সহবাসে স্বামীর অনীহা: স্ত্রীর করণীয়
প্রশ্নঃ ১৭১৩২৭. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, স্বামী শারীরিক সম্পর্কে অনিচ্ছা প্রকাশ করলে স্ত্রীর কী করণীয়?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নাকরী!
শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, স্বামী যদি কোনো শরয়ি ওজর ছাড়া স্ত্রীকে সম্পূর্ণরূপে সহবাস থেকে বঞ্চিত করেন, তাহলে তা জায়েয নয়। হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, স্ত্রীর সঙ্গে মাঝে মাঝে সহবাস করা স্বামীর ওপর দিয়ানাতের দিক থেকে ওয়াজিব। অতএব, স্বামী যদি কোনো শরয়ি ওজর ছাড়া সম্পূর্ণরূপে সহবাস বর্জন করেন, তাহলে স্ত্রী তার কাছে সহবাস দাবি করতে পারবেন। স্বামী তা প্রত্যাখ্যান করলে স্ত্রী শরয়ি বিচারকের কাছে গিয়ে নিজের দাম্পত্য অধিকার আদায়ের দাবি করতে পারবেন।
হানাফি ফোকাহায়ে কেরামের দৃষ্টিতে বিচারিকভাবে অন্তত একবার সহবাসে বাধ্য করার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। তবে প্রথমবারের অতিরিক্ত সহবাস বিচারিকভাবে বাধ্যতামূলক কি না—এ ব্যাপারে হানাফি ফকিহদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ এটিকে শুধু দিয়ানাতের দিক থেকে ওয়াজিব বলেছেন, আবার কেউ বিচারিকভাবেও তা ওয়াজিব বলেছেন।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ فَإِنْ كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَىٰ أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا
“তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। যদি তাদের অপছন্দ করো, তবে হতে পারে তোমরা কোনো কিছুকে অপছন্দ করছ অথচ আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রেখেছেন।” (সূরা আন-নিসা, ৪:১৯)
এ আয়াত থেকে স্বামী-স্ত্রীর معاشرة بالمعروف বা শরিয়তসম্মত উত্তম দাম্পত্য আচরণের মূলনীতি প্রমাণিত হয়। স্ত্রীকে ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘদিন তার দাম্পত্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা এই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
স্ত্রীকে ঝুলিয়ে না রাখার নির্দেশনা দিয়ে কুরআনে আরো ইরশাদ হয়েছে-
فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ
“অতঃপর হয় বিধিমত রেখে দেওয়া, অথবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেওয়া।” (সূরা আল-বাকারা, ২:২২৯)
অর্থাৎ স্ত্রীকে এমনভাবে আটকে রাখা উচিত নয় যে, স্বামী দাম্পত্য অধিকারও দেবেন না, আবার বিচ্ছেদের পথও খুলে দেবেন না।
আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন—
لِلَّذِينَ يُؤْلُونَ مِنْ نِسَائِهِمْ تَرَبُّصُ أَرْبَعَةِ أَشْهُرٍ ۖ فَإِنْ فَاءُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ وَإِنْ عَزَمُوا الطَّلَاقَ فَإِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
“যারা নিজেদের স্ত্রীদের থেকে ইলা করে, তাদের জন্য চার মাস অপেক্ষার অবকাশ। অতঃপর তারা যদি ফিরে আসে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর যদি তারা তালাকের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (সূরা আল-বাকারা, ২:২২৬–২২৭)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—وَإِنَّ لِزَوْجِكَ عَلَيْكَ حَقًّا “নিশ্চয়ই তোমার স্ত্রীরও তোমার ওপর অধিকার রয়েছে।” (সহিহ আল-বুখারি, 1968)
https://muslimbangla.com/hadith/1850
جاء في "فتح القدير شرح الهداية" (المكتبة الشاملة) : وَاعْلَمْ أَنَّ تَرْكَ جِمَاعِهَا مُطْلَقًا لَا يَحِلُّ لَهُ، صَرَّحَ أَصْحَابُنَا بِأَنَّ جِمَاعَهَا أَحْيَانًا وَاجِبٌ دِيَانَةً لَكِنَّهُ لَا يَدْخُلُ تَحْتَ الْقَضَاءِ وَالْإِلْزَامِ إِلَّا الْوَطْأَةُ الْأُولَى وَلَمْ يُقَدِّرُوا فِيهِ مُدَّةً، وَيَجِبُ أَنْ لَا يَبْلُغَ بِهِ مُدَّةَ الْإِيلَاءِ إِلَّا بِرِضَاهَا وَطِيبِ نَفْسِهَا بِهِ.
অনুবাদ: জেনে রাখুন, স্ত্রীকে সম্পূর্ণরূপে সহবাস থেকে বিরত রাখা স্বামীর জন্য বৈধ নয়। আমাদের ফকিহগণ সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, মাঝে মাঝে স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করা দিয়ানাতের দিক থেকে ওয়াজিব। তবে বিচারিকভাবে আদায় করানো ও বাধ্য করার আওতায় প্রথমবারের সহবাসটিই অন্তর্ভুক্ত। আর তাঁরা এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেননি। তবে স্ত্রীর সম্মতি ও আন্তরিক সন্তুষ্টি ছাড়া তাকে সহবাস থেকে বিরত রাখার সময়কাল ইলার মেয়াদে পৌঁছানো যাবে না।
رد المحتار-এ আছে-
(قَوْلُهُ وَيَسْقُطُ حَقُّهَا بِمَرَّةٍ) قَالَ فِي الْفَتْحِ : وَاعْلَمْ أَنَّ تَرْكَ جِمَاعِهَا مُطْلَقًا لَا يَحِلُّ لَهُ، صَرَّحَ أَصْحَابُنَا بِأَنَّ جِمَاعَهَا أَحْيَانًا وَاجِبٌ دِيَانَةً، لَكِنْ لَا يَدْخُلُ تَحْتَ الْقَضَاءِ وَالْإِلْزَامِ إلَّا الْوَطْأَةُ الْأُولَى وَلَمْ يُقَدِّرُوا فِيهِ مُدَّةً ….. قَالَ فِي النَّهْرِ: فِي هَذَا الْكَلَامِ تَصْرِيحٌ بِأَنَّ الْجِمَاعَ بَعْدَ الْمَرَّةِ حَقُّهُ لَا حَقُّهَا اهـ. قُلْت: فِيهِ نَظَرٌ بَلْ هُوَ حَقُّهُ وَحَقُّهَا أَيْضًا، لِمَا عَلِمْت مِنْ أَنَّهُ وَاجِبٌ دِيَانَةً. قَالَ فِي الْبَحْرِ: وَحَيْثُ عُلِمَ أَنَّ الْوَطْءَ لَا يَدْخُلُ تَحْتَ الْقَسْمِ فَهَلْ هُوَ وَاجِبٌ لِلزَّوْجَةِ وَفِي الْبَدَائِعِ: لَهَا أَنْ تُطَالِبَهُ بِالْوَطْءِ لِأَنَّ حِلَّهُ لَهَا حَقُّهَا، كَمَا أَنَّ حِلَّهَا لَهُ حَقُّهُ، وَإِذَا طَالَبَتْهُ يَجِبُ عَلَيْهِ وَيُجْبَرُ عَلَيْهِ فِي الْحُكْمِ مَرَّةً وَالزِّيَادَةُ تَجِبُ دِيَانَةً لَا فِي الْحُكْمِ عِنْدَ بَعْضِ أَصْحَابِنَا وَعِنْدَ بَعْضِهِمْ تَجِبُ عَلَيْهِ فِي الْحُكْمِ. اهـ. (المكتبة الشاملة)
অনুবাদ: “(হাসকাফি রহ.-এর বক্তব্য: ‘একবার সহবাসের মাধ্যমে তার [স্ত্রীর] অধিকার রহিত হয়ে যায়।’) ফাতহুল কাদীরে বলা হয়েছে: জেনে রাখুন, স্ত্রীকে সম্পূর্ণরূপে সহবাস থেকে বিরত রাখা স্বামীর জন্য বৈধ নয়। আমাদের ফকিহগণ সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, মাঝে মাঝে তার সঙ্গে সহবাস করা দিয়ানাতের দিক থেকে ওয়াজিব। তবে বিচারিকভাবে আদায় করানো ও বাধ্য করার আওতায় প্রথমবারের সহবাসটিই অন্তর্ভুক্ত। আর তাঁরা এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেননি। [এখানে ফাতহুল কাদীরের আরও বক্তব্য রয়েছে।]
আন্ নাহরুল ফায়েকে বলা হয়েছে: এই বক্তব্যের মধ্যে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, প্রথমবারের পরের সহবাস স্বামীর অধিকার, স্ত্রীর অধিকার নয়।
আমি [ইবনু আবিদীন] বলছি: এতে আপত্তির অবকাশ রয়েছে। বরং এটি স্বামীর অধিকার এবং স্ত্রীরও অধিকার। কারণ, ইতিপূর্বে জেনে এসেছ যে, এটি দিয়ানাতের দিক থেকে ওয়াজিব।
বাহরুর রায়েকে বলা হয়েছে: যখন জানা গেল যে, সহবাস কসম বা স্ত্রীদের মধ্যে পালা-বণ্টনের অন্তর্ভুক্ত নয়, তখন প্রশ্ন হলো—সহবাস কি স্ত্রীর অধিকার হিসেবে ওয়াজিব?
বাদায়েউস সানায়েতে বলা হয়েছে: স্ত্রীর অধিকার রয়েছে যে, সে স্বামীর কাছে সহবাস দাবি করতে পারে। কারণ, যেমন স্বামীর জন্য তার সঙ্গে সহবাস বৈধ হওয়া তার [স্বামীর] অধিকার, তেমনি স্ত্রীর জন্য স্বামীর সঙ্গে সহবাস বৈধ হওয়াও তার [স্ত্রীর] অধিকার। আর যখন স্ত্রী তার কাছে সহবাস দাবি করবে, তখন স্বামীর ওপর তা আদায় করা ওয়াজিব হবে এবং বিচারিকভাবে তাকে একবার সহবাসে বাধ্য করা হবে।
আর অতিরিক্ত সহবাসের ব্যাপারে আমাদের কোনো কোনো আসহাবের মতে তা দিয়ানাতের দিক থেকে ওয়াজিব, কিন্তু বিচারিকভাবে ওয়াজিব নয়। পক্ষান্তরে, আমাদের অন্য কোনো কোনো আসহাবের মতে, অতিরিক্ত সহবাসও তার ওপর বিচারিকভাবে ওয়াজিব এবং তাকে এর জন্য বাধ্য করা হবে।”
বাস্তবসম্মত সমাধান
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই/বোন!
বাস্তব জীবনে এ ধরনের সমস্যার সমাধান কেবল আদালতে গিয়ে অধিকার আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং স্বামী যদি কোনো শরয়ি ওজর ছাড়া স্ত্রীর যৌন অধিকার ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করেন, তাহলে প্রথমেই স্ত্রীকে শান্তভাবে স্বামীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে হবে এবং সমস্যার প্রকৃত কারণ জানতে হবে। স্বামীর শারীরিক অসুস্থতা, যৌন দুর্বলতা, মানসিক চাপ, দাম্পত্য কলহ, কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা অন্য কোনো কারণ থাকলে তা চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজন হলে উভয় পক্ষের বিশ্বস্ত ও বিচক্ষণ অভিভাবক বা অভিজ্ঞ আলেমের মাধ্যমে মীমাংসার ব্যবস্থা করতে হবে। দাম্পত্য সমস্যায় পারস্পরিক আলোচনা ও প্রয়োজনে উপযুক্ত কাউন্সেলিংয়ের পরামর্শও সমসাময়িক হানাফি ফতোয়ায় দেওয়া হয়েছে।
স্বামীর জন্য জ্ঞাতব্য
স্বামীকে মনে রাখতে হবে, স্ত্রীর যৌন চাহিদা পূরণ করাও দাম্পত্য অধিকারের অংশ। এটিকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা বা স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শরীয়তের দৃষ্টিতে গুরুতর অন্যায়। তাই সমস্যা দেখা দিলে হয় স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন ফিরিয়ে আনতে হবে, নয়তো সমস্যার শরয়ি সমাধান করতে হবে—এভাবে স্ত্রীকে ঝুলিয়ে রাখা জায়েজ হবে না।
আর স্ত্রীকেও মনে রাখতে হবে, স্বামীর অবহেলা তাকে পরকীয়ার অনুমতি দেয় না। পরকীয়া বা অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া কোনোভাবেই এই সমস্যার শরয়ি সমাধান নয়; বরং তা আরেকটি গুরুতর অপরাধ। আরেকটি কবিরাহ গুনাহ। দাম্পত্য অধিকার অপূর্ণ থাকলে বৈধ পথেই সমাধান খুঁজতে হবে।
স্ত্রীর জন্য জ্ঞাতব্য
যদি বারবার বোঝানো, পারিবারিক মীমাংসা এবং সংশোধনের চেষ্টা সত্ত্বেও স্বামী ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রীর এই অধিকার নষ্ট করতে থাকে এবং এর ফলে স্ত্রীর জন্য সংসার চালানো কষ্টকর কিংবা অসম্ভব পড়ে, তাহলে তিনি খুলা তালাকের দাবি অথবা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে শরয়ি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। হানাফি ফিকহের সমসাময়িক ফতোয়াতেও স্বামীর যৌন অধিকার পূরণে অক্ষমতা বা দীর্ঘস্থায়ী অস্বীকৃতিকে বিবাহ বিচ্ছেদের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। (যেমনটি বাদায়েউস সানায়ে এর ইবারতে উল্লেখ করা হয়েছে)।
উভয় পরিবারের দায়িত্ব
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উভয় পরিবারের দায়িত্ব হলো, স্ত্রীকে না পরকীয়ার দিকে ঠেলে দেওয়া, না বছরের পর বছর কষ্টের মধ্যে ঝুলিয়ে রাখা; বরং প্রথমে আন্তরিক আলোচনা এবং পারিবারিক সমাধানের পথে এগুতে হবে। প্রয়োজনে বিজ্ঞ আলেমের মাধ্যমে মীমাংসা করতে হবে। যদি এর কোনোটিই ফলপ্রসূ না হয় এবং কোনোভাবেই দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব না হয় তাহলে শরঈ পদ্ধতিতে বিচ্ছেদের পথ গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ তায়াল সকলের দাম্পত্য জীবনকে সুখময় করুন। শান্তি, সমৃদ্ধি দিয়ে পরিপূর্ণ করে দিন । আমিন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন