শিক্ষা ও শাসনে নীতিমালা ও আদর্শ পদ্ধতি
প্রশ্নঃ ১৬৪৩৭১. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আজ রাগের বিষয় পড়লাম কুইজ দিতে গিয়ে। এখন প্রশ্ন ইলম/ জ্ঞান / চরিত্র শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে ছাত্র/ছাত্রীদের সাথে রাগ করা যাবে কি না? যেমন: পড়াশোনা করেনা/ লেখা দেয় না/ কথা শুনেনা ইত্যাদি,একই প্রশ্ন সন্তানের ক্ষেত্রে।
১২ আগস্ট, ২০২৬
নাগেশ্বরী
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রিয় প্রশবনকারী, ছাত্র বা সন্তানের মঙ্গলের জন্য নিয়ন্ত্রিত রাগ জায়েজ, কিন্তু মেজাজ হারিয়ে গালিগালাজ বা অমানবিক আচরণ করা গুনাহ।
আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং সঠিক শিক্ষা দান করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। ইসলামি শরিয়ত প্রতিটি নেক কাজের যেমন উৎসাহ দিয়েছে, তেমনি তার জন্য নির্দিষ্ট সীমা ও নীতিমালাও নির্ধারণ করে দিয়েছে। নিয়ম বহির্ভূত যেকোনো নেক কাজ সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহের কারণ হতে পারে। শিশুদের লালন-পালন ও শাসনের ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়তের ভারসাম্যপূর্ণ নির্দেশনাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো,
১. শাসন ও মায়ার ভারসাম্য
শিশুদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কঠোরতা ও কোমলতার মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। শাসনের প্রয়োজনীয়তাকে যেমন অস্বীকার করা যাবে না, তেমনি রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সীমার বাইরে যাওয়াও যাবে না।
রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে নামাযের নির্দেশ দাও, আর দশ বছর হলে (নামায না পড়লে) তাদের শাসন করো।
পরিবারে শাসনের গুরুত্ব বোঝাতে প্রয়োজনে ঘরে এমন স্থানে লাঠি বা চাবুক রাখা যেতে পারে যা সবার নজরে পড়ে, যাতে তারা শৃঙ্খলা বজায় রাখার গুরুত্ব অনুভব করে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) তাঁর ছাত্র ইকরিমা (রহ.)-কে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কুরআন ও সুন্নাহ শেখাতেন। প্রয়োজনে তিনি শাসনমূলক কঠোরতা অবলম্বন করতেন যেন ছাত্রের মনোযোগ বিচ্যুত না হয়।
২. শাসন বা শাস্তি প্রদানের ১১টি জরুরি শর্ত
অভিভাবক বা শিক্ষকদের জন্য শিশুদের সংশোধনের উদ্দেশ্যে সাজা দেওয়া জায়েজ, তবে ফকীহগণ ১১টি কঠোর শর্তারোপ করেছেন:
১. যদি শিশু হয় তাহলে তার মা-বাবার কাছ থেকে শাসনের ব্যাপারে পূর্বানুমতি থাকতে হবে।
২. সাজার উদ্দেশ্য হতে হবে কেবল সংশোধন ও তরবিয়ত; ব্যক্তিগত রাগ মেটানো বা প্রতিশোধ নেওয়া নয়।
৩. শরিয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ কোনো পদ্ধতিতে সাজা দেওয়া যাবে না।
৪. রাগের অবস্থায় মারা যাবে না। রাগ দমিত হওয়ার পর কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে শাসন করতে হবে।
৫. শারীরিক গঠন ও সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে।
৬. মাদরাসা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও সীমারেখা মেনে চলতে হবে।
৭. সাধারণত হাত দিয়ে শাসন করতে হবে; লাঠি বা ডাণ্ডা ব্যবহার করা যাবে না। তবে বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনবোধে হালকা লাঠি ব্যবহার করা যেতে পারে।
৮. এক সময়ে তিনটির বেশি আঘাত করা যাবে না এবং একই জায়গায় বারবার মারা যাবে না; শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে দিতে হবে।
৯. মাথা, মুখমণ্ডল এবং শরীরের কোনো নাজুক বা স্পর্শকাতর স্থানে কখনোই আঘাত করা যাবে না।
১০. শাসনের অর্থ বোঝার মতো বয়সে পৌঁছাতে হবে। খুব ছোট শিশু যে ভালো-মন্দ বোঝে না, তাকে মারা সম্পূর্ণ অবৈধ।
১১. এমনভাবে সাজা দেওয়া যাবে না যাতে হাড় ভেঙে যায়, চামড়া ফেটে যায়, শরীরে কালো দাগ পড়ে বা কোনো অঙ্গের স্থায়ী ক্ষতি হয়। এটি শরিয়তে সম্পূর্ণ হারাম।
৩. অতিরিক্ত শাসনের কুফল
অতিরিক্ত মারপিট ও কঠোরতা উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি করে। এর ফলে:
তারা জেদি ও নির্লজ্জ হয়ে যায়।
তাদের মনে ভয়ের সৃষ্টি হয়, যার ফলে তারা পড়াশোনা বা সৃজনশীলতা হারিয়ে ফেলে।
অতিরিক্ত শাসনে হীনম্মন্যতায় ভোগে এবং একসময় শাসনের গুরুত্ব তাদের কাছে হারিয়ে যায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে মায়া ও মমতা দিয়ে গড়ে তুলেছেন। তাঁর আদর্শ হলো যথাসম্ভব কোমলতা অবলম্বন করা। সাজার প্রয়োজন হলে তা ধাপে ধাপে হতে হবে:
(ক) সদুপদেশ (খ) তিরস্কার (গ) ধমক (ঘ) হালকা কান টানা (ঙ) হাত দিয়ে মৃদু শাসন।
৪. মাদরাসা বা বিদ্যালয়ে বিকল্প শাস্তির ব্যবস্থা
পড়া মনে না থাকলে বা নিয়ম ভঙ্গ করলে শারীরিক আঘাতের পরিবর্তে আধুনিক ও কার্যকরী কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে:
নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের খেলাধুলা বা সাধারণ ছুটি বন্ধ রাখা। এটি মানসিক প্রভাব ফেলে।
ক্লাসের এক কোণে কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশ দেওয়া।
কান ধরে ওঠবস করানো (এটি যেমন শাসন, তেমনি এক ধরনের শরীরচর্চাও)।
ভালো করলে পুরস্কার বা প্রশংসা করা। অনেক সময় পুরস্কারের লোভ শাস্তির চেয়ে বেশি কার্যকর হয়।
(সূত্র দারুল উলুম করাচি)
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
জাওয়াদ তাহের
মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামিয়া বাবুস সালাম, বিমানবন্দর ঢাকা
মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামিয়া বাবুস সালাম, বিমানবন্দর ঢাকা
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১