রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

رياض الصالحين من كلام سيد المرسلين

ভূমিকা অধ্যায় - এর পরিচ্ছেদসমূহ

মোট হাদীস ৬৭৯ টি

হাদীস নং: ১৪১
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ সৎকর্মের বহুবিধ পন্থা।
সদাকার বিভিন্ন প্রকার
হাদীছ নং: ১৪১

হযরত আবূ মূসা আশ'আরী রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, প্রত্যেক মুসলিমের সদাকা করা অবশ্যকর্তব্য। এক সাহাবী বললেন, বলুন তো সে যদি কিছু না পায়? তিনি বললেন, তখন সে নিজের দু'হাতে কাজ করবে আর এভাবে নিজ প্রয়োজন মেটাবে এবং সদাকাও করবে। সাহাবী বললেন, যদি সে তাও না পারে? তিনি বললেন, তাহলে প্রয়োজনগ্রস্ত ও দুঃস্থদের সাহায্য করবে। সাহাবী বললেন, বলুন তো যদি তাও না পারে? তিনি বললেন, তবে সৎকাজের বা কল্যাণকর কাজের আদেশ করবে। সাহাবী বললেন, বলুন তো যদি তাও করতে না পারে? তিনি বললেন, তাহলে সে অন্ততপক্ষে মন্দ কাজ করা থেকে বিরত থাকবে। কেননা এটাও সদাকা। -বুখারী ও মুসলিম.
(সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৬০২২; সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ১০০৮; সুনানে নাসাঈ, হাদীছ নং ২৫৩৮; মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ১৯৫৩১; বায়হাকী, হাদীছ নং ৭৮২১; বাগাবী, শারহুস - সুন্নাহ, হাদীছ নং ১৬৪৩)
مقدمة الامام النووي
13 - باب في بيان كثرة طرق الخير
141 - الخامس والعشرون: عن أَبي موسى - رضي الله عنه - عن النَّبيّ - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «عَلَى كُلِّ [ص:66] مُسْلِمٍ صَدَقَةٌ» قَالَ: أرأيتَ إنْ لَمْ يَجِدْ؟ قَالَ: «يَعْمَلُ بِيَدَيْهِ فَيَنْفَعُ نَفْسَهُ وَيَتَصَدَّقُ» قَالَ: أرأيتَ إن لَمْ يَسْتَطِعْ؟ قَالَ: «يُعِينُ ذَا الحَاجَةِ المَلْهُوفَ (1)» قَالَ: أرأيتَ إنْ لَمْ يَسْتَطِعْ، قَالَ: «يَأمُرُ بِالمَعْرُوفِ أوِ الخَيْرِ». قَالَ: أرَأيْتَ إنْ لَمْ يَفْعَلْ؟ قَالَ: «يُمْسِكُ عَنِ الشَّرِّ، فَإِنَّهَا صَدَقَةٌ». مُتَّفَقٌ عَلَيهِ. (2)
হাদীস নং: ১৪২
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ‘ইবাদতে মধ্যপন্থা প্রসঙ্গ

ইসলামে মধ্যপন্থা ও ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্ব

ইসলামে মধ্যপন্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা ইসলামের এক অসাধারণ বৈশিষ্ট্য। ইসলাম সবকিছুতেই তার এ বৈশিষ্ট্য রক্ষা করেছে। কি 'আকীদা-বিশ্বাস, কি ‘ইবাদত বন্দেগী, কি আখলাক-চরিত্র, কোনও ক্ষেত্রেই ইসলাম মধ্যপন্থা পরিত্যাগ করেনি।। কোনও বিষয়ে না আছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি এবং না আছে এমন শৈথিল্য, যা বিষয়টির গুরুত্ব ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে।
‘ইবাদতের কথাই ধরা যাক। এর মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নামায। শরী'আত নামায ফরয করেছে পাঁচ ওয়াক্ত। এর বেশি হলে মানুষের উপর চাপ পড়ে যেত। আবার যদি কম হত তবে এর কাঙ্ক্ষিত সুফল লাভ হত না। এর রাক'আত সংখ্যাও রাখা হয়েছে পরিমাণমত। যে ওয়াক্তের জন্য যা সমীচীন ঠিক তাই। এর ফরয-ওয়াজিব ও সুন্নত-মুস্তাহাব প্রতিটি বিষয়কে আপন আপন জায়গায় রাখা হয়েছে। যদি এর বিপরীত হত, অর্থাৎ যে বিধান যে সংখ্যায় ও যে পর্যায়ে দেওয়া হয়েছে তার পরিবর্তে যদি অন্যরকম দেওয়া হত, তবে ভারসাম্য নষ্ট হত। ফলে এখন যত সহজে নামায পড়া সম্ভব হয়, তখন তা সম্ভব হত না এবং এখন যে সুফল এর মধ্যে নিহিত আছে, তখন তা থাকত না। তত্ত্ববিদ 'আলেমগণ তা ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দিয়েছেন।
তাই ইসলামের যথার্থ অনুসারীর কর্তব্য নামায, রোযা প্রভৃতি 'ইবাদত-বন্দেগী শরী'আত যেভাবে দিয়েছে ঠিক সেভাবেই পালন করা। এতে কোনও রকম বাড়াবাড়িও না করা এবং শিথিলতাও না দেখানো। শিথিলতা করার তো অবকাশই নেই। কেননা সে ক্ষেত্রে বিধান সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে যায়। বাড়াবাড়ি করা অত্যন্ত ক্ষতিকর। কেননা তাতে একপর্যায়ে ক্লান্তি আসে ও অবসাদ দেখা দেয়। ফলে আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষা সম্ভব হয় না। কেননা মানুষের জৈবিক চাহিদা আছে। সে চাহিদা পূরণ না করলে শরীর ভেঙে পড়ে। ঠিকমত খাবার দেওয়া না হলে শরীর দুর্বল হয়ে যায়। প্রয়োজনীয় মাত্রায় না ঘুমালে স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায়। শরীর দিয়ে অসহনীয় পর্যায়ে কাজ নিলে আগেভাগেই শক্তিসামর্থ্য লোপ পায়। নিয়মশৃঙ্খলা রক্ষা না করলে নানা রকম রোগব্যাধি দেখা দেয়। তো যে ব্যক্তি অতিরিক্ত আমল করবে তার হয় ঘুম নষ্ট হবে, নয়তো শরীরের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে, পানাহার, বিশ্রাম ইত্যাদির নিয়মশৃঙ্খলা নষ্ট হবে, আর এভাবে একপর্যায়ে চরম স্বাস্থ্যহানির শিকার হয়ে 'ইবাদত-বন্দেগী করতেই অক্ষম হয়ে পড়বে।
বস্তুত ইসলাম এক স্বভাবধর্ম। সে মানুষের স্বাভাবিক চাহিদাসমূহ বৈধ সীমার ভেতর পূরণ করতে বলেছে, যাতে শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক থাকে। চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রেও ভারসাম্যের হুকুম দিয়েছে, যাতে মাত্রা অপেক্ষা এত কম না হয়, যা স্বাস্থ্যহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায় আবার এত বেশিও না হয়, যা পশুপ্রবৃত্তি উস্‌কে দেয়। ইসলাম এ ক্ষেত্রে সন্ন্যাসী হয়ে যাওয়াকেও অনুমোদন করেনি, আবার সম্পূর্ণ ইন্দ্রিয়পরবশ ও স্বেচ্ছাচারী হওয়াকেও জায়েয রাখেনি। ঠিক মাঝখানে থাকতে বলেছে। অর্থাৎ পরিমিত মাত্রায় ও বিধিসম্মতভাবে চাহিদা পূরণের হুকুম দিয়েছে। এর দ্বারা একদিকে স্বাস্থ্য ঠিক থাকে, অপরদিকে 'ইবাদত-বন্দেগীর ধারাবাহিকতা রক্ষাও সম্ভব হয়। কাজেই ইবাদতের স্বার্থেই স্বাস্থ্যরক্ষা জরুরি এবং এটা শরীরের হক। এদিকে ইঙ্গিত করে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ- إن لنفسك عليك حقا “নিশ্চয়ই তোমার উপর তোমার নিজ সত্তারও হক আছে। " সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৬১৩৯; জামে তিরমিযী, হাদীছ নং ২৪১৩; সুনানে আবু দাউদ,হাদীছ নং ১৩৬৯; মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ২৬৩০৯
এ হক আদায় দ্বারা 'ইবাদত-বন্দেগীর ধারাবাহিকতা রক্ষা সম্ভব হয়, তাই এটা আর কেবল দুনিয়াবী কাজ থাকে না; বরং ছাওয়াবের পরিণত হয়ে যায়। তাই তো হযরত মু'আয ইব্ন জাবাল রাযি. বলেনঃ- أحتسب نومتي كما أحتسب قومتي “আমি আমার ঘুম দ্বারাও ছাওয়াবের আশা করি, যেমন ছাওয়াবের আশা করি নামায দ্বারা।” সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৪৩৪৪
অপরপক্ষে স্বভাবগত চাহিদা যথাযথভাবে পূরণ না করলে যেহেতু শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং এ কারণে ইবাদতের ধারাবাহিকতা রক্ষাও সম্ভব হয় না, সেহেতু এটা একরকম অপরাধ; হক আদায় না করার অপরাধ। জনৈক বেদুঈন ইসলাম গ্রহণের পর এক বছর যাবৎ দিনের বেলা খানা খায়নি। এ কারণে তার এমন স্বাস্থ্যহানি ঘটেছিল যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে চিনতে পারছিলেন না। শেষে বেদুঈন যখন নিজ পরিচয় দিলেন এবং একটানা রোযা রাখার কথা জানালেন, তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে তিরস্কার করে বলেছিলেনঃ- من أمرك أن تعذب نفسك؟ “এভাবে নিজেকে নিজে শাস্তি দিতে তোমাকে কে আদেশ করেছে?” মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ২০৩২৩; সুনানে ইবন মাজাহ, হাদীছ নং ১৭৪১; আত-তবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর, হাদীছ নং ৯০১
প্রকৃতপক্ষে মধ্যপন্থাই শ্রেয়। বিখ্যাত তাবি'ঈ মুতাররিফ ইব্ন 'আব্দুল্লাহ তাঁর পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, বাছা! পুণ্য হচ্ছে দুই পাপের মাঝখানে। অর্থাৎ শৈথিল্য ও বাড়াবাড়ির মাঝখানে। সবকিছুর মধ্য অবস্থায়ই সেরা। সেই গতি অতি মন্দ, যার তীব্রতা বাহনকে ধ্বংস করে। উয়ুনুল আখবার, ১ম খ., ৩৭৬ পৃ.।
মধ্যপন্থার গুরুত্ব ও ফযীলত সম্পর্কে আছে বহু আয়াত ও হাদীছ। ইমাম নববী রহ এ অধ্যায়ে সেরকম কিছু আয়াত ও হাদীছ উল্লেখ করেছেন। নিচে আমরা তার অর্থ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা পেশ করছি।

“ইবাদতে মধ্যপন্থা সম্পর্কে কয়েকটি আয়াত

এক নং আয়াত

طه (1) مَا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْقُرْآنَ لِتَشْقَى (2)

অর্থ : (১) তোয়া-হা। (২) আমি তোমার প্রতি কুরআন এজন্য নাযিল করিনি যে,তুমি কষ্ট ভোগ করবে। সূরা তোয়া-হা, আয়াত ১-২

ব্যাখ্যা

এটি সূরা তোয়া-হা'র প্রথম ও দ্বিতীয় আয়াত। এর শানে নুযূল সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, নবুওয়াত লাভের পর প্রথমদিকে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনেক দীর্ঘ নামায পড়তেন। কখনও কখনও তিনি এক পা উঁচু করে অন্য পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতেন। এতে তাঁর পা ফুলে-ফেটে যেত এবং তাঁর অনেক কষ্ট হত। তারই পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াত নাযিল হয় এবং এতে জানানো হয় যে, তাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য কুরআন নাযিল করা হয়নি। কাজেই নামাযে এত লম্বা সময় দাঁড়িয়ে এত বেশি পরিমাণ কুরআন পড়ার দরকার নেই, যদ্দরুন তার পা ফুলে ফেটে যায় এবং অতিরিক্ত কষ্ট হয়। তার মানে নামায পড়া ও কুরআন তিলাওয়াতে ভারসাম্য রক্ষা করা উচিত। এভাবে এ আয়াত দ্বারা ‘ইবাদত-বন্দেগীতে মধ্যপন্থা ও ভারসাম্য রক্ষার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

দুই নং আয়াত

يُرِيدُ اللهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ

অর্থ : আল্লাহ তোমাদের পক্ষে যা সহজ সেটাই চান, তোমাদের জন্য জটিলতা চান না। সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৫

ব্যাখ্যা

এ আয়াতটি নাযিল হয়েছে রোযা সম্পর্কে। এতে মুসাফির ও অসুস্থ ব্যক্তিকে রমযানের রোযা না রাখার অবকাশ দেওয়া হয়েছে। তারা পরে সময়-সুযোগমত তার কাযা করে নেবে। যেহেতু তাদেরকে অবকাশ দেওয়া হয়েছে, তাই সকল কষ্টক্লেশ উপেক্ষা করে যদি রোযা রাখে এবং তা তাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর হয় কিংবা এ কারণে কোনও দীনী স্বার্থ বিঘ্নিত হয়, তবে তাদের জন্য সে রোযা কিছুতেই পসন্দনীয় নয়। এরূপ ক্ষেত্রে শরী'আতপ্রদত্ত অবকাশ গ্রহণ করে নেওয়াই শ্রেয়। এ আয়াতে সে কথাই বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের পক্ষে যা সহজ সেটাই চান, তোমাদের প্রতি কঠোরতা করতে চান না। অন্য এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-

وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ

অর্থ : তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের প্রতি কোনও সংকীর্ণতা আরোপ করেননি।সূরা হজ্জ, আয়াত ৭৮
মোটকথা, দীনের প্রতিটি বিধানই সহজসাধ্য। কাজেই শরী'আত প্রতিটি বিধান যেমন সহজরূপে প্রদান করেছে, সে অবস্থায় রেখে আমল করাই উত্তম। কোনও বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয়ে সহজ আমলকে কঠিন করে তোলা উচিত নয়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক হাদীছে ইরশাদ করেছেন-

إِنَّكُمْ أُمَّةٌ أُرِيدَ بِكُمُ الْيُسْرُ

তোমরা এমন এক উম্মত যে, তোমাদের জন্য (দীনের সব ব্যাপারে) সহজতা ও অনায়াসসাধ্যতা চাওয়া হয়েছে।মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ২০৩৪৭
আল্লাহর কাছে স্থায়ী আমলই বেশি পসন্দনীয়
হাদীছ নং: ১৪২

হযরত ‘আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে আসলেন। তখন তার নিকট এক স্ত্রীলোক উপস্থিত ছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ কে? হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি. বললেন, সে অমুক। তার নামাযের কথা (লোকমুখে) চর্চা হয়। তিনি বললেন, থাম। তোমাদের কর্তব্য অতটুকুই করা, যতটুকু করার ক্ষমতা রাখ। আল্লাহর কসম! আল্লাহ ক্লান্ত হন না (অর্থাৎ ছাওয়াব দেওয়া বন্ধ করেন না), যাবত না তোমরা ক্লান্ত হয়ে পড়। আর তাঁর কাছে ওই আমলই বেশি পসন্দ, যা আমলকারী নিয়মিতভাবে করে। -বুখারী ও মুসলিম-. সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৪৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৮৫
مه এটা একটা নিষেধাজ্ঞা ও বিরক্তিসূচক শব্দ। এর অর্থ রাখ, থাম।
لا يمل الله –এর আক্ষরিক অর্থ আল্লাহ ক্লান্ত হন না। এর দ্বারা বোঝানো উদ্দেশ্য তিনি তোমাদের আমলের ছাওয়াব ও প্রতিদান দেওয়া বন্ধ করেন না। অর্থাৎ ক্লান্তশ্রান্ত ব্যক্তি যেমনটা করে, অনুরূপ কাজ তিনি করেন না।
حتى تملوا –যাবৎ না তোমরা ক্লান্ত হও। অর্থাৎ তোমরা ক্লান্ত হয়ে আমল ছেড়ে দাও । তোমরা আমল ছেড়ে দিলেই তিনি ছাওয়াব দেওয়া বন্ধ করেন। কাজেই তোমাদের কর্তব্য অতটুকু আমলই গ্রহণ করা, যতটুকু নিয়মিতভাবে করে যেতে পারবে, যাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে ছাওয়াব দান অব্যাহত থাকে এবং তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ বর্ষণ জারি থাকে।
مقدمة الامام النووي
14 - باب في الاقتصاد في العبادة
قَالَ الله تَعَالَى: {طه مَا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْقُرْآنَ لِتَشْقَى} [طه: 1]، وَقالَ تَعَالَى: {يُرِيدُ اللهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ} [البقرة: 185].
142 - وعن عائشة رضي الله عنها: أنَّ النَّبيّ - صلى الله عليه وسلم - دخل عَلَيْهَا وعِندها امرأةٌ، قَالَ: «مَنْ هذِهِ؟» قَالَتْ: هذِهِ فُلاَنَةٌ تَذْكُرُ مِنْ صَلاتِهَا. قَالَ: «مَهْ، عَلَيْكُمْ بِمَا تُطِيقُونَ، فَواللهِ لاَ يَمَلُّ اللهُ حَتَّى تَمَلُّوا» وكَانَ أَحَبُّ الدِّينِ إِلَيْهِ مَا دَاوَمَ صَاحِبُهُ عَلَيهِ. مُتَّفَقٌ عَلَيهِ. (1)
وَ «مهْ»: كَلِمَةُ نَهْي وَزَجْر. ومَعْنَى «لاَ يَمَلُّ اللهُ»: لاَ يَقْطَعُ ثَوَابَهُ عَنْكُمْ وَجَزَاء أَعْمَالِكُمْ ويُعَامِلُكُمْ مُعَامَلةَ المَالِّ حَتَّى تَمَلُّوا فَتَتْرُكُوا، فَيَنْبَغِي لَكُمْ أَنْ تَأخُذُوا مَا تُطِيقُونَ الدَّوَامَ عَلَيهِ لَيدُومَ ثَوابُهُ لَكُمْ وَفَضْلُهُ عَلَيْكُمْ.
হাদীস নং: ১৪৩
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ‘ইবাদতে মধ্যপন্থা প্রসঙ্গ।
স্বভাবগত চাহিদা পূরণ ও নফল ‘ইবাদতের ক্ষেত্রে নববী আদর্শ
হাদীছ নং: ১৪৩

হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তিন ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞাসার উদ্দেশ্যে তাঁর স্ত্রীগণের ঘরে এসে উপস্থিত হল। তাদেরকে যখন (সে সম্পর্কে) অবহিত করা হল, তখন যেন তারা তাকে (অর্থাৎ তাঁর আমলসমূহকে) অল্প বিবেচনা করল। শেষে তারা বলল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে আমাদের তুলনা কী, যখন তাঁর আগের পরের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়েছে? তারপর তাদের একজন বলল, তবে আমি সর্বদা রাতভর নামায পড়ব। আরেকজন বলল, আমি সর্বদা নিরবচ্ছিন্ন রোযা রাখব, কখনও রোযাবিহীন থাকব না। অপরজন বলল, আমি নারীদের পরিহার করে চলব, কখনও বিবাহ করব না।
তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম (তাদের এসব কথা শুনতে পেরে) তাদের কাছে আসলেন। তিনি তাদের বললেন, তোমরাই তারা, যারা এই এই কথা বলেছ? শোন, আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তাঁর জন্য তোমাদের চেয়ে বেশি তাকওয়া অবলম্বন করে থাকি। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি রোযা রাখি আবার রোযা ছাড়াও থাকি, আমি রাত জেগে নামায পড়ি এবং ঘুমাইও, আর আমি নারীদের বিবাহ করি। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে বিমুখ হবে সে আমার লোক নয়। -বুখারী ও মুসলিম.
(সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৫০৬৩; সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ১৪০১; সুনানে নাসাঈ, হাদীছ ন ৩২১৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ১৩৫৫৮: বায়হাকী, হাদীছ নং ১৩৪৪৮: বাগাবী, শারহুস্- সুন্নাহ, হাদীছ নং ৯৬)
مقدمة الامام النووي
14 - باب في الاقتصاد في العبادة
143 - وعن أنس - رضي الله عنه - قَالَ: جَاءَ ثَلاثَةُ رَهْطٍ إِلَى بُيُوتِ أزْوَاجِ النَّبيّ - صلى الله عليه وسلم - يَسْأَلُونَ عَنْ عِبَادَةِ النَّبيّ - صلى الله عليه وسلم - فَلَمَّا أُخْبِروا كَأَنَّهُمْ تَقَالُّوهَا وَقَالُوا: أَيْنَ نَحْنُ مِنَ النَّبيِّ - صلى الله عليه وسلم - وَقدْ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأخَّرَ. قَالَ أحدُهُم: أمَّا أنا فَأُصَلِّي اللَّيلَ أبدًا. وَقالَ الآخَرُ: وَأَنَا أصُومُ الدَّهْرَ أَبَدًا وَلا أُفْطِرُ. وَقالَ الآخر: وَأَنا أعْتَزِلُ النِّسَاءَ فَلاَ أتَزَوَّجُ أبَدًا. فجاء رسولُ الله - صلى الله عليه وسلم - إليهم، فَقَالَ: «أنْتُمُ الَّذِينَ قُلْتُمْ كَذَا وَكَذَا؟ أَمَا واللهِ إنِّي لأخْشَاكُمْ للهِ، وَأَتْقَاكُمْ لَهُ، لَكِنِّي أصُومُ وَأُفْطِرُ، وأُصَلِّي وَأَرْقُدُ، وَأَتَزَوَّجُ النِّساءَ، فَمَنْ رَغِبَ (1) عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي». مُتَّفَقٌ عَلَيهِ. (2)
হাদীস নং: ১৪৪
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ‘ইবাদতে মধ্যপন্থা প্রসঙ্গ।
অহেতুক কঠোরতা অবলম্বনের পরিণাম
হাদীছ নং: ১৪৪

হযরত 'আব্দুল্লাহ ইবন মাস'উদ রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, অহেতুক কঠোরতা অবলম্বনকারীগণ ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি এ কথা তিনবার বলেছেন। -মুসলিম'
المتنطعون-এর অর্থ যে জায়গা কঠোরতার নয় সেখানে কঠোরতা অবলম্বনকারী, অহেতুক খোঁড়াখুঁড়িতে লিপ্ত ব্যক্তি।
(সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ২৬৭০: সুনানে আবূ দাউদ, হাদীছ নং ৪৬০৮; মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ৩৬৫৫; তবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর, হাদীছ নং ১০৩৬৮)
مقدمة الامام النووي
14 - باب في الاقتصاد في العبادة
144 - وعن ابن مسعود - رضي الله عنه: أنّ النَّبيّ - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «هَلَكَ المُتَنَطِّعُونَ» قالها ثَلاثًا. رواه مسلم. (1)
«المُتَنَطِّعونَ»: المتعمقون المشددون في غير موضِعِ التشديدِ.
হাদীস নং: ১৪৫
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ‘ইবাদতে মধ্যপন্থা প্রসঙ্গ।
কঠোরতা অবলম্বনের ক্ষতি ও মধ্যপন্থা রক্ষার গুরুত্ব
হাদীছ নং: ১৪৫

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, দীন সহজ। যে-কেউ দীনকে কঠিন বানাবে, দীন তাকে অবশ্যই পরাস্ত করবে। তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন কর, সাধ্যানুযায়ী আমল কর ও সুসংবাদ নাও এবং সকাল, সন্ধ্যা ও রাতের কিছু অংশ দ্বারা সাহায্য গ্রহণ কর।-বুখারী'*
বুখারীর অপর এক বর্ণনায় আছে, তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন কর ও সামর্থ্য অনুযায়ী আমল কর এবং বের হয়ে পড় সকালে, সন্ধ্যায় ও রাতের কিছু অংশে। মধ্যপন্থা অবলম্বন কর, মধ্যপন্থা অবলম্বন কর, লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে।
*(সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৩৯, ৫৬৭৩, ৬৪৬৪: সুনানে নাসাঈ, হাদীছ নং ৫০৩৪; মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ১০৯৫২)
مقدمة الامام النووي
14 - باب في الاقتصاد في العبادة
145 - عن أَبي هريرةَ - رضي الله عنه - عن النَّبيّ - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «إنَّ الدِّينَ يُسْرٌ، وَلَنْ يُشَادَّ الدِّيْنُ إلاَّ غَلَبَهُ، فَسَدِّدُوا وَقَارِبُوا وَأبْشِرُوا، وَاسْتَعِينُوا بِالغَدْوَةِ وَالرَّوْحَةِ وَشَيءٍ مِنَ الدُّلْجَةِ». رواه البخاري. (1)
وفي رواية لَهُ: «سَدِّدُوا وَقَارِبُوا، وَاغْدُوا وَرُوحُوا، وَشَيءٌ مِنَ الدُّلْجَةِ، القَصْدَ القَصْدَ تَبْلُغُوا».
قوله: «الدِّينُ»: هُوَ مرفوع عَلَى مَا لَمْ يسم فاعله. وروي منصوبًا وروي «لن يشادَّ الدينَ أحدٌ». وقوله - صلى الله عليه وسلم: «إلا غَلَبَهُ»: أي غَلَبَهُ الدِّينُ وَعَجَزَ ذلِكَ المُشَادُّ عَنْ مُقَاوَمَةِ الدِّينِ لِكَثْرَةِ طُرُقِهِ. وَ «الغَدْوَةُ»: سير أولِ النهارِ. وَ «الرَّوْحَةُ»: آخِرُ النهارِ. وَ «الدُّلْجَةُ»: آخِرُ اللَّيلِ.
وهذا استعارة وتمثيل، ومعناه: اسْتَعِينُوا عَلَى طَاعَةِ اللهِ - عز وجل - بِالأَعْمَالِ في وَقْتِ نَشَاطِكُمْ وَفَرَاغِ قُلُوبِكُمْ بِحَيثُ تَسْتَلِذُّونَ العِبَادَةَ ولا تَسْأَمُونَ وتبلُغُونَ مَقْصُودَكُمْ، كَمَا أنَّ المُسَافِرَ الحَاذِقَ يَسيرُ في هذِهِ الأوْقَاتِ ويستريح هُوَ وَدَابَّتُهُ في غَيرِهَا فَيَصِلُ المَقْصُودَ بِغَيْرِ تَعَب، واللهُ أعلم.
হাদীস নং: ১৪৬
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ‘ইবাদতে মধ্যপন্থা প্রসঙ্গ।
শরীর-মন যতক্ষণ প্রফুল্ল থাকে, নফল ‘ইবাদত ততক্ষণই
হাদীছ নং: ১৪৬

হযরত আনাস ইবন মালিক রাযি. বলেন, একদা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে প্রবেশ করলেন। সহসা দেখেন দুই খুঁটির মাঝখানে একটি রশি টানানো আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এই রশিটি কিসের? তারা আরজ করলেন, এটি যায়নাবের রশি। তিনি যখন (নামায পড়তে পড়তে) ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন এটিতে ঝুলে পড়েন। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটি খুলে ফেল। তোমাদের প্রত্যেকে যেন নামায পড়ে তার প্রফুল্ল থাকা পর্যন্ত। যখনই ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন যেন শুয়ে পড়ে। -বুখারী ও মুসলিম.
(সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ১১৫০; সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ৭৮৪; সুনানে আবূ দাউদ, হাদীছ নং ১৩১২; সুনানে নাসাঈ, হাদীছ নং ১৬৪৩)
مقدمة الامام النووي
14 - باب في الاقتصاد في العبادة
146 - وعن أنس - رضي الله عنه - قَالَ: دَخَلَ النَّبيُّ - صلى الله عليه وسلم - المَسْجِدَ فَإِذَا حَبْلٌ مَمْدُودٌ بَيْنَ السَّارِيَتَيْنِ، فَقَالَ: «مَا هَذَا الحَبْلُ؟» قالُوا: هَذَا حَبْلٌ لِزَيْنَبَ، فَإِذَا فَتَرَتْ (1) تَعَلَّقَتْ بِهِ. فَقَالَ النَّبيُّ - صلى الله عليه وسلم: «حُلُّوهُ، لِيُصلِّ أَحَدُكُمْ نَشَاطَهُ فَإِذَا فَتَرَ فَلْيَرْقُدْ». مُتَّفَقٌ عَلَيهِ. (2)
হাদীস নং: ১৪৭
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ‘ইবাদতে মধ্যপন্থা প্রসঙ্গ।
তন্দ্রালু অবস্থায় নামায পড়া উচিত নয়
হাদীছ নং: ১৪৭

উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের কেউ যদি নামায পড়া অবস্থায় তন্দ্রাগ্রস্ত হয়, তবে সে যেন শুয়ে পড়ে, যাবৎ না তার ঘুম চলে যায়। কেননা তোমাদের কেউ যদি তন্দ্রাগ্রস্ত অবস্থায় নামায পড়ে, তখন সে বুঝতে পারবে না হয়তো ইস্তিগফার করতে গিয়ে নিজেকে গালি দিয়ে ফেলবে। -বুখারী ও মুসলিম'
(সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ২১২; সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ৭৮৬: সুনানে আবূ দাউদ, হাদীছ নং ১৩১০: জামে তিরমিযী, হাদীছ নং ৩৫৫; মুআত্তা মালিক, হাদীছ নং ৩৮৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ২৪২৮৭; সুনানে ইবন মাজাহ, হাদীছ নং ১৩৬৯)
مقدمة الامام النووي
14 - باب في الاقتصاد في العبادة
147 - وعن عائشة رضي الله عنها: أنَّ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «إِذَا نَعَسَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ يُصَلِّي فَلْيَرْقُدْ حَتَّى يَذْهَبَ عَنْهُ النَّومُ، فإِنَّ أحَدَكُم إِذَا صَلَّى وَهُوَ نَاعِسٌ لا يَدْرِي لَعَلَّهُ يَذْهَبُ يَسْتَغْفِرُ فَيَسُبُّ نَفْسَهُ». مُتَّفَقٌ عَلَيهِ. (1)
হাদীস নং: ১৪৮
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ‘ইবাদতে মধ্যপন্থা প্রসঙ্গ।
ইমামের কর্তব্য নামায ও খুতবায় মধ্যপন্থা রক্ষা
হাদীছ নং: ১৪৮

হযরত জাবির ইবন সামুরা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে নামায পড়তাম। তাঁর নামায হত মাঝামাঝি এবং তাঁর খুতবাও হত মাঝামাঝি। -মুসলিম.
(সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ৮৬৬; সুনানে আবু দাউদ, হাদীছ নং ১৩১০; জামে তিরমিযী, হাদীছ নং ৫০৭: সুনানে নাসাঈ, হাদীছ নং ১৫৮২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ২০৮৮৫; বায়হাকী, হাদীছ নং ৫৭৬১; বাগাবী, হাদীছ নং ১০৭৭)
مقدمة الامام النووي
14 - باب في الاقتصاد في العبادة
148 - وعن أَبي عبد الله جابر بن سمرة رضي الله عنهما، قَالَ: كُنْتُ أصَلِّي مَعَ النَّبيِّ - صلى الله عليه وسلم - الصَّلَوَاتِ، فَكَانتْ صَلاتُهُ قَصْدًا وَخُطْبَتُهُ قَصْدًا. رواه مسلم. (1)
قوله: «قَصْدًا»: أي بين الطولِ والقِصرِ.
হাদীস নং: ১৪৯
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ‘ইবাদতে মধ্যপন্থা প্রসঙ্গ।
‘ইবাদতের পাশাপাশি নিজ শরীর ও পরিবারবর্গের হক আদায়ের অপরিহার্যতা
হাদীছ নং: ১৪৯

হযরত আবূ জুহাইফা ওয়াহব ইবন 'আব্দুল্লাহ রাযি. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সালমান ফারিসী ও আবুদ দারদা রাযি.-এর মধ্যে ভ্রাতৃবন্ধন স্থাপন করে দেন। একদিন সালমান রাযি. আবুদ দারদা রাযি.-এর সঙ্গে দেখা করতে এসে হযরত উম্মুদ দারদা রাযি.-কে মলিন বেশে দেখতে পান। তিনি বললেন, আপনার কী হয়েছে? হযরত উম্মুদ দারদা রাযি. বললেন, আপনার ভাই আবুদ দারদা তো এমন যে, দুনিয়ার কোনও কিছুতে তার কোনও প্রয়োজন নেই। এরই মধ্যে আবুদ- দারদা রাযি. এসে গেলেন এবং তাঁর জন্য খানার ব্যবস্থা করলেন। তারপর বললেন আপনি খান। আমি রোযাদার। হযরত সালমান রাযি. বললেন, আপনি না খাওয়া পর্যন্ত আমি খাওয়ার নই। অগত্যা আবুদ দারদা রাযি.-ও খেলেন। তারপর যখন রাত হল, আবুদ দারদা রাযি. নামায পড়তে উদ্যত হলেন। কিন্তু হযরত সালমান রাযি. তাঁকে ঘুমাতে বললেন। ফলে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। তারপর উঠতে গেলে হযরত সালমান রাযি. তাঁকে আবারও ঘুমাতে বললেন। পরিশেষে যখন রাতের শেষাংশ আসল তখন সালমান রাযি. বললেন, এবার উঠুন। তখন তাঁরা উভয়ে নামায পড়লেন। তারপর সালমান রাযি. তাঁকে লক্ষ করে বললেন, নিশ্চয়ই আপনার উপর আপনার প্রতিপালকের হক আছে, আপনার উপর আপনার নিজেরও হক আছে এবং আপনার উপর আপনার পরিবারবর্গেরও হক আছে। সুতরাং প্রত্যেক হকদারকে তার হক আদায় করে দিন। তারপর হযরত আবুদ দারদা রাযি. নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে এ বৃত্তান্ত জানালে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সালমান সঠিক বলেছে। -বুখারী.
(সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৬১৩৯; জামে তিরমিযী, হাদীছ নং ২৪১৩: বায়হাকী, হাদীছ নং ৮১২৮)
مقدمة الامام النووي
14 - باب في الاقتصاد في العبادة
149 - وعن أبي جُحَيْفَة وَهْب بنِ عبد اللهِ - رضي الله عنه - قَالَ: آخَى النَّبيُّ - صلى الله عليه وسلم - بَيْنَ سَلْمَانَ وَأَبي الدَّرْداءِ، فَزارَ سَلْمَانُ أَبَا الدَّرداءِ فَرَأى أُمَّ الدَّرداءِ مُتَبَذِّلَةً (1)، فَقَالَ: مَا شَأنُكِ؟ قَالَتْ: أخُوكَ أَبُو الدَّردَاءِ لَيْسَ لَهُ حَاجَةٌ في الدُّنْيَا، فَجاءَ أَبُو الدَّرْدَاءِ فَصَنَعَ لَهُ طَعَامًا، فَقَالَ لَهُ: كُلْ فَإِنِّي صَائِمٌ، قَالَ: مَا أنا بِآكِلٍ حَتَّى تَأكُلَ فأكل، فَلَمَّا كَانَ اللَّيلُ ذَهَبَ أَبُو الدَّردَاءِ يَقُومُ فَقَالَ لَهُ: نَمْ، فنام، ثُمَّ ذَهَبَ يَقُومُ فَقَالَ لَهُ: نَمْ. فَلَمَّا كَانَ من آخِر اللَّيلِ قَالَ سَلْمَانُ: قُم الآن، فَصَلَّيَا جَمِيعًا فَقَالَ لَهُ سَلْمَانُ: إنَّ لِرَبِّكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَإِنَّ لِنَفْسِكَ عَلَيكَ حَقًّا، وَلأَهْلِكَ عَلَيكَ حَقًّا، فَأعْطِ كُلَّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ، فَأَتَى النَّبيَّ - صلى الله عليه وسلم - فَذَكَرَ ذلِكَ لَهُ فَقَالَ النَّبيُّ - صلى الله عليه وسلم: «صَدَقَ سَلْمَانُ». رواه البخاري. (2)
হাদীস নং: ১৫০
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ‘ইবাদতে মধ্যপন্থা প্রসঙ্গ।
হযরত ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আমর রাযি.-এর ‘ইবাদত-বন্দেগী ও ভারসাম্য প্রসঙ্গ
হাদীছ নং: ১৫০

হযরত আব্দুল্লাহ ইবন 'আমর ইবনুল আস রাযি. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানানো হল যে, আমি বলে থাকি- আল্লাহর কসম! আমি যতকাল জীবিত থাকি, অবশ্যই দিনে রোযা রাখব এবং রাতে নামায পড়ব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, তুমিই কি এমন এমন কথা বল? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার প্রতি আমার পিতামাতা উৎসর্গিত- অবশ্যই আমি তা বলেছি। তিনি বললেন, তুমি তা পারবে না। সুতরাং তুমি রোযা রাখবে, তারপর রোযা ছেড়ে দেবে। তুমি রাতে ঘুমাবেও এবং নামাযও পড়বে। আর প্রতি মাসে তিন দিন রোযা রাখবে। কেননা প্রত্যেক নেকী দশগুণ বৃদ্ধি করা হয়। এরূপ রোযা রাখলে সারা বছর রোযা রাখার মত হবে। আমি বললাম, আমি এর চেয়ে বেশির সামর্থ্য রাখি। তিনি বললেন, তাহলে একদিন রোযা রাখবে আর দু'দিন রাখবে না। আমি বললাম, আমি এর চেয়ে বেশির সামর্থ্য রাখি। তিনি বললেন, তাহলে একদিন রোযা রাখবে, একদিন রাখবে না। এটা দাউদ 'আলাইহিস সালামের রোযা এবং এটা সর্বাপেক্ষা ভারসাম্যপূর্ণ রোযা।
অপর এক বর্ণনায় আছে, এটা সর্বোত্তম রোযা। আমি বললাম, আমি তো এর চেয়ে আরও ভালোর সামর্থ্য রাখি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এর চেয়ে ভালো কিছু নেই। (পরবর্তীকালে) হযরত আব্দুল্লাহ ইবন 'আমর রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে তিন দিনের কথা বলেছিলেন, তা গ্রহণ করে নেওয়াই আমার কাছে আমার পরিবার-পরিজন ও ধনসম্পদ অপেক্ষা প্রিয় হত।
অপর এক বর্ণণায় আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমাকে কি খবর দেওয়া হয়নি যে, তুমি (নিয়মিতভাবে) দিনে রোযা রাখ ও রাতে নামায পড়? আমি বললাম, অবশ্যই ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন, এমন করো না। তুমি রোযা রাখবে এবং রোযা ছাড়াও থাকবে। নামাযও পড়বে এবং ঘুমাবেও। কেননা তোমার উপর তোমার শরীরের হক আছে, তোমার উপর তোমার চোখের হক আছে, তোমার উপর তোমার স্ত্রীর হক আছে এবং তোমার উপর তোমার সাক্ষাৎকারীদেরও হক আছে। তোমার জন্য প্রত্যেক মাসে তিন দিন রোযা রাখাই যথেষ্ট। কেননা তোমার জন্য প্রতিটি নেক আমলের বিনিময়ে রয়েছে দশগুণ ছাওয়াব। সুতরাং এটা সারা বছর রোযা রাখার মত। কিন্তু আমি নিজের প্রতি কঠোরতা করলাম, ফলে আমার প্রতিও কঠোরতা করা হল। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি নিজের ভেতর বিশেষ শক্তি অনুভব করছি। তিনি বললেন, তুমি আল্লাহর নবী দাউদ 'আলাইহিস সালামের মত রোযা রাখ, তার বেশি নয়। আমি জিজ্ঞেস করলাম, দাউদের রোযা কেমন ছিল? তিনি বললেন, বছরের অর্ধেক। পরে হযরত 'আব্দুল্লাহ রাযি. যখন বৃদ্ধ হয়ে গেলেন তখন (আক্ষেপ করে) বলতেন, আহা! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেওয়া অবকাশ যদি গ্রহণ করতাম!
অপর এক বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমাকে কি খবর দেওয়া হয়নি যে, তুমি সারা বছর রোযা রাখ এবং রাতভর কুরআন পাঠ কর? আমি বললাম, অবশ্যই ইয়া রাসূলাল্লাহ! তবে এর দ্বারা কেবল কল্যাণ লাভই আমার উদ্দেশ্য। তিনি বললেন, তুমি আল্লাহর নবী দাউদের রোযার মত রোযা রাখ। তিনি মানুষের মধ্যে সবচে' বেশি ইবাদতগুযার ছিলেন। আর তুমি পূর্ণ মাসে (এক খতম) কুরআন পড়বে। আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! আমি এর চেয়ে বেশি ক্ষমতা রাখি। তিনি বললেন, তবে প্রতি বিশ দিনে তা পড়। আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! আমি এরচে' বেশি সামর্থ্য রাখি। তিনি বললেন, তবে প্রতি দশ দিনে তা পড়। আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! আমি এরচে' বেশি সামর্থ্য রাখি। তবে প্রতি সাত দিনে তা পড়, এরচে' বেশি নয়। এভাবে আমি নিজের প্রতি কঠোরতা করলাম, ফলে আমার প্রতিও কঠোরতা করা হল। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেছিলেন, তুমি জান না হয়তো তুমি দীর্ঘায়ু লাভ করবে। হযরত 'আব্দুল্লাহ রাযি. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে যা বলেছিলেন, আমি সেখানে পৌঁছে গেছি। সুতরাং যখন বার্ধক্যে পৌঁছলাম, তখন আমার আক্ষেপ হল- আহা! যদি আমি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেওয়া সুযোগ গ্রহণ করতাম! অপর এক বর্ণনায় আছে, তোমার প্রতি তোমার সন্তানেরও হক আছে।
অপর এক বর্ণনায় আছে, যে ব্যক্তি সর্বদা রোযা রাখল সে রোযাই রাখল না। এ কথা তিনি তিনবার বলেছেন,
অপর এক বর্ণনায় আছে, আল্লাহ তা'আলার কাছে সর্বাপেক্ষা বেশি প্রিয় রোযা হল দাউদের রোযা এবং আল্লাহ তা'আলার কাছে বেশি প্রিয় নামায হল দাউদের নামায। তিনি রাতের অর্ধেক পর্যন্ত ঘুমাতেন, তিন ভাগের এক ভাগ নামায পড়তেন, তারপর ছয় ভাগের এক ভাগ ঘুমাতেন, তিনি একদিন পরপর রোযা রাখতেন আর (রণক্ষেত্রে) শত্রুর সম্মুখীন হলে পলায়ন করতেন না।
অপর এক বর্ণনায় আছে, আমার পিতা আমাকে এক সম্ভ্রান্ত মহিলার সঙ্গে বিবাহ দিলেন। তিনি নিজ পুত্রবধূর খোঁজখবর নিতেন এবং তাকে তার স্বামী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন। সে তাঁকে বলত, তিনি বেশ ভালো লোক। এমন ভালো যে, আমি তাঁর কাছে আসার পর থেকে এ পর্যন্ত তিনি কখনও আমার বিছানায় পা রাখেননি এবং আমার পর্দা সরিয়ে দেখেননি। তাঁর কাছে যখন এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হল, শেষে বিষয়টা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উল্লেখ করলেন। তিনি বললেন, তাকে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বল। পরে আমি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কিভাবে রোযা রাখ? বললাম, প্রতিদিন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, কিভাবে কুরআন খতম কর? বললাম, প্রতি রাতে এক খতম। এভাবে পূর্বের অনুরূপ বর্ণনা দিলেন।
তিনি তাঁর পরিবারের কাউকে কুরআনের এক সপ্তমাংশ শোনাতেন, যা তিনি রাতে পড়ার ইচ্ছা করতেন, যাতে তাঁর জন্য রাতে তা পড়া সহজ হয়। আর যখন তিনি শক্তি সঞ্চয় করতে চাইতেন, তখন পরপর কয়েকদিন রোযা ছেড়ে দিতেন এবং সে দিনগুলো গুণে রাখতেন। তারপর সমসংখ্যক দিন রোযা রেখে নিতেন। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আমলের যে অবস্থায় তিনি পৃথক হয়েছেন, তার কিছুমাত্র ছেড়ে দেওয়া তাঁর অপসন্দ ছিল।
এ বর্ণনাগুলোর প্রত্যেকটিই সহীহ। এর অধিকাংশই বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ উভয় গ্রন্থেই আছে। অল্পকিছু আছে দুই গ্রন্থের কোনও একখানিতে।'
(সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ১৯৭৬, ৩৪১৮, ৫০৫২: সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ১১৫৯; সুনানে আবু দাউদ, হাদীছ নং ২৪২৭: জামে তিরমিযী, হাদীছ নং ২৯৪৬: সুনানে নাসাঈ, হাদীছ নং ২৩৮৯, ২৩৯২, ২৩৯৪: বায়হাকী, হাদীছ নং ৮৪৫১; মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ৬৭৬১, ৬৭৬৩, ৭০৯৯; বাগাবী, হাদীছ নং ১৮০৮)
مقدمة الامام النووي
14 - باب في الاقتصاد في العبادة
150 - وعن أَبي محمد عبدِ اللهِ بنِ عَمْرو بن العاصِ رضي الله عنهما، قَالَ: أُخْبرَ النَّبيُّ - صلى الله عليه وسلم - أنِّي أقُولُ: وَاللهِ لأَصُومَنَّ النَّهَارَ، وَلأَقُومَنَّ اللَّيلَ مَا عِشْتُ. فَقَالَ رسولُ الله - صلى الله عليه وسلم: «أنتَ الَّذِي تَقُولُ ذلِكَ؟» فَقُلْتُ لَهُ: قَدْ قُلْتُهُ بأبي أنْتَ وأمِّي يَا رسولَ الله. قَالَ: «فَإِنَّكَ لاَ تَسْتَطِيعُ ذلِكَ فَصُمْ وَأَفْطِرْ، وَنَمْ وَقُمْ، وَصُمْ مِنَ الشَّهْرِ ثَلاثةَ أيَّامٍ، فإنَّ الحَسَنَةَ بِعَشْرِ أمْثَالِهَا وَذَلكَ مِثلُ صِيامِ الدَّهْرِ»، قُلْتُ: فَإِنِّي أُطيقُ أَفْضَلَ مِنْ ذلِكَ، قَالَ: «فَصُمْ يَومًا
[ص:69] وَأَفْطِرْ يَوْمَيْنِ»، قُلْتُ: فَإنِّي أُطِيقُ أفضَلَ مِنْ ذلِكَ، قَالَ: «فَصُمْ يَومًا وَأفْطِرْ يَومًا فَذلِكَ صِيَامُ دَاوُد - صلى الله عليه وسلم - وَهُوَ أعْدَلُ الصيامِ».

وفي رواية: «هُوَ أفْضَلُ الصِّيامِ» فَقُلْتُ: فَإِنِّي أُطيقُ أفْضَلَ مِنْ ذلِكَ، فَقَالَ رسولُ الله - صلى الله عليه وسلم: «لا أفضَلَ مِنْ ذلِكَ»، وَلأنْ أكُونَ قَبِلْتُ الثَّلاثَةَ الأَيّامِ الَّتي قَالَ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم - أحَبُّ إليَّ مِنْ أهْلي وَمَالي.

وفي رواية: «أَلَمْ أُخْبَرْ أنَّكَ تَصُومُ النَّهَارَ وتَقُومُ اللَّيلَ؟» قُلْتُ: بَلَى، يَا رَسُول الله، قَالَ: «فَلاَ تَفْعَلْ: صُمْ وَأَفْطِرْ، وَنَمْ وَقُمْ؛ فإنَّ لِجَسَدِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَإِنَّ لِعَيْنَيكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَإِنَّ لِزَوْجِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَإِنَّ لِزَوْرِكَ (1) عَلَيْكَ حَقًّا، وَإنَّ بِحَسْبِكَ أَنْ تَصُومَ في كُلِّ شَهْرٍ ثَلاثَةَ أيَّامٍ، فإنَّ لَكَ بِكُلِّ حَسَنَةٍ عَشْرَ أمْثَالِهَا، فَإِنَّ ذلِكَ صِيَامُ الدَّهْر» فَشَدَّدْتُ فَشُدِّدَ عَلَيَّ، قُلْتُ: يَا رَسُول الله، إنِّي أجِدُ قُوَّةً، قَالَ: «صُمْ صِيَامَ نَبيِّ الله دَاوُد وَلاَ تَزد عَلَيهِ» قُلْتُ: وَمَا كَانَ صِيَامُ دَاوُد؟ قَالَ: «نِصْفُ الدَّهْرِ» فَكَانَ عَبدُ الله يقول بَعدَمَا كَبِرَ: يَا لَيتَنِي قَبِلْتُ رُخْصَة رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم.

وفي رواية: «أَلَمْ أُخْبَرْ أَنَّكَ تَصُومُ الدَّهرَ، وَتَقْرَأُ القُرآنَ كُلَّ لَيْلَة؟» فقلت: بَلَى، يَا رَسُول الله، وَلَمْ أُرِدْ بذلِكَ إلاَّ الخَيرَ، قَالَ: «فَصُمْ صَومَ نَبيِّ اللهِ دَاوُد، فَإنَّهُ كَانَ أعْبَدَ النَّاسِ، وَاقْرَأ القُرْآنَ في كُلِّ شَهْر»، قُلْتُ: يَا نَبيَّ اللهِ، إنِّي أُطِيقُ أَفْضَلَ مِنْ ذلِكَ؟ قَالَ: «فاقرأه في كل عشرين» قُلْتُ: يَا نبي الله، إني أطيق أفضل من ذلِكَ؟ قَالَ: «فَاقْرَأهُ في كُلِّ عَشْر» قُلْتُ: يَا نبي اللهِ، إنِّي أُطيقُ أَفْضَلَ مِنْ ذلِكَ؟ قَالَ: «فاقْرَأهُ في كُلِّ سَبْعٍ وَلاَ تَزِدْ عَلَى ذلِكَ» فشدَّدْتُ فَشُدِّدَ عَلَيَّ وَقالَ لي النَّبيّ - صلى الله عليه وسلم: «إنَّكَ لا تَدرِي لَعَلَّكَ يَطُولُ بِكَ عُمُرٌ» قَالَ: فَصِرْتُ إِلَى الَّذِي قَالَ لي النَّبيُّ - صلى الله عليه وسلم. فَلَمَّا كَبِرْتُ وَدِدْتُ أنِّي كُنْتُ قَبِلتُ رُخْصَةَ
نَبيِّ الله - صلى الله عليه وسلم.

وفي رواية: «وَإِنَّ لِوَلَدِكَ عَلَيْكَ حَقًّا».

وفي رواية: «لاَ صَامَ مَنْ صَامَ الأَبَدَ» ثلاثًا.

وفي رواية: «أَحَبُّ الصِيَامِ إِلَى اللهِ تَعَالَى صِيَامُ دَاوُد، وَأَحَبُّ الصَّلاةِ إِلَى اللهِ تَعَالَى صَلاةُ دَاوُدَ: كَانَ ينام نصف الليل، ويقوم ثلثه، وينام سدسه، وكان يصوم يومًا ويفطر يومًا، وَلاَ يَفِرُّ إِذَا لاقَى».

وفي رواية قال: «أنْكَحَني أَبي امرَأةً ذَاتَ حَسَبٍ وَكَانَ يَتَعَاهَدُ كنَّتَهُ - أي: امْرَأَةَ وَلَدِهِ - فَيَسْأَلُهَا عَنْ بَعْلِهَا. فَتقُولُ لَهُ: نِعْمَ الرَّجُلُ مِنْ رَجُلٍ لَمْ يَطَأْ لَنَا فِرَاشًا، وَلَمْ يُفَتِّشْ لَنَا كَنَفًا (1) مُنْذُ أتَيْنَاهُ. فَلَمَّا طَالَ ذلِكَ عَلَيهِ ذَكَرَ ذلك للنَّبيِّ - صلى الله عليه وسلم - فَقَالَ: «القِنِي بِهِ» فَلَقيتُهُ بَعد ذلك، فَقَالَ: «كَيْفَ تَصُومُ؟» قُلْتُ: كُلَّ يَومٍ، قَالَ: «وَكَيْفَ تَخْتِمُ؟» قُلْتُ: كُلَّ لَيْلَةٍ، وَذَكَرَ نَحْوَ مَا سَبَقَ، وَكَانَ يَقْرَأُ عَلَى بَعْضِ أهْلِهِ السُّبُعَ الَّذِي يَقْرَؤُهُ، يَعْرِضُهُ مِنَ النَّهَارِ ليَكُونَ أخفّ عَلَيهِ باللَّيلِ، وَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَتَقَوَّى أفْطَرَ أيَّامًا وَأحْصَى وَصَامَ مِثْلَهُنَّ كرَاهِيَةَ أَنْ يَترُكَ شَيئًا فَارَقَ عَلَيهِ النَّبيَّ - صلى الله عليه وسلم.
كل هذِهِ الرواياتِ صحيحةٌ، مُعظمُها في الصحيحين، وقليل مِنْهَا في أحدِهِما. (2)
হাদীস নং: ১৫১
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ‘ইবাদতে মধ্যপন্থা প্রসঙ্গ।
আপন ঈমান সম্পর্কে সাহাবীগণের সচেতনতার দৃষ্টান্ত
হাদীছ নং : ১৫১

হযরত আবূ রিব'ঈ হানযালা ইবনুর রাবী' আল-উসাইয়িদী রাযি. - যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন কাতিব (লিপিকর) ছিলেন- বলেন, একদিন হযরত আবূ বকর রাযি. আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, হে হানযালা! তুমি কেমন আছ? আমি বললাম, হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে। তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ! তুমি কী বলছ? আমি বললাম, আমরা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে থাকি আর তিনি আমাদেরকে জান্নাত-জাহান্নামের কথা বলে উপদেশ দেন, তখন মনে হয় যেন নিজ চোখে তা দেখতে পাচ্ছি। তারপর যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট থেকে বের হয়ে আসি এবং স্ত্রী, সন্তানসন্ততি ও জমি-জায়েদাদের ঝামেলায় লিপ্ত হই, তখন অনেক কিছুই ভুলে যাই। আবূ বকর রাযি. বললেন, আল্লাহর কসম! আমরাও তো এরকম বোধ করি।
সুতরাং আমি ও আবূ বকর চলতে থাকলাম এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌঁছে গেলাম। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সেটা কী? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা যখন আপনার কাছে থাকি আর আপনি আমাদেরকে জান্নাত- জাহান্নামের কথা বলে উপদেশ দেন, তখন মনে হয় যেন নিজ চোখে তা দেখতে পাচ্ছি। তারপর যখন আপনার নিকট থেকে বের হয়ে আসি এবং স্ত্রী, সন্তানসন্ততি ও জমিজায়েদাদের ঝামেলায় লিপ্ত হই, তখন অনেক কিছুই ভুলে যাই।
এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সেই আল্লাহর কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! আমার কাছে থাকা অবস্থায় যেমন থাক, তোমরা যদি সে অবস্থায় এবং আল্লাহর যিকরের সাথে সর্বদা থাকতে, তবে ফিরিশতাগণ তোমাদের সঙ্গে মুসাফাহা করত তোমাদের বিছানায় এবং তোমাদের পথেঘাটে। কিন্তু হে হানযালা! কখনও এরকম এবং কখনও ওরকম। তিনি এ কথা তিনবার বললেন। -মুসলিম'
(সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ২৭৫০। জামে তিরমিযী, হাদীছ নং ২৫১৪; সুনানে ইবন মাজাহ, হাদীছ নং ৪২৩৯; মুসনাদে আহমান, হাদীছ নং ১৯০৪৫)
مقدمة الامام النووي
14 - باب في الاقتصاد في العبادة
151 - وعن أبي رِبعِي حنظلة بنِ الربيعِ الأُسَيِّدِيِّ الكاتب أحدِ كتّاب رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: لَقِيَنِي أَبُو بَكر - رضي الله عنه - فَقَالَ: كَيْفَ أنْتَ يَا حنْظَلَةُ؟ قُلْتُ: نَافَقَ حَنْظَلَةُ! قَالَ: سُبْحَانَ الله مَا تَقُولُ؟! قُلْتُ: نَكُونُ عِنْدَ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم - يُذَكِّرُنَا بالجَنَّةِ وَالنَّارِ كأنَّا رَأيَ عَيْنٍ (1) فإِذَا خَرَجْنَا مِنْ عِنْدِ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم - عَافَسْنَا الأَزْواجَ وَالأَوْلاَدَ وَالضَّيْعَاتِ نَسينَا كَثِيرًا، قَالَ أَبُو بكر - رضي الله عنه: فَوَالله إنَّا لَنَلْقَى مِثْلَ هَذَا، فانْطَلَقْتُ أَنَا وأبُو بَكْر حَتَّى دَخَلْنَا عَلَى رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم. فقُلْتُ: نَافَقَ حَنْظَلَةُ يَا رَسُول اللهِ! فَقَالَ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم: «وَمَا ذَاكَ؟» قُلْتُ: يَا رَسُول اللهِ، نَكُونُ عِنْدَكَ تُذَكِّرُنَا بِالنَّارِ والجَنَّةِ كأنَّا رَأيَ العَيْن فإِذَا خَرَجْنَا مِنْ عِنْدِكَ عَافَسْنَا الأَزْواجَ وَالأَوْلاَدَ وَالضَّيْعَاتِ نَسينَا كَثِيرًا. فَقَالَ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم: «وَالَّذِي نَفْسي بِيَدِهِ، لَوْ تَدُومُونَ عَلَى مَا تَكُونونَ عِنْدِي، وَفي الذِّكْر، لصَافَحَتْكُمُ الملائِكَةُ عَلَى فُرُشِكُمْ وَفي طُرُقِكُمْ، لَكِنْ يَا حَنْظَلَةُ سَاعَةً وسَاعَةً» ثَلاَثَ مَرَات. رواه مسلم. (2)
قولُهُ: «رِبْعِيٌّ» بِكسر الراء. وَ «الأُسَيِّدِي» بضم الهمزة وفتح السين وبعدها ياء مكسورة مشددة. وقوله: «عَافَسْنَا» هُوَ بِالعينِ والسينِ المهملتين أي: عالجنا ولاعبنا. وَ «الضَّيْعاتُ»: المعايش.
হাদীস নং: ১৫২
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ‘ইবাদতে মধ্যপন্থা প্রসঙ্গ।
নিরর্থক আত্মপীড়ন কোনও ছাওয়াবের কাজ নয়
হাদীছ নং : ১৫২

হযরত আব্দুল্লাহ ইবন 'আব্বাস রাযি. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুতবা দিচ্ছিলেন। হঠাৎ দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন। তিনি তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে লোকেরা বলল, ইনি আবূ ইসরাঈল, মানত করেছেন যে, সর্বদা রোদে দাঁড়িয়ে থাকবেন, বসবেনও না, ছায়াও গ্রহণ করবেন না, কারও সঙ্গে কথাও বলবেন না আর রোযা রাখবেন। এ কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাকে আদেশ কর যেন কথা বলে, ছায়া গ্রহণ করে ও বসে আর নিজের রোযা যেন পূর্ণ করে নেয়। -বুখারী'
সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৬৭০৪; সুনানে আবু দাউদ, ৩৩০০; সুনানে ইবন মাজাহ হাদীছ নং ২১৩৬, বায়হাকী, হাদীছ নং ২০৯২: তবারানী, হাদীছ নং ১০৯৩
مقدمة الامام النووي
14 - باب في الاقتصاد في العبادة
152 - وعنِ ابن عباس رضي الله عنهما، قَالَ: بينما النَّبيُّ - صلى الله عليه وسلم - يخطب إِذَا هُوَ برجلٍ قائم فسأل عَنْهُ، فقالوا: أَبُو إسْرَائيلَ نَذَرَ أَنْ يَقُومَ في الشَّمْسِ وَلاَ يَقْعُدَ، وَلاَ يَسْتَظِل، وَلاَ يَتَكَلَّمَ، وَيَصُومَ، فَقَالَ النَّبيّ - صلى الله عليه وسلم: «مُرُوهُ، فَلْيَتَكَلَّمْ، وَلْيَسْتَظِلَّ، وَلْيَقْعُدْ، وَلْيُتِمَّ صَوْمَهُ». رواه البخاري. (1)
হাদীস নং: ১৫৩
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ আমলে যত্নবান থাকা ও তার ধারাবাহিকতা রক্ষা প্রসঙ্গ

এর আগের অধ্যায়ের আলোচনা ছিল আমলে ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা রক্ষা সম্পর্কে। ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা রক্ষার সুফল হচ্ছে আমলের ধারাবাহিকতা বজায় থাকা। আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষা জরুরি। আল্লাহ তা'আলার কাছে ওই আমলই বেশি পছন্দ, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়। কোনও আমল শুরু করার পর তা কিছুতেই ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। কেননা সেটা হয় আল্লাহর দরবারে হাজির হওয়ার পর সরে যাওয়ার মত। যে-কোনও বড় ব্যক্তির মজলিসে কিছুদিন আসা-যাওয়া করার পর যদি তা বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে সেই বড় ব্যক্তির কাছে তা প্রীতিকর হয় না। কাজেই কোনও আমল শুরু করার পর ছেড়ে দেওয়া, যা কিনা আল্লাহর দরবারে হাজির হওয়ার পর ফের গরহাজির থাকার মত কাজ, কী করে পছন্দনীয় হতে পারে?
এজন্যই যাতে গরহাজির হতে না হয়, অর্থাৎ আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায়, তাই এর আগের অধ্যায়ে মধ্যপন্থা রক্ষা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। যখন মধ্যপন্থা রক্ষার গুরুত্ব জানা গেল, তখন প্রত্যেকের কর্তব্য সে অনুযায়ী আমল শুরু করা। অতঃপর যখন ভারসাম্য রক্ষার সাথে আমল শুরু করা হবে, তখন কর্তব্য হবে কোনও অলসতাকে প্রশ্রয় না দেওয়া। নফস ও শয়তান অলসতা সৃষ্টি করতে চায়। শয়তান চায় না মানুষ ইবাদত-বন্দেগী করে আল্লাহ তা'আলার রহমত ও সন্তুষ্টির উপযুক্ত হোক। ইন্দ্রিয়সুখ হাসিল হয় না বলে নফসও তা করতে প্রস্তুত হয় না। তাই ‘ইবাদত যত আসান ও যত অল্পই হোক না কেন, তা করতে আলস্য বোধ হয়। কিন্তু সে আলস্য ঝেড়ে ফেলতে হবে। এখনই 'ইবাদত-বন্দেগীতে লেগে যেতে হবে। তারপর সর্বাবস্থায় তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। পরিমাণমত আমল নিয়মিতভাবে করতে থাকলে ইনশাআল্লাহ আল্লাহর পথে উন্নতি লাভ হতে থাকবে এবং একপর্যায়ে তাঁর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি হাসিল হয়ে যাবে।
মানুষ যাতে সব অলসতা ঝেড়ে ফেলে শরী'আতের বিধানাবলি পালনে যত্নবান থাকে এবং ভারসাম্যের সাথে আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে, সে লক্ষ্যে কুরআন ও হাদীছে তাকে নানাভাবে উৎসাহ দান করা হয়েছে। ইমাম নববী রহ. এ অধ্যায়ে সেরকম কিছু আয়াত ও হাদীছ উল্লেখ করেছেন। আমরা নিচে তার অর্থ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা পেশ করছি। আল্লাহ তা'আলা তাওফীক দান করুন, আমীন।

আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষায় উৎসাহদান সম্পর্কিত কিছু আয়াত

এক নং আয়াত

أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلَا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে, তাদের জন্য কি এখনও সেই সময় আসেনি যে, আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তাদের অন্তর বিগলিত হবে? এবং তারা তাদের মত হবে না, যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছিল অতঃপর যখন তাদের উপর দিয়ে দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হল, তখন তাদের অন্তর শক্ত হয়ে গেল।' সূরা হাদীদ, আয়াত ১৬

ব্যাখ্যা

আল্লাহ তা'আলা চান মু'মিনগণ কামেল ঈমানদার হয়ে যাক। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাদেরকে যে শরী'আত দেওয়া হয়েছে তার পুরোপুরি অনুসরণ করুক। এমন যেন না হয় যে, তারা দুনিয়ার ভোগবিলাসিতা ও এর আনন্দ-ফুর্তিতে মজে গিয়ে আখিরাতকে ভুলে বসবে এবং শরী'আতের কোনও বিধান পালনে গড়িমসি করবে। মানুষের মনে দুনিয়ার আসক্তি তো আছেই, হরেক রকমের মনভোলানো উপকরণ প্রতিক্ষণ তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। ফলে অনেক সময় সে সংযম হারিয়ে গুনাহে লিপ্ত হয়ে পড়ে কিংবা সংযম হারিয়ে ফেলার উপক্রম হয়। তখন গুনাহ না করলেও কেমন এক উদাসীনতা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। কিন্তু সে উদাসীনতাও কাম্য নয়। জীবনের অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে। আর কতদিন বাকি আছে জানা নেই। যে-কোনও সময় মৃত্যু হয়ে যেতে পারে। তার আগে কবর ও আখিরাতের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে ফেলা দরকার। তাই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতে সজাগ করছেন- মুমিনদের কি সে সময় আসেনি যে, তাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সত্যদীন নাযিল হয়েছে তার সামনে ঝুঁকে পড়বে, অর্থাৎ শরী'আতের অনুসরণ ও পাপাচার বর্জনে অঙ্গীকারাবদ্ধ হবে?
মূলত এর দ্বারা মু'মিনদেরকে তাওবা করতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। যার সারকথা- বিগত ভুল-ত্রুটির জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়ে ভবিষ্যতে শরী'আতের পুরোপুরি পাবন্দী ও গুনাহমুক্ত জীবনযাপনের জন্য অঙ্গীকার করে ফেলা এবং একমুহূর্তও দেরি না করে সে অঙ্গীকার এখনই করে ফেলা।
বান্দা যাতে তাওবা করতে ও আখিরাতমুখী হয়ে যেতে এখনই প্রস্তুত হয়ে যায়,সেজন্য আল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী জাতিসমূহের কার্যকলাপ তুলে ধরেছেন, যারা অনেক দীর্ঘ আয়ু পেয়েছিল আর সে কারণে তাদের অন্তর শক্ত হয়ে গিয়েছিল, ফলে আল্লাহর কিতাব তাদের অন্তরে আছর করত না, কিতাবের উপদেশ উপেক্ষা করে দুনিয়াদারীতে মগ্ন হয়ে থাকত এবং হালাল-হারাম নির্বিচারে ভোগবিলাসিতার ভেতর জীবন কাটাত।
এর দ্বারা বিশেষভাবে ইহুদী ও খ্রিষ্টান জাতির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তারা তাদের কিতাবের উপদেশ উপেক্ষা করে শরীর ও মনের চাহিদাপূরণে ব্যস্ত থাকে। এভাবে তাদের দিন গড়াতে থাকে। কোনওক্রমেই তাওবায় লিপ্ত হয় না। ফলে অন্তর শক্ত হয়ে যায়। অন্তর শক্ত হয়ে যাওয়ার দরুণ তারা শিরক ও কুফরকে এমন মজবুতভাবে ধরে রাখে যে, সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত পাওয়া সত্ত্বেও এবং তাঁর সত্যতা তাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পরও তারা ঈমান আনতে রাজি হয়নি।
সুতরাং হে মু'মিনগণ! তোমরা যদি অলসতা কর এবং গুনাহে গা ভাসিয়ে দাও, আর এভাবে তোমাদের সময় গড়াতে থাকে কিন্তু তাওবায় লিপ্ত না হও, তবে অসম্ভব নয় যে, তোমাদের অন্তর তাদের মত শক্ত হয়ে যাবে। ফলে গুনাহ ছেড়ে দেওয়া ও নেক আমলে অবতীর্ণ হওয়া কঠিন হয়ে যাবে। কাজেই আর দেরি নয়, তোমরা এখনই সব অলসতা ঝেড়ে ফেল এবং তাওবা করে শরী'আতের পূর্ণাঙ্গ পাবন্দী শুরু করে দাও।
কুরআন মাজীদের এ আয়াতটির তাছীর অত্যন্ত গভীর ও শক্তিশালী। এর প্রভাবে অনেক সময় কঠিন কঠিন পাপী জীবন বদলে ফেলেছে। তারপর যুহদ ও তাকওয়ার পথে চলে রূহানী উন্নতির এমন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে যে, আজ সর্বস্তরের মানুষ গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাদের নাম স্মরণ করে। এ ক্ষেত্রে ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. ও ফুযায়ল ইবন ইয়ায রহ.-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুরাবক রহ.-এর জীবনের রোখ বদল

বিখ্যাত মুফাসসির ইমাম কুরতুবী রহ.-সহ বহু মুফাসসির ও ঐতিহাসিক উল্লেখ করেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. একদিন তাঁর বাগানে আনন্দ-ফুর্তিতে মাতোয়ারা ছিলেন। এভাবে সারাদিন কেটে যাওয়ার পর যখন রাত হল, তখন গানবাদ্যের আসর জমালেন। নিজ হাতেও বাদ্যযন্ত্র নিলেন। তারপর বরাবরের মত বাজাতে শুরু করলেন। কিন্তু কেন যেন আজ বাদ্যযন্ত্রে সুরের ঝঙ্কার ওঠে না। অনেক কসরত করলেন। কিন্তু সে যন্ত্র কিছুতেই সাড়া দেয় না। বেশ কিছু সময় গড়িয়ে গেল। তারপর সহসাই নতুন এক সুরের মূর্ছনা উঠল। কেউ যেন আবৃত্তি করছে-

الَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِ

“যারা ঈমান এনেছে, তাদের জন্য কি এখনও সেই সময় আসেনি যে, আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তাদের অন্তর বিগলিত হবে?”
অমনি আব্দুল্লাহ চিৎকার করে উঠলেন। বললেন, অবশ্যই হে আল্লাহ! সময় এসে গেছে। এই বলে তিনি বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ফেললেন এবং আসর ছেড়ে উঠে গেলেন। তারপর শুরু হল তাঁর সাধনা ও মুজাহাদার জীবন। সে জীবনে তিনি কোথা হতে কোথায় পৌঁছে গেছেন, দীনদার মহলের তা অজানা নয়।

আরেকটি জীবনের গতিমোড়

এমনিভাবে ফুযায়ল ইবন ইয়ায রহ.-এর প্রথম জীবনও ছিল ছন্নছাড়া ধরনের। ছিলেন এক মস্ত ডাকাতও। সে জীবনে তিনি একটি মেয়ের ভালোবাসায় মত্ত হয়ে পড়েছিলেন। কোনও এক রাতে ওই মেয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে বের হয়েছিলেন। রাস্তায় হঠাৎ তার কানে আসে কেউ একজন তিলাওয়াত করছে-

الَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ

“যারা ঈমান এনেছে, তাদের জন্য কি এখনও সেই সময় আসেনি যে, আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তাদের অন্তর বিগলিত হবে?” অমনি তাঁরও ভাবান্তর ঘটে যায়। চিৎকার করে বলে ওঠেন, নিশ্চয়ই হে আল্লাহ! সময় এসে গেছে। আবেগের উত্তেজনায় তিনি দৌড়ে একটা পরিত্যক্ত বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়েন। তখন এক পথিকদল আত্মগোপন করে সেখানে অবস্থান করছিল। তিনি শুনতে পেলেন তারা নিজেরা বলাবলি করছে, সাবধান! এ পথে কিন্তু ফুযায়ল ডাকাত আছে। এ কথা শুনে ফুযায়ল বলে উঠলেন, উহ্, কেমন রাত পার করছি! এক পাপের চেষ্টায় বের হয়েছি, আবার একদল মুসলিম আমার জন্য আতঙ্কিত। হে আল্লাহ! আমি তাওবা করলাম। আমি এখন থেকে তোমার ঘরেই পড়ে থাকব। ব্যস, ফুযায়ল রহ.-এর জীবন বদলে গেল। একপর্যায়ে তিনি আধ্যাত্মিক উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে গেলেন। তিনি আজ সকলের পরম শ্রদ্ধার পাত্র।
আল্লাহ তা'আলা আমাদের জীবনকেও এভাবে বদলে ফেলার তাওফীক দান করুন, আমীন ইয়া রাব্বাল আলামীন।

দুই নং আয়াত

وَقَفَّيْنَا بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَآتَيْنَاهُ الْإِنْجِيلَ وَجَعَلْنَا فِي قُلُوبِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ رَأْفَةً وَرَحْمَةً وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللَّهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا

অর্থ : এবং তাদের পেছনে পাঠালাম ঈসা ইবনে মারয়ামকে আর তাকে দান করলাম ইনজীল। যারা তার অনুসরণ করল, আমি তাদের অন্তরে দিলাম মমতা ও দয়া। আর রাহবানিয়্যাতের যে বিষয়টা, তা তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছিল। আমি তাদের উপর তা বাধ্যতামূলক করিনি। বস্তুত তারা (এর মাধ্যমে) আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানই করতে চেয়েছিল, কিন্তু তারা তা যথাযথভাবে পালন করেনি।সূরা হাদীদ, আয়াত ২৭

ব্যাখ্যা

এ আয়াতে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের অনুসারীদের দু'টি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। তার একটি প্রশংসনীয়, অন্যটি নিন্দনীয়। প্রশংসনীয় বিষয়টি হল তাদের একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। বলা হয়েছে যে, তাদের অন্তরে মমতা ও দয়ার গুণ দেওয়া হয়েছিল। নিঃসন্দেহে এটি একটি মহৎ গুণ।
এমনিতে তো মমতা ও করুণার বিষয়টা সমস্ত নবীর শিক্ষায়ই ছিল, কিন্তু হযরত “ঈসা 'আলাইহিস সালামের শিক্ষায় এর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তাছাড়া তাঁর শরী'আতে যেহেতু যুদ্ধ-বিগ্রহের বিধান ছিল না, তাই তাঁর অনুসারীদের মধ্যে দয়া- মায়ার দিকটি বেশি প্রতীয়মান ছিল।
এর দ্বারা এই উম্মতকে উৎসাহ দেওয়া উদ্দেশ্য যে, তারাও যেন মমতা ও দয়ার গুণ অর্জনের চেষ্টা করে। কেননা এ গুণ অর্জন দ্বারা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক মায়া-মহব্বত সৃষ্টি হয়। তাতে একে অন্যের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করে। পরস্পরে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়। আর এভাবে পারস্পরিক সম্প্রীতি এবং সামাজিক শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা কেবল দুনিয়ার শান্তির জন্যই প্রয়োজন নয়; বরং আখিরাতের কল্যাণ ও নাজাতের জন্যও জরুরি।
আর যে বিষয়টি দ্বারা তাদের নিন্দা করা হয়েছে তা হচ্ছে বৈরাগ্যবাদ। ‘রাহবানিয়্যাত’ অর্থ বৈরাগ্য। তথা দুনিয়ার সব আনন্দ ও বিষয়ভোগ পরিহার করা। হযরত ঈসা 'আলাইহিস সালামকে আসমানে তুলে নেওয়ার বহুকাল পরে খ্রিষ্টান সম্প্রদায় এমন এক আশ্রমিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিল, যাতে কোনও ব্যক্তি আশ্রমে ঢুকে পড়ার পর সংসারজীবন সম্পূর্ণরূপে বর্জন করত। বিয়েশাদি করত না এবং পার্থিব কোনও রকমের স্বাদ ও আনন্দে অংশগ্রহণ করত না। তাদের এই আশ্রমিক ব্যবস্থাকেই ‘রাহবানিয়্যাত’ বলে। এ ব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল এভাবে যে, হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের অনুসারীদের উপর বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ জুলুমনির্যাতন চালাতে থাকলে তারা নিজেদের দ্বীন রক্ষার তাগিদে শহরের বাইরে গিয়ে বসবাস শুরু করল, যেখানে জীবনযাপনের সাধারণ সুবিধাসমূহ পাওয়া যেত না। কালক্রমে তাদের কাছে জীবনযাপনের এই কঠিন ব্যবস্থাই এক স্বতন্ত্র ইবাদতের রূপ পরিগ্রহ করে। পরবর্তীকালের লোকেরা জীবনযাপনের উপকরণাদি হস্তগত হওয়া সত্ত্বেও এই মনগড়া 'ইবাদতের জন্য তা পরিহার করতে থাকল। আল্লাহ তা'আলা বলছেন, আমি তাদেরকে এরূপ কঠিন জীবনযাত্রার নির্দেশ দেইনি। তারা নিজেরাই এর প্রবর্তন করেছে।
বৈরাগ্যবাদের এ প্রথা প্রথম দিকে তো তারা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি বিধানের জন্যই অবলম্বন করেছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে তারা এটা পুরোপুরিভাবে রক্ষা করতে পারেনি। রক্ষা করতে না পারার দুটো দিক আছে। (এক) আল্লাহ তাআলার নির্দেশের অনুবর্তী না থাকা। আর এভাবে আল্লাহ তা'আলা যে জিনিসকে তাদের জন্য বাধ্যতামূলক করেননি, তারা সেটাকে নিজেদের জন্য বাধ্যতামূলক করে নিল। মনে করল, এরূপ না করলে তাদের একটা মহা ইবাদত ছুটে যাবে। অথচ দ্বীনের মাঝে নিজেদের পক্ষ থেকে কোনও জিনিসকে এ রকম জরুরি মনে করা যে, তা না করলে অপরাধ হবে, সম্পূর্ণ নাজায়েয।(তাওযীহুল কুরআন, সূরা হাদীদ-এর ২৭ নং আয়াতের টাকা হতে গৃহীত।)
প্রকৃতপক্ষে 'ইবাদত হিসেবে কেবল এমন আমলই গ্রহণযোগ্য, যা নবী-রাসূলগণ শিক্ষা দিয়েছেন। এর বাইরে নিজেদের পক্ষ থেকে কোনও রীতিনীতি বা কোনও প্রথা চালু করলে আপাতদৃষ্টিতে তা যতই সুন্দর মনে হোক না কেন, তা 'ইবাদত' নামে অভিহিত হওয়ার উপযুক্ত কিছুতেই নয়। বরং তার পারিভাষিক নাম হচ্ছে বিদ'আত। এ জাতীয় কাজ দ্বারা কোনও ছাওয়াব পাওয়া যায় না; বরং তাতে অর্থহীন কষ্টভোগ হয় এবং কোনও ক্ষেত্রে হয় অর্থের অপচয়, সেইসঙ্গে গুনাহ তো আছেই। কাজেই এর থেকে বেঁচে থাকা অবশ্যকর্তব্য। আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভ ও ছাওয়াব হাসিলের পথ একটাই, আর তা হচ্ছে শরী'আতের অনুসরণ তথা নবী-রাসূলগণের দেখানো পথে চলা। আমাদের জন্য তা হচ্ছে আখেরী নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত মোতাবেক জীবনযাপন করা।

তিন নং আয়াত

وَلَا تَكُونُوا كَالَّتِي نَقَضَتْ غَزْلَهَا مِنْ بَعْدِ قُوَّةٍ أَنْكَاثًا

অর্থ : যে নারী তার সুতা মজবুত করে পাকানোর পর পাক খুলে তা রোয়া রোয়া করে ফেলেছিল, তোমরা তার মত হয়ো না।সূরা নাহল, আয়াত ৯২

ব্যাখ্যা

বর্ণিত আছে, মক্কা মুকাররমায় খারকা নাম্নী এক উন্মাদিনী ছিল। সে দিনভর পরিশ্রম করে সুতা কাটত আবার সন্ধ্যা হলে তা খুলে খুলে নষ্ট করে ফেলত। কালক্রমে তার এ কাজটি একটি দৃষ্টান্তে পরিণত হয়। যেমন কেউ যখন কোনও ভালো কাজ সম্পন্ন করার পর নিজেই তা নষ্ট করে ফেলে তখন ওই নারীর সাথে তাকে উপমিত করা হয়। এখানে তার সাথে তুলনা করা হয়েছে সেইসব লোককে, যারা কোনও বিষয়ে জোরদারভাবে কসম করার পর তা ভেঙ্গে ফেলে।
এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে ওই নারীর মত হতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ আমরা যদি কোনও বিষয়ে কসম করি বা প্রতিশ্রুতি দিই, তবে সে কসম পূর্ণ করা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে, কোনওক্রমেই তার বরখেলাফ করা যাবে না। আমরা তো কালেমা পড়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে গেছি যে, সর্বদা আল্লাহর হুকুম মেনে চলব এবং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নতের অনুসরণ করব। সুতরাং কখনও যদি এর ব্যতিক্রম হয়, তবে তা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শামিল হয়ে যাবে এবং তা ওই মহিলার মতই নির্বুদ্ধিতার কাজ হবে।
কোনও আমল শুরু করার পর তা পূর্ণ না করাও এরকমই নির্বুদ্ধিতা। এমনিভাবে কোনও আমল শুরু করে তার ধারাবাহিকতা রক্ষা না করাও এর অন্তর্ভুক্ত। এরূপ কিছুতেই উচিত নয়। শুরুতেই নফল আমল এতটুকু পরিমাণ ধরা উচিত, যার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হবে। তারপর সে আমল শুরু করার পর যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে কোনওক্রমেই যাতে তা ছুটে না যায়। পরিমাণ যদি অল্পও হয় এবং তা নিয়মিত চালু রাখা যায়, তবে আশা রাখা যায় সে অল্প আমলের বদৌলতেই আল্লাহ তা'আলার কাছে অশেষ ছাওয়াবের অধিকারী হওয়া যাবে, এমনকি তা আখিরাতে নাজাতের অসিলাও হয়ে যেতে পারে।

চার নং আয়াত

وَاعْبُدُ رَبِّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ

অর্থ : এবং নিজ প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাক যাবৎ না যার আগমন সুনিশ্চিত তোমার কাছে তা এসে যায়।সূরা হিজর, আয়াত ৯৯

ব্যাখ্যা

এ আয়াতে ইয়াকীন ও সুনিশ্চিত বিষয় দ্বারা মৃত্যু বোঝানো হয়েছে। বোঝানো হচ্ছে যে, মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার ইবাদত-বন্দেগীতে লেগে থাক। যে সকল “ইবাদত ফরয ও ওয়াজিব পর্যায়ের তা তো মৃত্যু পর্যন্ত করে যেতেই হবে, সেইসঙ্গে ওইসব নফলও নিয়মিত চালু রাখতে হবে, যা নিয়মিত করার উদ্দেশ্যে শুরু করে দেওয়া হয়েছে। যদি এই নিয়তে তাহাজ্জুদ শুরু করা হয় যে, আমি নিয়মিত এ নামায পড়ব, তবে অব্যাহতভাবে তা পড়া বাঞ্ছনীয়। মাঝেমধ্যে কখনও ছুটে গেলে ভিন্ন কথা, কিন্তু এমনভাবে ছেড়ে দেওয়া যে, আর পড়াই হচ্ছে না, এটা কিছুতেই উচিত নয়। রাতের নির্জনতায় যখন আল্লাহ তাআলার দরবারে হাজিরা দেওয়ার আমল শুরু করে ফেলা হয়েছে, তখন এক আশেক বান্দার জন্য সে হাজিরা ছেড়ে দেওয়া কিছুতেই শোভন হতে পারে না। এটা এক প্রকার অনিহা প্রদর্শন, যা আল্লাহর রহমত ও বরকত থেকে বঞ্চিত হয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে বেশি বেশি নেক আমলের তাওফীক দিন এবং তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করুন, আমীন।

আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষায় উৎসাহদান সংক্রান্ত হাদীছ

এ বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের বহু হাদীছ আছে। তার মধ্যে একটা হাদীছ উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি. থেকে বর্ণিত। তাতে আছে-

وكَانَ أَحَبُّ الدِّينِ إِلَيْهِ مَا دَاوَمَ صَاحِبُهُ عَلَيْهِ

“তাঁর কাছে সর্বাপেক্ষা প্রিয় আমল তাই, যা তার আমলকারী নিয়মিতভাবে করে।”-বুখারী ও মুসলিম. সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৪৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৮৫
এ হাদীছটি পূর্ববর্তী অধ্যায়ের হাদীছ নং ১৪২-এ গত হয়েছে।
কখনও কোনও ওযিফা ছুটে গেলে করণীয়
হাদীছ নং : ১৫৩

হযরত 'উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি তার রাতের ওযিফা বা তার অংশবিশেষ আদায় না করেই ঘুমিয়ে যায়, তারপর ফজরের নামায ও যোহরের নামাযের মধ্যবর্তী সময়ে তা পড়ে নেয়, তার জন্য লিখে দেওয়া হয় (এ পরিমাণ ছাওয়াব) যেন সে তা রাতেই পড়েছে। -মুসলিম.
(সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ৭৪৭; সুনানে আবূ দাউদ, হাদীছ নং ১৩১৩; জামে তিরমিযী, হাদীছ নং ৫৮১; সুনানে ইবন মাজাহ, হাদীছ নং ১৩৪৩; সুনানে নাসাঈ, হাদীছ নং ১৯৭০; মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ২২০; বায়হাকী, হাদীছ নং ৪২৩২)
مقدمة الامام النووي
15 - باب في المحافظة عَلَى الأعمال
قَالَ الله تَعَالَى: {أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ} [الحديد: 16]، وَقالَ تَعَالَى: {وَقَفَّيْنَا بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَآتَيْنَاهُ الأِنْجِيلَ وَجَعَلْنَا فِي قُلُوبِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ رَأْفَةً وَرَحْمَةً وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلاَّ ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا} [الحديد: 27]، وَقالَ تَعَالَى: {وَلا تَكُونُوا كَالَّتِي نَقَضَتْ غَزْلَهَا مِنْ بَعْدِ قُوَّةٍ أَنْكَاثًا} [النحل: 92]، وَقالَ تَعَالَى: {وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ} [الحجر: 99].
153 - وعن عمر بن الخطاب - رضي الله عنه - قَالَ: قَالَ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم: «مَنْ نَامَ عَنْ حِزْبهِ (2) مِنَ اللَّيلِ، أَوْ عَنْ شَيءٍ مِنْهُ، فَقَرَأَهُ مَا بَيْنَ صَلاةِ الفَجْرِ وَصَلاةِ الظُّهْرِ، كُتِبَ لَهُ كَأَنَّمَا قَرَأَهُ مِنَ اللَّيلِ». رواه مسلم. (3)
হাদীস নং: ১৫৪
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ আমলে যত্নবান থাকা ও তার ধারাবাহিকতা রক্ষা প্রসঙ্গ।
তাহাজ্জুদের ধারাবাহিকতা রক্ষার গুরুত্ব
হাদীছ নং: ১৫৪

হযরত ‘আব্দুল্লাহ ইবন 'আমর ইবনুল আস রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আব্দুল্লাহ! তুমি অমুকের মত হয়ো না, যে রাতে উঠে নামায পড়ত, তারপর রাতে উঠা ছেড়ে দিয়েছে।-বুখারী ও মুসলিম'
(সহীহ বুখারী,হাদীছ নং ১১৫২: সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ১১৫৯; সুনানে নাসাঈ, হাদীছ নং ১৭৬৪; সুনানে ইবন মাজাহ, হাদীছ নং ১৩৩১)
مقدمة الامام النووي
15 - باب في المحافظة عَلَى الأعمال
154 - وعن عبد الله بن عَمْرو بن العاص رَضِيَ الله عنهما، قَالَ: قَالَ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم: «يَا عبدَ اللهِ، لاَ تَكُنْ مِثْلَ فُلان، كَانَ يَقُومُ اللَّيلَ فَتَرَكَ قِيَامَ اللَّيلِ». مُتَّفَقٌ عَلَيهِ. (1)
হাদীস নং: ১৫৫
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ আমলে যত্নবান থাকা ও তার ধারাবাহিকতা রক্ষা প্রসঙ্গ।
কোনও কারণে তাহাজ্জুদ ছুটে গেলে করণীয়
হাদীছ নং: ১৫৫

উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাতের নামায যদি কোনও যন্ত্রণা বা অন্য কোনও কারণে ছুটে যেত, তবে দিনের বেলা বারো রাক'আত পড়ে নিতেন।-মুসলিম.
(সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ৭৪৬; সুনানে নাসাঈ, হাদীছ নং ১৬০১; মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ২৪৬৮, ২৬২৬২; সুনানে আবূ দাউদ, হাদীছ নং ১৩৪২; জামে তিরমিযী, হাদীছ নং ৪৪৫; বায়হাকী, হাদীছ নং ৪২৩৭; বাগাবী, হাদীছ নং ৯৬৩)
مقدمة الامام النووي
15 - باب في المحافظة عَلَى الأعمال
155 - وعن عائشة رضي الله عنها، قَالَتْ: كَانَ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم - إِذَا فَاتَتْهُ الصَّلاةُ مِنَ اللَّيلِ مِنْ وَجَعٍ أَوْ غَيرِهِ، صَلَّى مِنَ النَّهارِ ثنْتَيْ عَشرَةَ رَكْعَةً. رواه مسلم. (1)
হাদীস নং: ১৫৬
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ অধ্যায়ঃ ১৬

সুন্নত ও তার আদবসমূহ রক্ষায় যত্নবান থাকার আদেশ।

সুন্নতের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ

সুন্নতের আভিধানিক অর্থ- পথ, পন্থা, তরিকা ও রীতি-নীতি। এ হিসেবে ভালো ও মন্দ উভয় পন্থার জন্যই শব্দটি ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমন এক হাদীছে আছেঃ-

من سن سنة حسنة فله أجرها وأجر من عمل بها إلى يوم القيامة، ومن سن سنة سيئة فله وزرها ووزر من عمل بها إلى يوم القيامة

“যে ব্যক্তি কোনও ভালো সুন্নত (তরিকা) চালু করে, তার জন্য রয়েছে সে সুন্নত নিজে পালন করার ছাওয়াব এবং কিয়ামত পর্যন্ত যত লোক তা পালন করবে তারও ছাওয়াব। আর যে ব্যক্তি কোনও মন্দ সুন্নত (তরিকা) চালু করবে, তার জন্য রয়েছে তা নিজে করার গুনাহ এবং কিয়ামত পর্যন্ত যত লোক তা পালন করবে তারও গুনাহ।*
এ হাদীছে ভালো ও মন্দ উভয় তরিকা ও পন্থার জন্য 'সুন্নত' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। তবে পরিভাষায় এ শব্দটি মন্দ তরিকার জন্য ব্যবহৃত হয় না।
পরিভাষায় এ শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। ফিকহ শাস্ত্রে ইসলামী বিধানাবলীর বিভিন্ন স্তরের মধ্যে ফরয ও ওয়াজিবের পরবর্তী স্তরকে সুন্নত বলা হয়।
কখনও কখনও বিদ'আতের বিপরীত কাজকেও সুন্নত বলে। সে হিসেবে বিদ'আতের পাশাপাশি 'সুন্নত' শব্দের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায়।
অনেক সময় সুন্নত শব্দটি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরিকা বোঝানোর জন্যও ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ তিনি ‘ইবাদত-বন্দেগী, আখলাক-চরিত্র, আচার-আচরণ ও জীবনযাপনের যে পন্থা নিজে অবলম্বন করেছেন ও উম্মতের জন্য রেখে গেছেন, তাকেও সুন্নত বলা হয়।
এ অধ্যায়ে সুন্নত দ্বারা এ অর্থই বোঝানো উদ্দেশ্য।
এ হিসেবে ফিক্হ শাস্ত্রের ফরয, ওয়াজিব, সুন্নত ও মুস্তাহাব সর্বস্তরের বিধানই সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। কেননা এ সবই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরিকার মধ্যে পড়ে।
বলা যায় এ অর্থ হিসেবে সুন্নত শব্দটি দীন ও ইসলামের সমার্থবোধক।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে দীন আমাদের জন্য রেখে গেছেন। সেটাই ইসলাম এবং তিনি ছিলেন তার বাস্তব নমুনা। তিনি নিজে এর হুবহু অনুসরণ করতেন এবং সে অনুযায়ীই জীবনযাপন করতেন। কাজেই ইসলামই তাঁর জীবনাদর্শ এবং ইসলামই তাঁর তরিকা। সুতরাং তাঁর সুন্নত হচ্ছে সমগ্র ইসলাম। ‘আকীদা-বিশ্বাস ও ‘ইবাদত-বন্দেগীসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামের অনুসরণ করলেই তাঁর সুন্নত ও তরিকার অনুসরণ করা হয়। আবার তাঁর সুন্নত ও তরিকা অনুসরণ করে চললেই ইসলামের অনুসরণ হয়।

কালক্রমে সুন্নতের পরিপূর্ণ অনুসরণে শিথিলতা ও তার পরিণাম এবং আমাদের করণীয়

কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াত ও বহু হাদীছে 'পূর্ণাঙ্গ ইসলামে' প্রবেশ ও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিপূর্ণ অনুসরণ করার হুকুম দেওয়া হয়েছে।সাহাবায়ে কিরাম তাঁর পরিপূর্ণ অনুসরণই করতেন। তাঁরা বিধানাবলীর স্তরভেদের প্রতি লক্ষ করতেন না যে, যা ফরয-ওয়াজিব কেবল তা-ই পালন করবেন আর ফরয-ওয়াজিব না হলে তাতে শিথিলতা প্রদর্শন করবেন। বরং তাঁরা কেবল এদিকেই লক্ষ করতেন যে, তিনি কী করছেন ও কী বলছেন। তিনি যা করতেন, তাঁরা তা-ই করতেন এবং যা করতে বলতেন, পূর্ণ গুরুত্বের সঙ্গে তা পালন করতেন। মুস্তাহাব কাজকেও সেই যত্নের সঙ্গেই করতেন, যে যত্ন ফরয-ওয়াজিবের ক্ষেত্রে দিয়ে থাকতেন। এভাবে তাঁরা জীবনের সব ক্ষেত্রে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত ও তরিকার ওপরই চলতেন। তাঁদের দেখাদেখি তাবি'ঈগণও সেভাবেই জীবনযাপন করতেন। এভাবে চলেছে বহুযুগ। সুন্নতের সে পাবন্দীর কারণেই তখন মুসলিম উম্মাহ শৌর্য-বীর্যের চরম শিখরে পৌছে গিয়েছিলেন। মুসলিম জীবনের উন্নতি ও উৎকর্ষ মূলত এরই মধ্যে নিহিত।
কিন্তু কালক্রমে এ জাতির মধ্যে বিত্তবাসনা ও দুনিয়ার আসক্তি ঢুকে পড়ে। পার্থিব খেয়াল-খুশি পূরণ ও আনন্দ-স্ফূর্তিতে দিন কাটানোর প্রতি তাদের আগ্রহ দেখা দেয়। বলাবাহুল্য, সুন্নতের অনুসরণ সেরকম জীবনের পক্ষে অন্তরায়। তাই ধীরে ধীরে এ জাতি সুন্নত তথা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনাদর্শের অনুসরণ থেকে দূরে সরতে শুরু করে। আর যখন থেকে তারা তা থেকে দূরে সরতে শুরু করে,তখন থেকে তাদের অধঃপতনও শুরু হয়ে যায়। এভাবে তারা নামতে নামতে আজকের এ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। মুসলিম উম্মাহর আজকের এ চরম অধঃপতন এবং তাদের লাঞ্ছনা ও হীনতার একমাত্র কারণ এটাই যে, তারা তাদের জীবন থেকে সুন্নত ও নববী তরিকা বাদ দিয়ে দিয়েছে।
সুতরাং এ জাতি যদি তাদের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করতে চায়, তবে তাদেরকে সুন্নতের পথে ফিরে আসতে হবে। তারা যদি প্রথম যমানার মত ইজ্জত-সম্মানের জীবন আশা করে, তবে ফের নববী তরিকা আঁকড়ে ধরতে হবে। তা ধরতে পারলে তারা আবারও পৃথিবীর নেতৃত্বে সমাসীন হতে পারবে। অন্যথায় আর যে পথই ধরুক না কেন, এ লাঞ্ছনা থেকে তাদের রেহাই নেই। সবচে' বড় কথা, পরকালীন মুক্তির নিশ্চয়তাও আছে কেবল নববী তরিকার মধ্যেই। কাজেই আখিরাতের মুক্তির জন্য আমাদের সেদিকে ফিরে আসতেই হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন- আমীন।
ইমাম নববী রহ. এ অধ্যায়ে সুন্নত অর্থাৎ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের রেখে যাওয়া তরিকার ওপর চলার গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য সম্পর্কে কয়েকটি আয়াত ও কিছু সংখ্যক হাদীছ উল্লেখ করেছেন। আমরা তার অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা পেশ করছি। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীকদাতা।

সুন্নত ও তার আদবসমূহ রক্ষায় যত্নবান থাকার আদেশ সম্পর্কিত কয়েকটি আয়াত

এক নং আয়াত

وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا

অর্থ : রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর তোমাদেরকে যা কিছুতে নিষেধ করে তা হতে বিরত থাক।সূরা হাশর (৫৯), আয়াত ৭

ব্যাখ্যা

এ আয়াত মূলত গনীমতের মাল বণ্টন প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছে। কিন্তু আয়াতের শব্দ ব্যাপক। সে ব্যাপকতার ইঙ্গিত আয়াতের মধ্যেই আছে। আয়াতে দেওয়ার বিপরীত শব্দ আনা হয়েছে নিষেধ করা। প্রকৃতপক্ষে দেওয়ার বিপরীত শব্দ হল না দেওয়া বা দেওয়া হতে বিরত থাকা। কিন্তু তার পরিবর্তে 'নিষেধ করা' শব্দ ব্যবহারের মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, দেওয়া দ্বারা কেবল মাল দেওয়া বোঝানো উদ্দেশ্য নয়; বরং আদেশ দেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত।
সুতরাং আয়াতের মর্ম হচ্ছে, রাসূল তোমাদেরকে যা-কিছুই দেন, তা অর্থ-সম্পদ হোক কিংবা হোক হিদায়াত, পথনির্দেশ, আখলাক-চরিত্রের শিক্ষা ও শরী'আতের বিধানাবলী, তা সবই গ্রহণ করে নাও। বহু সাহাবী থেকে এ ব্যাপক অর্থ বর্ণিত আছে এবং এরই ভিত্তিতে তাঁরা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিটি হুকুমকে কুরআনেরই হুকুম সাব্যস্ত করতেন এবং অবশ্যপালনীয় বলে বিশ্বাস করতেন।
হযরত 'আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাযি. একবার এক ব্যক্তিকে ইহরাম অবস্থায় সেলাইকৃত পোশাক পরতে দেখে বললেন, এ কাপড় খুলে ফেল। লোকটি বলল, এ সম্পর্কে কি আপনি কুরআনের কোনও আয়াত বলতে পারেন, যে আয়াতে এরূপ পোশাক পরতে নিষেধ করা হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ, সে আয়াত আমি তোমাকে জানাচ্ছি। এই বলে তিনি পাঠ করলেন-

وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا

অর্থ : রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর তোমাদেরকে যা কিছুতে নিষেধ করে তা হতে বিরত থাক।
এর দ্বারা বোঝা গেল নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেওয়া আদেশ-নিষেধ কুরআন মাজীদের আদেশ-নিষেধের মতই উম্মতের জন্য অবশ্যপালনীয়। তিনি তাঁর আদেশ-নিষেধ দ্বারা মূলত উম্মতের চলার পথ ও পন্থা বাতলান। সুতরাং তাঁর আদেশ-নিষেধ সুন্নতই বটে। এভাবে এ আয়াত তাঁর আদেশ-নিষেধ আঁকড়ে ধরার হুকুম দিয়ে মূলত তাঁর সুন্নত অনুসারে চলারই তাগিদ করেছে।

দুই নং আয়াত

وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى (3) إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى (4)


অর্থ : সে তার নিজ খেয়াল-খুশি থেকে কিছু বলে না। এটা তো খালেস ওহী, যা তাঁর কাছে পাঠানো হয়।সূরা নাজম (৫৩), আয়াত ৩, ৪

ব্যাখ্যা

অর্থাৎ এটা কখনওই সম্ভব নয় যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের পক্ষ থেকে কোনও কথা তৈরি করে সেটিকে আল্লাহ তা'আলার বাণী বলে প্রচার করবেন; বরং তিনি যা-ই বলেন তা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ওহীই হয়ে থাকে।

হাদীছও ওহীই বটে

এক ওহী তো কুরআন মাজীদ, যার ভাব ও ভাষা সবই আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। কিন্তু ওহী কেবল কুরআন মাজীদই নয়; নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীছও ওহীই বটে। হাদীছের ভাব আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ, কিন্তু তার ভাষা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজের। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা কিছু করেছেন তাও আল্লাহ তা'আলার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হুকুমেই করেছেন। সুতরাং তাও ওহী। এমনিভাবে তিনি যা-কিছু অনুমোদন করেছেন তাও আল্লাহ তা'আলার হুকুমেই করেছেন। কাজেই তাও ওহীর অন্তর্ভুক্ত। যখন তাঁর সমস্ত কথা, কাজ ও অনুমোদন ওহী সাব্যস্ত হল, তখন উম্মতের জন্য তা সবই অনুসরণীয়।
কাফেরদের ধারণা ছিল তিনি নিজের পক্ষ থেকে কথা তৈরি করে আল্লাহর নামে প্রচার করছেন। কাজেই তা অনুসরণীয় ও ভ্রুক্ষেপযোগ্য নয়। এ আয়াতে তাদের সে ধারণা রদ করে জানানো হয়েছে, তিনি কোনওকিছুই বানিয়ে বলেন না। যা-কিছুই বলেন, তা আল্লাহ তা'আলার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ওহী। সুতরাং তা গুরুত্বের সঙ্গে শোনা ও মানা তোমাদের অবশ্যকর্তব্য।
যদিও কাফেরদের ধারণা খণ্ডনে এ আয়াত নাযিল হয়েছে, কিন্তু এর বক্তব্যবিষয় আমাদের জন্যও প্রযোজ্য। তাঁর পক্ষ থেকে পাওয়া সব যখন ওহী ও আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত, তখন উম্মত হিসেবে আমাদের জন্য তা অনুসরণ করা জরুরি হয়ে যায়। এভাবে এ আয়াত দ্বারা প্রমাণ হয় যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত ও জীবনাদর্শের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ প্রত্যেক মুসলিমের অবশ্যকর্তব্য।

তিন নং আয়াত

قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ

অর্থ : (হে নবী! মানুষকে) বলে দাও, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবেসে থাক, তবে আমার অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন।সূরা আলে ইমরান (৩), আয়াত ৩১

ব্যাখ্যা

প্রত্যেক মু'মিনেরই কথা হচ্ছে সে আল্লাহ তা'আলাকে ভালোবাসে। এ আয়াতে সে ভালোবাসার দাবি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলাকে ভালোবাসবে, তার অবশ্যকর্তব্য নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করা। কেননা যে ব্যক্তি কাউকে ভালোবাসে, সে তার সন্তুষ্টি কামনা করে এবং তাকে পেতে চায়।

আল্লাহপ্রেমিকদের করণীয়

আমরা যখন আল্লাহ তা'আলাকে ভালোবাসি, তখন তাঁর সন্তুষ্টি কামনা তো করিই। প্রশ্ন হচ্ছে, কিভাবে তাঁকে সন্তুষ্ট করা যাবে? আমরা সরাসরি তাঁকে না দেখতে পাই, না তাঁর কথা শুনতে পারি। তাঁর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের কোনও উপায় আমাদের নেই। এ অবস্থায় কী করলে তিনি খুশি হবেন আর কী করলে নাখোশ হবেন- তা আমরা কিভাবে বুঝব? দয়াময় আল্লাহ আমাদেরকে তা বোঝানোর জন্য নবী-রাসুল পাঠান। তাঁদের প্রতি ওহী নাযিল করে আমাদেরকে তাঁকে পাওয়ার পথ জানিয়ে দেন। সেইসঙ্গে নবী-রাসূলগণকে ওহীর বাস্তব নমুনা বানিয়ে দেন, যাতে আমরা সেই নমুনা দেখে দেখে ওহীর পথে চলি ও জীবন গঠন করি। সেই ধারার সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর কুরআন হচ্ছে সর্বশেষ ওহী।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন ওহীর বাস্তব নমুনা। এখন কিয়ামত পর্যন্ত যারা আল্লাহ তা'আলাকে ভালোবাসবে, তাদের সকলের কর্তব্য সর্বশেষ নাযিলকৃত ওহীর পথে চলা আর সে পথে চলার জন্য নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করা। যারা তাঁর যথাযথ অনুসরণ করবে, তাদের পথচলা ওহীর নির্দেশনা অনুযায়ীই হবে। আর সেভাবে চলতে থাকলে আল্লাহ তা'আলা পর্যন্ত পৌঁছা যাবে। ব্যস, একমাত্র এটাই আল্লাহ তা'আলাকে পাওয়া ও তাঁর সন্তুষ্টি লাভ করার উপায়। এ আয়াতে সে কথাই বলা হয়েছে যে, যারা আল্লাহ তাআলাকে ভালোবাসে বলে দাবি করে, তারা যেন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করে।

সুন্নত অনুসরণের পুরস্কার

এ আয়াতে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করার দ্বারা বান্দার কী অর্জিত হবে তাও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার একটি হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার ভালোবাসা লাভ। যারা তাঁর অনুসরণ করবে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসবেন। অর্থাৎ তারা আল্লাহকে পেয়ে যাবে। প্রত্যেক প্রেমিকজনের তো এটাই কামনা যে, সে যাকে ভালোবাসে তাকে যেন পেয়ে যায়। তাকে পাওয়া মানে তার ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি লাভ করা এবং তার মাহবূব হয়ে যাওয়া। আল্লাহ তা'আলা ভালোবাসার পরম লক্ষ্য তো এটাই যে, বান্দা আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি পেয়ে যাবে। আয়াত জানাচ্ছে, তা পাওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করা।
দ্বিতীয় পুরস্কার হচ্ছে গুনাহ মাফ হওয়া। আল্লাহ তা'আলা যখন বান্দাকে ভালোবেসে ফেলবেন ও তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন, তখন তাকে পাপের পঙ্কিলতায় রেখে দেবেন তা কি সম্ভব? তিনি নিজ মেহেরবানীতে পাপরাশি ক্ষমা করে তাকে শুদ্ধ ও পবিত্র করে ফেলবেন।
সারকথা, এ আয়াত আল্লাহপ্রেমিকদের উৎসাহ দিচ্ছে, তারা যেন নিজেদের গুনাহ মাফ করানো ও আল্লাহ তা'আলার ভালোবাসা লাভের জন্য প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত ও জীবনাদর্শের অনুসরণ করে চলে। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন।

চার নং আয়াত

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُوا اللهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ


অর্থ : বস্তুত রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ—এমন ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের আশা রাখে।সূরা আহযাব (৩৩), আয়াত ২১

ব্যাখ্যা

অর্থাৎ যারা আশা রাখে- আখিরাতে আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করবেন এবং নিজ রহমতে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত রেখে চিরসুখের জান্নাতে স্থান দেবেন, তাদের কর্তব্য মহানবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করা। কেননা কেবল তার মধ্যেই আছে তাদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ।

সর্বাবস্থায় আল্লাহভক্তদের শ্রেষ্ঠতম আদর্শ

সরাসরি এ আয়াতের সম্পর্ক যুদ্ধাবস্থা ও সংকটময় পরিস্থিতির সাথে। খন্দকের যুদ্ধে মুসলিমগণ এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। আরবের সমস্ত গোত্র একাট্রা হয়ে মদীনা মুনাওয়ারায় অভিযান চালিয়েছিল। তাদের লোকবল ও অস্ত্রবল ছিল মুসলিম বাহিনীর তুলনায় অনেক অনেক বেশি। সেইসঙ্গে ছিল প্রচণ্ড খাদ্যাভাব ও ক্ষুধার কষ্ট। সময়টাও ছিল প্রচণ্ড শীতের। তদুপরি ভেতর থেকে ইয়াহুদী গোত্রগুলো ষড়যন্ত্র চালাচ্ছিল। শত্রুবাহিনীর পক্ষ থেকে অবরোধও ছিল অনেক দীর্ঘ। এহেনও পরিস্থিতিতে মু'মিনগণ এমন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল যে, কুরআনের ভাষায় তাদের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গিয়েছিল, প্রাণ হয়েছিল কণ্ঠাগত এবং তাদেরকে তীব্র প্রকম্পনে কাঁপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে অনেকের মনে নানারকম ভাবনা দেখা দিয়েছিল এবং সৃষ্টি হয়েছিল বিভিন্ন ওয়াসওয়াসা। কিন্তু নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবিন্দু টলেননি। আল্লাহর প্রতি তাঁর ভরসায় সামান্যতম চিড় ধরেনি। ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তার সাথে তিনি পরিস্থিতি মোকাবেলা করে যাচ্ছিলেন। এ আয়াতে সে প্রসঙ্গেই বলা হয়েছে, কঠিন কঠিন পরিস্থিতিতে কিভাবে আল্লাহর প্রতি ভরসা রেখে আপন অবস্থানে অবিচল থাকতে হয়, সে ব্যাপারে তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।
আয়াতের পরিপ্রেক্ষিত যদিও এই বিশেষ ঘটনা, কিন্তু এর শব্দাবলী ব্যাপক অর্থবোধক। মানবজীবনের প্রতিটি অবস্থাই এর অন্তর্ভুক্ত। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অবস্থায় কিভাবে শোকর করতে হয়, দুঃখ-কষ্ট ও সংকটময় পরিস্থিতিতে কিভাবে সবর অটুট রাখতে হয়, তাঁর জীবনাদর্শের মধ্যে রয়েছে তার উত্তম নমুনা। সন্তানের লালন-পালন, স্ত্রীর প্রতি আচরণ, আত্মীয়তা রক্ষা, প্রতিবেশীর হক আদায়, বিচার-নিষ্পত্তি, দেশ- পরিচালনা এমনকি হাসি-কান্না, ওঠাবসা, চলাফেরা, রসিকতা প্রভৃতি মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক যত অনুষঙ্গ আছে প্রতিটি ক্ষেত্রে মহানবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনাচার মানবজাতির সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম আদর্শ। সুতরাং আখিরাতমুখী ও আল্লাহর রহমতকামী প্রতিটি মানুষের কর্তব্য জীবনের সকল ব্যাপারে তাঁর সে আদর্শ অনুসরণ করে চলা। এ আয়াতে আমাদের সে নির্দেশই দেওয়া হয়েছে।

পাঁচ নং আয়াত

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا (65)

অর্থ : না, (হে নবী!) তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না নিজেদের পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদের ক্ষেত্রে তোমাকে বিচারক মানবে, তারপর তুমি যে রায় দাও সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোনওরূপ কুণ্ঠাবোধ না করবে এবং অবনত মস্তকে তা গ্রহণ করে নেবে।সূরা নিসা (৪), আয়াত ৬৫

ব্যাখ্যা

এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের শপথ করে জানিয়েছেন, কোনও ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত মু'মিন ও মুসলিম হতে পারে না, যতক্ষণ না সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিটি সিদ্ধান্ত অকুণ্ঠ ও সন্তুষ্টমনে মেনে নেবে।

রাসুলের প্রতি বিশ্বাসের উদ্দেশ্য

বস্তুত নবীর নবুওয়াতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে তাঁর যাবতীয় আদেশ-নিষেধ মেনে নেওয়া, তাঁর প্রতিটি ফয়সালায় খুশি থাকা ও তাঁর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ বজায় রাখা। নবীর প্রতি বিশ্বাস কেবল ভক্তি প্রদর্শন ও গুণগান করার জন্য নয় এবং নয় কেবল তাঁর নাম নিয়ে গর্ব করার জন্য। সুতরাং তিনি যখন যে ফয়সালা দান করেন, সন্তুষ্টচিত্তে তা মেনে না নেওয়া হলে এ বিশ্বাসের কোনও সার্থকতা থাকে না। সেজন্যই এ আয়াতে তাঁর সিদ্ধান্ত মানার প্রতি জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এ তাগিদের দাবি হচ্ছে প্রত্যেকে তাঁর পূর্ণাঙ্গ আনুগত্যে বদ্ধপরিকর থাকবে, এমনকি তাঁর কোনও সিদ্ধান্ত যদি নিজ রুচি-অভিরুচির পরিপন্থীও হয়। তাঁর কোনও ফয়সালা মানতে গেলে যদি নিজ স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয় কিংবা লোকসম্মুখে আপাতদৃষ্টিতে ছোট হতে হয়, তাও খুশিমনে তা মেনে নেওয়া চাই। কোনও সন্দেহ নেই তা মেনে নেওয়ার মধ্যেই গৌরব। তারই মধ্যে প্রকৃত মর্যাদা।
নবীর ফয়সালা না মানা তাঁর অবাধ্যতা করার শামিল, যা ইসলাম ও মুসলমানিত্বের পরিপন্থী এবং প্রকৃতপক্ষে তা নিজ খেয়াল-খুশির গোলামী ও শয়তানের আনুগত্য। এর পরিণতিতে মানুষ গোমরাহীর শিকার হয়ে যায় ও সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়। এমনকি এটা মুনাফিকীরও আলামত। এ আয়াতের শানে নুযূলও (অবতরণ- প্রেক্ষাপট) সেদিকে ইঙ্গিত করে।

একটি বিচারের ঘটনা ও হযরত উমর রাযি.-এর 'ফারূক' উপাধি লাভ

ইমাম কুরতুবী রহ. এ আয়াতের শানে নুযূল সম্পর্কে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তাতে আছে, বিশর নামক জনৈক মুনাফিক ও এক ইয়াহুদীর মধ্যে কোনও এক বিষয়ে বিবাদ চলছিল। এর ফয়সালার জন্য ইয়াহুদী বলল, চল আমরা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে যাই। কারণ ইয়াহুদী জানত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ন্যায়বিচারই করবেন এবং তা তার পক্ষেই যাবে। কেননা তার দাবি সঠিক ছিল। অপরদিকে বিশর বলল, না, আমরা কা‘ব ইবন আশরাফের কাছে যাব।
কা‘ব ইবন আশরাফ ছিল ইয়াহুদীদের নেতা। কিন্তু ইয়াহুদী অনড়। সে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছেই যাবে। অগত্যা বিশর তাতে রাজি হল। তারা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে আপন আপন বক্তব্য পেশ করল। তিনি ইয়াহুদীর পক্ষে রায় দিলেন। বিশর তাঁর সামনে তা মেনে নিলেও পরে তা প্রত্যাখ্যান করল। সে বলল, চল, আমরা আবূ বকরের কাছে যাই। তিনিও একই রায় দিলেন। তখন সে বলল, চল 'উমরের কাছে যাই। তারা হযরত উমর রাযি.-এর কাছে গিয়ে উপস্থিত হল। ইয়াহুদী হযরত উমর রাযি.-এর কাছে সম্পূর্ণ বৃত্তান্ত বর্ণনা করল। তিনি বিশরকে বললেন, সে যা বলছে তা সঠিক? বিশর বলল, হাঁ। তিনি বললেন, ঠিক আছে, তোমরা অপেক্ষা কর। আমি আসছি। তিনি ভেতর থেকে তরবারি নিয়ে আসলেন এবং বিশরকে এই বলে কতল করে ফেললেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ফয়সালায় রাজি হয় না, তার ব্যাপারে এই হচ্ছে আমার ফয়সালা। এ অবস্থা দেখে ইয়াহুদী ভয়ে পালিয়ে গেল। তারই পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াত নাযিল হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব শুনে হযরত উমর রাযি.-কে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি 'আল ফারূক'- সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী। তখন থেকেই হযরত 'উমর ফারূক রাযি. 'আল-ফারুক' উপাধিতে পরিচিতি লাভ করেন। কুরতুবী, আল-জামে লি আহকামিল কুরআন, ৫ম খণ্ড, ১৭০ পৃ.
প্রকাশ থাকে যে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি এ নিঃশর্ত আনুগত্যের হুকুম কেবল তাঁর জীবদ্দশার জন্যই নির্দিষ্ট নয়; বরং তাঁর ওফাতের পরও এ হুকুম বলবৎ রয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এখন তাঁর আনুগত্য করার অর্থ হচ্ছে তাঁর জীবনাদর্শের অনুসরণ করা তথা জীবনের প্রতিটি কাজ কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা মোতাবেক সম্পন্ন করা।

ছয় নং আয়াত

فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ

অর্থ: অতঃপর তোমাদের মধ্যে যদি কোনও বিষয়ে বিরোধ দেখা দেয়, তবে তোমরা সে বিষয়কে আল্লাহ ও রাসুলের ওপর ন্যস্ত কর।সূরা নিসা (৪), আয়াত ৫৯

ব্যাখ্যা

এ আয়াতের সরাসরি সম্পর্ক আমীর ও শাসকের আনুগত্য করার সাথে। বোঝানো হচ্ছে, শাসকের কোনও আদেশ যদি তোমাদের কাছে আপত্তিকর মনে হয় এবং তোমরা মনে কর—তা শরী'আত বিরোধী, অপরদিকে শাসক আদেশটিকে শরী'আতসম্মতই মনে করে আর এভাবে উভয়পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়, তবে উভয়পক্ষের কর্তব্য হবে বিষয়টিকে আল্লাহ ও রাসূলের ওপর ন্যস্ত করা অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহর মাপকাঠিতে যাচাই করা। যে মত কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক হবে, উভয়পক্ষের কর্তব্য হবে সেটিই মেনে নেওয়া, মতটি যে পক্ষেরই হোক না কেন।
আসল কথা হচ্ছে কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ। মতটি কার সেটি বিবেচ্য নয়। আমার মত নয় বলে মানব না, তা যতই কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক হোক না কেন—এ মনোভাব নিছক অহমিকা ও হঠকারিতা। কিছুতেই এটা একজন মু'মিনের চরিত্র হতে পারে না। তাই তো আয়াতে শর্ত বলে দেওয়া হয়েছে যে, যদি আল্লাহ ও পরকালের ওপর তোমাদের ঈমান থাকে। অর্থাৎ তোমরা যদি মু'মিন হও, তবে বিতর্কিত বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহর শরণাপন্ন হওয়া ও তার ফয়সালা মেনে নেওয়া তোমাদের জন্য ফরয ও অবশ্যকর্তব্য।
এ আয়াতের সরাসরি সম্পর্ক যদিও শাসক ও জনগণের পারস্পরিক বিষয়ের সাথে, কিন্তু এর মর্মবস্তু ব্যাপক। অর্থাৎ যে-কোনও বিষয়ে যে কোনও দুই ব্যক্তি বা দুই পক্ষের মধ্যে মতভিন্নতা দেখা দিলে তাদের কর্তব্য সে বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ফয়সালা গ্রহণ করা। যে মত কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা সমর্থিত হয়, সকলের কর্তব্য কোনওরূপ দ্বিধা-সংকোচ ছাড়া সেটিই মেনে নেওয়া।
বলাবাহুল্য, কুরআন-সুন্নাহর ফয়সালা মেনে নেওয়া রাসূলের ফয়সালা মেনে নেওয়াই বটে। এভাবে এ আয়াত দ্বারাও কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের রেখে যাওয়া তরিকা ও সুন্নতের অনুসরণ করার অপরিহার্যতা প্রমাণিত হয়।

সাত নং আয়াত

مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ الله

অর্থ : যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করে সে আল্লাহরই আনুগত্য করল।সূরা নিসা (৪), আয়াত ৮০

ব্যাখ্যা

এ আয়াতে রাসূলের আনুগত্যকে আল্লাহরই আনুগত্য সাব্যস্ত করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য করা প্রতিটি মানুষের অবশ্যকর্তব্য। আল্লাহ তা'আলা মানুষকে সৃষ্টিই করেছেন এজন্য যে, তারা তাঁর আনুগত্য করে চলবে। কিন্তু তিনি তো গায়েব। মানুষ তাঁর আনুগত্য কিভাবে করবে? কী করে তারা জানবে কী কাজ করলে আল্লাহর আনুগত্য করা হয় আর কী করলে তাঁর অবাধ্যতা হয়ে যায়?

রাসূলের আনুগত্য আল্লাহরই আনুগত্য

আল্লাহ তা'আলা নবী-রাসূল পাঠিয়ে মানুষের এ সমস্যার সমাধান করে দিয়েছেন। তাঁরা আল্লাহ তা'আলার নাযিল করা ওহীর মাধ্যমে মানুষকে জানিয়ে দেন কোন্ কাজ তাঁর আনুগত্যমূলক আর কোন কাজ তাঁর অবাধ্যতামূলক। সেইসঙ্গে তাঁরা নিজ আচার-আচরণ দ্বারা দেখিয়েও দেন কিভাবে তাঁর আনুগত্য করতে হয় এবং কিভাবে তাঁর অবাধ্যতা থেকে বাঁচতে হয়। সুতরাং তাঁদের জীবন মানুষের জন্য আল্লাহর আনুগত্য করা ও তাঁর অবাধ্যতা হতে বাঁচার নমুনা। কাজেই কেউ যদি আল্লাহর অনুগত বান্দা হতে চায়, তবে তার একান্ত কর্তব্য হবে নবী-রাসূলগণের অনুসরণ ও আনুগত্য করা। তাঁদের আনুগত্য করলে তা আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য বলেই গণ্য হবে।
হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেহেতু সর্বশেষ নবী ও রাসূল, তাই তাঁর আবির্ভাবের পর কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের কর্তব্য তাঁর আনুগত্য করা তথা তাঁর রেখে যাওয়া তরিকা ও সুন্নত অনুযায়ী চলা। এখন আল্লাহ তা'আলার অনুগত বান্দা হওয়ার একমাত্র উপায় এটাই। যারা মহানবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরিকা অনুযায়ী চলবে, কেবল তারাই আল্লাহর অনুগত বান্দারূপে গণ্য হবে। আর যারা তাঁর তরিকা অমান্য করবে, তারা আল্লাহ তা'আলারও অবাধ্য সাব্যস্ত হবে। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার অনুগত বান্দারূপে জীবনযাপনের জন্য আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য সকল কাজকর্মে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরিকা ও সুন্নত অনুসরণ করে চলা। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন।

আট নং আয়াত

وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ (52) صِرَاطِ اللَّهِ

অর্থ : নিশ্চয়ই তুমি মানুষকে দেখাচ্ছ হিদায়াতের সেই সরল পথ, যা আল্লাহর পথ।সূরা শূরা (৪২), আয়াত ৫২-৫৩

ব্যাখ্যা

অর্থাৎ তোমার প্রতি যে ওহী নাযিল করি, তার মাধ্যমে তুমি মানুষকে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার সরল সোজা পথ দেখিয়ে থাক। যারা আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছতে চাবে, তাদের কর্তব্য- তোমার দেখানো পথেই চলা।

সুন্নতের অনুসরণ ছাড়া আল্লাহকে পাওয়ার কোনও বিকল্প পথ নেই

এ আয়াত দ্বারাও সুন্নত তথা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরিকা অনুসরণের অপরিহার্যতা প্রমাণিত হয়। কেননা তিনি যে তরিকা রেখে গেছেন, এক তো তা তাঁর নিজের মনগড়া নয়; বরং আল্লাহপ্রদত্ত, দ্বিতীয়ত সে তরিকাই মানুষকে আল্লাহ পর্যন্ত পৌছায়। কোনও কালেই আল্লাহ পর্যন্ত পৌছার জন্য নবীদের দেখানো পথের কোনও বিকল্প ছিল না। সে বিকল্প নেই আজও। অর্থাৎ শেষ নবীর আগমনের পর এখন আল্লাহ পর্যন্ত পৌছার একমাত্র পথ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের রেখে যাওয়া তরিকা। সুতরাং আল্লাহকে পেতে হলে সকলকে এ তরিকার ওপরই চলতে হবে। কেউ যদি অন্য কোনও বিকল্প অবলম্বন করে, তবে তা আর যাই হোক, আল্লাহর পথ হবে না এবং সে ব্যক্তি আর যাই পাক না কেন, আল্লাহকে কিছুতেই পেতে পারে না; বরং সে আল্লাহ থেকে দূরে সরে যাবে এবং ইবলীসের পদাঙ্ক অনুসারী বলে গণ্য হবে। যেমন এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-

وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ

অর্থ : (হে নবী! তাদেরকে) আরও বল, এটা আমার সরল-সঠিক পথ। সুতরাং এর অনুসরণ কর, অন্য কোনও পথের অনুসরণ করো না, করলে তা তোমাদেরকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।সূরা আন'আম (৬), আয়াত ১৫৩

নয় নং আয়াত

فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ (63)

অর্থ : সুতরাং যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তাদের ভয় করা উচিত না-জানি তাদের ওপর কোনও বিপদ আপতিত হয় অথবা যন্ত্রণাদায়ক কোনও শাস্তি তাদেরকে আক্রান্ত করে। সূরা নূর (২৪), আয়াত ৬৩

ব্যাখ্যা

এর আগে মুনাফিকদের সম্পর্কে জানানো হয়েছে যে, তারা নানা বাহানায় ও বিভিন্ন ছলচাতুরীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট থেকে সরে পড়ত ও তাঁর হুকুম অমান্য করত। এস্থলে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে যে, তারা যদি আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত না হয়, তবে আল্লাহ তা'আলা যে-কোনও মুহূর্তে তাদেরকে কঠিন শাস্তি দিতে পারেন আর আখিরাতের শাস্তি তো অবধারিত আছেই।
যদিও এ শান্তির সতর্কবাণী মুনাফিকদের চরিত্র বর্ণনা প্রসঙ্গে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এর শব্দাবলী ব্যাপক। যারাই আল্লাহ তা'আলা ও রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারাই এ সতর্কবাণীর আওতার মধ্যে রয়েছে। সুতরাং আমাদের সকলেরই সতর্ক হওয়া উচিত যাতে আমাদের কোনও কর্মকাণ্ড দ্বারা আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধাচরণ না হয়ে যায় এবং তার পরিণামে আল্লাহ তা'আলার আযাবের কবলে না পড়ে যাই। সে বিরুদ্ধাচরণ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় জীবনের সকল ক্ষেত্রে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত ও তরিকার অনুসরণ করা।

দশ নং আয়াত

وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ وَالْحِكْمَةِ

অর্থ : এবং তোমাদের গৃহে আল্লাহর যে আয়াতসমূহ ও হিকমতের কথা পাঠ করা হয়, তা স্মরণ রাখ।সূরা আহযাব (৩৩), আয়াত ৩৪

ব্যাখ্যা

এ আয়াতে আল্লাহর আয়াত দ্বারা কুরআন মাজীদ এবং 'হিকমত' দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত ও শিক্ষামালা বোঝানো হয়েছে। এখানে সরাসরি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণকে লক্ষ্য করে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তোমাদের ঘরে কুরআনের যে আয়াত পাঠ করা হয় এবং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে সুন্নত চর্চা করা হয়, তোমাদের কর্তব্য তা স্মরণ রাখা। স্মরণ রাখার দু'টি দিক রয়েছে-
এক হচ্ছে কুরআন ও সুন্নত সংরক্ষণ করা এবং ভুলে যাওয়া হতে তা হেফাজত করা। আরেকটি দিক হচ্ছে সে অনুযায়ী আমল করা।
আমল করা হচ্ছে মূল উদ্দেশ্য। আর সে উদ্দেশ্য পূরণের জন্য কুরআন ও সুন্নতের সংরক্ষণও জরুরি। সুতরাং এ দু'টি বিষয়ই স্মরণ রাখার নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত।
বিশেষভাবে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণকে লক্ষ্য করে এ নির্দেশ দেওয়ার কারণ হচ্ছে, তাঁর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে জানার সর্বাপেক্ষা নির্ভরযোগ্য মাধ্যম তারাই। পারিবারিক জীবনযাপন সম্পর্কে ইসলামের বহু বিধি-বিধান আছে। সেসব বিধান সংরক্ষিত না থাকলে ইসলামের একটা বড় অংশই আমাদের অজ্ঞাত থেকে যেত। সে ক্ষেত্রে আমরা ইসলামের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করতে সক্ষম হতাম না। অথচ কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মানুষের জীবনের সকল ক্ষেত্রেই ইসলামের অনুসরণ জরুরি। মানুষের এ প্রয়োজন পূরণার্থেই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারের নারীগণকে এদিকে বিশেষভাবে মনোযোগী থাকতে বলা হয়েছে। বস্তুত তাঁর বহু বিবাহের একটা রহস্য এটাও যে, তাঁর স্ত্রীগণ তাঁর গার্হস্থ্য ও পারিবারিক জীবনের যাবতীয় বিষয় মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ করবেন এবং তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে মানুষের কাছে পৌছাবেন। সন্দেহ নেই যে, তাঁরা অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে এ দায়িত্ব পালন করেছেন। উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি. হযরত যায়নাব বিনতে জাহশ রাযি, হযরত উম্মু সালামা রাযি, হযরত মায়মুনা রাযি, প্রমুখের কাছ থেকে আমরা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের যে শিক্ষা ও আদর্শসমূহ জানতে পেরেছি, তা ইসলামী শিক্ষামালার এক বিস্তৃত অধ্যায়। এজন্য আল্লাহ তা'আলা আমাদের এবং সমগ্র উম্মতের পক্ষ থেকে তাঁদেরকে তাঁর শান মোতাবেক জাযায়ে খায়র দান করুন।
যদিও সরাসরি এ হুকুম দেওয়া হয়েছে উম্মাহাতুল মু'মিনীনকে অর্থাৎ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণকে, কিন্তু পরোক্ষভাবে আমাদের জন্যও এ হুকুম প্রযোজ্য। কেননা কুরআন-হাদীছের বিধানাবলী বিশ্বের সমস্ত মানুষের জন্য দেওয়া। তাই সকলেরই কর্তব্য সেসব বিধান মেনে চলা। আর কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মানুষ যাতে তা মেনে চলতে পারে, সে লক্ষ্যে এর হেফাজতের ব্যবস্থা গ্রহণও সকলের জন্য জরুরি। একদল তো সক্রিয়ভাবেই তাতে লিপ্ত থাকবে এবং কুরআন-হাদীছের হেফাজত সংক্রান্ত যাবতীয় কাজে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করবে, আর অন্যরা সেই জীবনোৎসর্গকারীদের সর্বাত্মক সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে এ হুকুম মেনে চলার তাওফীক দান করুন।
* সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ১০১৭: সুনানে নাসাঈ, হাদীছ নং ২৫৫৪; সুনানে ইবন মাজাহ, হাদীছ নং ২০৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ১৯১৫৬
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের যাবতীয় আদেশ-নিষেধ পালনে যত্নবান থাকা ও বাড়তি প্রশ্ন হতে বিরত থাকার গুরুত্ব
হাদীছ নং: ১৫৬

আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আমি যতক্ষণ তোমাদের ছেড়ে দিই (অর্থাৎ কোনও বিষয়ে বিস্তারিত কিছু না বলি), ততক্ষণ তোমরাও আমাকে ছেড়ে দিও (অর্থাৎ সে বিষয়ে কোনও প্রশ্ন করো না)। তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে তো ধ্বংস করেছে তাদের অত্যধিক প্রশ্ন এবং তাদের নবীদের সঙ্গে বিরোধতায় লিপ্ত হওয়া। সুতরাং আমি যখন তোমাদেরকে কোনও বিষয়ে নিষেধ করি, তখন তোমরা তা থেকে বিরত থাকবে। আর যখন তোমাদেরকে কোনও বিষয়ে আদেশ করি, তখন যথাসাধ্য তা পালন করবে -বুখারী ও মুসলিম।
(সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৭২৮৮; সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ১৩৩৭; সুনানে নাসাঈ, হাদীছ নং ২৬১৯: জামে তিরমিযী, হাদীছ নং ২৮৭৪; সুনানে ইবন মাজাহ, হাদীছ নং ২)
مقدمة الامام النووي
16 - باب في الأمر بالمحافظة عَلَى السنة وآدابها
قَالَ الله تَعَالَى: {وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا} [الحشر: 7]، وَقالَ تَعَالَى: {وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلا وَحْيٌ يُوحَى} [النجم:3 - 4]، وَقالَ تَعَالَى: {قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ} [آل عمران: 31]، وَقالَ تَعَالَى: {لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللهَ وَالْيَوْمَ الآخِر} [الأحزاب:21]، وَقالَ تَعَالَى: {فَلا وَرَبِّكَ لا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا} [النساء: 65]، وَقالَ تَعَالَى: {فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُولِ} [النساء: 59] قَالَ العلماء: معناه إِلَى الكتاب والسُنّة، وَقالَ تَعَالَى: {مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ الله} [النساء:80]، وَقالَ تَعَالَى: {وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ صِراطِ اللهِ} [الشورى: 52 - 53]، وَقالَ تَعَالَى: {فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ} [النور: 63]، وَقالَ تَعَالَى: {وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيَاتِ اللهِ وَالْحِكْمَةِ} [الأحزاب: 34]، والآيات في الباب كثيرة.
156 - فالأول: عن أبي هريرةَ - رضي الله عنه - عن النَّبيّ - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «دَعُونِي مَا تَرَكْتُكُمْ، إِنَّمَا أهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَثْرَةُ سُؤَالِهِمْ واخْتِلافُهُمْ عَلَى أَنْبيَائِهِمْ، فَإِذَا نَهَيْتُكُمْ عَنْ شَيْء فَاجْتَنِبُوهُ، وَإِذَا أمَرْتُكُمْ بِأمْرٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ». مُتَّفَقٌ عَلَيهِ. (1)
হাদীস নং: ১৫৭
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ সুন্নত ও তার আদবসমূহ রক্ষায় যত্নবান থাকার আদেশ।
সুন্নতের অনুসরণ ও বিদ‘আত প্রত্যাখ্যান করার অপরিহার্যতা
হাদীছ নং : ১৫৭

হযরত 'ইরবায ইবন সারিয়া রাযি. বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে নসীহত করলেন এমন মর্মস্পর্শী উপদেশ যে, আমাদের হৃদয় তাতে ভীত-বিগলিত হল এবং চোখ অশ্রুসজল হল—। আমরা বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটা যেন বিদায় গ্রহণকারীর উপদেশ। সুতরাং আপনি আমাদেরকে অসিয়ত করুন। তিনি বললেন, আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি আল্লাহভীতির এবং (আমীরের) পূর্ণ আনুগত্যের, যদিও তোমাদের আমীর হয়ে যায় কোনও হাবশী গোলাম। তোমাদের কেউ জীবিত থাকলে অচিরেই সে অনেক মতভেদ দেখতে পাবে। তখন তোমাদের কর্তব্য হবে আমার সুন্নত ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নত আঁকড়ে ধরা। তোমরা তা মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরবে (অর্থাৎ শক্তভাবে আঁকড়ে ধরবে)। এবং তোমরা নব উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ (অর্থাৎ বিদ'আত) থেকে বেঁচে থাকবে। কেননা প্রতিটি বিদ'আতই গোমরাহী -আবু দাউদ ও তিরমিযী।

ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, এটি একটি হাসান সহীহ স্তরের হাদীছ।
(সুনানে আবূ দাউদ, হাদীছ নং ৪৬০৭; জামে তিরমিযী, হাদীছ নং ২৮৭০; সুনানে ইবন মাজাহ, হাদীছ নং ৪২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ১৭১৪২)
مقدمة الامام النووي
16 - باب في الأمر بالمحافظة على السنة وآدابها
157 - الثاني: عن أَبي نَجيحٍ العِرباضِ بنِ سَارية - رضي الله عنه - قَالَ: وَعَظَنَا رسولُ اللهِ - صلى الله عليه وسلم - مَوعظةً بَليغَةً وَجِلَتْ مِنْهَا القُلُوبُ، وَذَرَفَتْ مِنْهَا العُيُونُ، فَقُلْنَا: يَا رسولَ اللهِ، كَأَنَّهَا مَوْعِظَةُ مُوَدِّعٍ فَأوْصِنَا، قَالَ: «أُوصِيكُمْ بِتَقْوَى اللهِ، وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ، وَإنْ تَأَمَّر عَلَيْكُمْ عَبْدٌ حَبَشِيٌّ، وَإِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ فَسَيَرَى اختِلافًا كَثيرًا، فَعَليْكُمْ بسُنَّتِي وسُنَّةِ الخُلَفاءِ الرَّاشِدِينَ المَهْدِيِيِّنَ، عَضُّوا عَلَيْهَا بالنَّواجِذِ، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ؛ فإنَّ كلَّ بِدعَةٍ ضَلاَلَة». رواه أَبُو داود والترمذي، وَقالَ: «حديث حسن صحيح» (1). [ص:73]
«النَّواجذُ» بالذال المعجمةِ: الأنيَابُ، وَقِيلَ: الأضْراسُ.
হাদীস নং: ১৫৮
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ সুন্নত ও তার আদবসমূহ রক্ষায় যত্নবান থাকার আদেশ।
জান্নাতকামীর কর্তব্য
হাদীছ নং : ১৫৮

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার উম্মতের প্রত্যেকেই জান্নাতে প্রবেশ করবে। তবে যে ব্যক্তি প্রবেশ করতে চায় না তার কথা আলাদা। জিজ্ঞেস করা হল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কে তা চায় না? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি আমার অবাধ্যতা করে, সে-ই (জান্নাতে প্রবেশ করতে) চায় না -বুখারী।” (সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৭২৮০; মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ৮৭২৮; তাবারানী, আল- আওসাত, হাদীছ নং ৮১২; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীছ নং ১৭)
مقدمة الامام النووي
16 - باب في الأمر بالمحافظة على السنة وآدابها
158 - الثَّالثُ: عَنْ أَبي هريرةَ - رضي الله عنه: أنَّ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «كُلُّ أُمَّتِي يَدخُلُونَ الجَنَّةَ إلاَّ مَنْ أبَى (1)». قيلَ: وَمَنْ يَأبَى يَا رَسُول الله؟ قَالَ: «مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الجَنَّةَ، وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أبَى». رواه البخاري. (2)
হাদীস নং: ১৫৯
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ সুন্নত ও তার আদবসমূহ রক্ষায় যত্নবান থাকার আদেশ।
ডান হাতে পানাহার করা সুন্নত; এর বিরুদ্ধাচরণ করার পরিণতি
হাদীছ নং: ১৫৯

হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া' রাযি. থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকটে বসে বাম হাত দিয়ে খাচ্ছিল। তিনি তাকে বললেন, তোমার ডান হাত দিয়ে খাও। সে বলল, আমি পারি না। তিনি বললেন, তুমি যেন না-ই পার।
মূলত তার অহংকারই তাকে তা করতে বাধা দিচ্ছিল। তারপর আর সে তার সেই হাত মুখের কাছে উঠাতে পারেনি.- মুসলিম।(সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ২০২১ মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ১৬৪৯৩: তাবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর, হাদীছ নং ৬২৩৬: বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা, হাদীছ নং ৪৬১১)
مقدمة الامام النووي
16 - باب في الأمر بالمحافظة على السنة وآدابها
159 - الرابع: عن أَبي مسلم، وقيل: أَبي إياس سَلمة بنِ عمرو بنِ الأكوع - رضي الله عنه: أنَّ رَجُلًا أَكَلَ عِنْدَ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم - بِشِمَالِهِ، فَقَالَ: «كُلْ بِيَمِينكَ» قَالَ: لا أسْتَطيعُ. قَالَ: «لاَ استَطَعْتَ» مَا مَنَعَهُ إلاَّ الكِبْرُ فمَا رَفَعَهَا إِلَى فِيهِ. رواه مسلم. (1)
হাদীস নং: ১৬০
ভূমিকা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ সুন্নত ও তার আদবসমূহ রক্ষায় যত্নবান থাকার আদেশ।
নামাযে কাতার সোজা করার গুরুত্ব
হাদীছ নং: ১৬০

হযরত আবু আব্দুল্লাহ নু'মান ইবন বাশীর রাযি. বলেন, আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, হয় তোমরা তোমাদের কাতার সোজা করবে, অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের চেহারাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ সৃষ্টি করে দেবেন। বুখারী ও মুসলিম।
মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের কাতারসমূহ এমনভাবে সোজা করতেন, যেন তিনি এর দ্বারা তিরের কাঠি সোজা করছেন, (তিনি এভাবে সোজা করতে থাকেন) যাবৎ না তিনি দেখলেন বিষয়টি আমরা তাঁর কাছ থেকে ভালোভাবে বুঝে নিয়েছি (তখন তিনি ক্ষান্ত হলেন)। তারপর একদিন তিনি বের হয়ে আসলেন। এসে নামাযে দাঁড়ালেন, এমনকি তিনি তাকবীর বলতে উদ্যত হলেন। সহসাই এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন, যার বুক কাতারের বাইরে বের হয়ে আছে। তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহর বান্দাগণ! হয় তোমরা কাতার সোজা করবে, নয়তো আল্লাহ তোমাদের চেহারাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ সৃষ্টি করে দেবেন।
(সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৭১৭; সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ৪৩৬; সুনানে আবূ দাউদ, হাদীছ নং ৬৬৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদীছ নং ১৮৩৮৯; জামে তিরমিযী, হাদীছ নং ২২৭: সুনানে নাসাঈ, হাদীছ নং ৮৮৬; সুনানে ইবন মাজাহ, হাদীছ নং ৯৯৪)
مقدمة الامام النووي
16 - باب في الأمر بالمحافظة على السنة وآدابها
160 - الخامس: عن أَبي عبدِ الله النعمان بن بشير رَضيَ الله عنهما، قَالَ: سمعت رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم - يقول: «لَتُسَوُّنَّ صُفُوفَكُمْ، أَوْ لَيُخَالِفَنَّ اللهُ بَيْنَ وُجُوهِكُمْ». مُتَّفَقٌ عَلَيهِ. (1)
وفي رواية لمسلم: كَانَ رَسُول الله - صلى الله عليه وسلم - يُسَوِّي صُفُوفَنَا حَتَّى كَأنَّما يُسَوِّي بِهَا القِدَاحَ (2) حَتَّى إِذَا رَأَى أَنَّا قَدْ عَقَلْنَا عَنْهُ. ثُمَّ خَرَجَ يَومًا فقامَ حَتَّى كَادَ أَنْ يُكَبِّرَ فرأَى رَجلًا بَاديًا صَدْرُهُ، فَقَالَ: «عِبَادَ الله، لَتُسَوُّنَّ صُفُوفَكُمْ أَوْ لَيُخَالِفَنَّ اللهُ بَيْنَ وُجُوهِكُمْ».