মা'আরিফুল হাদীস

معارف الحديث

ইলম অধ্যায় - এর পরিচ্ছেদসমূহ

মোট হাদীস ১২ টি

হাদীস নং: ১
ইলম অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ইলম অধ্যায়

দীনী পরিভাষা এবং কুরআন ও হাদীসের ভাষায় ইলম দ্বারা উদ্দেশ্য সেই ইলম যা নবী (আ) গণের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে বান্দাদের হিদায়াতের জন্য এসেছে। আল্লাহর কোন নবী ও রাসূলের প্রতি ঈমান এনে এবং তাঁকে নবী ও রাসূল মেনে নেওয়ার পর মানুষের ওপর সর্ব প্রথম অবশ্য কর্তব্য এটা বর্তায় যে, সে জানবে এবং জানার চেষ্টা করবে, এ নবী আমার জন্য কী শিক্ষা ও উপদেশাবলি নিয়ে এসেছেন? কি করা আর না করা আমার উচিত? ইলমের ওপর দীনের যাবতীয় ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত। এ জন্য ইলম শিক্ষা করা এবং অন্যকে শিক্ষাদান করা ঈমানের পর সর্বপ্রথম অপরিহার্য কর্তব্য।

এই শিক্ষা করা ও শিক্ষা দেওয়া মৌখিক কথা-বার্তা এবং পর্যবেক্ষণ দ্বারাও হতে পারে। যেমন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে ও তাঁর পরবর্তী নিকটবর্তী যুগে ছিল। সাহাবা কিরাম (রা)-এর গোটা ইলম তাই ছিল, যা তাঁদের অর্জিত হয়েছিল স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীসমূহ শুনে, তাঁর কার্যাবলি পর্যবেক্ষণ করে, কিংবা এরূপে তাঁর নিকট হতে কোনভাবে উপকৃত হওয়া অন্য সাহাবা কিরাম (রা) থেকে। এভাবে অধিকাংশ তাবিঈনের ইলমও তাই ছিল যা সাহাবা কিরাম-এর সাহচর্য ও তাঁদের থেকে শ্রবণের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল। আর এ ইলম লিখা-পড়া ও গ্রন্থাদির মাধ্যমেও অর্জিত হতে পারে। যেমন, পরবর্তী যুগসমূহে এর সাধারণ অবলম্বন ছিল গ্রন্থাদি পঠন-পাঠন, যা এখনো প্রচলিত আছে।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় বাণীসমূহে আবশ্যকীয় দীনী ইলম অর্জন করা প্রত্যেক সেই ব্যক্তির জন্য অবশ্য কর্তব্য বলেছেন, যে ব্যক্তি তাঁকে আল্লাহর নবী স্বীকার করে তাঁর প্রতি ঈমান আনবে, আল্লাহর দীন ইসলাম গ্রহণ করবে। এই ইলম অর্জনে কষ্ট ও পরিশ্রমকে তিনি 'আল্লাহর পথে' এক প্রকার জিহাদ ও আল্লাহর নৈকট্যলাভের অতি বিশেষ ওসীলা বলেছেন। আর এ বিষয়ে শৈথিল্য ও অবহেলাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ স্থির করেছেন।
এ ইলম নবী (আ) গণের, বিশেষভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মূল্যবান ত্যাজ্যবিত্ত, এবং গোটা জগতের সর্বাধিক প্রিয় ও মূল্যবান সম্পদ। আর যে সব সৌভাগ্যবান বান্দা এ ইলম অর্জন করে, এর দাবি পূরণ করে, তাঁরা নবীগণের উত্তরাধিকারী। আসমানের ফেরেশতা থেকে যমিনের পিঁপড়া ও সাগরের মাছ- তথা গোটা সৃষ্টি তাঁদের ভালবাসে, তাঁদের জন্য কল্যাণের দু'আ করে। আল্লাহ্ তা'আলা সেগুলোর প্রকৃতিতে এ বিষয় রেখে দিয়েছেন। পক্ষান্তরে যে সব ব্যক্তি নবী (আ) গণের এই পবিত্র ত্যাজ্যবিত্তকে ভুল উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে তারা নিকৃষ্টতম অপরাধী এবং আল্লাহ্ তা'আলার ক্রোধ ও আযাবের যোগ্য।
-نَعُوْذُ بِاللّٰهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئاتِ أَعْمَالِنَا

এ সংক্ষিপ্ত ভূমিকার পর ইলম শিক্ষা করা ও শিক্ষাদান সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিম্ন বর্ণিত হাদীসসমূহ পাঠ করুন।

প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ইলম অন্বেষণ ও অর্জন অবশ্য কর্তব্য
১. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ইলম অন্বেষণ ও অর্জন প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরয।
এ হাদীস হযরত আনাস (রা) থেকে বায়হাকী শু'আবুল ঈমান এবং ইবনে আদী কামিলে বর্ণনা করেছেন। আর এ হাদীসই তাবারানী মু'জামে আওসাতে হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে 'আব্বাস (রা) থেকে এবং সুনানে কবীর ও সুনানে আওসাতে আবূ মাসউদ ও আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে এবং মু'জামে সাগীরে হযরত হুসাইন থেকেও বর্ণনা করা হয়েছে।
کتاب العلم
عَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ. (رواه البيهقى فى شعب الايمان وابن عدى فى الكامل رواه الطبرانى فى الاوسط عن ابن عباس ورواه الكبير والاوسط عن ابي مسعود وابي سعيد وفى الصغير عن الحسين)
হাদীস নং: ২
ইলম অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ দীনে অজ্ঞ ব্যক্তিদের কর্তব্য হচ্ছে, জ্ঞাত ব্যক্তিদের থেকে শিখবে, আর জ্ঞাত ব্যক্তিদের দায়িত্ব হচ্ছে, তাদেরকে শিক্ষা দেবে।
২. প্রসিদ্ধ সাহাবী আব্দুর রহমান (রা)-এর পিতা আবযা আল খুযায়ী (রা) থেকে বর্ণিত, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মসজিদের মিম্বরে) ওয়াজ করেন, তাতে তিনি মুসলমানদের কতক গোত্রের প্রশংসা করেন। (যে, তারা তাদের দায়িত্বসমূহ সঠিক ভাবে পালন করছে) এরপর তিনি (মুসলমানদের অন্যান্য গোত্রকে সতর্ক ও তিরস্কার করে) বলেন, কী ব্যাপার সেই ব্যক্তিদের (এবং কী অজুহাত তাদের নিকট) যারা দীন না জানা মুসলমান প্রতিবেশীকে দীন শিক্ষা দেয় না এবং দীনের জ্ঞান প্রদান করে না। ওয়াজ নসীহত করে না, তাদের প্রতি সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ সম্পর্কীয় দায়িত্ব পালন করে না (এতদসঙ্গে তিনি বলেন) আর কী ব্যাপার সেই লোকদের (এবং কী অজুহাত তাদের নিকট যারা দীন ও আহকাম সম্বন্ধে জ্ঞাত নয় তা সত্ত্বেও) যারা নিজেদের নিকটে বসবাসকারী দীনী শিক্ষা ও দীনী ইলম অজর্নকারী মুসলমানদের থেকে দীন শিখতে, দীনী জ্ঞান আহরণ করতে এবং তাদের ওয়াজ নসীহত থেকে উপকৃত হতে চেষ্টা করে না? (এরপর তিনি শপথসহ জোর দিয়ে বলেন)

বস্তুত সেই ব্যক্তিগণ (যারা দীনের ইলম রাখে তারা, দীনের ইলম রাখে না) নিজেদের প্রতিবেশীদেরকে আবশ্যিকভাবে দীন শিক্ষা দিতে এবং তাদের মধ্যে দীনের জ্ঞান সৃষ্টি করতে স্বচেষ্ট হবে। তাদেরকে ওয়াজ নসীহত, ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর (যে সব ব্যক্তি দীন ও এর আহ্কাম সম্বন্ধে জ্ঞাত নয় তাদের প্রতি) আমার তাকিদ হচ্ছে, তারা (দীনের জ্ঞান ও ইলমধারী প্রতিবেশীদের থেকে দীন শিক্ষা করবে, দীনের জ্ঞান অর্জন করবে, তাদের ওয়াজ নসীহত হতে উপকৃত হবে, না হলে (অর্থাৎ- যদি এ উভয় দল এ উপদেশ অনুযায়ী কাজ না করে তবে) এ জগতেই আমি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করব।

এরপর (অর্থাৎ এই সতর্কীকরণ ওয়াজের পর) তিনি মিম্বর থেকে অবতরণ করে ঘরে প্রবেশ করেন। তারপর লোকজন পরস্পর বলাবলি করেন, কী ধারণা? হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য কারা? (অর্থাৎ এ ওয়াজে তিনি কাদের সতর্ক ও তিরস্কার করেছেন?) কেউ বললেন, আমাদের ধারণা, তাঁর উদ্দেশ্য আশ'আরী সম্প্রদায়, (অর্থাৎ আবূ মূসা আশ'আরীর গোত্রের লোকজন) তাঁদের অবস্থা হচ্ছে, তাঁরা ফকীহ্, দীনের জ্ঞান ও ইলম রাখে) আর তাঁদের পাশে পানির নালার নিকটে বাসকারী এরূপ বেদুঈন রয়েছে যারা একেবারে নিরক্ষর (এবং দীন সম্বন্ধে বিলকুল অজ্ঞ)।

এসব কথা আশ'আরীদের কানে এলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম-এর সমীপে হাযির হয়ে নিবেদন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! (জানতে পারলাম) আপনি প্রশংসার সাথে কতক গোত্রের উল্লেখ করেছেন। আর আমাদের মন্দ বলা হয়েছে। আমাদের বিষয় কী? (এবং ত্রুটি কি?) তিনি বললেন, (আমার বলা কেবল এই-দীনের ইলম ও জ্ঞানী) লোকদের দায়িত্ব হচ্ছে, তারা (দীন না জানা) স্বীয় প্রতিবেশীদেরকে দীন শিক্ষা দেবে, তাদের মধ্যে দীনের জ্ঞান সৃষ্টি করবে, তাদের ওয়াজ নসীহত, এবং ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বারণ করবে। আর যারা দীন জানে না, তাদের অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে, তারা (দীনের জ্ঞানী) নিজেদের প্রতিবেশী থেকে দীনী শিক্ষা গ্রহণ করবে এবং তাদের ওয়াজ ও নসীহত দ্বারা নিজেরা উপকৃত হতে থাকবে, এবং তাদের থেকে দীনের জ্ঞান লাভ করবে। কিম্বা এরপর আমি দুনিয়াতেই তাদেরকে শাস্তি দেওয়াব। আশ'আরীগণ নিবেদন করলেন, অন্য লোকদের অপরাধ ও ত্রুটির শাস্তিও কি আমাদের ভোগ করতে হবে? উত্তরে তিনি সেই কথাই পুনরোক্ত করলেন যা পূর্বে বলেছিলেন। আশ'আরীগণ আবার সেই নিবেদন করেন, যা প্রথমে নিবেদন করেছিলেন যে, অন্যদের গাফলত ও ত্রুটির শাস্তিও কি আমরা পাব? তিনি বললেন, হ্যাঁ তা-ও। (অর্থাৎ দীন জানা ব্যক্তিগণ যদি নিজেদের অজ্ঞ প্রতিবেশীদের দীন শিক্ষা দিতে ত্রুটি করে, তবে তারাও এর শাস্তি পাবে।

আশ'আরীগণ নিবেদন করলেন, এরপর আমাদেরকে এক বছরের অবকাশ দেওয়া হোক। তিনি তাদেরকে এক বছরের অবকাশ দান করেন, যেন নিজেদের প্রতিবেশীদেরকে দীন শিক্ষা দেয়, তাদের মধ্যে জ্ঞান সৃষ্টি করে ও ওয়াজ নসীহত দ্বারা তাদের সংশোধনের চেষ্টা করে। এরপর তিনি (সূরা মায়িদার) এ আয়াত তিলাওয়াত করেন-
{لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُودَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ (78) كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُنْكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ} [المائدة: 78، 79]
'বনী ইসরাঈলের মধ্যে যারা কুফরী করেছিল তারা দাউদ ও মারয়াম (আ)-এর পুত্র কর্তৃক অভিশপ্ত হয়েছিল। এটা এ জন্য যে, তারা ছিল অবাধ্য ও সীমালঙ্ঘনকারী। তারা যে সব মন্দ কাজ করত তা থেকে তারা একে অন্যকে বারণ করত না, তারা যা করত তা কতই না নিকৃষ্ট'! (সূরা মায়িদা ৭৮-৭৯)
(মুসনাদে ইবনে রাহবীয়া, বুখারীর ওয়াহ্দান, মান্দা ইবনে মানদাহ্, তাবারানীর মু'জামে কাবীর)
کتاب العلم
عن أبزى الخزاعي والد عبد الرحمن1 قال: خطب رسول الله صلى الله عليه وسلم ذات يوم، فأثنى على طوائف من المسلمين خيرا، ثم قال: ما بال أقوام لا يفقهون جيرانهم، ولا يعلمونهم ولا يعظونهم ولا يأمرونهم ولا ينهونهم؟ وما بال أقوام لا يتعلمون من جيرانهم ولا يتفقهون ولا يتفطنون، والله ليعلمن أقوام جيرانهم، ويفطنونهم ويفقهونهم، ويأمرونهم وينهونهم وليتعلمن قوم من جيرانهم، ويتفطنون ويتفقهون أو لأعاجلنهم بالعقوبة في دار الدنيا، ثم نزل فدخل بيته، فقال قوم: من تراه عنى بهؤلاء؟ فقالوا: نراه عنى الأشعريين هم قوم فقهاء، ولهم جيران جفاة من أهل المياه والأعراب، فبلغ ذلك الأشعريين، فأتوا رسول الله صلى الله عليه وسلم فقالوا: يا رسول الله ذكرت قوما بخير، وذكرتنا بشر، فما بالنا؟ فقال: ليعلمن قوم جيرانهم وليفقهنهم وليفطننهم وليأمرنهم، وليهينهم وليتعلمن قوم من جيرانهم، ويتفطنون ويتفقهون، أو لأعاجلنهم بالعقوبة في دار الدنيا، فقالوا: يا رسول الله أبطير غيرنا؟ فأعاد قوله عليهم، وأعادوا قولهم أبطير غيرنا؟ فقال: ذلك أيضا، قالوا فأمهلنا سنة فأمهلهم سنة ليفقهوهم ويعلموهم ويفطنوهم، ثم قرأ رسول الله صلى الله عليه وسلم: {لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ بَنِي إِسْرائيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُدَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ كَانُوا لا يَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُنْكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ} (رواه ابن راهويه والبخارى فى الوحدان وابن السكن وابن منذة والطبرانى فى الكبير)
হাদীস নং: ৩
ইলম অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ দীনী ইলম এবং তা শিক্ষার্থী ও শিক্ষাদানকারীর স্থান ও মর্যাদা
৩. হযরত আবুদ দারদা (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি (দীনের) ইলম অর্জনের জন্য কোন পথে চলে এর বিনিময়ে আল্লাহ্ তা'আলা তাকে জান্নাতের পথসমূহের একটি পথে পরিচালিত করেন। আর (তিনি বলেন) আল্লাহ তা'আলার ফেরেস্তাগণ ইলম অন্বেষণকারীদের জন্য সন্তুষ্টি প্রকাশ (এবং সম্মান) হিসাবে নিজেদের পাখা অবনত করে দেন। আর (বলেন) দীনী ইলম বহনকারীর জন্য আসমান যমীনের যাবতীয় সৃষ্টি আল্লাহ্ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে। এমনকি পানিতে বসবাসকারী মাছও। আর (তিনি বলেন) আবিদগণের ওপর আলিমের এরূপ মর্যাদা অর্জিত যেমন পূর্ণিমার রাতের চাঁদের মর্যাদা অন্যান্য নক্ষত্রের ওপর। তিনি এটাও বলেছেন, আলিমগণ নবীগণের উত্তরাধিকারী। আর নবীগণ দীনার ও দিরহাম ছেড়ে যাননি বরং তাঁরা উত্তাধিকার হিসাবে ইলম ছেড়ে গেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি তা অর্জন করল, সে বড় সৌভাগ্য অর্জন করল।
(মুসনাদে আহমদ, জামি' তিরমিযী, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে ইবনে মাজাহ্, মুসনাদে দারিমী)।
کتاب العلم
عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَطْلُبُ فِيهِ عِلْمًا سَلَكَ اللَّهُ بِهِ طَرِيقًا مِنْ طُرُقِ الْجَنَّةِ وَإِنَّ الْمَلاَئِكَةَ لَتَضَعُ أَجْنِحَتَهَا رِضًا لِطَالِبِ الْعِلْمِ وَإِنَّ الْعَالِمَ لَيَسْتَغْفِرُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَمَنْ فِي الأَرْضِ وَالْحِيتَانُ فِي جَوْفِ الْمَاءِ وَإِنَّ فَضْلَ الْعَالِمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ عَلَى سَائِرِ الْكَوَاكِبِ وَإِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الأَنْبِيَاءِ وَإِنَّ الأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِّثُوا دِينَارًا وَلاَ دِرْهَمًا وَرَّثُوا الْعِلْمَ فَمَنْ أَخَذَهُ أَخَذَ بِحَظٍّ وَافِرٍ. (رواه احمد والترمذى وابوداؤد وابن ماجه والدارمى)
হাদীস নং: ৪
ইলম অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ দীনী ইলম এবং তা শিক্ষার্থী ও শিক্ষাদানকারীর স্থান ও মর্যাদা
৪. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণ ও অজর্নের জন্য (ঘর হতে কিংবা দেশ হতে) বের হয়েছে সে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত আল্লাহর পথে। (জামি' তিরমিযী, আল-মাকদিসী)
کتاب العلم
عَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ خَرَجَ فِي طَلَبِ الْعِلْمِ فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ حَتَّى يَرْجِعَ. (رواه الترمذى والضياء المقدسى)
হাদীস নং: ৫
ইলম অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ দীনী ইলম এবং তা শিক্ষার্থী ও শিক্ষাদানকারীর স্থান ও মর্যাদা
৫. হযরত আবূ উমামা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা'আলা রহমত বর্ষণ করেন, এবং তাঁর ফেরেশতাকুল, আসমান যমীনে বসবাসকারী সব সৃষ্টিবস্তু, এমন কি পিঁপড়া তার গর্তে এবং (পানিতে বসবাসকারী) মাছও সেই ব্যক্তির জন্য কল্যাণের দু'আ করে, যে লোকজনকে উত্তম বিষয়-দীন শিক্ষা দান করে। (জামি' তিরমিযী)
کتاب العلم
عَنْ أَبِي أُمَامَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللَّهَ وَمَلاَئِكَتَهُ وَأَهْلَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ حَتَّى النَّمْلَةَ فِي جُحْرِهَا وَحَتَّى الْحُوتَ لَيُصَلُّونَ عَلَى مُعَلِّمِ النَّاسِ الْخَيْرَ. (رواه الترمذى)
হাদীস নং: ৬
ইলম অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ দীনী ইলম এবং তা শিক্ষার্থী ও শিক্ষাদানকারীর স্থান ও মর্যাদা
৬. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে 'আমর ইবনুল 'আস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় মসজিদে অবস্থানরত দু'টি মজলিসের নিকট দিয়ে গেলেন। তিনি বললেন, উভয় মজলিসই উত্তম (একটি মজলিসের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন) এসব লোক আল্লাহর নিকট দু'আকারী, তাঁর প্রতি আকৃষ্ট। আল্লাহ চাইলে দান করবেন, আর চাইলে দান করবেন না। (তিনি মালিক ও ক্ষমতাবান) আর অন্য মজলিস সম্বন্ধে বললেন, এসব লোক ফিকহ অথবা দীনী ইলম অর্জনের জন্যে এবং অজ্ঞদেরকে শিক্ষাদানের জন্য ব্যস্ত আছে। সুতরাং তারা শ্রেষ্ঠ। আর আমি তো শিক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছি। এরপর তিনি তাঁদের মধ্যে বসে গেলেন। (মুসনাদে দারিমী)
کتاب العلم
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ بِمَجْلِسَيْنِ في مَسْجِدِهِ فَقَالَ: كِلاَهُمَا عَلَى خَيْرٍ وَأَحَدُهُمَا أَفْضَلُ مِنْ صَاحِبِهِ، أَمَّا هَؤُلاَءِ فَيَدْعُونَ اللَّهَ وَيُرَغِّبُونَ إِلَيْهِ فَإِنْ شَاءَ أَعْطَاهُمْ وَإِنْ شَاءَ مَنَعَهُمْ، وَأَمَّا هَؤُلاَءِ فَيَتَعَلَّمُونَ الْفِقْهَ وَالْعِلْمَ وَيُعَلِّمُونَ الْجَاهِلَ فَهُمْ أَفْضَلُ، وَإِنَّمَا بُعِثْتُ مُعَلِّماً ثُمَّ جَلَسَ فِيهِمْ. (رواه الدارمى)
হাদীস নং: ৭
ইলম অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ দীনী ইলম এবং তা শিক্ষার্থী ও শিক্ষাদানকারীর স্থান ও মর্যাদা
৭. হযরত হাসান বসরী ইরসালরূপে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তির মৃত্যু এমতাবস্থায় আসে যে, সে এ উদ্দেশ্যে দীনী ইলম অন্বেষণ ও অর্জনে নিয়োজিত, যা দ্বারা ইসলামকে জীবন্ত করবে, তবে জান্নাতে তার ও নবীগণের মধ্যে কেবল এক স্তর পার্থক্য হবে।
(মুসনাদে দারিমী)
کتاب العلم
عَنِ الْحَسَنِ مُرْسَلًا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ جَاءَهُ الْمَوْتُ وَهُوَ يَطْلُبُ الْعِلْمَ لِيُحْيِيَ بِهِ الإِسْلاَمَ فَبَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّبِيِّينَ دَرَجَةٌ وَاحِدَةٌ في الْجَنَّةِ. (رواه الدارمى)
হাদীস নং: ৮
ইলম অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ দীনী ইলম এবং তা শিক্ষার্থী ও শিক্ষাদানকারীর স্থান ও মর্যাদা
৮. হযরত হাসান বসরী (র) ইরসালরূপে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বনী ইসরাঈলের এরূপ দু'ব্যক্তি সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করা হল, যাদের একজনের অভ্যাস ছিল, তিনি ফরয নামায আদায় করতেন এরপর বসে লোকজনকে উত্তম ও নেকীর কথা বলতেন ও দীনের শিক্ষাদান করতেন। অন্যজনের অবস্থা ছিল, সারা দিন রোযা রাখতেন আর রাতে দাঁড়িয়ে নফল নামায আদায় করতেন। (তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল) এ দু'ব্যক্তির মধ্যে কে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ? তিনি বললেন, এই আলিম, যে ফরয নামায পূর্ণ করে পুনরায় লোকজনকে দীন ও নেকীর কথা শিক্ষাদানের জন্য বসে যায়। দিনে রোযা পালনকারী ও রাতজাগা আবিদের তুলনায় তাঁর এরূপ শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত, যে রূপ তোমাদের কোন সাধারণ ব্যক্তির ওপর আমার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত। (মুসনাদে দারিমী)
کتاب العلم
عَنِ الْحَسَنِ مُرْسَلًا قَالَ: سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ رَجُلَيْنِ كَانَا في بَنِي إِسْرَائِيلَ: أَحَدُهُمَا كَانَ عَالِماً يُصَلِّي الْمَكْتُوبَةَ ثُمَّ يَجْلِسُ فَيُعَلِّمُ النَّاسَ الْخَيْرَ، وَالآخَرُ يَصُومُ النَّهَارَ وَيَقُومُ اللَّيْلَ أَيُّهُمَا أَفْضَلُ؟ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: فَضْلُ هَذَا الْعَالِمِ الذي يُصَلِّي الْمَكْتُوبَةَ ثُمَّ يَجْلِسُ فَيُعَلِّمُ النَّاسَ الْخَيْرَ عَلَى الْعَابِدِ الذي يَصُومُ النَّهَارَ وَيَقُومُ اللَّيْلَ كَفَضْلِي عَلَى أَدْنَاكُمْ. (رواه الدارمى)
হাদীস নং: ৯
ইলম অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ পার্থিব উদ্দেশ্যে দীনী ইলম অজর্নকারীদের ঠিকানা জাহান্নাম, তারা জান্নাতের সুগন্ধি থেকে পর্যন্ত বঞ্চিত
৯. হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ইলম, দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা হয় (অর্থাৎ দীন, কিতাব ও সুন্নাতের ইলম) যদি কোন ব্যক্তি দুনিয়ার সম্পদ লাভের জন্য এটা অর্জন করে তবে সে কিয়ামতের দিন জান্নাতের সুগন্ধি থেকেও বঞ্চিত থাকবে।
(আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ্)
کتاب العلم
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ لاَ يَتَعَلَّمُهُ إِلاَّ لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدُّنْيَا لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ. يَعْنِي رِيحَهَا. (رواه احمد وابوداؤد وابن ماجه)
হাদীস নং: ১০
ইলম অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ পার্থিব উদ্দেশ্যে দীনী ইলম অজর্নকারীদের ঠিকানা জাহান্নাম, তারা জান্নাতের সুগন্ধি থেকে পর্যন্ত বঞ্চিত
১০. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি দীনী ইলম আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয় বরং গাইরুল্লাহর জন্য (অর্থাৎ নিজের পার্থিব ও আত্মার উদ্দেশ্যে) অর্জন করে জাহান্নামে সে তার ঠিকানা নির্ধারণ করুক। (জামি' তিরমিযী)
کتاب العلم
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا لِغَيْرِ اللَّهِ أَوْ أَرَادَ بِهِ غَيْرَ اللَّهِ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ. (رواه الترمذى)
হাদীস নং: ১১
ইলম অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ আমলহীন আলিম ও উস্তাদের দৃষ্টান্ত এবং আখিরাতে তাদের অবস্থা
১১. হযরত জুন্দুব (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে আলিম অন্য লোকজনকে নেকীর শিক্ষা দান করে আর নিজে ভুলে থাকে তার দৃষ্টান্ত সেই বাতির ন্যায়, যে বাতি লোকজনকে আলো পৌঁছায় আর নিজে জ্বলতে থাকে। (তাবারানী, আযযিয়া)
کتاب العلم
عَنْ جُنْدُبٍ، قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَثَلُ الْعَالِمِ الَّذِي يُعَلِّمُ النَّاسَ الْخَيْرَ ويَنْسَى نَفْسَهُ كَمَثَلِ السِّرَاجِ يُضِيءُ لِلنَّاسِ ويَحْرِقُ نَفْسَهُ» (رواه الطبرانى والضياء)
tahqiq

তাহকীক:

হাদীস নং: ১২
ইলম অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ আমলহীন আলিম ও উস্তাদের দৃষ্টান্ত এবং আখিরাতে তাদের অবস্থা
১২. হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কিয়ামতের দিন সর্বাধিক শাস্তি সেই আলিমের হবে যাকে তার ইলম ফায়দা পৌঁছায়নি (অর্থাৎ সে তার কর্মজীবন ইলমের অধীনে তৈরি করেনি)
(মুসনাদে আবূ দাউদ তায়ালিসি, সুনানে সাঈদ ইবনে মানসূর, কামিল ইবনে 'আদী, শু'আবুল ঈমান)
کتاب العلم
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ: «أَشَدُّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَالِمٌ لَمْ يَنْفَعْهُ عِلْمُهُ» (رواه الطيالسى فى مسنده وسعيد بن منصور فى سننه وابن عدى فى الكامل والبيهقى فى شعب الايمان)