অনুমতি ছাড়া আমানতের টাকা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা অন্যায়
প্রশ্নঃ ১৫৬৮১৫. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমতুল্লাহ।
মুহতারাম মুফতি সাহেব,
আশা করি আল্লাহ তাআলার অশেষ রহমতে ভালো আছেন। দ্বীনের বহুমুখী খিদমতে আপনার দীর্ঘায়ু ও সুস্থতা কামনা করছি। বাস্তব জীবনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক লেনদেন ও জটিলতার শরয়ী সমাধান এবং দলিলসহ বিস্তারিত মাসআলা জানার জন্য আপনার শরণাপন্ন হয়েছি। ঘটনা দুটি নিচে বিস্তারিত উল্লেখ করা হলো:
(একই ধরনের দুইটি মাসআলা, এই জন্যই এক সাথেই উল্লেখ করেছি, যদিও শর্তের মধ্যে একাধিক প্রশ্নের জন্য মানা আছে, দয়া করে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি কামনা করি)
১ম ঘটনা (কর্মচারী কর্তৃক বিলের টাকা ব্যবহার):
একটি ফ্যাক্টরির বিদ্যুৎ বিল এসেছে ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা। বিল পরিশোধের শেষ তারিখ চলতি মাসের ১৫ তারিখ। ফ্যাক্টরি কর্তৃপক্ষ বিলটি পরিশোধ করার জন্য গত ৮ তারিখে একজন কর্মকর্তার কাছে নগদ ৫০,০০০ টাকা বুঝিয়ে দেন। কিন্তু সেই কর্মকর্তা ৮ তারিখে বিলটি পরিশোধ না করে, টাকাটি নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বা ব্যবসায় খাটান। পরবর্তীতে তিনি নির্ধারিত শেষ তারিখে (১৫ তারিখে) ঠিকই ফ্যাক্টরির বিদ্যুৎ বিলটি পরিশোধ করে দেন। এতে ফ্যাক্টরির বাহ্যিক কোনো আর্থিক ক্ষতি বা জরিমানা হয়নি।
এই সুরতে জানার বিষয় হলো: মালিকের অজান্তে বা অনুমতি ছাড়া কর্মকর্তা কর্তৃক মাঝখানের এই কয়েকদিন টাকাটি নিজের কাজে ব্যবহার করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হয়েছে কি? যদি বৈধ না হয়, তবে এটি আমানতের খেয়ানত বা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা?
২য় ঘটনা (বিকাশ এজেন্ট কর্তৃক বিলের টাকা আটকে রাখা):
আমাদের গ্রামাঞ্চলে বা মফস্বলে অনেক সাধারণ মানুষ বিকাশ এজেন্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে থাকেন। গ্রাহক যখন এজেন্টের দোকানে এসে বিদ্যুৎ বিলের মূল টাকা এবং নির্ধারিত বিল-পে চার্জ প্রদান করেন, এজেন্ট তখন সাথে সাথে গ্রাহককে তার দোকানের একটি নিজস্ব রিসিট বা টোকেন (টাকা প্রাপ্তির প্রমাণস্বরূপ) দিয়ে দেন। গ্রাহক ভাবেন তার বিল পরিশোধ হয়ে গেছে। কিন্তু এজেন্ট সাথে সাথে অ্যাপ বা সিস্টেমের মাধ্যমে বিলটি পে না করে, সেই টাকা নিজের কাছে রেখে দেন বা নিজের অন্য ব্যবসায় খাটান। অতঃপর বিল দেওয়ার একদম শেষ তারিখে (যেমন ১৫ তারিখে) তিনি সেই বিলটি সিস্টেমের মাধ্যমে পরিশোধ করে দেন।
এই সুরতে জানার বিষয় হলো: গ্রাহকের অজান্তে এজেন্ট কর্তৃক এই টাকাটি নিজের কাছে আটকে রেখে অন্য ব্যবসায় খাটানো শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ আছে কি? শেষ তারিখে বিল পরিশোধ হয়ে গেলেও মাঝখানের এই প্রক্রিয়ার শরয়ী হুকুম কী?
উপরোক্ত বিষয় দুটির সুনিশ্চিত, দলিলভিত্তিক ও বিস্তারিত সমাধান প্রদান করে বাধিত করবেন।
বিনীত,
আপনার দ্বীনি ভাই
মাওলানা শরীফুল ইসলাম
শুকুন্দী, শিবপুর, নরসিংদী।
মোবাইলঃ ০১৭৪৭৮৭৮২৩৩
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রিয় প্রশ্নকারী দ্বীনি ভাই! আল্লাহ তায়ালা আপনাকেও সুস্থতার সাথে ঈমান ও নেক আমলে সমৃদ্ধ দীর্ঘ হায়াত দান করুন। এবং দ্বীনি ইলম অন্বেষণে আরও বেশি অগ্রগামী হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন!!
আপনার প্রশ্নের উত্তর নিম্নরূপ-
মৌলিক কথা : অনুমতি ব্যতীত আমানতের টাকা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা জায়েয নেই। এরূপ করা নিশ্চয়ই খেয়ানত বলে গণ্য হবে। যা অন্যায় ও গুনাহের কাজ। এর থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
প্রশ্নোক্ত উভয় ক্ষেত্রেই, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ বাবদ দেওয়া টাকা গ্রহণকারীদের (ফ্যাক্টরির কর্মকর্তা এবং বিকাশ এজেন্ট) নিকট আমানত বলে বিবেচিত হবে। তাদের দায়িত্ব যথা সময়ে আমানত আদায় করা। অর্থাৎ দাতাগণ (ফ্যাক্টরির কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ গ্রাহক) যে সময়ে বিল পরিশোধের কথা বলেছেন সে সময় আমানতদারিতার সাথে বিদ্যুৎ বিল আদায় করা। এর ব্যতিক্রম করার কোন সুযোগ নেই। ব্যতিক্রম করা, তথা বিদ্যুৎ বিল বাবদ দেওয়া টাকা অনুমতি ব্যতীত ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা কোনভাবেই বৈধ হবে না। ব্যবহার করলে তা অবশ্যই আমানতের খেয়ানত বলে গণ্য হবে। তখন তা আর আমানত হিসেবে থাকবে না। বরং যামানত হয়ে যাবে। অর্থাৎ বিল পরিশোধের পূর্বে উক্ত বিলের টাকার কোন প্রকার ক্ষয়-ক্ষতি হলে তার পূর্ণ জরিমানা তাদেরকে দিতে হবে।
উল্লেখ্য, শরিয়তের দৃষ্টিতে আমানত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমানত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন-
﴿إِنَّ ٱللَّهَ يَأۡمُرُكُمۡ أَن تُؤَدُّواْ ٱلۡأَمَٰنَٰتِ إِلَىٰٓ أَهۡلِهَا﴾ [النساء: 58]
(হে মুসলিমগণ!) নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারকে আদায় করে দেবে। -সূরা নিসা, আয়াত নং ৫৮
আমানত রক্ষা করা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, আমানতকে ঈমানের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
لَا إِيمَانَ لِمَنْ لَا أَمَانَةَ لَهُ.
যার মধ্যে আমানত নেই তার ঈমান নেই। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১২৩৮৩; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদীস নং ৩২৩৩২
আমানত আদায় ও খেয়ানত করা নিষেধ সম্পর্কে হাদীসে এসেছে-
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
أَدِّ الأَمَانَةَ إِلَى مَنْ ائْتَمَنَكَ، وَلاَ تَخُنْ مَنْ خَانَكَ.
যে তোমার নিকট আমানত রেখেছে তার আমানত আদায় করে দাও। যে তোমার সাথে খেয়ানত করেছে তার সাথেও খেয়ানত করো না। -সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১২৬৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৫৩৫
সুতরাং সর্বাবস্থায় সর্ব প্রকার আমানত রক্ষা করা অতীব জরুরি। সামান্য পার্থিব উদ্দেশ্যে আমানতের খেয়ানত করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
من المستندات الشرعية
** «الدر المختار» (6/ 200):
«لا يجوز التصرف في مال غيره بلا إذنه ولا ولايته»
** « الفتاوى الهندية» (4/ 338):
«فأما وجوب الحفظ فيلزم على المودع فلا بد من قبوله، والدلالة إذا وضع عنده متاعا ولم يقل شيئا، أو قال: هذا وديعة عندك، وسكت الآخر صار مودعا حتى لو غاب الآخر فضاع ضمن؛ لأنه إيداع وقبول عرفا، كذا في خزانة المفتين.»
«وأما حكمها فوجوب الحفظ على المودع وصيرورة المال أمانة في يده ووجوب أدائه عند طلب مالكه، كذا في الشمني.»
** «مرقاة المفاتيح شرح مشكاة المصابيح» (1/ 126):
«وَحَقُّ الْأَمَانَةِ أَنْ تُؤَدَّى إِلَى أَهْلِهَا، فَالْخِيَانَةُ مُخَالَفَةٌ لَهَا،»
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন