বড় বোন অবিবাহিত থাকা অবস্থায় ছোট বোনের বিয়ের শরয়ী বিধান
প্রশ্নঃ ১৬৮৯৯৩. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমি বর্তমানে বাসা থেকে দূরে ভার্সিটিতে পড়াশোনা করছি। ভার্সিটির পরিবেশ খুব বাজে, ফিতনা অনেক বেশি। আমার পরিবার আলেম পরিবার নয়। অর্থাৎ আমার বাবা মা নামায কালাম পড়লেও আমাদের দ্বীন চর্চার ব্যাপারে উদাসীন। আমি আলহামদুলিল্লাহ নিজ থেকেই ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি। আল্লাহ আমাকে হেদায়েত দান করেছেন, এখন আমি আমাদের ধর্মের পরিপূর্ণ বিধিনিষেধ মেনে চলতে চাই। কিন্তু আমি জেনারেলে পড়াশোনা করায় আর এখন ভার্সিটিতে পড়ায় আমার পরিবার আমার বিষয়টা বুঝতে চাচ্ছে না। আমি এখন ফিতনা থেকে বাচতে বিয়ে করতে চাই, এবং স্বামীর অনুমতি নিয়ে তার সাথে থেকে পড়াশোনা চালানোর পাশাপাশি ধর্মীয় সকল বিধিনিষেধ মেনে চলতে চাই। আমার অবিবাহিত বড় বোন আছে। বাসায় আমি বড় বোনের আগে আমাকে বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে জানালে মা বাবা নিষেধ করেন। প্রয়োজন হলে উনারা আমার সাথে এসে থাকবেন তবুও এখনি বিয়ে দিবেন না। আর আমি আমার পরিবারে থেকে পরিপূর্ণ দ্বীন চর্চা করতে পারব না। এমতাবস্থায় আমার করণীয় কি?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
আপনার দ্বীন চর্চার আগ্রহ, নিজের ঈমান ও চরিত্র রক্ষার ফিকির এবং পারিবারিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দ্বীনের ওপর থাকার চেষ্টা প্রশংসনীয়। তবে এ বিষয়ে আবেগ দিয়ে নয়; বরং নিজের দ্বীন রক্ষা, মা-বাবার হক এবং ভবিষ্যৎ দাম্পত্যজীবনের সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে প্রজ্ঞার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
আপনার পরিস্থিতিতে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন—
১. শরয়ি বিধান
বড় বোনের আগে ছোট বোনের বিয়ে: শরিয়তে এমন কোনো বিধান নেই যে, বড় বোন অবিবাহিত থাকলে ছোট বোনের বিয়ে দেওয়া যাবে না। এটি মূলত সামাজিক একটি প্রচলন। তাই শুধু এ কারণে ছোট বোনের বিয়ে দেওয়া শরিয়তবিরোধী নয়।
ফিতনা থেকে বেঁচে থাকার জন্য বিয়ে: বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে যদি বাস্তবেই অনৈতিকতা ও ফিতনার আশঙ্কা থাকে এবং বিয়ের মাধ্যমে নিজেকে হারাম থেকে রক্ষা করার প্রয়োজন হয়, তাহলে বিয়ের চিন্তা করা শরিয়তসম্মত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ، مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ
অর্থ: “হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে। কারণ এটি দৃষ্টিকে সংযত রাখতে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করতে অধিক সহায়ক।”
—সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৫০৬৬
(হাদীস নং : https://muslimbangla.com/hadith/4700)
২. বর্তমান অবস্থায় করণীয়
তাড়াহুড়া না করে উপযুক্ত পাত্র নির্বাচন: শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ খারাপ বা মা-বাবা বিয়েতে রাজি নন—এ কারণে আবেগের বশে যেকোনো ব্যক্তিকে বিয়ে করা উচিত নয়। পাত্রের দ্বীনদারি, চরিত্র, দায়িত্বশীলতা, উপার্জন এবং বিয়ের পর আপনার পর্দা ও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি।
এ ধরনের বিষয়ে একা সিদ্ধান্ত না নিয়ে মা-বাবা ও দায়িত্বশীল অভিভাবকদের পরামর্শ নেওয়া বেশি নিরাপদ। কোনো উপযুক্ত পাত্র পাওয়া গেলে তাঁর বিষয়ে ভালোভাবে খোঁজখবর নিয়ে পরিবারের সামনে বিষয়টি উপস্থাপন করা উচিত।
মা-বাবার সঙ্গে আলোচনার পদ্ধতি: বাবা-মা দ্বীনি বিষয়ে উদাসীন হলেও তাঁদের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও আদব বজায় রাখা জরুরি। তাই সরাসরি বিরোধিতা না করে শান্তভাবে তাঁদের বোঝানো উচিত যে, আপনি বিয়ের মাধ্যমে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে চান না; বরং একজন দ্বীনদার ও দায়িত্বশীল স্বামীর সঙ্গে থেকে পর্দা, নামাজ ও অন্যান্য দ্বীনি বিধান মেনে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান।
আপনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে দ্বীন ও চরিত্র হেফাজত করা কঠিন হয়ে পড়ছে, এ বিষয়টিও তাঁদের কাছে শান্তভাবে তুলে ধরা যেতে পারে। প্রয়োজনে পরিবারের কোনো বিচক্ষণ মুরব্বি, আলেম বা আত্মীয়ের মাধ্যমে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। পিতা-মাতাকে বোঝানোর ক্ষেত্রে নিচের হাদীসের হাদীসের উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে।
হাদীসে আছে—
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ إِلاَّ تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيضٌ
অর্থ: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যদি তোমাদের কাছে এমন কেউ বিবাহের প্রস্তাব দেয়, যার দ্বীন ও চরিত্র তোমাদের পছন্দনীয় হয়, তবে তাকে বিবাহ দাও। যদি এরূপ না কর, তবে পৃথিবীতে ফিতনা ও বিরাট বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে।”
—সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ১০৮৪
(হাদীস নং : https://muslimbangla.com/hadith/30721)
বড় বোনের সঙ্গে আলোচনা: বড় বোনের সঙ্গেও সুন্দর ও সহানুভূতিশীলভাবে আলোচনা করা যেতে পারে। তিনি বিষয়টি সহজভাবে গ্রহণ করলে এবং মা-বাবাকে বোঝাতে সহযোগিতা করলে পারিবারিক আপত্তি অনেকটা কমে যেতে পারে।
৩. বিয়ের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত দ্বীন ও চরিত্র রক্ষার চেষ্টা
যতদিন বিয়ের উপযুক্ত ব্যবস্থা না হয়, ততদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে নিজেকে যথাসম্ভব ফিতনা থেকে দূরে রাখা উচিত। প্রয়োজন ছাড়া ছেলে-মেয়ের অবাধ মেলামেশা, আড্ডা ও অনর্থক সময় কাটানো থেকে বিরত থাকা এবং দ্বীনদার বান্ধবীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখা উপকারী।
শাহওয়াত ও প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের জন্য নফল রোজা রাখাও উপকারী। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ، مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ، وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ، فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ
অর্থ: “হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে। আর যে ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে; কারণ রোজা তার যৌনপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।”
—সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৫০৬৬
(হাদীস নং : https://muslimbangla.com/hadith/4700)
এ সময়ে গোপন সম্পর্ক বা গোপনে বিয়ের মতো তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বরং পরিবারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে শরিয়তসম্মত ও নিরাপদ পদ্ধতিতে বিয়ের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা উচিত।
সারকথা
আপনার জন্য মূল বিষয় হলো, একদিকে দ্বীন ও চরিত্র রক্ষা করা, অন্যদিকে মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না করে প্রজ্ঞার সঙ্গে বিয়ের বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া। বড় বোন অবিবাহিত থাকার কারণে আপনার বিয়ে শরিয়তে নিষিদ্ধ নয়। তাই কোনো উপযুক্ত দ্বীনদার পাত্র পাওয়া গেলে তাঁর বিষয়ে যথাযথ যাচাই-বাছাই করে একজন বিশ্বস্ত আলেম বা মুরব্বির মাধ্যমে মা-বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।
এদিকে বিয়ের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিতনাময় পরিবেশ থেকে যতটা সম্ভব নিজেকে হেফাজত করা, প্রয়োজনীয় পড়াশোনা করা এবং নিয়মিত ইবাদত ও আমলের মাধ্যমে ঈমান মজবুত রাখা উচিত।
সর্বোপরি আল্লাহ তাআলার কাছে বেশি বেশি দুআ করা উচিত। নফল নামাজ পড়ে নিজের প্রয়োজন আল্লাহর কাছে পেশ করা যেতে পারে। বিয়ের বিষয়ে উপযুক্ত পাত্র পাওয়া গেলে ইস্তিখারা করে আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা যেতে পারে।
কুরআনের এই দুআটিও বেশি বেশি পড়া যেতে পারে—
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
অর্থ: “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য নয়নপ্রীতি দান করুন এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ বানিয়ে দিন।”
—সূরা আল-ফুরকান: ৭৪
কুরআনে বর্ণিত এ দুআটিও বেশি বেশি করা যেতে পারে—
رَبِّ اِنِّیۡ لِمَاۤ اَنۡزَلۡتَ اِلَیَّ مِنۡ خَیۡرٍ فَقِیۡرٌ
অর্থ: “হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার প্রতি যে কল্যাণ বর্ষণ করবে আমি তার ভিখারী।”
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য কল্যাণকর সিদ্ধান্ত সহজ করে দিন, আপনার ঈমান ও চরিত্র হেফাজত করুন এবং একজন দ্বীনদার ও দায়িত্বশীল জীবনসঙ্গী নসিব করুন। আমীন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
উস্তাজ, ইদারাতুত্ তাখাসসুস ফিল উলূমিল ইসলামিয়া, আজিমপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন