একই ব্যক্তি উভয় পক্ষের উকিল হওয়া
প্রশ্নঃ ১৬০৩০২. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, একজন ব্যক্তি উভয় পক্ষের ওলী হতে পারবে কি না ?ইখতিলাফ ও দলীল সহ।
৭ জুলাই, ২০২৬
মুরাদনগর
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
শরিয়তের বিধান অনুযায়ী,একই ব্যক্তি কোনো ব্যবসায়িক চুক্তিতে বা লেনদেনে উভয় পক্ষের (ক্রেতা ও বিক্রেতা বা চুক্তিবদ্ধ দুই পক্ষ) প্রতিনিধি বা উকিল হতে পারবেন না। কারণ, চুক্তির ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের স্বার্থ সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হয় (যেমন: ক্রেতার লক্ষ্য থাকে কম মূল্যে কেনা এবং বিক্রেতার লক্ষ্য থাকে বেশি মূল্যে বিক্রি করা)। একজন ব্যক্তি একই সাথে দুটি বিপরীতমুখী স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন না।
হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ফিকাহ গ্রন্থ 'আল-হিদায়া-তে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম মারগিনানী (রহ.) বলেন:
وإذا وكل رجل رجلا بأن يشتري له عبدا، ووكل آخر ذلك الوكيل بأن يبيع منه عبدا له، لم يجز له أن يباشر العقد وحده
অর্থ: "যদি কোনো ব্যক্তি একজন উকিলকে নিজের জন্য একটি দাস (বা যেকোনো পণ্য) ক্রয় করার দায়িত্ব দেয়, এবং অন্য আরেক ব্যক্তি সেই একই উকিলকে তার নিজের একটি দাস বিক্রি করার দায়িত্ব দেয়—তবে ওই উকিলের পক্ষে একাকী (উভয় পক্ষের হয়ে) এই ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন করা জায়েজ নেই।
তবে বিবাহ চুক্তিতে এক ব্যক্তি একই সাথে উভয় পক্ষের ওলী (অভিভাবক) বা উকিল (প্রতিনিধি) হতে পারবেন কি না—এ বিষয়ে ফকীহগণের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত বা ইখতিলাফ রয়েছে।
১. হানাফী মাযহাবের মতামত হলো - এক ব্যক্তি এককভাবে বিবাহের উভয় পক্ষের দায়িত্বশীল হতে পারবেন। অর্থাৎ, তিনি একাই পাত্র ও পাত্রী উভয়ের ওলী বা উকিল হয়ে অথবা এক পক্ষের ওলী এবং অন্য পক্ষের উকিল হয়ে বিবাহের প্রস্তাব (ঈজাব) ও কবুল সম্পন্ন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে তাকে কেবল একটি বাক্য বললেই চুক্তি সম্পন্ন হয়ে যাবে। যেমন: "আমি আমার অমুক নাতনিকে আমার অমুক নাতির সাথে বিবাহ দিলাম।"
বিখ্যাত হানাফী ফিকহের কিতাব 'আল-হিদায়াহ' (الْهِدَايَةُ فِي شَرْحِ بِدَايَةِ الْمُبْتَدِي)-তে ইমাম মারগীনানী (রহ.) লিখেছেন:
وَيَجُوزُ لِلْوَاحِدِ أَنْ يَتَوَلَّى طَرَفَيْ الْعَقْدِ فِي النِّكَاحِ، بِأَنْ يَكُونَ وَلِيًّا لَهُمَا، أَوْ وَكِيلًا عَنْهُمَا، أَوْ وَلِيًّا مِنْ جَانِبٍ وَوَكِيلًا مِنْ جَانِبٍ، أَوْ أَصِيلًا مِنْ جَانِبٍ وَوَلِيًّا أَوْ وَكِيلًا مِنْ جَانِبٍ آخَرَ.
অর্থাৎ- "বিবাহের ক্ষেত্রে এক ব্যক্তির জন্য চুক্তির উভয় পক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করা জায়েজ। যেমন: সে নিজেই উভয় পক্ষের ওলী হবে, অথবা উভয় পক্ষের উকিল হবে, কিংবা এক পক্ষের ওলী এবং অন্য পক্ষের উকিল হবে, অথবা এক পক্ষের মূল ব্যক্তি (যেমন পাত্র নিজে) এবং অন্য পক্ষের ওলী বা উকিল হবে।"
হানাফী মাযহাবের দলীল- হানাফী ফকীহগণ সাহাবী হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা.)-এর একটি আছার বা আমলকে দলীল হিসেবে পেশ করেন। তিনি উম্মে হাকীম বিনতে কারিজ (রা.)-এর বিবাহের ক্ষেত্রে এককভাবে উভয় পক্ষের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
কিতাবে বর্ণিত হয়েছে:
"أَنَّ عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ عَوْفٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْه قَالَ لِأُمِّ حَكِيمٍ بِنْتِ قَارِظٍ: «أَتَجْعَلِينَ أَمْرَكِ إلَيَّ؟ قَالَتْ: نَعَمْ، فَقَالَ: قَدْ تَزَوَّجْتُكِ"
অর্থাৎ "হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা.) উম্মে হাকীম বিনতে কারিজ-কে বললেন, 'তুমি কি তোমার বিয়ের বিষয়টি আমার ওপর সোপর্দ করছ?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ'। তখন আব্দুর রহমান (রা.) বললেন, 'আমি তোমাকে নিজের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করে নিলাম।'" (এখানে তিনি একাই কনে পক্ষের উকিল এবং পাত্র পক্ষের মূল ব্যক্তি হিসেবে বিবাহ সম্পন্ন করেন)।
২. জুমহুর ওলামায়ে কেরামের (শাফেয়ী, মালেকী এবং হাম্বলী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য ) মতে, এক ব্যক্তি বিবাহের উভয় পক্ষের দায়িত্বশীল হতে পারবেন না।
তাদের মতে, বিবাহ একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, যেখানে একজন প্রস্তাবকারী (মুজিব) এবং একজন গ্রহণকারী (কাবিল) থাকা আবশ্যক। একজন মানুষ একই সাথে নিজেকে প্রস্তাব দিতে এবং নিজের প্রস্তাব নিজেই গ্রহণ করতে পারে না।
বিখ্যাত শাফেয়ী ফিকহের কিতাব ইমাম নববী (রহ.) রচিত 'মিনহাজুত তালিবীন' (مِنْهَاجُ الطَّالِبِينَ)-এ বলা হয়েছে:
"وَلَا يَتَوَلَّى طَرَفَي الْعَقْدِ وَاحِدٌ بِإِذْنٍ أَوْ وِلَايَةٍ، فَلَا يُزَوِّجُ الْوَكِيلُ بِنْتَ الْمُوَكِّلِ مِنْ نَفْسِهِ، وَلَا الْوَلِيُّ مَوْلَاتَهُ مِنْ نَفْسِهِ إلَّا الْأَبَ وَالْجَدَّ."
অর্থাৎ- "অনুমতি কিংবা অভিভাবকত্ব (ওলায়াত)—কোনো মাধ্যমেই এক ব্যক্তি চুক্তির উভয় পক্ষের দায়িত্বশীল হতে পারবে না। অতএব, কোনো উকিল তার মুয়াক্কিলের (যার পক্ষ থেকে সে প্রতিনিধিত্ব করছে) মেয়েকে নিজের সাথে বিবাহ দিতে পারবে না, এবং কোনো ওলীও তার অভিভাবকত্বে থাকা নারীকে নিজের সাথে বিবাহ দিতে পারবে না; তবে পিতা ও দাদার বিষয়টি ভিন্ন (নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে তারা নিজ নাবালক সন্তানের বিয়ে নিজেরা দিতে পারেন)।"
সারসংক্ষেপ: হানাফী মাযহাবের ফতোয়া অনুযায়ী এক ব্যক্তি উভয় পক্ষের ওলী বা উকিল হতে পারবেন এবং তার একার কথা বা সম্মতিতেই বিবাহ সম্পন্ন হয়ে যাবে (তবে অবশ্যই সেখানে দুজন সাক্ষী উপস্থিত থাকতে হবে)।
জুমহুর (শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী) মাযহাব অনুযায়ী:এক ব্যক্তি এককভাবে উভয় পক্ষের দায়িত্ব নিতে পারবেন না। বিবাহের প্রস্তাবক এবং কবুলকারী সম্পূর্ণ পৃথক ব্যক্তি হতে হবে।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতি মোহাম্মদ আমীর হোসাইন
মুহাদ্দীস, শাইখ আবু সাঈদ ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার মোহাম্মাদপুর।
মুহাদ্দীস, শাইখ আবু সাঈদ ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার মোহাম্মাদপুর।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১