কেন আল্লাহর ইবাদত করতে হবে?-কুরআন-সুন্নাহ ও যুক্তি-দর্শনের আলোকে
প্রশ্নঃ ১৬২৭৬৪. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আল্লাহ্কে কেন ইবাদত বা উপাসনা করতে হবে? তিনি তো এমনিতেই মহান! আর তাঁর ইবাদত না করলে তিনি কেন আমাদের শাস্তি দেবেন? তিনি তো তাঁর নিজের ইচ্ছায় আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমরা তো জন্ম নেওয়ার জন্য আবেদন করিনি—তাহলে এমন কেন?
২৬ জুলাই, ২০২৬
ঢাকা
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
কেন আল্লাহর ইবাদত করতে হবে?-কুরআন-সুন্নাহ ও যুক্তি-দর্শনের আলোকে
আল্লাহর কেন ইবাদত করতে হবে? আমরা তো জন্ম নিতে চাইনি- তাহলে কেন তাঁর আনুগত্য করতে হবে? ইবাদত না করলে তিনি কেন আমাদের শাস্তি দেবেন?
এমন প্রশ্ন নতুন নয়; বরং যুগে যুগে মানুষের মনে এসেছে। অনেকেই জানতে চান- "আল্লাহ তো এমনিতেই মহান। আমাদের ইবাদতে তাঁর কী লাভ? আমরা যদি ইবাদত না করি, তাহলে তিনি কেন শাস্তি দেবেন? তিনি তো তাঁর নিজের ইচ্ছায় আমাদের সৃষ্টি করেছেন; আমরা তো জন্ম নেওয়ার জন্য আবেদন করিনি!"
ইসলাম এমন প্রশ্নকে নিষিদ্ধ করেনি; বরং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এর যুক্তিসংগত উত্তর দিয়েছে। তবে এর উত্তর বুঝতে হলে প্রথমেই একটি মৌলিক বিষয় উপলব্ধি করতে হবে।
সৃষ্টি হয়ে স্রষ্টাকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়
মানুষ সৃষ্টি, আর আল্লাহ স্রষ্টা। স্রষ্টার জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সত্তা অসীম; আর মানুষের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। তাই সীমাবদ্ধ সৃষ্টি হয়ে অসীম স্রষ্টার প্রতিটি কাজ ও সিদ্ধান্তের পূর্ণাঙ্গ হিকমাহ অনুধাবন করা কখনোই সম্ভব নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَمَا أُوتِيتُم مِّنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا﴾
"তোমাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে অতি সামান্য।" -সূরা আল-ইসরা ১৭:৮৫
এই সীমাবদ্ধতার একটি চমৎকার উদাহরণ রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। হযরত মূসা আ. ও হযরত খিজির আ. সমুদ্রতীরে নৌকায় অবস্থানকালে-
فَجَاءَ عُصْفُورٌ فَوَقَعَ عَلَى حَرْفِ السَّفِينَةِ، فَنَقَرَ نَقْرَةً أَوْ نَقْرَتَيْنِ فِي الْبَحْرِ. فَقَالَ الْخَضِرُ يَا مُوسَى، مَا نَقَصَ عِلْمِي وَعِلْمُكَ مِنْ عِلْمِ اللَّهِ إِلاَّ كَنَقْرَةِ هَذَا الْعُصْفُورِ فِي الْبَحْرِ.
একটি চড়ুই পাখি নৌকার কিনারায় বসে সমুদ্রে এক বা দুইবার ঠোঁট মারল। তখন খিজির আ. বললেন, ‘হে মুসা! আমার ইলম এবং তোমার ইলম (সব মিলেও) আল্লাহর ইলম থেকে সমুদ্র থেকে চড়ুই পাখির ঠোঁটে যতটুকু পানি এসেছে ততটুকু পরিমাণও কমাতে পারবে না। -সহিহ বুখারী, হাদীস: ১২২; সহিহ মুসলিম, হাদীস: ২৩৮০
অতএব, সীমিত জ্ঞান দিয়ে অসীম স্রষ্টার প্রতিটি প্রজ্ঞা বুঝে ফেলার দাবি নিজেই অযৌক্তিক। যদি সৃষ্টি হয়ে মানুষ স্রষ্টার সমস্ত জ্ঞান ও হিকমাহ অনুধাবন করতে পারত, তাহলে সৃষ্টি ও স্রষ্টার মধ্যে পার্থক্যই বা কোথায় থাকত?
এ কারণেই আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল অত্যন্ত গভীর একটি কথা বলেছেন-
"جو سمجھ میں آ گیا، پھر وہ خدا کیوں کر ہوا؟"
অর্থাৎ, "যাকে মানুষের সীমিত বুদ্ধি সম্পূর্ণভাবে আয়ত্ত করে ফেলতে পারে, সে আবার কেমন স্রষ্টা?"
ঈমান কি শুধু যুক্তির নাম?
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
ইসলাম কখনো অন্ধবিশ্বাস শিক্ষা দেয় না। আবার এটাও বলে না যে, আল্লাহর প্রতিটি সিদ্ধান্তের সব হিকমাহ আগে বুঝে নিতে হবে, তারপর বিশ্বাস করতে হবে।
বরং ইসলাম প্রথমে মানুষকে চিন্তা করতে, প্রমাণ দেখতে এবং সত্য অনুসন্ধান করতে আহ্বান জানায়। যখন অকাট্য দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে মানুষ নিশ্চিত হয় যে, আল্লাহই সত্য এবং মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর রাসূল, তখন ঈমানের দাবি হলো পূর্ণ আত্মসমর্পণ।
এ কারণেই ইসলামের নাম "ইসলাম", যার অর্থই আত্মসমর্পণ।
ইসলাম যুক্তির বিপরীত (Against Reason) নয়; বরং অনেক বিষয় যুক্তির ঊর্ধ্বে (Above Reason)। অর্থাৎ, ইসলামের প্রতিটি বিধানের পেছনে নিখুঁত হিকমাহ রয়েছে। কিছু আমরা বুঝি, কিছু পরে বুঝি, আর কিছু আমাদের সীমাবদ্ধ জ্ঞানের কারণে বুঝতে পারি না।
আল্লাহ মুমিনদের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে-
﴿سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا﴾
"আমরা শুনলাম এবং আনুগত্য করলাম।" -সূরা আল-বাকারা ২:২৮৫
অতএব, "আমি বুঝি না, তাই মানব না"- এটি জ্ঞানের ভাষা নয়; বরং সীমাবদ্ধ বুদ্ধিকে অসীম স্রষ্টার বিচারক বানানোর চেষ্টা।
এখন প্রশ্ন হলো- সেই সর্বজ্ঞ ও সর্বপ্রজ্ঞ আল্লাহ মানুষকে কেন সৃষ্টি করলেন এবং কেন তাঁর ইবাদতের নির্দেশ দিলেন?
১. আল্লাহ মানুষকে একটি মহৎ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন
আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ﴾
"আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।" -সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫৬
এ আয়াতের অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ আমাদের ইবাদতের মুখাপেক্ষী। বরং মানুষের প্রকৃত সফলতা, আত্মশুদ্ধি ও চিরস্থায়ী কল্যাণ নিহিত রয়েছে আল্লাহর ইবাদতের মধ্যেই। যেমন একটি যন্ত্র প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী চললে সঠিকভাবে কাজ করে, তেমনি মানুষও তার স্রষ্টার নির্দেশনা অনুযায়ী চললেই প্রকৃত শান্তি ও সফলতা লাভ করে।
২. আল্লাহর ইবাদতে আল্লাহর কোনো লাভ নেই; লাভ মানুষেরই
আল্লাহ বলেন,
﴿إِن تَكْفُرُوا أَنتُمْ وَمَن فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا فَإِنَّ اللَّهَ لَغَنِيٌّ حَمِيدٌ﴾
"তোমরা এবং পৃথিবীর সবাই যদি কুফরি কর, তবুও আল্লাহ অবশ্যই অমুখাপেক্ষী, সর্বপ্রশংসিত।" -সূরা ইবরাহীম ১৪:৮
আরও বলেন,
﴿مَنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفْسِهِ وَمَنْ أَسَاءَ فَعَلَيْهَا﴾
"যে সৎকর্ম করে, তা তার নিজেরই উপকারে আসে; আর যে অসৎকর্ম করে, তার ক্ষতিও তার নিজের ওপরই বর্তায়।" -সূরা ফুসসিলাত ৪১:৪৬
রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর পক্ষ থেকে বর্ণনা করেন,
يَا عِبَادِي، لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ، وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ، كَانُوا عَلَى أَتْقَى قَلْبِ رَجُلٍ وَاحِدٍ مِنْكُمْ، مَا زَادَ ذَلِكَ فِي مُلْكِي شَيْئًا.
يَا عِبَادِي، لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ، وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ، كَانُوا عَلَى أَفْجَرِ قَلْبِ رَجُلٍ وَاحِدٍ مِنْكُمْ، مَا نَقَصَ ذَلِكَ مِنْ مُلْكِي شَيْئًا.
يَا عِبَادِي، إِنَّمَا هِيَ أَعْمَالُكُمْ أُحْصِيهَا لَكُمْ، ثُمَّ أُوَفِّيكُمْ إِيَّاهَا، فَمَنْ وَجَدَ خَيْرًا فَلْيَحْمَدِ اللَّهَ، وَمَنْ وَجَدَ غَيْرَ ذَلِكَ فَلَا يَلُومَنَّ إِلَّا نَفْسَهُ.
"হে আমার বান্দারা! তোমাদের প্রথম ও শেষ, মানুষ ও জিন সবাই যদি সবচেয়ে পরহেজগার ব্যক্তির মতো হয়ে যায়, তবুও এতে আমার রাজত্বের কিছুই বৃদ্ধি পাবে না। আর যদি সবাই সবচেয়ে পাপী ব্যক্তির মতো হয়ে যায়, তবুও এতে আমার রাজত্বের কিছুই কমবে না।"
"হে আমার বান্দারা! এগুলো তো তোমাদেরই আমল, যা আমি সংরক্ষণ করি। অতঃপর আমি তোমাদেরকে তার পূর্ণ প্রতিদান দেব। যে কল্যাণ পাবে, সে যেন আল্লাহর প্রশংসা করে। আর যে অন্য কিছু পাবে, সে যেন নিজেকেই দোষারোপ করে।" -সহিহ মুসলিম, হাদীস: ২৫৭৭
অতএব, ইবাদত আল্লাহর মর্যাদা বাড়ানোর জন্য নয়; বরং মানুষের নিজের কল্যাণের জন্য।
৩. তাহলে শাস্তি কেন?
শাস্তি এ কারণে নয় যে, আল্লাহ আমাদের ইবাদতের মুখাপেক্ষী। বরং শাস্তি হলো সত্য স্পষ্ট হওয়ার পর অহংকারবশত স্রষ্টার অধিকার অস্বীকার করার ন্যায়সঙ্গত পরিণতি।
আল্লাহ মানুষের শাস্তি কামনা করেন না। বরং তিনি নিজেই ঘোষণা করেছেন-
﴿مَا يَفْعَلُ اللَّهُ بِعَذَابِكُمْ إِن شَكَرْتُمْ وَآمَنتُمْ﴾
"তোমরা যদি কৃতজ্ঞ হও এবং ঈমান আনো, তবে আল্লাহ তোমাদের শাস্তি দিয়ে কী করবেন?" -সূরা আন-নিসা, ৪:১৪৭
অর্থাৎ, শাস্তি দেওয়া আল্লাহর কোনো প্রয়োজন বা উদ্দেশ্য নয়। তিনি বান্দার ধ্বংস চান না; বরং চান বান্দা ঈমান আনুক, কৃতজ্ঞ হোক এবং সফলতা লাভ করুক। শাস্তি কেবল তখনই আসে, যখন মানুষ সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও অহংকার ও অবাধ্যতার পথ বেছে নেয়।
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন-
﴿وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا﴾
"আমি কোনো রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দিই না।" -সূরা আল-ইসরা ১৭:১৫
অর্থাৎ, আল্লাহ আগে সত্য পৌঁছে দেন, প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করেন, তারপর হিসাব নেন। কাউকে অজ্ঞাতসারে শাস্তি দেওয়া তাঁর নীতি নয়।
৪. আমরা তো জন্ম নিতে চাইনি- তাহলে দায়িত্ব কেন?
এ প্রশ্নটি আবেগগতভাবে স্বাভাবিক। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ কেবল দুনিয়ার জন্ম থেকেই তার ইতিহাস শুরু করেনি। কুরআন জানায়, দুনিয়ায় প্রেরণের পূর্বেই আল্লাহ তাআলা আদম আ.-এর বংশধরদের থেকে তাঁর রব হওয়ার স্বীকৃতি গ্রহণ করেছিলেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنۢ بَنِىٓ ءَادَمَ مِن ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ ۖ قَالُوا۟ بَلَىٰ﴾
আর স্মরণ করুন, যখন আপনার রব আদম-সন্তানদের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করে তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষী করেছিলেন (এবং বলেছিলেন), 'আমি কি তোমাদের রব নই?' তারা বলেছিল, 'অবশ্যই, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি। -সূরা আল-আ'রাফ ৭:১৭২
এ অঙ্গীকারের প্রকৃত ধরন ও বিস্তারিত বিষয় আল্লাহই সর্বাধিক জানেন। তবে কুরআন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, আল্লাহ মানুষের মধ্যে তাঁর রবকে চেনার মৌলিক প্রবণতা (ফিতরাহ) স্থাপন করেছেন এবং তাঁর রবুবিয়্যাতের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন; এরপর রাসূল ও ওহীর মাধ্যমে সত্যকে সুস্পষ্ট করে পরীক্ষা নিয়েছেন।
তাই "আমরা তো জন্ম নিতে চাইনি, তাই আমাদের কোনো দায়িত্ব নেই"¬- এ ধারণা কুরআনের উপস্থাপিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে সৃষ্টি করা স্রষ্টার অধিকার। যেমন কোনো সন্তান তার জন্মের সিদ্ধান্ত নেয় না, কিন্তু জন্মের পর সে একটি বাস্তব জগতে প্রবেশ করে, যেখানে তার অধিকার যেমন আছে, তেমনি দায়িত্বও আছে।
আল্লাহ বলেন,
﴿لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ﴾
"তিনি যা করেন, সে সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না; বরং তাদেরই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।" -সূরা আল-আম্বিয়া ২১:২৩
এটি অন্ধ কর্তৃত্বের ঘোষণা নয়; বরং এ সত্যের ঘোষণা যে, অসীম জ্ঞান ও পরিপূর্ণ প্রজ্ঞার অধিকারী স্রষ্টার সিদ্ধান্তকে সীমাবদ্ধ জ্ঞানের মানুষ সম্পূর্ণরূপে পরিবেষ্টন করতে পারে না।
৫. আল্লাহ কখনো কারও প্রতি জুলুম করেন না
আল্লাহ বলেন,
﴿وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا﴾
"আপনার রব কারও প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম করেন না।" -সূরা আল-কাহফ ১৮:৪৯
আরও বলেন,
﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ﴾
"আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না।" -সূরা আন-নিসা ৪:৪০
মানুষ ভাল-মন্দ যাই ভোগ করবে তা তার কৃতকর্মের ফল; তিনি কারও উপর যুলুম করেন না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
مَنۡ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفۡسِہٖ وَمَنۡ اَسَآءَ فَعَلَیۡہَا ؕ وَمَا رَبُّکَ بِظَلَّامٍ لِّلۡعَبِیۡدِ
কেউ সৎকর্ম করলে তা নিজেরই কল্যাণার্থে করে আর কেউ অসৎ কাজ করলে, তার ক্ষতিও তার নিজেরই। তোমার প্রতিপালক বান্দাদের প্রতি জুলুম করেন না। -সূরা ফুসসিলাত ৪১:৪৬
অন্য আয়াতে বলেন-
ذٰلِکَ بِمَا قَدَّمَتۡ اَیۡدِیۡکُمۡ وَاَنَّ اللّٰہَ لَیۡسَ بِظَلَّامٍ لِّلۡعَبِیۡدِ ۚ
এসব তোমাদের নিজ হাতের সেই কৃতকর্মের ফল, যা তোমরা সম্মুখে প্রেরণ করেছিলে। আর এটা স্থিরীকৃত বিষয় যে, আল্লাহ বান্দাদের প্রতি জুলুম করেন না। -সূরা আলে ইমরান ৩:১৮২
৬. ইবাদত আসলে কৃতজ্ঞতার প্রকাশ
জীবন, দৃষ্টি, শ্রবণ, বুদ্ধি, রিযিক- আমাদের যা কিছু আছে, সবই আল্লাহর দান।
﴿وَمَا بِكُم مِّن نِّعْمَةٍ فَمِنَ اللَّهِ﴾
"তোমাদের কাছে যে নিয়ামতই আছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই।" -সূরা আন-নাহল ১৬:৫৩
রাসূল ﷺ রাতভর ইবাদত করতেন। যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, "আপনার তো সব গুনাহ ক্ষমা করা হয়েছে, তবুও এত ইবাদত কেন?" তিনি বললেন,
«أَفَلَا أَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا»
"আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?" -সহিহ আল-বুখারী, ১১৩০; সহিহ মুসলিম, ২৮১৯
৭. কিছু সাধারণ যৌক্তিক দিক তুলে ধরা হলো-
প্রথমত: যিনি সৃষ্টি করেছেন, প্রকৃত মালিক তিনিই। মালিকের নির্দেশ মানা অন্যায় নয়; বরং ন্যায়সঙ্গত।
দ্বিতীয়ত: পৃথিবী একটি পরীক্ষার স্থান।
﴿الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا﴾
"তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি পরীক্ষা করেন- তোমাদের মধ্যে কে আমলে উত্তম।" -সূরা আল-মুলক ৬৭:২
তৃতীয়ত: মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দেওয়া হয়েছে। যা অন্য কোনো প্রাণীকে দেওয়া হয়নি। এর দ্বারা অন্যান্য প্রাণী থেকে মানুষকে আলাদা করা হয়েছে। তাই ইচ্ছাশক্তির স্বাধীনতা থাকলে জবাবদিহিও থাকবে।
চতুর্থত: যদি সৎ-অসৎ, জালিম-মজলুম, নবী-অপরাধী- সবার পরিণতি এক হয়ে যায়, তাহলে সেটিই হবে প্রকৃত অন্যায়। আখিরাতের বিচার আল্লাহর পরিপূর্ণ ন্যায়বিচারেরই দাবি।
সূতরাং ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহর ইবাদত তাঁর কোনো অভাব পূরণের জন্য নয়; বরং এটি মানুষের সৃষ্টিগত উদ্দেশ্য, আত্মার খাদ্য, কৃতজ্ঞতার প্রকাশ এবং চিরস্থায়ী সফলতার পথ। আল্লাহ মানুষকে বিনা প্রমাণে বা বিনা বার্তায় শাস্তি দেন না; বরং রাসূল, ওহী, বিবেক ও সৃষ্টিজগতের অসংখ্য নিদর্শনের মাধ্যমে সত্য স্পষ্ট করে দেন। এরপর মানুষ তার স্বাধীন ইচ্ছায় যে পথ বেছে নেয়, তারই ন্যায়সঙ্গত প্রতিফল পায়।
অতএব, ঈমানের অর্থ এই নয় যে, আমি আল্লাহর প্রতিটি সিদ্ধান্তের সব হিকমাহ বুঝতে হবে। বরং ঈমানের অর্থ হলো- আমি অকাট্য প্রমাণে নিশ্চিত হয়েছি যে, আল্লাহই সত্য, তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বপ্রজ্ঞ ও পরম ন্যায়বিচারক। তাই যেখানে আমার জ্ঞান শেষ হয়, সেখানে তাঁর জ্ঞানের ওপরই আমি পূর্ণ আস্থা রাখি। এ আস্থার নামই ঈমান, এ আত্মসমর্পণের নামই ইসলাম, আর এ পথেই রয়েছে মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত সফলতা।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুহাম্মাদ আশরাফুল আলম
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১