যৌথ পরিবারে পর্দা
প্রশ্নঃ ১৬৭৫১১. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, “আমি বর্তমানে এমন একটি পরিবারে আছি, যেখানে চার ভাই একসঙ্গে বসবাস ও খাওয়া-দাওয়া করে। আমি চেষ্টা করি গায়রে মাহরামের সামনে না যেতে এবং ভাসুরের সামনে যাই না। কিন্তু আমার ছোট দেবর আছে, সেও একই ঘরে থাকে। তার সঙ্গে কীভাবে পর্দা করব? হঠাৎ হঠাৎ দেবর ও ভাসুরের সামনে পড়ে যেতে হয়। এমন যৌথ পরিবারে থেকে আমি কীভাবে আল্লাহর দ্বীনের ওপর চলতে পারি?”
৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ফেনী
৮ বার পড়া হয়েছে
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
দেবর ও ভাসুর উভয়েই স্ত্রীর (নারীর) জন্য গায়রে মাহরাম। অতএব, তাদের সঙ্গে শরিয়তসম্মত পর্দা করা আবশ্যক। একই বাড়িতে বসবাস করা, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করা কিংবা পারিবারিক সম্পর্ক থাকা—এসব কারণে তাদের মাহরাম হওয়ার কোনো পরিবর্তন হয় না।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ
“তোমরা যখন তাদের কাছে কোনো সামগ্রী চাইবে, তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে।”—সূরা আল-আহযাব: ৫৩
আর রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল! দেবর সম্পর্কে কী বলেন?” তিনি বললেন— الْحَمْوُ الْمَوْتُ “দেবর তো মৃত্যুর মতো।”
—সহিহ বুখারি: ৫২৩২; সহিহ মুসলিম: ২১৭২
এখানে ‘হামউ’ বলতে স্বামীর এমন নিকটাত্মীয়কে বোঝানো হয়েছে, যে স্ত্রীর জন্য মাহরাম নয়; যেমন—দেবর, ভাসুর ইত্যাদি। হাদিসে তাদের ব্যাপারে বিশেষ সতর্ক করা হয়েছে, কারণ যৌথ পরিবারে তাদের সঙ্গে অবাধ যাতায়াত ও পর্দাহীনতার সুযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
বাস্তবে কীভাবে পর্দা করবেন?
যদি চার ভাই একই বাড়িতে বসবাস করেন এবং ছোট দেবরও একই ঘর বা চলাচলের জায়গায় থাকে, তাহলে সাধ্যানুযায়ী কিছু বাস্তব ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
আলাদা ব্যক্তিগত পরিসর তৈরি করুন।
সম্ভব হলে নিজের জন্য এমন একটি কক্ষ বা পর্দাযুক্ত নির্দিষ্ট জায়গা রাখুন, যেখানে গায়রে মাহরাম পুরুষের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশ বা হঠাৎ মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। তার জন্য আপনার থাকার ঘর, রান্না ঘর, ওয়াশরুম এবং বেলকনি ইত্যাদি আলাদা রাখুন।
চলাচলের সময় সতর্কতা অবলম্বন করুন।
ঘর থেকে বের হওয়ার আগে দরজার বাইরে কেউ আছে কি না খেয়াল করা, প্রয়োজন হলে পরিবারের নারী শিশুদের সদস্যকে আগে পাঠানো এবং গায়রে মাহরাম থাকলে তাদের সাইডে সরে যেতে বলা। যারা পর্দা করে না তারা এটাকে প্রথম দিকে কিছুটা অস্বাভাবিকভাবে নিবে; কিন্তু যখন বিষয়টি সকলের বোধগম্য হবে এবং পর্দার গুরুত্ব বুঝে আসবে তখন এটা মেনে নেওয়া সহজ হবে। সেই পর্যন্ত আপনাকে ধৈর্য ও হিকমার সাথে কাজ করতে হবে।
অনিচ্ছাকৃতভাবে সামনে পড়ে গেলে?
অনিচ্ছাকৃতভাবে সামনে পড়ে গেলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
হঠাৎ কোনো গায়রে মাহরামের সামনে পড়ে যাওয়া এবং ইচ্ছাকৃতভাবে তার সামনে অবস্থান করা এক বিষয় নয়। অনিচ্ছাকৃতভাবে সামনে পড়ে গেলে দ্রুত নিজেকে আড়াল করে নেবেন এবং প্রয়োজন ছাড়া সেখানে অবস্থান করবেন না।
প্রয়োজনীয় কথা বলার ক্ষেত্রে:
দেবর বা ভাসুরের সঙ্গে একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কথা বলার প্রয়োজন নাই। তাদে খোঁজখবর রাখা এবং তাদের আপ্যায়নের জন্য আপনার শ্বশুর শাশুড়ি, দেবর-ভাসুরের স্ত্রী-সন্তানদের কিংবা পরিবারের শিশুদের সহযোগিতা নিন। একান্ত বিকল্প না থাকলে এবং প্রয়োজনীয় কথা বলার দরকার হলে শরিয়তসম্মত পর্দার আড়াল থেকে কোমলতা পরিহার করে সক্ষেপে কথা বলুন। তবে অপ্রয়োজনীয় আলাপ, হাসি-ঠাট্টা, অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা ও নির্জন অবস্থান থেকে বিরত থাকতে হবে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ
“তোমরা যখন তাদের কাছে কোনো সামগ্রী চাইবে, তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে।”—সূরা আল-আহযাব: ৫৩
একই সুরার ৩২ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِالۡقَوۡلِ فَیَطۡمَعَ الَّذِیۡ فِیۡ قَلۡبِہٖ مَرَضٌ وَّقُلۡنَ قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا
সুতরাং তোমরা কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, পাছে অন্তরে ব্যাধি আছে এমন ব্যক্তি লালায়িত হয়ে পড়ে। আর তোমরা বলো ন্যায়সঙ্গত কথা।
স্বামীর সহযোগিতা:
বিষয়টি শুধু নিজের ওপর চাপিয়ে না রেখে স্বামীকে শান্তভাবে বুঝিয়ে বলুন যে আপনি কারও সঙ্গে অসৌজন্য করতে চান না; বরং আল্লাহর বিধান মেনে চলার চেষ্টা করছেন। স্বামী সহযোগিতা করলে ঘরের মধ্যে পর্দার জন্য একটি বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা করা অনেক সহজ হবে। বরং এক্ষেত্রে আপনার স্বামীর ভূমিকাই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারের সঙ্গে হিকমতের আচরণ করুন:
পর্দা রক্ষা করতে গিয়ে শ্বশুরবাড়ির মানুষের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করা বা তাদের অসম্মান করা উচিত নয়। নম্রতা, সুন্দর ব্যবহার ও ধৈর্যের সঙ্গে নিজের প্রয়োজনটি বোঝাতে হবে। আপনার উত্তম চরিত্র ও সুন্দর আচরণই ইনশাআল্লাহ পরিবারের ওপর বেশি প্রভাব ফেলবে।
আল্লাহর দ্বীনের ওপর কীভাবে চলবেন?
দ্বীনের ওপর চলা মানে শুধু অন্যদের পরিবর্তন করার চেষ্টা করা নয়; বরং নিজে ধীরে ধীরে আল্লাহর বিধান মেনে চলা এবং নিজের আচরণের মাধ্যমে পরিবারের সামনে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরা।
আপনি নামাজ, পর্দা, ইবাদত, উত্তম আখলাক এবং পরিবারের সদস্যদের হক আদায়ের ব্যাপারে যত্নবান হোন। কোনো বিষয়ে পরিবারের সঙ্গে মতপার্থক্য হলে তাড়াহুড়া না করে হিকমত ও ধৈর্যের সঙ্গে এগিয়ে চলুন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ
“অতএব, তোমরা সাধ্যানুযায়ী আল্লাহকে ভয় করো।”
—সূরা আত-তাগাবুন: ১৬
ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো বিবাহের পর সকলের পরিবার আলাদ হয়ে যাবে। তবে ঘর আর খাবার দাবার আলাদা মানেই বিচ্ছিন্নতা নয়। বরং স্বীয় পরিবারের সম্মান-স্বাধীকার বজায় রাখা।
আবার যৌথ পরিবারে থাকা মানেই সমস্যা নয়, যৌথ পরিবারে থাকা মানেই পর্দা লঙ্ঘণ নয়। বরং সমস্যা হলো পর্দার বিধান উপেক্ষা করে অবাধ মেলামেশা করা। আপনি সাধ্যানুযায়ী পর্দার ব্যবস্থা করবেন, অনিচ্ছাকৃত পরিস্থিতিতে নিজেকে দ্রুত আড়াল করবেন এবং একই সঙ্গে পরিবারের সঙ্গে সুন্দর আচরণ বজায় রাখবেন। এভাবেই ইনশাআল্লাহ পারিবারিক সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রেখে দ্বীনের ওপর চলা সম্ভব।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে হায়া, পর্দা, হিকমত ও ধৈর্যের সঙ্গে দ্বীনের ওপর অটল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
সাইদুজ্জামান কাসেমি
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১