নামাজের বাইরে রুকু ও সিজদার তাসবিহ দিয়ে জিকির
প্রশ্নঃ ১৬৯৩৪৩. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, হযরত, সুবহানা রাব্বিয়াল আলা=সিজদাহর তাসবীহ, সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম= রুকুর তাসবীহ দিয়ে জিকির করা যাবে কিনা, দয়া করে এ উভয় জিকিরের গুরুত্ব ও ফজিলত কিরূপ, জানানোর অনুরোধ করছি।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
হ্যাঁ, নামাজের বাইরে সাধারণ জিকির হিসেবেও উভয় তাসবিহ পাঠ করা জায়েজ হবে। বরং আল্লাহ তাআলার পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এগুলো অত্যন্ত অর্থবহ ও ফজিলতপূর্ণ জিকির।
তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে—নামাজের রুকু ও সিজদায় এগুলো পাঠের যে বিশেষ সুন্নাহ ও বিধান রয়েছে, তা স্বতন্ত্র। সাধারণ জিকির হিসেবে পাঠ করার বৈধতা এবং নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট সংখ্যায় পাঠের বিশেষ ফজিলত প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।
রুকু ও সিজদার তাসবিহ সংক্রান্ত হাদিস:
হাদিস: ১
حَدَّثَنَا الرَّبِيعُ بْنُ نَافِعٍ أَبُو تَوْبَةَ، وَمُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ، - الْمَعْنَى - قَالاَ حَدَّثَنَا ابْنُ الْمُبَارَكِ، عَنْ مُوسَى، - قَالَ أَبُو سَلَمَةَ مُوسَى بْنِ أَيُّوبَ - عَنْ عَمِّهِ، عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ، قَالَ لَمَّا نَزَلَتْ ( فَسَبِّحْ بِاسْمِ رَبِّكَ الْعَظِيمِ ) قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " اجْعَلُوهَا فِي رُكُوعِكُمْ " . فَلَمَّا نَزَلَتْ ( سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الأَعْلَى ) قَالَ " اجْعَلُوهَا فِي سُجُودِكُمْ " .
৮৬৯. আর-রবি ইবনে নাফি আবু তাওবা (রহ.) ..... উকবা ইবনে আমের (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কুরআনের আয়াত “ফাসাব্বিহ বিসমি রাব্বিকাল আজিম” অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূল (ﷺ) বললেন, তোমরা এটা রুকুতে পড়বে। অতঃপর কুরআনের অন্য আয়াত “সাব্বিহিসমা রাব্বিকাল আ'লা” অবতীর্ণ হলে তিনি বলেন, এটা তোমরা সিজদায় পড়বে। সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৮৬৯ (আন্তর্জাতিক হাদিস নং: ৮৬৯)
হাদিসের লিংক: https://muslimbangla.com/hadith/15215
হাদিস: ২
وَحَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ نُمَيْرٍ، وَأَبُو مُعَاوِيَةَ ح وَحَدَّثَنَا زُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، وَإِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، جَمِيعًا عَنْ جَرِيرٍ، كُلُّهُمْ عَنِ الأَعْمَشِ، ح وَحَدَّثَنَا ابْنُ، نُمَيْرٍ - وَاللَّفْظُ لَهُ - حَدَّثَنَا أَبِي، حَدَّثَنَا الأَعْمَشُ، عَنْ سَعْدِ بْنِ عُبَيْدَةَ، عَنِ الْمُسْتَوْرِدِ بْنِ الأَحْنَفِ، عَنْ صِلَةَ بْنِ زُفَرَ، عَنْ حُذَيْفَةَ، قَالَ صَلَّيْتُ مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم ذَاتَ لَيْلَةٍ فَافْتَتَحَ الْبَقَرَةَ فَقُلْتُ يَرْكَعُ عِنْدَ الْمِائَةِ . ثُمَّ مَضَى فَقُلْتُ يُصَلِّي بِهَا فِي رَكْعَةٍ فَمَضَى فَقُلْتُ يَرْكَعُ بِهَا . ثُمَّ افْتَتَحَ النِّسَاءَ فَقَرَأَهَا ثُمَّ افْتَتَحَ آلَ عِمْرَانَ فَقَرَأَهَا يَقْرَأُ مُتَرَسِّلاً إِذَا مَرَّ بِآيَةٍ فِيهَا تَسْبِيحٌ سَبَّحَ وَإِذَا مَرَّ بِسُؤَالٍ سَأَلَ وَإِذَا مَرَّ بِتَعَوُّذٍ تَعَوَّذَ ثُمَّ رَكَعَ فَجَعَلَ يَقُولُ " سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ " . فَكَانَ رُكُوعُهُ نَحْوًا مِنْ قِيَامِهِ ثُمَّ قَالَ " سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ " . ثُمَّ قَامَ طَوِيلاً قَرِيبًا مِمَّا رَكَعَ ثُمَّ سَجَدَ فَقَالَ " سُبْحَانَ رَبِّيَ الأَعْلَى " . فَكَانَ سُجُودُهُ قَرِيبًا مِنْ قِيَامِهِ . قَالَ وَفِي حَدِيثِ جَرِيرٍ مِنَ الزِّيَادَةِ فَقَالَ " سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ" .
১৬৮৭। আবু বকর ইবনে শায়বা, যুহাইর ইবনে হারব, ইসহাক ইবনে ইবরাহীম, ইবনে নুমাইর (রহ.) ......... হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, এক রাতে আমি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে নামাজ আদায় করছিলাম। তিনি সূরা বাকারা শুরু করলেন, আমি মনে করলাম সম্ভবত একশত আয়াতের মাথায় রুকু করবেন। কিন্তু তিনি অগ্রসর হয়ে গেলেন। তখন আমি ভাবলাম, তিনি সূরা বাকারা দিয়ে নামাজ পূর্ণ করবেন। কিন্তু তিনি সূরা নিসা আরম্ভ করলেন এবং তাও পড়ে আলে ইমরান শুরু করে তাও পড়ে ফেললেন। তিনি ধীর-স্থিরতার সাথে পাঠ করে যাচ্ছিলেন। যখন তাসবিহ যুক্ত কোনো আয়াতে উপনীত হতেন তখন তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ) পাঠ করতেন এবং যখন প্রার্থনার কোনো আয়াতে উপনীত হতেন তখন তিনি প্রার্থনা করে নিতেন। আর যখন (আল্লাহর কাছে) আশ্রয় গ্রহণের আয়াতে পৌঁছতেন তখন (আল্লাহর কাছে) পানাহ চাইতেন। তারপর রুকু করলেন এবং রুকুতে سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ (আমার মহান প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা করছি), বলতে থাকেন। তাঁর রুকু ছিল প্রায় তাঁর দাঁড়ানোর সমান (দীর্ঘ)। এরপর বললেন, سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ (যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রশংসা করে আল্লাহ তা শোনেন)। তারপর দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলেন রুকুতে যতক্ষণ ছিলেন তার কাছাকাছি। তারপর সিজদা করলেন এবং سُبْحَانَ رَبِّيَ الأَعْلَى (আমার সুমহান প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা করছি), বললেন। তাঁর সিজদার পরিমাণ ছিল তাঁর দাঁড়ানোর কাছাকাছি। বর্ণনাকারী বলেন, জারীর (রহ.)-এর হাদিসে অতিরিক্ত রয়েছে যে, নবী (ﷺ) বললেন, سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ (যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রশংসা করে, তিনি তা শোনেন আমাদের প্রতিপালক! আপনারই জন্য সকল প্রশংসা)। সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৬৮৭ (আন্তর্জাতিক হাদিস নং: ৭৭২) হাদিসের লিংক: https://muslimbangla.com/hadith/8736
রুকু-সিজদার তাসবিহর কাছাকাছি শব্দে বর্ণিত তাসবিহ:
حَدَّثَنِي أَحْمَدُ بْنُ إِشْكَابٍ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ فُضَيْلٍ، عَنْ عُمَارَةَ بْنِ الْقَعْقَاعِ، عَنْ أَبِي زُرْعَةَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " كَلِمَتَانِ حَبِيبَتَانِ إِلَى الرَّحْمَنِ، خَفِيفَتَانِ عَلَى اللِّسَانِ، ثَقِيلَتَانِ فِي الْمِيزَانِ سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ " .
৭০৫৩। আহমদ ইবনে ইশকাব (রহ.) ......... আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন: দুটি কালেমা (বাণী) রয়েছে, যেগুলো দয়াময় আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়, উচ্চারণে খুবই সহজ, (আমলের) পাল্লায় অত্যন্ত ভারী। (বাণী দুটি হচ্ছে:) ″সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি সুবহানাল্লাহিল আজিম″ আমরা আল্লাহ তাআলার প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করছি, মহান আল্লাহ অতীব পবিত্র। সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৭০৫৩ (আন্তর্জাতিক হাদিস নং: ৭৫৬৩)
হাদিসের লিংক: https://muslimbangla.com/hadith/7053
এ হাদিসে দ্বিতীয় জিকিরটি হলো سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ। এটি سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ থেকে শব্দগতভাবে ভিন্ন। তাই হাদিসের নির্দিষ্ট ফজিলতটি হুবহু প্রথম বাক্যটির জন্যই বর্ণিত হয়েছে। তবে উভয় বাক্যেই আল্লাহর মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করা হয়।
আরেকটি হাদিস:
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ مَنِيعٍ، وَغَيْرُ، وَاحِدٍ، قَالُوا حَدَّثَنَا رَوْحُ بْنُ عُبَادَةَ، عَنْ حَجَّاجٍ الصَّوَّافِ، عَنْ أَبِي الزُّبَيْرِ، عَنْ جَابِرٍ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " مَنْ قَالَ سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ وَبِحَمْدِهِ . غُرِسَتْ لَهُ نَخْلَةٌ فِي الْجَنَّةِ " . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ غَرِيبٌ لاَ نَعْرِفُهُ إِلاَّ مِنْ حَدِيثِ أَبِي الزُّبَيْرِ عَنْ جَابِرٍ .
৩৪৬৪. আহমাদ ইবনে মানী প্রমুখ (রহ.) ..... জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেন: কেউ যদি ″সুবহানাল্লাহিল আজিম ওয়া বিহামদিহি″ পাঠ করে তবে তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর চারা লাগানো হয়। হাদিসটি হাসান-সহীহ-গারীব। আবুয যুবাইর-জাবির (রা.) সূত্র ছাড়া এটি সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না। জামে তিরমিযী, হাদিস নং: ৩৪৬৪ (আন্তর্জাতিক হাদিস নং: ৩৪৬৪)
হাদিসের লিংক: https://muslimbangla.com/hadith/33110
এখানে ‘সুবহানাল্লাহিল আজিম ওয়া বিহামদিহি’ তাসবিহর ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। এ তাসবিহটিও রুকুর তাসবিহর কাছাকাছি।
মোটকথা, রুকু এবং সিজদার তাসবিহ ওই ক্ষেত্রেই বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে। তবে নামাজের বাইরেও সেগুলো পড়া যাবে এবং অবশ্যই তার মাধ্যমে সওয়াব ও ফজিলত অর্জন করা যাবে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বা ফজিলত বলতে গেলে সেক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট দলিল প্রয়োজন হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সদা-সর্বদা তাসবিহ-তাহলিলের মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা ৷
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন