বিজ্ঞানই কি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নিয়ন্ত্রক?
প্রশ্নঃ ১৬৯১০৮. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, "দৈনন্দিন জীবনের বিজ্ঞান" একটা রচনা আছে এটাতে বলেছে "এখন বিজ্ঞানই মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নিয়ন্ত্রক" এই কথাটা মানা যাবে?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বাক্যটি আক্ষরিকভাবে বিশ্বাস করা বা মেনে নেওয়া যাবে না, তবে রূপক বা বাহ্যিক উপায়-উপকরণের অর্থে এটি বুঝালে তা ব্যাখ্যা সাপেক্ষে বিবেচিত হবে। ইসলামের মূল আকীদা ও কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বিষয়টি নিচে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হলো:
আকীদার দৃষ্টিকোণ থেকে আক্ষরিক অর্থে এটি মানা যাবে না কেন?
কারণ ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস অনুযায়ী মানুষের জীবন, মৃত্যু, রিযিক এবং প্রাত্যহিক জীবনের সমস্ত বিষয়ের একমাত্র নিয়ন্ত্রক হলেন আল্লাহ তাআলা। বিজ্ঞান কোনো স্বাধীন সত্তা নয়, বরং বিজ্ঞান হলো আল্লাহর সৃষ্টি করা প্রকৃতির নিয়মাবলিকে (খোদায়ী নিযাম) মানুষের আবিষ্কার করার একটি প্রক্রিয়া মাত্র। কাজেই বিজ্ঞান নিয়ন্ত্রক নয়; বরং বিজ্ঞান মানুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আর মানুষ আল্লাহ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
اَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْاَمْرُ ؕ تَبٰرَكَ اللّٰهُ رَبُّ الْعٰلَمِیْنَ
"জেনে রেখো, সৃষ্টিও তাঁর এবং নিয়ন্ত্রণ ও আদেশও তাঁর। বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ বরকতময়।" (সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৫৪)
অতএব, কেউ যদি মনে করে বিজ্ঞান নিজে থেকেই মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করছে বা বিজ্ঞানই মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করছে, তবে তা শরিয়তের পরিভাষায় শিরক এবং কুফরির শামিল হবে।
রূপক বা বাহ্যিক অর্থে যেভাবে কথাটি বিবেচনা করা যায়
রচনায় বা সাধারণ কথাবার্তায় যদি বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রভাব ও ব্যাপৃত নির্ভরশীলতা বোঝানোর উদ্দেশ্যে বলা হয় "বিজ্ঞানই মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নিয়ন্ত্রক", এবং এর দ্বারা মানুষের আকীদা বা বিশ্বাস পরিবর্তন করা উদ্দেশ্য না থাকে তাহলে রূপক অর্থে তা বলা শিরিক হবে না।
যেমন, ঘুম থেকে ওঠা (অ্যালার্ম), যাতায়াত (গাড়ি/যানবাহন), যোগাযোগ (মোবাইল ফোন), রান্না (গ্যাস/ওভেন) থেকে শুরু করে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি কাজ বিজ্ঞানের তৈরি প্রযুক্তি দ্বারা পরিবেষ্টিত। এই বাহ্যিক প্রভাবের কারণে যদি কেউ রূপক অর্থে শব্দটিকে ব্যবহার করে থাকেন তাহলে তা শিরিক হবে না। কেননা, ইসলামে বাহ্যিক উপায়-উপকরণ (সবব) ব্যবহার করা জায়েজ। যেমন: কেউ অসুস্থ হলে ওষুধ খায়। বাহ্যিকভাবে ওষুধ রোগ নিয়ন্ত্রণ বা নিরাময় করে, কিন্তু বিশ্বাস রাখতে হয় যে—নিরাময়কারী একমাত্র আল্লাহ।
সতর্কতা: ইসলমী শরীয়তে মানুষের আকল/বোধশক্তি এবং জ্ঞানের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী বক্তব্য প্রদানের এবং যা তাদের জ্ঞানের অবোধগম্য, তা পরিহার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সহিহ মুসলিমের মুকাদ্দিমায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন,
مَا أَنْتَ بِمُحَدِّثٍ قَوْمًا حَدِيثًا لَا تَبْلُغُهُ عُقُولُهُمْ، إِلَّا كَانَ لِبَعْضِهِمْ فِتْنَةً
যখন তুমি কোন সম্প্রদায়ের কাছে এমন কোন হাদীস বর্ণনা করবে, যা তাদের জ্ঞানের অবোধগম্য, তখন তা তাদের কারো কারো জন্য ফিতনা হয়ে দাঁড়াবে।
https://muslimbangla.com/hadith/14342
সহীহ বুখারীর ৬২০৩ নং হাদিসে আনাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত তিনি ইরশাদ করেন,
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَحْسَنَ النَّاسِ خُلُقًا، وَكَانَ لِي أَخٌ يُقَالُ لَهُ أَبُو عُمَيْرٍ - قَالَ: أَحْسِبُهُ - فَطِيمًا، وَكَانَ إِذَا جَاءَ قَالَ: «يَا أَبَا عُمَيْرٍ، مَا فَعَلَ النُّغَيْرُ» نُغَرٌ كَانَ يَلْعَبُ بِهِ، فَرُبَّمَا حَضَرَ الصَّلاَةَ وَهُوَ فِي بَيْتِنَا، فَيَأْمُرُ بِالْبِسَاطِ الَّذِي تَحْتَهُ فَيُكْنَسُ وَيُنْضَحُ، ثُمَّ يَقُومُ وَنَقُومُ خَلْفَهُ فَيُصَلِّي بِنَا
অর্থ: নবী (ﷺ) সবার চেয়ে বেশী সদাচারী ছিলেন। আমার একজন ভাই ছিল; তাকে ‘আবু উমায়ের’ বলে ডাকা হত। আমার অনুমান যে, সে তখন মায়ের দুধ খেতো না। যখনই সে তাঁর নিকট আসত, তিনি বলতেন, হে আবু উমায়র! তোমার নুগায়ের কি করছে? সে নুগায়ের পাখিটা নিয়ে খেলত। আর প্রায়ই যখন নামাযের সময় হত, আর তিনি আমাদের ঘরে থাকতেন, তখন তার নীচে যে বিছানা থাকতো, সামান্য পানি ছিটিয়ে ঝেড়ে দেওয়ার জন্য আমাদের নির্দেশ দিতেন। তারপর উনি নামাযের জন্য দাঁড়াতেন এবং আমরাও তাঁর পেছনে দাঁড়াতাম। আর তিনি আমাদের নিয়ে নামায আদায় করতেন।
হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/5770
এই হাদিস থেকে কেবল নবী সা. এর উত্তম আখলাকই নয় বরং
- উত্তম, সুন্দর ও মার্জিত উপায়ে কথা বলা।
- শ্রোতা বা যার সাথে কথা বলা হচ্ছে, তার সামাজিক মর্যাদা ও মানসিক স্তর বিবেচনা/রক্ষা করা।
- শ্রোতাকে তার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ও পছন্দনীয় নামে সম্বোধন করা এবং মন্দ বা অপমানজনক উপাধিতে ডাকা বর্জন করা। এসব বিষয় ফোটে ওঠে।
কাজেই একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের বিশ্বাস ও ভাষার ব্যবহারে সতর্ক হওয়া আবশ্যক। বিজ্ঞান কেবল একটি মাধ্যম বা উসিলা, আমাদের জীবনের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক একমাত্র আল্লাহ। রচনায় কিংবা বক্তব্যে এমন কোনো শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করা যাবে না যার ফলে মানুষের ইমান-আকিদা-বিশ্বাসে সংশয় সৃষ্টি করে কিংবা ভুল বার্তা প্রদান করে। এই ধরণের রচনায় যদি আমরা বাক্যটিকে এভাবে বলি—"এখন বিজ্ঞান মানুষের প্রাত্যহিক জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে" বা "বিজ্ঞান মানুষের জীবনের অন্যতম সহায়ক"—তবে তা কুরআন-সুন্নাহর সাথেও সাংঘর্ষিক হয় না এবং বিজ্ঞানের গুরুত্বও হ্রাস পায় না। কাজেই যেই বস্তুর অবস্থান যেখানে সেটাকে সেখানে রেখেই উপস্থান করতে হবে। তবেই তার সঠিক মূল্যায়ন হবে।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন