়েছিলে; আমি এর এক দিরহামও নড়াইনি। আলকামাহ বললেন: আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন, তুমি আমার সাথে এমন আচরণ কেন করেছিলে? তিনি বললেন: আমি তোমার থেকে যা শুনেছি তার কারণে। তিনি বললেন: তুমি আমার থেকে কী শুনেছ? তিনি বললেন: আমি তোমাকে ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করতে শুনেছি যে, নবী ﷺ বলেছেন: কোনো মুসলিম যদি অন্য মুসলিমকে দুইবার ঋণ দেয়, তবে তা একবার সদকা করার সমান সওয়াব পায়। তিনি বললেন: হ্যাঁ, ইবনে মাসউদ আমাকে এভাবেই জানিয়েছেন।
★ কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে এই বিষয়ে অবতীর্ণ হয়েছে,
(১)
مَنْ ذَا الَّذِی یُقْرِضُ اللہَ قَرْضاً حَسَناً فَیُضَاعِفَہُ لَہُ اَضْعَافاً کَثِیْرَةً وَاللہُ یَقْبِضُ وَیَبْسُطُ وَاِلَیْہِ تُرْجَعُوْنَ (البقرة: 245)
অনুবাদ:
কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম পন্থায় ঋণ দেবে, ফলে তিনি তার কল্যাণে তা বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন? আল্লাহই সংকট সৃষ্টি করেন এবং তিনিই স্বচ্ছলতা দান করেন, আর তাঁরই কাছে তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।
(বাকারা, ২৪৫ নং আয়াত)
(২)
وَاَقْرَضْتُمُ اللہَ قَرْضاً حَسَناً لَاُکَفِّرَنَّ عَنْکُمْ سَیِّئَاتِکُمْ وَلَاُدْخِلَنَّکُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِھَا الْاَنْھَارُ (المائدة: 12)
অনুবাদ:
এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান কর, ১৫ তবে অবশ্যই আমি তোমাদের পাপরাশি মোচন করব এবং তোমাদের এমন উদ্যানরাজিতে দাখিল করব, যার তলদেশে নহর প্রবহমান থাকবে। এরপরও তোমাদের মধ্য হতে কেউ কুফর অবলম্বন করলে, প্রকৃতপক্ষে সে সরল পথই হারাবে। (মায়িদা: ১২)
(৩)
مَنْ ذَا الَّذِی یُقْرِضُ اللہَ قَرْضاً حَسَناً فَیُضَاعِفَہُ لَہُ وَلَہُ اَجْرٌ کَرِیْمٌ (الحدید: 11)
অনুবাদ:
কে আছে, যে আল্লাহকে ঋণ দেবে, উত্তম ঋণ? তাহলে তিনি দাতার জন্য তা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেবেন এবং তার জন্য রয়েছে মহা প্রতিদান।
(হাদীদ: ১১)
আরো দেখুন: সূরা হাদীদ ১৮; তাগাবুন: ১৭; মুযযাম্মিল : ২০।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
শাহাদাত হুসাইন ফরায়েজী
মুফতী, ফাতাওয়া বিভাগ, মুসলিম বাংলা
লেখক ও গবেষক, হাদীস বিভাগ, মুসলিম বাংলা
খতীব, রৌশন আলী মুন্সীবাড়ী জামে মসজিদ, ফেনী
মুফতী, ফাতাওয়া বিভাগ, মুসলিম বাংলা
লেখক ও গবেষক, হাদীস বিভাগ, মুসলিম বাংলা
খতীব, রৌশন আলী মুন্সীবাড়ী জামে মসজিদ, ফেনী
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১