আল মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ
১৫- ক্রয় - বিক্রয়ের অধ্যায়
হাদীস নং: ৮৩৩
- ক্রয় - বিক্রয়ের অধ্যায়
খেজুর বাগান এবং ভূমিতে ভাগচাষ ও কৃষিকাজ।
৮৩৩। সুলায়মান ইবনে ইয়াসার (রাহঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাযিঃ)-কে (খায়বার এলাকায়) পাঠাতেন। তিনি নিজের এবং ইহুদীদের মাঝে অনুমানে ফলের পরিমাণ নির্ধারণ করে দিতেন। একদা তারা নিজেদের মহিলাদের অলংকারপত্র একত্র করে (আব্দুল্লাহ্কে) বললো, এটা আপনার জন্য, আমাদের উপর নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কমিয়ে দিন এবং বণ্টনে বিলম্ব করুন। তিনি বলেন, হে ইহূদী সম্প্রদায়, আল্লাহর শপথ! আমাদের দৃষ্টিতে তোমরা আল্লাহর সবচেয়ে অভিশপ্ত সৃষ্টি। এরপরও তোমাদের পেশকৃত এই ঘুষ আমাকে তোমাদের উপর জুলুম করতে উত্তেজিত করে না। কেননা এটা হারাম এবং আমরা তা খাই না। ইহুদীরা বললো, আসমান ও জমীন এইজন্যই কায়েম রয়েছে।
ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, আমরা এই হাদীসের উপর আমল করি। খেজুর বাগান এবং কৃষিযোগ্য খালি জমি উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক, তিনের একাংশ, চারের একাংশ চুক্তিতে ভাগচাষে দেয়ায় কোন দোষ নেই। অবশ্য ইমাম আবু হানীফা (রাহঃ) এটাকে মাকরূহ মনে করতেন এবং বলতেন যে, এটা সেই মুখাবারা (বর্গাচাষ), যা রাসূলুল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন।**
ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, আমরা এই হাদীসের উপর আমল করি। খেজুর বাগান এবং কৃষিযোগ্য খালি জমি উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক, তিনের একাংশ, চারের একাংশ চুক্তিতে ভাগচাষে দেয়ায় কোন দোষ নেই। অবশ্য ইমাম আবু হানীফা (রাহঃ) এটাকে মাকরূহ মনে করতেন এবং বলতেন যে, এটা সেই মুখাবারা (বর্গাচাষ), যা রাসূলুল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন।**
كتاب البيوع في التجارات والسلم
أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، أَخْبَرَنَا ابْنُ شِهَابٍ، عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ يَسَارٍ، «أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَبْعَثُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ رَوَاحَةَ فَيَخْرُصُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْيَهُودِ» ، قَالَ: فَجَمَعُوا حُلِيًّا مِنْ حُلِيِّ نِسَائِهِمْ، فَقَالُوا: هَذَا لَكَ، وَخَفِّفْ عَنَّا، وَتَجَاوَزْ فِي الْقِسْمَةِ، فَقَالَ: يَا مَعْشَرَ الْيَهُودِ، وَاللَّهِ إِنَّكُمْ لَمِنْ أَبْغَضِ خَلْقِ اللَّهِ إِلَيَّ، وَمَا ذَاكَ بِحَامِلِي أَنْ أَحِيفَ عَلَيْكُمْ، أَمَّا الَّذِي عَرَضْتُمْ مِنَ الرَّشْوَةِ، فَإِنَّهَا سُحْتٌ وَإِنَّا لا نَأْكُلُهَا، قَالُوا: بِهَذَا قَامَتِ السَّمَوَاتُ وَالأَرْضُ.
قَالَ مُحَمَّدٌ: وَبِهَذَا نَأْخُذُ، لا بَأْسَ بِمُعَامَلَةِ النَّخْلِ عَلَى الشَّطْرِ وَالثُّلُثِ وَالرُّبْعِ، وَبِمُزَارَعَةِ الأَرْضِ الْبَيْضَاءِ عَلَى الشَّطْرِ وَالثُّلُثِ وَالرُّبْعِ، وَكَانَ أَبُو حَنِيفَةَ يَكْرَهُ ذَلِكَ، وَيَذْكُرُ أَنَّ ذَلِكَ هُوَ الْمُخَابَرَةُ الَّتِي نَهَى عَنْهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
قَالَ مُحَمَّدٌ: وَبِهَذَا نَأْخُذُ، لا بَأْسَ بِمُعَامَلَةِ النَّخْلِ عَلَى الشَّطْرِ وَالثُّلُثِ وَالرُّبْعِ، وَبِمُزَارَعَةِ الأَرْضِ الْبَيْضَاءِ عَلَى الشَّطْرِ وَالثُّلُثِ وَالرُّبْعِ، وَكَانَ أَبُو حَنِيفَةَ يَكْرَهُ ذَلِكَ، وَيَذْكُرُ أَنَّ ذَلِكَ هُوَ الْمُخَابَرَةُ الَّتِي نَهَى عَنْهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):
** ভাগচাষ সম্পর্কিত অধ্যায় হাদীস শাস্ত্রের অন্যতম কঠিন অধ্যায়। কেননা এই অধ্যায়ে আমরা পাশাপাশি দুই ধরনের অভিমত দেখতে পাই। একদিকে আমরা দেখছি রাসূলুল্লাহ ﷺ কৃষিযোগ্য ভূমি বা ফলের বাগান ভাগচাষে দিতে নিষেধ করেছেন। অপরদিকে দেখা যাচ্ছে, তিনি ভাগচাষের অনুমতি দিচ্ছেন। আমরা কখনো এটা কল্পনা করতে পারি না যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ একই ব্যাপারে দুই বিপরীত নির্দেশ দিতে পারেন। অতএব বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখা দরকার । মূল বিষয়ের আলোচনার পূর্বে এর সাথে সম্পর্কিত কয়েকটি পরিভাষার উপর আলোকপাত করা দরকার।
'মুযারাআ' (المزارعة) ও মুখাবারা (المخابرة)ঃ শব্দ দু'টি সমার্থবোধক। এর অর্থ, উৎপাদিত শস্যের একটি নির্দিষ্ট অংশ প্রদানের চুক্তিতে অন্যকে নিজ জমি চাষাবাদ করতে দেয়া। স্থানীয় পরিভাষায় এটাকে বলা হয় ভাগচাষ বা বর্গাচাষ (কোন কোন এলাকায় বলা হয় আধি)। মুযারাআ ও মুখাবারার মধ্যে পার্থক্য এই যে, মুযারাআর ক্ষেত্রে জমীর মালিক বীজ সরবরাহ করে এবং মুখাবারার ক্ষেত্রে বর্গাচাষী বীজ সরবরাহ করে। মুসাকা (المساقة) শব্দটিও মুযারাআ শব্দের সমার্থবোধক। শুধু পার্থক্য এই যে, কৃষি জমি বর্গা দেয়াকে মুযারাআ বলে আর ফলের বাগান বর্গা দেয়াকে মুসাকা বলে। বাগানের ক্ষেত্রে চাষাবাদের প্রয়োজন হয় না, শুধু পানি সরবরাহ করতে হয়। শব্দটির আভিধানিক অর্থ পানি সরবরাহ করা। আর মুযারাআ শব্দটির অর্থ ফসল উৎপন্ন করা।
মুহাকালা (المحاقلة)ঃ এই শব্দটি হাদীস শরীফে পৃথক পৃথক তিনটি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। 'ক্ষেতের ফসল পাকার পূর্বেই বিক্রি করা', 'জমি বর্গা দেয়া' এবং 'জমি ইজারা (lease) দেয়া'।
কিরাউল আরদ (كراء الارض)ঃ শব্দটি 'নগদ মূল্যে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কৃষিজমি বিক্রি করা’ এবং ‘জীমর উৎপাদিত ফসলের অংশ দেয়ার শর্তে অন্যকে তা চাষাবাদ করতে দেয়া', এই দু'টি অর্থেই ব্যবহৃত হয়।
যেসব হাদীসে ভাগচাষ নিষিদ্ধ উল্লেখ আছে তার রাবীগণ হচ্ছেন রাফে ইবনে খাদীজ (রা), জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) ও ছাবিত ইবনুদ দাহ্হাক (রা)। হাফেজ ইবনুল কায়্যিম (র) তার ‘যাদুল মাআদ' গ্রন্থে এসব হাদীস নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করেছেন এবং ভাগচাষ বা বর্গাচাষ প্ৰথা নিষিদ্ধ হওয়ার পিছনে যেসব শোষণমূলক কারণ বিদ্যমান রয়েছে, তা নির্দেশ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদিত ফসলে চাষী ও মালিকের অংশ নির্দিষ্ট না করা, চাষীকে দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে জোরপূর্বক অতিরিক্ত কাজ করিয়ে নেয়া অথবা তাদের কাছ থেকে অগ্রিম কোন সুবিধা গ্রহণ করা (যেমন এতো পরিমাণ টাকা ধার দিলে আমি তোমাদেরকে আমার জমি চাষাবাদ করতে দিবো ইত্যাদি)। এসব কারণেই আল্লাহর রাসূল ﷺ ভাগচাষ নিষিদ্ধ করেছেন।
কিন্তু এই প্রথা যদি চূড়ান্তরূপেই নিষিদ্ধ হতো তবে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবদ্দশায় এবং চারজন মহান ও সৎপথপ্রাপ্ত খলীফার জীবদ্দশায় ভাগচাষের প্রচলন থাকতো না। এমনকি আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা)-র মতো আল্লাহভীরু সাহাবীও আমীর মুআবিয়ার রাজত্বের শেষভাগ পর্যন্ত এই প্রথাকে অভ্রান্ত মনে করতেন না। কিন্তু পরবর্তী কালে তিনি রাফে ইবনে খাদীজ (রা)-র কাছে এর অবৈধতা সম্পর্কে জানতে পারলেন এবং তা পরিত্যাগ করলেন। তবে তিনি এই প্রথাকে হারাম মনে করে পরিত্যাগ করেননি, বরং তাকওয়া ও পবিত্রতার অনুভূতিই তাকে এটা পরিত্যাগ করতে বাধ্য করেছে।
আল্লামা হাফেজ ইবনে হাযম (র)-ও তার 'আল-মুহাল্লা' গ্রন্থে (৮ম খণ্ডে) ভাগচাষ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর যেসব সাহাবী নিজেদের জমি অন্যদের ভাগচাষে দিতেন তিনি তাদের নামও উল্লেখ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন হযরত আবু বাকর (রা), উমার (রা), খাব্বাব (রা) ও হুযায়ফা (রা)। অতএব বর্গাপ্রথা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ হলে এই মহান সাহাবীগণ তা অবশ্যই পরিহার করতেন।
দ্বিতীয় লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ কোন ভঙ্গীতে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যের ধরন থেকে বুঝা যায়, তিনি চূড়ান্তভাবে বর্গাপ্রথা নিষিদ্ধ করেননি। বরং ভাগচাষের নির্দিষ্ট কতগুলো পন্থাকে তিনি অপছন্দ করেছেন এবং সাহাবীদের মনে অন্যদের জন্য নিঃস্বার্থ ত্যাগের ভাবধারা জাগ্রত করতে চেয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ “কোন ব্যক্তি যদি নিজের জমি তার মুসলিম ভাইকে কোন বিনিময় ছাড়া নিঃস্বার্থভাবে চাষাবাদ করতে দেয়, তবে তা খুবই উত্তম।”
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বর্গাপ্রথা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেননি। বরং তিনি বলেছেনঃ তোমাদের কারো জমি তার ভাইকে নিঃস্বার্থভাবে চাষাবাদ করতে দেয়া উৎপাদিত ফসলে অংশীদারিত্বের শর্তে চাষাবাদ করতে দেয়ার চেয়ে অধিক উত্তম" (মুসলিম)। এ ধরনের উদারতা, মহানুভবতা ও সহৃদয়তা সর্বাবস্থায় প্রশংসনীয়। মুহাজিরগণ যখন মদীনায় এসে উপস্থিত হন, তখন তাদের খুবই দুর্দিন যাচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ এই দুঃসময় উপরোক্ত উপদেশবাণী দান করেন। এটা কোন আইনের নির্দেশ ছিলো না, বরং মুসলিম ভাইদের সাথে সদয় ব্যবহার করার উপদেশ দেয়া হয়েছিল (আল-মাবসূত, খণ্ড ২৩, পৃ. ১৩; ইবনে মাজা, মুযারাআ অনুচ্ছেদ)।
অপরদিকে ভাগচাষ বৈধ হওয়ার সপক্ষেও হাদীস রয়েছে। তাতে দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ ভাগচাষের অনুমতি দিয়েছেন, যদি তা চাষীর জন্য উপকারী হয় এবং শোষণের উপাদান উপস্থিত না থাকে। মূলত ভাগচাষকে নিষিদ্ধ করা হয়নি, বরং এর মধ্যকার কতগুলো অন্যায় আচরণকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বর্গাপ্রথা যদি অসহায় চাষীদের শোষণ করার হাতিয়ারে পরিণত না হয়, তবে তা ক্ষতিকর নয়। যদি উৎপাদিত শস্যে উভয়ের অংশ নির্দিষ্ট করে নেয়া হয় এবং চাষীর কাছে কোন অতিরিক্ত ও অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দাবি না করা হয়, তবে শরীআতের দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রথা অবৈধ হওয়ার কোন কারণ থাকতে পারে না।
এখানে আরো একটি কথা মনে রাখা দরকার যে, মুযারাআ ( ভাগচাষ) মুদারাবারই (লাভ-লোকসানে ভাগী হওয়ার শর্তে একজনের পুঁজি দিয়ে অপরজনের ব্যবসা করা) অনুরূপ। ইমাম খাত্তাবী (র) তার আবু দাউদের শরাহ 'মাআলিমুস সুনান' গ্রন্থে (৩য় খণ্ড, পৃ. ৯৪) লিখেছেন, মুযারাআর ভিত্তি তো মুদারাবার মধ্যেই নিহিত। এখন মুদারাবা পদ্ধতি যদি জায়েয হয়, তবে মুযারাআ নাজায়েয হওয়ার কি কারণ থাকতে পারে? ইমাম আবু ইউসুফ (র) তার 'কিতাবুল খারাজ' গ্রন্থে এই একই কথা বলেছেন এবং মুযারাআ ও মুদারাবাকে একই স্তরে রেখেছেন (পৃ. ৯১)। অতএব মুযারাআ যদি সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ হতো, তবে মুদারাবাকে বৈধ বলার কারণ থাকতে পারে না। কিন্তু ফিকহবিদগণ এ ব্যাপারে একমত যে, ইসলামী শরীআতে মুদারাবা পদ্ধতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য করা জায়েয। সুতরাং মুযারাআকে অবৈধ বলার পক্ষে কোন যুক্তি থাকতে পারে না। মুযারাআ সম্পর্কে আল্লামা শাওকানীও ব্যাপক আলোচনা করেছেন (নাইলুল আওতার, ৫ম খণ্ড, পৃ. ২৭২-৮১ দ্রষ্টব্য)।
এখানে আরো উল্লেখ্য যে, ফিকহ-এর প্রখ্যাত চার ইমামের মধ্যে ইমাম মালেক, শাফিঈ, আহমাদ ইবনে হাম্বল ও ইমাম আবু হানীফার দুই প্রখ্যাত ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ শায়বানী (র)-এর মতে মুযারাআ সম্পূর্ণরূপে হারাম নয়। ইমাম আবু হানীফা (র) যদিও মুযারাআকে নিষিদ্ধ বলেছেন, কিন্তু কতগুলো শর্ত সাপেক্ষে তিনিও এই প্রথাকে জায়েয মনে করেন। তার মতে জমির মালিক যদি জমি ভাগচাষে দেয়ার সময় বীজ ও চাষাবাদের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে এবং লাভ-ক্ষতিতে অংশগ্রহণ করে তবে মুযারাআ প্রথায় কোন দোষ নেই (বিস্তারিত জানার জন্য আবদুর রহমান আল-জাযারীর কিতাবুল ফিকহ আলাল-মাযাহিবিল আরবাআ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩-২৫ দ্রষ্টব্য) (অনুবাদক)।
'মুযারাআ' (المزارعة) ও মুখাবারা (المخابرة)ঃ শব্দ দু'টি সমার্থবোধক। এর অর্থ, উৎপাদিত শস্যের একটি নির্দিষ্ট অংশ প্রদানের চুক্তিতে অন্যকে নিজ জমি চাষাবাদ করতে দেয়া। স্থানীয় পরিভাষায় এটাকে বলা হয় ভাগচাষ বা বর্গাচাষ (কোন কোন এলাকায় বলা হয় আধি)। মুযারাআ ও মুখাবারার মধ্যে পার্থক্য এই যে, মুযারাআর ক্ষেত্রে জমীর মালিক বীজ সরবরাহ করে এবং মুখাবারার ক্ষেত্রে বর্গাচাষী বীজ সরবরাহ করে। মুসাকা (المساقة) শব্দটিও মুযারাআ শব্দের সমার্থবোধক। শুধু পার্থক্য এই যে, কৃষি জমি বর্গা দেয়াকে মুযারাআ বলে আর ফলের বাগান বর্গা দেয়াকে মুসাকা বলে। বাগানের ক্ষেত্রে চাষাবাদের প্রয়োজন হয় না, শুধু পানি সরবরাহ করতে হয়। শব্দটির আভিধানিক অর্থ পানি সরবরাহ করা। আর মুযারাআ শব্দটির অর্থ ফসল উৎপন্ন করা।
মুহাকালা (المحاقلة)ঃ এই শব্দটি হাদীস শরীফে পৃথক পৃথক তিনটি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। 'ক্ষেতের ফসল পাকার পূর্বেই বিক্রি করা', 'জমি বর্গা দেয়া' এবং 'জমি ইজারা (lease) দেয়া'।
কিরাউল আরদ (كراء الارض)ঃ শব্দটি 'নগদ মূল্যে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কৃষিজমি বিক্রি করা’ এবং ‘জীমর উৎপাদিত ফসলের অংশ দেয়ার শর্তে অন্যকে তা চাষাবাদ করতে দেয়া', এই দু'টি অর্থেই ব্যবহৃত হয়।
যেসব হাদীসে ভাগচাষ নিষিদ্ধ উল্লেখ আছে তার রাবীগণ হচ্ছেন রাফে ইবনে খাদীজ (রা), জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) ও ছাবিত ইবনুদ দাহ্হাক (রা)। হাফেজ ইবনুল কায়্যিম (র) তার ‘যাদুল মাআদ' গ্রন্থে এসব হাদীস নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করেছেন এবং ভাগচাষ বা বর্গাচাষ প্ৰথা নিষিদ্ধ হওয়ার পিছনে যেসব শোষণমূলক কারণ বিদ্যমান রয়েছে, তা নির্দেশ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদিত ফসলে চাষী ও মালিকের অংশ নির্দিষ্ট না করা, চাষীকে দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে জোরপূর্বক অতিরিক্ত কাজ করিয়ে নেয়া অথবা তাদের কাছ থেকে অগ্রিম কোন সুবিধা গ্রহণ করা (যেমন এতো পরিমাণ টাকা ধার দিলে আমি তোমাদেরকে আমার জমি চাষাবাদ করতে দিবো ইত্যাদি)। এসব কারণেই আল্লাহর রাসূল ﷺ ভাগচাষ নিষিদ্ধ করেছেন।
কিন্তু এই প্রথা যদি চূড়ান্তরূপেই নিষিদ্ধ হতো তবে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবদ্দশায় এবং চারজন মহান ও সৎপথপ্রাপ্ত খলীফার জীবদ্দশায় ভাগচাষের প্রচলন থাকতো না। এমনকি আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা)-র মতো আল্লাহভীরু সাহাবীও আমীর মুআবিয়ার রাজত্বের শেষভাগ পর্যন্ত এই প্রথাকে অভ্রান্ত মনে করতেন না। কিন্তু পরবর্তী কালে তিনি রাফে ইবনে খাদীজ (রা)-র কাছে এর অবৈধতা সম্পর্কে জানতে পারলেন এবং তা পরিত্যাগ করলেন। তবে তিনি এই প্রথাকে হারাম মনে করে পরিত্যাগ করেননি, বরং তাকওয়া ও পবিত্রতার অনুভূতিই তাকে এটা পরিত্যাগ করতে বাধ্য করেছে।
আল্লামা হাফেজ ইবনে হাযম (র)-ও তার 'আল-মুহাল্লা' গ্রন্থে (৮ম খণ্ডে) ভাগচাষ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর যেসব সাহাবী নিজেদের জমি অন্যদের ভাগচাষে দিতেন তিনি তাদের নামও উল্লেখ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন হযরত আবু বাকর (রা), উমার (রা), খাব্বাব (রা) ও হুযায়ফা (রা)। অতএব বর্গাপ্রথা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ হলে এই মহান সাহাবীগণ তা অবশ্যই পরিহার করতেন।
দ্বিতীয় লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ কোন ভঙ্গীতে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যের ধরন থেকে বুঝা যায়, তিনি চূড়ান্তভাবে বর্গাপ্রথা নিষিদ্ধ করেননি। বরং ভাগচাষের নির্দিষ্ট কতগুলো পন্থাকে তিনি অপছন্দ করেছেন এবং সাহাবীদের মনে অন্যদের জন্য নিঃস্বার্থ ত্যাগের ভাবধারা জাগ্রত করতে চেয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ “কোন ব্যক্তি যদি নিজের জমি তার মুসলিম ভাইকে কোন বিনিময় ছাড়া নিঃস্বার্থভাবে চাষাবাদ করতে দেয়, তবে তা খুবই উত্তম।”
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বর্গাপ্রথা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেননি। বরং তিনি বলেছেনঃ তোমাদের কারো জমি তার ভাইকে নিঃস্বার্থভাবে চাষাবাদ করতে দেয়া উৎপাদিত ফসলে অংশীদারিত্বের শর্তে চাষাবাদ করতে দেয়ার চেয়ে অধিক উত্তম" (মুসলিম)। এ ধরনের উদারতা, মহানুভবতা ও সহৃদয়তা সর্বাবস্থায় প্রশংসনীয়। মুহাজিরগণ যখন মদীনায় এসে উপস্থিত হন, তখন তাদের খুবই দুর্দিন যাচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ এই দুঃসময় উপরোক্ত উপদেশবাণী দান করেন। এটা কোন আইনের নির্দেশ ছিলো না, বরং মুসলিম ভাইদের সাথে সদয় ব্যবহার করার উপদেশ দেয়া হয়েছিল (আল-মাবসূত, খণ্ড ২৩, পৃ. ১৩; ইবনে মাজা, মুযারাআ অনুচ্ছেদ)।
অপরদিকে ভাগচাষ বৈধ হওয়ার সপক্ষেও হাদীস রয়েছে। তাতে দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ ভাগচাষের অনুমতি দিয়েছেন, যদি তা চাষীর জন্য উপকারী হয় এবং শোষণের উপাদান উপস্থিত না থাকে। মূলত ভাগচাষকে নিষিদ্ধ করা হয়নি, বরং এর মধ্যকার কতগুলো অন্যায় আচরণকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বর্গাপ্রথা যদি অসহায় চাষীদের শোষণ করার হাতিয়ারে পরিণত না হয়, তবে তা ক্ষতিকর নয়। যদি উৎপাদিত শস্যে উভয়ের অংশ নির্দিষ্ট করে নেয়া হয় এবং চাষীর কাছে কোন অতিরিক্ত ও অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দাবি না করা হয়, তবে শরীআতের দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রথা অবৈধ হওয়ার কোন কারণ থাকতে পারে না।
এখানে আরো একটি কথা মনে রাখা দরকার যে, মুযারাআ ( ভাগচাষ) মুদারাবারই (লাভ-লোকসানে ভাগী হওয়ার শর্তে একজনের পুঁজি দিয়ে অপরজনের ব্যবসা করা) অনুরূপ। ইমাম খাত্তাবী (র) তার আবু দাউদের শরাহ 'মাআলিমুস সুনান' গ্রন্থে (৩য় খণ্ড, পৃ. ৯৪) লিখেছেন, মুযারাআর ভিত্তি তো মুদারাবার মধ্যেই নিহিত। এখন মুদারাবা পদ্ধতি যদি জায়েয হয়, তবে মুযারাআ নাজায়েয হওয়ার কি কারণ থাকতে পারে? ইমাম আবু ইউসুফ (র) তার 'কিতাবুল খারাজ' গ্রন্থে এই একই কথা বলেছেন এবং মুযারাআ ও মুদারাবাকে একই স্তরে রেখেছেন (পৃ. ৯১)। অতএব মুযারাআ যদি সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ হতো, তবে মুদারাবাকে বৈধ বলার কারণ থাকতে পারে না। কিন্তু ফিকহবিদগণ এ ব্যাপারে একমত যে, ইসলামী শরীআতে মুদারাবা পদ্ধতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য করা জায়েয। সুতরাং মুযারাআকে অবৈধ বলার পক্ষে কোন যুক্তি থাকতে পারে না। মুযারাআ সম্পর্কে আল্লামা শাওকানীও ব্যাপক আলোচনা করেছেন (নাইলুল আওতার, ৫ম খণ্ড, পৃ. ২৭২-৮১ দ্রষ্টব্য)।
এখানে আরো উল্লেখ্য যে, ফিকহ-এর প্রখ্যাত চার ইমামের মধ্যে ইমাম মালেক, শাফিঈ, আহমাদ ইবনে হাম্বল ও ইমাম আবু হানীফার দুই প্রখ্যাত ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ শায়বানী (র)-এর মতে মুযারাআ সম্পূর্ণরূপে হারাম নয়। ইমাম আবু হানীফা (র) যদিও মুযারাআকে নিষিদ্ধ বলেছেন, কিন্তু কতগুলো শর্ত সাপেক্ষে তিনিও এই প্রথাকে জায়েয মনে করেন। তার মতে জমির মালিক যদি জমি ভাগচাষে দেয়ার সময় বীজ ও চাষাবাদের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে এবং লাভ-ক্ষতিতে অংশগ্রহণ করে তবে মুযারাআ প্রথায় কোন দোষ নেই (বিস্তারিত জানার জন্য আবদুর রহমান আল-জাযারীর কিতাবুল ফিকহ আলাল-মাযাহিবিল আরবাআ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩-২৫ দ্রষ্টব্য) (অনুবাদক)।