যাকাত ফান্ড কায়েম করে যাকাতের মাল থেকে তার কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন দেওয়ার বিধান
প্রশ্নঃ ১৫০৬৮৮. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, জাকাত আদায়কারী ব্যক্তি, যাকাত বিতরণকারী, যাকাতের টাকা পরিচালনা করার জন্য অফিস ভাড়া, যাকাতের টাকা বিতরণের জন্য যাতায়াত খরচ এগুলো কি সব যাকাতের টাকা দিয়ে খরচ করা যাবে?
৮ মে, ২০২৬
ঢাকা ১২০৪
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
উপরিউক্ত কাজের জন্য যাকাতের টাকা ব্যয় করা যাবে না। কেননা বর্তমানে যারা যাকাতের টাকা গ্রহন করে মানুষের মাঝে বিতরণ করেন তারা যাকাত গ্রহিতাদের পক্ষ থেকে উকিল নয়; বড়জোরে তারা যাকাত দাতাতের উকিল। কাজেই যতক্ষণ পর্যন্ত সেই টাকা যাকাতগ্রহিতাদের হাতে না পৌঁছাবে ততক্ষণ পর্যন্ত যাকাত আদায় হবে না। কাজেই যাকাতের সহায়ক কাজে সেই টাকা ব্যয় করলে যাকাতদাতাদের যাকাত আদায় হবে না। কুরআনুল কারিমের যাকাত সংক্রান্ত প্রসিদ্ধ আয়াতের ব্যাখ্যায় অনেকেই ভুল বোঝতে পারেন।
নিচে আমরা আয়াতটির অনুবাদ এবং ব্যাখ্যা ও তাফসিরসহ উল্লেখ করেছি।
اِنَّمَا الصَّدَقٰتُ لِلۡفُقَرَآءِ وَالۡمَسٰکِیۡنِ وَالۡعٰمِلِیۡنَ عَلَیۡہَا وَالۡمُؤَلَّفَۃِ قُلُوۡبُہُمۡ وَفِی الرِّقَابِ وَالۡغٰرِمِیۡنَ وَفِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَابۡنِ السَّبِیۡلِ ؕ فَرِیۡضَۃً مِّنَ اللّٰہِ ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌ حَکِیۡمٌ
প্রকৃতপক্ষে সদকা ফকীর ও মিসকীনদের হক এবং সেই সকল কর্মচারীদের, যারা সদকা উসূলের কাজে নিয়োজিত এবং যাদের মনোরঞ্জন করা উদ্দেশ্য তাদের। তাছাড়া দাসমুক্তিতে, ঋণগ্রস্তের ঋণ পরিশোধে এবং আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের সাহায্যেও (তা ব্যয় করা হবে)। এটা আল্লাহর পক্ষ হতে প্রদত্ত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
(সুরা তাওবাহ, আয়াত-৬০)
তাফসিরে মারেফুল কুরআনে এই আয়াতের তাফসিরে ফকির মিসকিনদের আলোচনার ইতি টেনে মুফতি শফি রহ. বলেন,
‘‘এই খাতের পর আরো ছয়টি খাতের বর্ণনা রয়েছে যার প্রথমটি হলো ’আমেলীনে সদকা’ অর্থাৎ সদকা আদায়কারী। এরা ইসলামী সরকারের পক্ষ হতে লোকদের কাছ থেকে যাকাত ও ওশর প্রভৃতি আদায় করে বায়তুলমালে জমা দেয়ার কাজে নিয়োজিত থাকে। এরা যেহেতু এ কাজে নিজেদের সময় ব্যয় করে, সেহেতু তাদের জীবিকা নির্বাহের দায়িত্ব ইসলামী সরকারের উপর বর্তায়। কোরআন মজীদের উপরোক্ত আয়াত যাকাতের একাংশ তাদের জন্য রেখে এ কথা পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, তাদের পারিশ্রমিক যাকাতের খাত থেকেই আদায় করা হবে।
এর মূল রহস্য হলো এই যে, আল্লাহ্ পাক মুসলমানদের থেকে যাকাত ও অপরাপর সদকা আদায়ের দায়িত্ব দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে। অত্র সূরার শেষের দিকে এক আয়াতে বলা হয়েছেঃ خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً “হে রাসূল, আপনি তাদের মালামাল থেকে সকা আদায় করুন।” এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পরে আসবে। এখানে এতটুকু বলে রাখি যে, উক্ত আয়াত মতে আমীরুল মু’মিনীনের উপর যাকাত ও সদাকা আদায়ের দায়িত্ব বর্তায়। বলা বাহুল্য, সহকারী ব্যতীত আমীরের পক্ষে এ দায়িত্ব সম্পাদন করা সম্ভব নয়। আলোচ্য আয়াতে যাকাত আদায়কারী তথা সেই সহকারীদের কথাই বলা হয়েছে।
এ আয়াত মতে নবী করীম (সা) অনেক সাহাবীকে বিভিন্ন স্থানে যাকাত আদায়ের জন্য প্রেরণ করেছিলেন এবং আদায়কৃত যাকাত থেকেই তাদের পারিশ্রমিক দিতেন। এ সকল সাহাবার মধ্যে অনেকে ধনীও ছিলেন। হাদীস শরীফে আছেঃ ধনীদের জন্য সকার অর্থ হালাল নয়, তবে পাঁচ ব্যক্তির জন্য হালাল। প্রথমত, যে জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হয়েছে কিন্তু সেখানে প্রয়োজনীয় অর্থ তার নেই, যদিও সে স্বদেশে ধনী। দ্বিতীয়ত, সকা আদায়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি। তৃতীয়ত, সেই অর্থশালী ব্যক্তি, যার মওজুদ অর্থের তুলনায় ঋণ অধিক। চতুর্থত, যে ব্যক্তি মূল্য আদায় করে গরীব-মিসকীন থেকে সকার মালামাল ক্রয় করে। পঞ্চমত, যাকে গরীব লোকেরা সস্কার প্রাপ্ত মাল হাদিয়াস্বরূপ প্রদান করে।
সদকা আদায়কারীদের কি পরিমাণ পারিশ্রমিক দেয়া হবে সে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক। এ ব্যাপারে হুকুম হলো, তাদের কাজ ও পরিশ্রম অনুসারে পারিশ্রমিক দেয়া হবে।—(আহকামুল কোরআন-জাসসাস, কুরতুবী) তবে তাদের পারিশ্রমিক আদায়কৃত যাকাতের অর্ধাংশের বেশি দেওয়া যাবে না। যাকাতের আদায়কৃত অর্থ যদি এত অল্প হয় যে, আদায়কারীদের বেতন দিয়ে তার অর্ধেকও বাকি থাকে না, তবে বেতনের হার হ্রাস করতে হবে। অর্ধেকের বেশি বেতন খাতে ব্যয় করা যাবে না। (তফসীরে মাযহারী, যহীরিয়া)
উপরোক্ত আলোচনা থেকে বোঝা গেল যে, যাকাত তহবিল থেকে আদায়কারীদের যে বেতন দেয়া হয়, তা সদৃকা হিসেবে নয়, বরং পরিশ্রমের বিনিময় হিসেবেই দেওয়া হয়। তাই তাঁরা ধনী হলেও এ অর্থের উপযুক্ত এবং যাকাত থেকে তাদের দেয়া জায়েয । আট প্রকারের ব্যয়খাতের মধ্যে এই একটি খাতই এমন যে, সেখানে স্বয়ং যাকাতের অর্থ পারিশ্রমিক রূপে দেওয়া যায়। অথচ যাকাত সে দানকেই বলা হয়, যা কোন বিনিময় ছাড়াই গরীবদের প্রদান করা হয়। সুতরাং কোন গরীবকে কাজের বিনিময়ে যাকাতের অর্থ দিলে যাকাত আদায় হবে না।
এখানে দু’টি প্রশ্ন উঠতে পারে। প্রথমত, যাকাত আদায়কারীদের কাজের বিনিময়ে কিরূপে যাকাতের অর্থ দেয়া যাবে। দ্বিতীয়ত, ধনীর জন্য যাকাতের অর্থ কিভাবে হালাল হবে। উভয় প্রশ্নের উত্তর একটিই। তা হলো এই যে, সদকা আদায়কারীদের আসল পরিচয় জেনে নিতে হবে। তারা আসলে গরীবদেরই উকীলস্বরূপ। বলা বাহুল্য, উকীল কিছু গ্রহণ করলে তা মক্কেলের গ্রহণ বলেই গণ্য হয়। কেউ যদি অন্য লোককে কারো থেকে কর্জ আদায়ের জন্য উকীল নিযুক্ত করে তবে কর্জের টাকা উকীলের হাতে অর্পণ করলেও যেমন কর্জদার দায়িত্ব মুক্ত হয়, তেমনি গরীবদের উকীল হিসেবে আদায়কারীর মাধ্যমে সকা আদায় করলেও ধনীদের যাকাত আদায় হয়ে যাবে। অতঃপর উকীল হিসেবে সকার যে অর্থ তারা সংগ্রহ করবে, গরীবরাই তার মালিক হবে। এরপর যাকাতের অর্থ থেকে আদায়কারীর যে বেতন দেয়া হয়, তা আসলে গরীবদের পক্ষ থেকেই, ধনীদের পক্ষ থেকে নয়। গরীবরা যাকাতের অর্থ দিয়ে যা ইচ্ছা করতে পারে। সুতরাং যাকাতের অর্থ দ্বারা তাদের উকীলদের পারিশ্রমিক দেয়ার অধিকারও তাদের থাকবে।
অতঃপর প্রশ্ন আসে যে, সকা আদায়কারীদের তো গরীবরা উকীল নিযুক্ত করেনি, তারা কেমন করে উকীল সেজে বসল ? জবাব হলো যে, ইসলামী রাষ্ট্রের আমীর স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহর পক্ষ থেকে সে দেশের সকল গরীব-মিসকীনের উকীল। কারণ এদের ভরণপোষণের সমুদয় দায়িত্ব তাঁর। তিনি সকা আদায়ের জন্য যাদের নিযুক্ত করেন, তারা তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে গরীবদেরও উকীল সাব্যস্ত হয়।
ভুল এ থেকে বোঝা যায় যে, সদকা আদায়কারীদের বেতন হিসেবে যা দেয়া হয় তা মূলত যাকাতের টাকা নয়, বরং যাকাত যে গরীবদের হক, সেই গরীবদের পক্ষ থেকে তা কাজের বিনিময় মাত্র। যেমন, কোন গরীব লোক যদি কাউকে তার মামলা পরিচালনার জন্য উকীল নিযুক্ত করে এবং তাকে এ কাজের জন্য যাকাতের টাকা থেকে মজুরি দেয়, এখানে এ মজুরি যাকাত হিসেবে দেয়াও হচ্ছে না, আর যাকাত হিসেবে নেয়াও হচ্ছে না।
বিশেষ জ্ঞাতব্যঃ এখানে উল্লেখযোগ্য যে, বর্তমান যুগে ইসলামী মাদ্রাসা এবং সে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালক বা তাদের প্রতিনিধিরা সকা ও যাকাত যে ধনীদের থেকে আদায় করেন, তারা উপরোক্ত হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই যাকাত সকা থেকে তাদের বেতন-ভাতা আদায় করা যাবে না। বরং ভিন্ন খাত থেকে তার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ তারা ধনীদের উকীল, গরীবদের নয়। ধনীদের পক্ষ থেকেই যাকাতের টাকা উপযুক্ত খাতে ব্যয় করার অধিকার তাদের দেয়া হয়েছে। সুতরাং যাকাতের টাকা তাদের হস্তগত হওয়ার পর সঠিক স্থানে ব্যয় না করা পর্যন্ত দাতাদের যাকাত আদায় হবে না।
তারা যে গরীবদের উকীল নয়, তা সুস্পষ্ট। কারণ কোন গরীব তাদের উকীল নিযুক্ত করেন নি এবং আমীরুল মু’মিনীনের প্রতিনিধিত্বও তারা করে না। তাই তাদের পক্ষে ধনীদের উকীল হওয়া ব্যতীত আর কোন পথ খোলা নেই। সুতরাং যাকাত খাতে ব্যয় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যাকাতের টাকা তাঁদের হাতে থাকা ও মালিকের হাতে থাকার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
এ ব্যাপারে সাধারণত সাবধানতা অবলম্বন করা হয় না। বহু প্রতিষ্ঠান যাকাতের বিস্তর টাকা সংগ্রহ করে বছরের পর বছর সিন্দুকে তালাবদ্ধ করে রাখে। আর যাকাতদাতারা মনে করে যে, যাকাত আদায় হয়ে গেল। অথচ তাদের যাকাত আদায় হবে তখনই, যখন তা যাকাতের খাতসমূহে ব্যয়িত হবে।
অনুরূপ অনেকে বর্তমান যুগের যাকাত আদায়কারীদের আমীরুল মু’মিনীনের প্রতিনিধিবর্গের সাথে তুলনা করে যাকাতের অর্থ থেকে তাদের বেতন আদায় করে। একান্তভাবেই এটি অজ্ঞতাপ্রসূত। দাতা ও গ্রহীতা কারো পক্ষেই তা জায়েয নয়।
(তাফসিরে মারেফুল কুরআন: 60 নং আয়াতের তাফসির।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
সাইদুজ্জামান কাসেমি
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১