স্ত্রীর অভিযোগ : স্বামী আমাকে মূল্যায়ন করে না!
প্রশ্নঃ ১৫৬৪৫৮. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমার বিবাহিত আমার স্বামি আমার কোনো কথায় রাখে না সব সময় মা বোনদের কথায় চলে,আমার শাশুরি তাবিজ করে রাখে ওদের যদিও আমি তেমন ওইগুলো বিশ্বাস করি না এই অবস্থায় আমি কি করবো? অনেক কস্ট হয় আমার কাউকে বলতে পারি নাহ!😭
১১ জুন, ২০২৬
হাটহাজারী
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
এটি একটি জটিল ও সূক্ষ্ম বিষয় যা ভারসাম্যপূর্ণ বোঝাপড়ার প্রয়োজন। এক, দুই কথায় এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছা সম্ভব নয়। সুতরাং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
শ্বশুরবাড়ির সম্পর্ক— আবহমানকাল থেকে চলমান। আর বউ-শাশুড়ীর ব্যাপারটা যেনো আল্লাহ তায়ালার কুদরাতেরই একটি বহিঃপ্রকাশ। আজ যিনি কণ্যা কাল তিনি বধু। পরশু তিনিই হয়ে যান পরম মমতাময়ী মা। কিছুদিন যেতে না যেতেই তিনি আরেকজন নারীর মা হিসেবে আবির্ভূত হন। সমাজ যাকে শাশুড়ী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। মানবসভ্যতার শুরু থেকেই এই ব্যবস্থা। কালের ঘুর্ণাবর্তে এতে ব্যাত্যয় ঘটেনি। ব্যাপারটা নিয়ে নতুন ও আলাদা করে কিছু বলতে হয় না।
তবে সমাজে সমস্যাটা যেখানে সৃষ্টি হয় সেটা হলো, স্বামী, স্ত্রী, শ্বশুর-শাশুড়ি এবং শশুর বাড়ীর লোকেরা নিজেদের দায়িত্ব, অধিকার এবং প্রাপ্তি সীমা ভুলে গিয়ে অন্যের ওপর অনধিকার চর্চা করে, অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করে।
বর্তমানে অধিকাংশ মানুষের মাঝে স্বার্থপরতা, জুলুম, অন্যের ক্ষতিসাধনের মনসিকতা তৈরী হয়েছে। প্রত্যেকেই নিজের প্রাপ্তি ও অধিকার সম্পর্কে সচেতনতার দাবী করেন। কিন্তু অন্যের পাওনা-দেনার ব্যাপ্যারে ধোড়াই কেয়ার করেন!! ভাবখানা এমন “নিজের বেলায় ষোল আনা-পরের বেলায় শুন্য আনা”।
ইসলামী শরীয়তে সকলের প্রাপ্যতা এবং অধিকারই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবং প্রতিটির নিজস্ব ক্ষেত্র ও সীমা রয়েছে।
আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াসে বিষয়টি সমাধানের চেষ্ট করব।
وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ ۚ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ
পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য:
দেখুন সুরা বানিইসরাইল, আয়াত:23-24
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا 23 وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرً 24
অর্থ : তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও এবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব-ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদেরকে ‘উহ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না এবং বল তাদেরকে শিষ্ঠাচারপূর্ণ কথা। তাদের সামনে ভালবাসার সাথে, নম্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বলঃ হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় বান্দাদের স্বীয় ইবাদাতের সাথে সাথে পিতামাতার সাথে সদাচরণ এবং তাদের জন্য দোয়া করতে নির্দেশ দিয়েছে। এই আয়াত ছাড়া আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমের সুরা নিসা-এর ৩৬ নং আয়াত, সুরা লোকমান ১৪ নং আয়াত, সুরা আনকাবুত ৮ নং আয়াত, সুরা নূহ এর ২৮ নং আয়াতে এবং বুখারি মুসলিমের হাদিসসহ অসংখ্য হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা. সন্তাতকে পিতামাতার খেদমত এবং তাদের সাথে সদ্ব্যহারের আদেশ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন।
রাসূল সা.-এক হাদিসে বলেন,
حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدِ بْنِ جَمِيلِ بْنِ طَرِيفٍ الثَّقَفِيُّ، وَزُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، قَالاَ حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ عُمَارَةَ بْنِ الْقَعْقَاعِ، عَنْ أَبِي زُرْعَةَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ مَنْ أَحَقُّ النَّاسِ بِحُسْنِ صَحَابَتِي قَالَ " أُمُّكَ " . قَالَ ثُمَّ مَنْ قَالَ " ثُمَّ أُمُّكَ " . قَالَ ثُمَّ مَنْ قَالَ " ثُمَّ أُمُّكَ " . قَالَ ثُمَّ مَنْ قَالَ " ثُمَّ أَبُوكَ " . وَفِي حَدِيثِ قُتَيْبَةَ مَنْ أَحَقُّ بِحُسْنِ صَحَابَتِي وَلَمْ يَذْكُرِ النَّاسَ .
৬২৬৯। কুতায়বা ইবনে সাঈদ ইবনে জামীল ইবনে তারীফ সাকাফী ও যুহাইর ইবনে হারব (রাহঃ) ......... আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কছে এলো এবং সে প্রশ্ন করল,ইয়া রাসুলাল্লাহ! মানুষের মধ্যে আমার সদ্ব্যবহারের সর্বাধিক ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, এরপরও তোমার মা। সে বললঃ এরপর কে? তিনি বললেন, এরপরও তোমার মা। সে বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, তোমার পিতা। আর কুতায়বা বর্ণিত হাদীসে “আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার সর্বাপেক্ষা যোগ্য কে” এর উল্লেখ আছে। তিনি তাঁর বর্ণনায় (النَّاسَ) মানুষ শব্দটি উল্লেখ করেননি। সহীহ মুসলিম, হাদীস নংঃ ৬২৬৯।
কাজেই প্রত্যেক সন্তানের ওপর আবশ্যক হলো তার পিতামাতার যথাযথ হক রক্ষা করা।
সাথেসাথে ভাই বোন এবং আত্মীয় স্বজনদের অধিকার রক্ষা করা।
স্ত্রীর অধিকার।
ঠিক একইভাবে স্ত্রীর সাথেও সদাচরণ বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। কুরআরেন এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
আয়াতঃ یٰۤ ۚ وَعَاشِرُوۡہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۚ فَاِنۡ کَرِہۡتُمُوۡہُنَّ فَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَہُوۡا شَیۡئًا وَّیَجۡعَلَ اللّٰہُ فِیۡہِ خَیۡرًا کَثِیۡرًا
অর্থ: আর তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবন যাপন কর। তোমরা যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে যে, তোমরা কোনও জিনিসকে অপছন্দ করছ অথচ আল্লাহ তাতে প্রভূত কল্যাণ নিহিত রেখেছেন। সূরাঃ আন নিসা - আয়াত নং 19
রাসূল সা. হাদিসে বলেন,
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يَحْيَى قَالَ: حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يُوسُفَ قَالَ: حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي، وَإِذَا مَاتَ صَاحِبُكُمْ فَدَعُوهُ» هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ [من حديث الثوري ما أقل من رواه عن الثوري] وَرُوِيَ هَذَا عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُرْسَلًا
৩৮৯৫। মুহাম্মাদ ইব্ন ইয়াহ্ইয়া (রাহঃ)... আয়িশা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে উত্তম হল সে, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে উত্তম । তোমাদের এ সঙ্গী (অর্থাৎ আমি) যখন মারা যাবে, তার জন্য তোমরা দু'আ করবে। জামে' তিরমিযী, হাদীস নংঃ ৩৮৯৫
তবে হ্যাঁ, ভরণপোষণ ও ব্যয় বহন করার ক্ষেত্রে স্ত্রী ও সন্তানাদি প্রাধান্য পাবে। যদি এমন পরিস্থিতি দেখা দেয় যে, বাবা-মা নিজেদের খরচ বহন করতে পারছেন না। বরং আপনাকে তাদের ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। তাহলে এক্ষেত্রে আপনি প্রথমে আপনার স্ত্রী ও সন্তানাদির খরচের ব্যবস্থা করবেন, তারপর বাবা-মার খরচের ব্যবস্থা করবেন।
কেননা স্ত্রীর ভরণপোষণ দেওয়া স্বামীর ওপর ওয়াজিব :
«بدائع الصنائع في ترتيب الشرائع» (4/ 15):
«أَمَّا وُجُوبُهَا فَقَدْ دَلَّ عَلَيْهِ الْكِتَابُ وَالسُّنَّةُ وَالْإِجْمَاعُ وَالْمَعْقُولُ أَمَّا الْكِتَابُ الْعَزِيزُ فَقَوْلُهُ عز وجل {أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنْتُمْ مِنْ وُجْدِكُمْ} [الطلاق: 6]»
অর্থাৎ, "ইমাম কাসানী 'বাদায়েউস সানায়ে' গ্রন্থে বলেছেন: স্ত্রীর নফকা কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমা দ্বারা ওয়াজিব।"
«الفتاوى العالمكيرية = الفتاوى الهندية» (1/ 544):
«تَجِبُ عَلَى الرَّجُلِ نَفَقَةُ امْرَأَتِهِ الْمُسْلِمَةِ وَالذِّمِّيَّةِ وَالْفَقِيرَةِ وَالْغَنِيَّةِ دَخَلَ بِهَا أَوْ لَمْ يَدْخُلْ»
পুরুষের দায়িত্ব :
সন্তান হিসেবে পুরুষের দায়িত্ব হলো, পিতা মাতার যথাযথ হক আদায় করা। তাদের দিকে ঝুঁকে গিয়ে স্ত্রীর ওপর জুলুম অথবা অনধিক চর্চা না করা। আবার স্বামী হিসেবে স্ত্রীর যাবতীয় হক আদায় করা। তাকে মূল্যায়ন করা। পারিবারিক বিষয়ে তার সাথে অন্যায় আচরণ না করা।
স্ত্রীর দায়িত্ব:
স্ত্রী হিসেবে একজন নারীর ওপর দায়িত্ব হলো তিনি তার স্বামীর মাল এবং সংসারের হেফাজতকারী। পারিবারিক বিষয়ে তিনিও অযাচিত হস্তক্ষেপ করবেন না। স্বামীর কাছ থেকে তার ন্যায্য অধিকার পেয়ে সন্তুষ্ট থাকবেন।
পরামর্শ : সম্মানিত বোন! যেহেতু পারিবারিক কলহ বিবাদ সম্পর্কিত বিষয় তাই এক পাক্ষিক কথা শোনে সমাধান দেওয়া যাবে না। তবে আপনি যদি আপনার স্বামীর কাছ থেকে উপরোক্ত অধিকারটুকু পেয়ে থাকেন তাহলে সন্তুষ্ট থাকুন। আর যদি বাস্তবেই আপনার স্বামী আপনার ওপর জুলুম করে থাকে তাহলে বিষয়টি তার সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন। সমাধান না হলে পারিবারিকভাবে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিন। আল্লাহ তায়ালা আপনাকে সুখময় দাম্পত্য জীবন দান করুন। আমিন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
সাইদুজ্জামান কাসেমি
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১