আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২৬. অধ্যায়ঃ জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা

হাদীস নং: ৫৫৮১
অধ্যায়ঃ জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা
পরিচ্ছেদ: জাহান্নামের তাপের প্রচণ্ডতা ইত্যাদির বর্ণনা
৫৫৮১. হযরত আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে নবী (ﷺ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা যখন জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করলেন, তখন তিনি জিব্রীলকে জান্নাতের কাছে প্রেরণ করলেন এবং বললেন, তুমি জান্নাতের প্রতি ও জান্নাতী ব্যক্তির জন্য আমি যা প্রস্তুত রেখেছি তার প্রতি একটু তাকিয়ে দেখ। নবী (ﷺ) বলেন, তারপর তিনি আসেন এবং জান্নাতের প্রতি ও জান্নাতবাসীর জন্য আল্লাহ্ তা'আলা সেখানে যা প্রস্তুত রেখেছেন, তার প্রতি তাকিয়ে দেখেন। তিনি বলেন, তারপর জিব্রীল আল্লাহ তা'আলার কাছে ফিরে গিয়ে বলেন, আপনার সম্ভ্রমের কসম, যেই এর কথা শুনবে সেই তো এতে প্রবেশ করবে। এরপর আল্লাহর হুকুমে কষ্টকর বিষয়াদি দ্বারা তা ঢেকে দেওয়া হল।
তারপর আল্লাহ্ তা'আলা বললেন, তুমি পুনরায় তার (জান্নাতের) কাছে যাও এবং আমি তাতে জান্নাতবাসীর জন্য যা প্রস্তুত রেখেছি, তার প্রতি তাকিয়ে দেখ।
তিনি বলেন, সেমতি জিবরীল (আঃ) পুনরায় জান্নাতের কাছে যেয়ে দেখেন যে, কষ্টকর বিষয়াদি দ্বারা তাতে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। তখন জিবরীল (আঃ) আল্লাহ্ তা'আলার কাছে ফিরে গিয়ে বলেন, আপনার সম্ভ্রমের কসম, আমি অবশ্যই ভয় করছি যে, কেউ তাতে প্রবেশ করবে না।
এরপর বলেন, তুমি জাহান্নামের কাছে যাও এবং তার প্রতি ও তার মধ্যে আমি জাহান্নামবাসীর জন্য যা রেখেছি, তার প্রতি একটু তাকিয়ে দেখ। তিনি বলেন, অতঃপর জিবরীল (ছাঃ) তার দিকে তাকিয়ে দেখে যে, জাহান্নামের একাংশ অপরাংশের উপর আছড়ে পড়ছে। তখন জিব্‌রীল (আঃ) আল্লাহ্ তা'আলার কাছে ফিরে গিয়ে বলেন, আপনার সম্ভ্রমের কসম, যে কেউ জাহান্নামের কথা শুনবে, কেউ তাতে প্রবেশ করবে না। এরপর জাহান্নামের ব্যাপারে হুকুম করা হলে তাকে প্রবৃত্তির বা ইন্দ্রিয় ভোগের দ্বারা ঢেকে দেওয়া হল। তারপর আল্লাহ্ তা'আলা বললেন, তুমি পুনরায় জাহান্নামের কাছে যাও। সেমতে তিনি জাহান্নামের কাছে যান (এবং সেখান থেকে ফিরে এসে) বলেন, আপনার সম্ভ্রমের কসম, আমি অবশ্যই ভয় করছি যে, এতে প্রবেশ না করে কেউই রেহাই পাবে না।
(আবু দাউদ, নাসাঈ ও তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। হাদীসটির উল্লিখিত ভাষা তিরমিযী বর্ণিত। তিনি বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।)
كتاب صفة الجنة والنار
فصل فِي شدَّة حرهَا وَغير ذَلِك
5581- وَعَن أبي هُرَيْرَة رَضِي الله عَنهُ عَن النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم قَالَ لما خلق الله الْجنَّة وَالنَّار أرسل جِبْرِيل إِلَى الْجنَّة فَقَالَ انْظُر إِلَيْهَا وَإِلَى مَا أَعدَدْت لأَهْلهَا فِيهَا
قَالَ فجَاء فَنظر إِلَيْهَا وَإِلَى مَا أعد الله لأَهْلهَا فِيهَا
قَالَ فَرجع إِلَيْهِ قَالَ وَعزَّتك لَا يسمع بهَا أحد إِلَّا دَخلهَا فَأمر بهَا فحفت بالمكاره فَقَالَ ارْجع إِلَيْهَا فَانْظُر إِلَى مَا أَعدَدْت لأَهْلهَا فِيهَا قَالَ فَرجع إِلَيْهَا فَإِذا هِيَ قد حفت بالمكاره فَرجع إِلَيْهِ فَقَالَ وَعزَّتك لقد خفت أَن لَا يدخلهَا أحد وَقَالَ اذْهَبْ إِلَى النَّار فَانْظُر إِلَيْهَا وَإِلَى مَا أَعدَدْت لأَهْلهَا فِيهَا قَالَ فَنظر إِلَيْهَا فَإِذا هِيَ يركب بَعْضهَا بَعْضًا فَرجع إِلَيْهِ فَقَالَ وَعزَّتك لَا يسمع بهَا أحد فيدخلها فَأمر بهَا فحفت بالشهوات فَقَالَ ارْجع إِلَيْهَا فَرجع إِلَيْهَا فَقَالَ وَعزَّتك لقد خشيت أَن لَا ينجو مِنْهَا أحد إِلَّا دَخلهَا

رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالنَّسَائِيّ وَالتِّرْمِذِيّ وَاللَّفْظ لَهُ وَقَالَ حَدِيث حسن صَحِيح

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আলোচ্য হাদীসের সবক হল: নফসের খাহেস বাহ্যতঃ খুব আকর্ষণীয় এবং খুব পছন্দনীয়। কিন্তু তার পরিণতি জাহান্নামের আযাব যার এক ঝলক সারা জীবনের আরাম আয়েশের স্মৃতি হরণ করে নেয়। অপর পক্ষে আল্লাহর হুকুম আহকামের আনুগত্য আমাদের নফসের নিকট খুবই কঠিন ও দূরূহ মনে হয়। কিন্তু তার পরিণতি এমন এক জান্নাত যেখানে জান্নাতী ব্যক্তি চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করবে এবং জান্নাতের আরাম আয়েশের সামগ্রীর কোন কল্পনাও দুনিয়ার কোন মানুষ করতে সক্ষম নয়।

বিঃ দ্রঃ জান্নাত আল্লাহর মহান নি'আমত সমূহের অন্যতম তার নির্মাণ কৌশল এত সুনিপুণ, তার সাজ সরঞ্জাম এত বেশী মুল্যবান অফুরন্ত এবং প্রচুর যে, দুনিয়ার সকল রাজা বাদশাহ এবং তাদের প্রজাবর্গ সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করেও জান্নাতের সদৃশ একটা ছোট মহল তৈরী করতে সক্ষম হবে না। জান্নাতের সেবিকাদের জন্য যেসব আচ্ছাদন ও সুগন্ধির ব্যবস্থা করা হয়েছে তার সহস্রাংশের মূল্য আদায় করতে দুনিয়ার রাজা বাদশাহগণ ব্যর্থ হবেন। তাই যে কেউ তার বিবরণ শুনবে সে তাতে যেতে চাইবে। জিবরাঈল (আ) প্রথমবার জান্নাত দেখার পর এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

অবশ্য আল্লাহ তা'আলা জান্নাতকে অফুরন্ত প্রাচুর্য ও অবর্ণনীয় সৌন্দর্য দান করেছেন। কিন্তু যে কেউ তাতে প্রবেশ করতে পারবে না। জান্নাতের মধ্যে দাখিল হওয়ার জন্য আল্লাহ শর্ত নির্ধারণ করেছেন। যারা আল্লাহকে দুনিয়া আসমানের বাদশাহ হিসাবে মানবে তার দেয়া আইনকে বিনা সঙ্কোচে জীবনের সকল ক্ষেত্রে আইন হিসাবে গ্রহণ করবে তার স্মৃতিগান করবে, তার শ্রেষ্ঠত্বের জয়গান করবে, তার বিরুদ্ধবাদীদের বিরুদ্ধে সকল শক্তি প্রয়োগ করবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। কিন্তু মানুষের প্রকৃতি ও প্রবৃত্তি অনেক ক্ষেত্রে জান্নাতের পথ থেকে দূরে রাখতে চায়। বুদ্ধি বিবেচনা যাকে সঠিক ও সুন্দর করেছে প্রবৃত্তি তাকে মেনে নিতে চায় না। আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্যের রাস্তা থেকে বিচ্যুত করে প্রবৃত্তি মানুষকে জান্নাতের নি'আমত থেকে বঞ্চিত করে। তাই দ্বিতীয়বার জান্নাত দর্শনের পর জিবরাঈল (আ)-এর মনে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছিল যে, দুর্বল মানুষ জান্নাত লাভের কঠিন পরিশ্রম করতে সক্ষম হবে না।

জাহান্নাম আল্লাহর আযাব ও ক্রোধের স্থান। তার চেয়ে কোন নিষ্ঠুর ও বিভৎস জিনিস তিনি তৈরী করেন নি। তাতে অপরাধীদের আযাব দানের জন্য এমন সব ব্যবস্থা করা হয়েছে যার বর্ণনা দেয়া অসম্ভব। তাতে অপরাধীদেরকে আযাব দেয়ার জন্য হামীম, গাসসাক, গিসলিন, (দুর্গন্ধ পুঁজ), যাক্কুম, কাঁটাযুক্ত ঘাস, প্রচন্ড আগুন, বিষধর জন্তু জানোয়ার তৈরী করে রাখা হয়েছে। তার অধিবাসীগণ না বাঁচার মত বাঁচতে পারবে, না মরতে পারবে। এ ভয়াবহ অবস্থা দেখার পর জিবরাঈল (আ) প্রথমবার মনে করেন, এর বিবরণ যে শুনবে সে কখনো এতে প্রবেশ করতে চাবে না। কিন্তু প্রবৃত্তির পূজাকারীদের জন্য জাহান্নামে রাস্তা খুবই সহজ। তাতে প্রবেশের জন্য পরিশ্রম ও মেহনতের প্রয়োজন নেই।

সাধারণভাবে দুনিয়ার মানুষ ভোগ লালসার অনুসরণ করে। নফসের আনুগত্যের মাধ্যমে দুনিয়ার জীবনের আরাম ভোগ করতে চায়। কোন হারাম জিনিস দর্শন করে সে তার চোখকে শীতল করতে চায়। কোন হারাম জিনিসকে খেয়ে তার বাসনাকে তৃপ্ত করতে চায়, কোন বিপদজনক জিনিসকে স্পর্শ করে তার জীবনকে ধন্য করতে চায়, হালাল-হারাম বৈধ-অবৈধ পরখ করে দেখার মধ্যে কষ্ট রয়েছে। অবৈধ ও হারাম জিনিস ত্যাগের মধ্যে নফসের বিরাট ত্যাগ রয়েছে। তাই নফস ত্যাগের পথ অবলম্বন করতে চায় না। বরং উপভোগের সহজ পথ এখতিয়ার করতে চায়। প্রবৃত্তির হুকুম যখন আল্লাহর হকুমের বিপরীত হয় এবং মানুষ আল্লাহর হুকুমের পরিবর্তে প্রযুক্তির অনুসরণ করে যখন প্রবৃত্তিকেই আল্লাহর আসন দান করে আল্লাহর ক্রোধের অধিকারী হয়। জাহান্নামের চারপাশে প্রলোভন ও আকর্ষণের জাল বিস্তার করে রাখা হয়েছে এবং পতঙ্গ যেভাবে আগুনে ঝাঁপ দেয় ঠিক সেভাবে প্রবৃত্তির পূজারীগণ তাতে ঝাঁপ দেবে। তাই জিবরাঈল (আ) দ্বিতীয়বার জাহান্নাম দেখার পর আশঙ্কা করছেন যে, জাহান্নামে আকর্ষণ থেকে কোন মানুষ রেহাই পাবে না।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান