পরিবারের সঙ্গে রাগ-অভিমান করে দীর্ঘদিন কথা বন্ধ রাখা ও রাগ নিয়ন্ত্রণের উপায়
প্রশ্নঃ ১৭৩৩০৯. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমি মাঝে মাঝে আমার মা,ভাই,বাবাবা পরিবারের অন্য সদস্য সাথে কোন কারণেই রাগ অভিমান করে কথা বলি না দীর্ঘদিন এতে কি গোনাহ হবে? আর এই রকম অভিমান বা মন খারাপ খুব বেশি হয়!এতে বাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যাই এই সমস্যা থেকে বেঁচে থাকা উপায় কোরআন ও হাদিসে আলোকে উত্তর দিন??
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
মা-বাবা, ভাই-বোন ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কোনো অন্যায় বা সাধারণ কারণে তাঁদের সঙ্গে রাগ-অভিমান করে দীর্ঘদিন কথা বন্ধ রাখা শরিয়তসম্মত নয়। এতে গুনাহ হতে পারে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার আশঙ্কা তৈরি হয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
«لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلَاثِ لَيَالٍ»
“কোনো মুসলিমের জন্য তার ভাইয়ের সঙ্গে তিন দিনের বেশি সম্পর্কচ্ছেদ করে থাকা বৈধ নয়।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬০৭৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৬০)
অতএব, রাগ-অভিমান হলেও দ্রুত তা মিটিয়ে নেওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখা উচিত। তবে কোনো ব্যক্তি নির্যাতন বা ক্ষতির শিকার হলে নিজের নিরাপত্তার জন্য সাময়িক দূরত্ব বজায় রাখা ভিন্ন বিষয়।
আপনার প্রশ্ন থেকে বোঝা যাচ্ছে, রাগ ও অভিমানের কারণে আপনি কখনো দীর্ঘদিন কথা বন্ধ রাখেন, এমনকি বাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যান। এ অভ্যাস থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অনুসরণ করুন।
রাগ নিয়ন্ত্রণ ও অভিমান দূর করার করণীয়
১. রাগ নিয়ন্ত্রণের দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিন
রাগ দমন করা মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ গুণ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ﴾
“আর যারা নিজেদের ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৪)
আয়াতটি থেকে শিক্ষা নিয়ে রাগ উঠলেই নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, ক্ষমা করা দুর্বলতা নয়; বরং এটি আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের মাধ্যম।
২. রাগ উঠলে শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চান
রাগের মুহূর্তে পড়ুন-
أَعُوذُ بِاللّٰهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
উচ্চারণ: আ‘ঊযু বিল্লাহি মিনাশ শাইত্বানির রাজীম।
অর্থ: আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
রাসূলুল্লাহ ﷺ রাগান্বিত ব্যক্তিকে এ বাক্য পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬১১৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬১০)
৩. রাগের সময় অবস্থান পরিবর্তন করুন
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ قَائِمٌ فَلْيَجْلِسْ، فَإِنْ ذَهَبَ عَنْهُ الْغَضَبُ وَإِلَّا فَلْيَضْطَجِعْ»
“তোমাদের কেউ দাঁড়ানো অবস্থায় রাগান্বিত হলে সে যেন বসে পড়ে। এতে রাগ চলে গেলে ভালো, অন্যথায় সে যেন শুয়ে পড়ে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৭৮২)
তাই রাগের সময়-
দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়ুন।
বসে থাকলে প্রয়োজনে শুয়ে পড়ুন।
উত্তেজিত অবস্থায় কোনো কথা, সিদ্ধান্ত বা প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না।
৪. রাগ কমাতে অজু করুন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِنَّ الْغَضَبَ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَإِنَّ الشَّيْطَانَ خُلِقَ مِنَ النَّارِ، وَإِنَّمَا تُطْفَأُ النَّارُ بِالْمَاءِ، فَإِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَتَوَضَّأْ».
রাগ শয়তানের প্রভাব থেকে আসে। শয়তানকে আগুন থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আর আগুন পানি দিয়ে নেভানো হয়। সুতরাং তোমাদের কারও রাগ হলে সে যেন অজু করে নেয়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৭৮৪)
৫. রাগের সময় কথা বন্ধ না করে শান্তভাবে নিজের কষ্ট প্রকাশ করুন
কোনো কথা বা আচরণে কষ্ট পেলে দীর্ঘদিন কথা বন্ধ না রেখে শান্তভাবে বলুন, “আপনার এই কথায় আমি কষ্ট পেয়েছি।” এতে ভুল বোঝাবুঝি কমবে এবং সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না।
৬. বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার অভ্যাস পরিহার করুন
সামান্য রাগ বা অভিমানের কারণে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া সমস্যার সমাধান নয়; বরং এতে পরিবারের সদস্যদের দুশ্চিন্তা ও কষ্ট বাড়ে। রাগের সময় কিছুক্ষণ নিরিবিলি থাকা প্রয়োজন হলে পরিবারের কাউকে জানিয়ে নিরাপদ স্থানে থাকুন। পরে শান্ত হয়ে সমস্যার সমাধান করুন।
৭. ক্ষমা করার অভ্যাস গড়ে তুলুন
পরিবারের সদস্যদের ছোটখাটো ভুল ক্ষমা করে দিন। সব কথার জবাব দেওয়া বা প্রতিটি বিষয়ে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করা জরুরি নয়। অনেক সময় নীরবতা, ধৈর্য ও ক্ষমাই সম্পর্ক রক্ষার সবচেয়ে ভালো উপায়।
৮. রাগের সমস্যা বেশি হলে সাহায্য নিন
যদি সামান্য কারণে অতিরিক্ত রাগ হয়, দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকে কিংবা বারবার বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছা করে, তাহলে বিশ্বস্ত আলেম, অভিজ্ঞ অভিভাবক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। প্রয়োজনে কাউন্সেলিং গ্রহণ করুন। এতে সমস্যার মূল কারণ বুঝতে এবং তা থেকে বের হতে সুবিধা হবে।
মোটকথা
আপনার উচিত রাগ-অভিমানকে নিয়ন্ত্রণ করে পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, দ্রুত মনোমালিন্য দূর করা এবং আল্লাহর কাছে উত্তম চরিত্র ও ধৈর্য প্রার্থনা করা। মনে রাখবেন, রাগের সময় নিজেকে সংযত করাই প্রকৃত বীরত্ব।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ»
“প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে অন্যকে কুস্তিতে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সেই ব্যক্তি, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬১১৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬০৯)
আল্লাহ তাআলা আপনাকে রাগ নিয়ন্ত্রণের তাওফীক দান করুন, পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন