শিল্পীর কাব্যিক উপমা: শরঈ বিশ্লেষণ
প্রশ্নঃ ১৩১৮৯৩. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, সম্মানিত মুফতি সাহেব, সময়ের আলোচিত একজন সংগীত শিল্পীর একটা সংগীত বর্তমানে প্রচুর ভাইরাল হয়েছে, যার কিছু লাইন নিচে দেওয়া হল–
হাদি সাহারার ঊষার বালুতে "আবে জমজম পানি"
হাদি "আজাদীর হাসান হোসেন" জান্নাতি ফুলদানি’’
হাদি ইতিহাস পাখি আবাবিল "মুসার হাতের লাঠি"
হাদি "ওমরের অর্ধ জাহান" মোড়ানো শীতলপাটি’’
হাদি গোলাপের মাতাল গন্ধ "খোলাফায়ে রাশেদার"
হাদি উত্তাল সাগরে জোয়ার আল্লাহু আকবার’’
আমার জানার বিষয় হল, সংগীতটির উপরে দেওয়া লাইনগুলোতে যে, জমজম পানি, হাসান হোসেন ও মুসার লাঠির সাথে তাশবীহ বা তুলনা করা হয়েছে, তা কতটুকু শরীয়ত সম্মত। তুলনা বা তাশবীহের ক্ষেত্রে শরয়ী কোন সীমারেখা আছে কিনা? থাকলে, সে সম্পর্কেও একটু জানতে চাই। শুকরিয়া, জাযাকুমুল্লাহ।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
১. ইসলামী সাহিত্যে, বিশেষ করে নাশিদ বা মানকাবাতে (কারো প্রশংসায় গাওয়া গীতি) রূপক অর্থ বা তাশবীহ ব্যবহার করা একটি প্রাচীন এবং স্বীকৃত রীতি। এখানে ব্যবহৃত উপমাগুলো হক-বাতিল হওয়ার মাপকাঠি হিসাবে ব্যবহার হয়েছে।
• এখানে, জমজম পানির সাথে তুলনা, মরুভূমির তৃষ্ণার্ত বালুতে জমজম যেমন জীবনদানকারী। জমজম যেমন তৃষ্ণার্তের প্রাণ বাঁচায়, কবি এখানে বোঝাতে চেয়েছেন ওই শহীদের কণ্ঠ বা আদর্শ মৃতপ্রায় সমাজকে প্রশান্তি দিয়েছে। এটি একটি সাহিত্যিক অলঙ্কার, যা জায়েজ।
• হাসান-হোসাইন ও জান্নাতি ফুলদানি, হাসান ও হোসাইন (রা.) জান্নাতের যুবকদের সর্দার এবং রাসূল (সা.)-এর অত্যন্ত প্রিয়। কাউকে তাঁদের সাথে তুলনা করার অর্থ হলো তাঁকে জান্নাতি গুণসম্পন্ন বা অত্যন্ত প্রিয় হিসেবে উপস্থাপন করা। আবার তিনি হাসান ও হোসাইন (রা.)-এর মতো অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন ছিলেন এবং তাঁদের মতোই শাহাদাতের তামান্না রাখতেন। সাহিত্যে এটি তাশবীহে বালীগ হিসেবেও দেখা হয়। এটি মহব্বত ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ।
• মুসার লাঠি ও আবাবিল, এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত মুজিজা বা সাহায্যের প্রতীক। কোনো আদর্শ বা ব্যক্তিকে বাতিল ধ্বংসকারী হিসেবে বোঝাতে এই উপমা ব্যবহার করা হয়েছে। মুসা (আ.)-এর লাঠি যেমন বাতিলকে চূর্ণ করেছিল, তেমনি তার নির্ভীক কণ্ঠ বাতেলের বিরুদ্ধে শক্তি হিসেবে কাজ করেছে, এটা কবির উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে তাকে নবী দাবি করা হয়নি, বরং তাঁর কাজের প্রভাবকে ওই শক্তির সাথে তুলনা করা হয়েছে।
• ওমরের অর্ধ-জাহান ও মোড়ানো শীতলপাটি, এটি দ্বারা হযরত ওমর (রা.)-এর অনাড়ম্বর জীবন ও বিশাল শাসনব্যবস্থাকে বোঝানো হয়েছে।
২. শরয়ী সীমারেখা হলো, উপমা যেন শিরক-এর পর্যায়ে না যায়, নবীদের মুজিজার অবমাননা না করে এবং কোনো মানুষকে পবিত্র সাহাবী বা নবীদের সমমর্যাদায় না বসায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
لاَ تُطْرُونِي، كَمَا أَطْرَتْ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ،
‘তোমরা আমাকে নিয়ে অতিরঞ্জন করো না যেমন খ্রিস্টানরা ঈসা (আ.)-কে নিয়ে করেছিল।’ (সহীহ বুখারী)।
হাদীসের লিংকঃ https://muslimbangla.com/hadith/3202
তবে কোনো নেককার বা শহীদকে সাহাবী বা নবীদের আদর্শের সাথে তুলনা করা গুলু বা নিষিদ্ধ অতিরঞ্জনের অন্তর্ভুক্ত নয়, যতক্ষণ না তাঁকে তাঁদের স্তরের বা তাঁদের চেয়ে বড় দাবি করা হয়।
৩. আর শিল্পীদের উচিত এমন শব্দ এড়িয়ে চলা যা সাধারণ মানুষের মাঝে আকীদাগত বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। উপমা দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল পবিত্র সত্তার গাম্ভীর্য ও পবিত্রতা বজায় রাখা অপরিহার্য।
শরঈ দলীল
عَنْ أَبِي مُوسَى رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَهُ: «يَا أَبَا مُوسَى لَقَدْ أُوتِيتَ مِزْمَارًا مِنْ مَزَامِيرِ آلِ دَاوُدَ»
আবু মুসা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল (ﷺ) তাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আবু মুসা! তোমাকে দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর সুমধুর কন্ঠ দান করা হয়েছে।(সহীহ বুখারী)
হাদিস নংঃ ৪৬৮৩ অন্তর্জাতিক হাদিস নংঃ ৫০৪৮
হাদিসের লিংকঃ https://muslimbangla.com/hadith/4683
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ يَزِيدَ، قَالَ: سَأَلْنَا حُذَيْفَةَ عَنْ رَجُلٍ قَرِيبِ السَّمْتِ وَالهَدْيِ مِنَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى نَأْخُذَ عَنْهُ، فَقَالَ: «مَا أَعْرِفُ أَحَدًا أَقْرَبَ سَمْتًا وَهَدْيًا وَدَلًّا بِالنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ ابْنِ أُمِّ عَبْدٍ»
আব্দুর রহমান ইবনে ইয়াযীদ (রাহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা হুযাইফা (রাযিঃ)- কে এমন এক ব্যক্তির সন্ধান দিতে অনুরোধ করলাম যার আকার আকৃতি, চাল-চলন, আচার-ব্যবহার এবং স্বভাব-চরিত্রে নবী কারীম (ﷺ)- এর সাথে সর্বাধিক সাদৃস্য আছে, আমরা তাঁর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করব। হুযাইফা (রাযিঃ) বললেন, আকার-আকৃতি, চাল-চলন, আচার-ব্যবহার এবং স্বভাব-চরিত্রে নবী কারীম (ﷺ)- এর সাথে সর্বাধিক সাদৃশ্য রাখেন এমন ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযিঃ) ব্যতীত অন্য কাউকে আমি জানি না। (সহীহ বুখারী)
হাদিস নংঃ ৩৪৯০ অন্তর্জাতিক হাদিস নংঃ ৩৭৬২
হাদিসের লিংকঃ https://muslimbangla.com/hadith/3490
تفسير القرطبي (12/271)
أَمَّا تَنَاشُدُ الْأَشْعَارِ فَاخْتُلِفَ فِي ذَلِكَ، فَمِنْ مَانِعٍ مُطْلَقًا، وَمِنْ مُجِيزٍ مُطْلَقًا، وَالْأَوْلَى التَّفْصِيلُ، وَهُوَ أَنْ يُنْظَرَ إِلَى الشِّعْرِ فَإِنْ كَانَ مِمَّا يَقْتَضِي الثَّنَاءَ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَوْ عَلَى رَسُولِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَوِ الذَّبَّ عَنْهُمَا كَمَا كَانَ شِعْرُ حَسَّانَ، أَوْ يَتَضَمَّنُ الْحَضَّ عَلَى الْخَيْرِ وَالْوَعْظَ وَالزُّهْدَ فِي الدُّنْيَا وَالتَّقَلُّلَ مِنْهَا، فَهُوَ حَسَنٌ فِي الْمَسَاجِدِ وَغَيْرِهَا، ......وَمَا لَمْ يَكُنْ كَذَلِكَ لَمْ يَجُزْ، لِأَنَّ الشِّعْرَ فِي الْغَالِبِ لَا يَخْلُو عَنِ الْفَوَاحِشِ وَالْكَذِبِ وَالتَّزَيُّنِ بِالْبَاطِلِ، وَلَوْ سَلِمَ مِنْ ذَلِكَ فَأَقَلُّ مَا فِيهِ اللَّغْوُ وَالْهَذَر.
تفسير القرطبي (13/147)
قَالَ ابْنُ الْعَرَبِيِّ: أَمَّا الِاسْتِعَارَاتُ فِي التَّشْبِيهَاتِ فَمَأْذُونٌ فِيهَا وَإِنِ اسْتَغْرَقَتِ الْحَدَّ وَتَجَاوَزَتِ الْمُعْتَادَ، فَبِذَلِكَ يَضْرِبُ الْمَلَكُ الْمُوَكَّلُ بِالرُّؤْيَا الْمَثَلَ.
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুহাদ্দিস, জামিয়া বাবুস সালাম, বিমানবন্দর ঢাকা
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন