রোবট দিয়ে কোরবানি ও পশু জবাই: শরঈ বিধান
প্রশ্নঃ ১৭০১৫৮. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, রোবট দিয়ে কোরবানি বা পশু জবাই করা জায়েজ আছে কি?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী,
প্রথমেই বলে রাখি যে, আপনার প্রশ্নে কিছুটা অস্পষ্টতা আছে। কেননা, রোবট দিয়ে কোরবানি বা পশু জবাই করা দ্বারা আসলে আপনি কি উদ্দেশ্য নিয়েছেন সেটা স্পষ্ট নয়। আপনার প্রশ্নের দুটি সম্ভবনা হতে পারে। আমরা উভয় সম্ভবনা উত্থাপন করে তার সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
১ম সম্ভবনা: যদি রোবট বলতে এমন একটি যন্ত্র বোঝানো হয়, যা একজন মুসলিম ব্যক্তি নিজে নিয়ন্ত্রণ করেন—প্রতিটি পশুর জবাইকে নিজ নিয়ন্ত্রণাধীন একটি যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পাদন করেন এবং প্রত্যেক পশুর নির্দিষ্ট জবাইয়ের সঙ্গে বিসমিল্লাহ সম্পৃক্ত করেন, তাহলে সেই যন্ত্রটি নিজে স্বাধীন কর্তা নয়; বরং মানুষের ব্যবহৃত آلة (জবাইয়ের যন্ত্র) হিসেবে কাজ করেছে।
বিধান: “এ পদ্ধতির বৈধতা নির্ভর করবে প্রচলিত জবাইয়ের সকল শরঈ শর্ত পূরণ হওয়ার ওপর; এর মধ্যে বিশেষভাবে জবাইকারীর যোগ্যতা, (মুসলিম হওয়া) যথাস্থানে (গলায়) জবাই করা এবং জবাইয়ের সময় বিসমিল্লাহ বলা উল্লেখযোগ্য।”
দ্বিতীয় সম্ভবনা: রোবট বা কোনো যন্ত্রকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছেড়ে দেওয়া যাতে কোনো মুসলিমের নিয়ন্ত্রন নেই, যাতে প্রতিটি পশু জবাইয়ের শুরুতে/সুইচ অন করার সময় বিসমিল্লাহ বলা নেই; বরং আগে থেকে প্রোগ্রাম সেট করে দেওয়া হলো এবং রোবট নিজে একের পর এক পশু জবাই করতে থাকল। বা একজন মুসলিম শুরুতে “بسم الله” বলে রোবট চালু করে দিলেন, তারপর রোবট ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিজে নিজে পশু জবাই করতে থাকলো…।
বিধান: এই পদ্ধতিতে জবাই করলে সেই জবাই এবং কুরবানী কোনোটিই সহিহ হবে না।
কেননা, শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রতিটি পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে ‘বিসমিল্লাহ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যা পশুর গলায় ছুরি চালানোর সময়ের সাথে সম্পৃক্ত। রোবট বা যন্ত্র নিজে কোনো মুকাল্লাফ (শরীয়তের বিধানের আওতাভুক্ত) নয়; বরং যন্ত্রের কাজকে তার ব্যবহারকারীর কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কাজেই যন্ত্রের ব্যবহার তখনই শরীয়তসম্মত হবে যখন ব্যবহারকারী যথাযথ শরীঈ নীতিমালা অনুসরণ করে ব্যবহার করবেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَأْكُلُوا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لَفِسْقٌ ۗ وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَىٰ أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ ۖ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ
“যার ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়নি, তা তোমরা আহার করো না। নিশ্চয়ই তা ফিসক।” — সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১২১
রাফে ইবনু খাদিজ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «كُلْ ـ يَعْنِي ـ مَا أَنْهَرَ الدَّمَ إِلَّا السِّنَّ وَالظُّفُرَ» “যে জিনিস রক্ত প্রবাহিত করে দেয়, তা দিয়ে জবাই করা পশু খাও; তবে দাঁত ও নখ দিয়ে নয়।”
— সহিহ আল-বুখারি, ৫৫০৬। https://muslimbangla.com/hadith/5110
ইমাম কাসানি তাঁর বিখ্যাত ফিকহের গ্রন্থ বাদায়েউস সানায়ে-তে বলেন,
وَالرُّكْنُ فِي الذَّكَاةِ الِاخْتِيَارِيَّةِ هُوَ الذَّبْحُ وَفِي الِاضْطِرَارِيَّةِ هُوَ الْجَرْحُ وَذَلِكَ مُضَافٌ إلَى الرَّامِي وَالْمُرْسِلِ وَإِنَّمَا السَّهْمُ وَالْكَلْبُ آلَةُ الْجَرْحِ وَالْفِعْلُ يُضَافُ إلَى مُسْتَعْمِلِ الْآلَةِ لَا إلَى الْآلَةِ لِذَلِكَ اُعْتُبِرَ وُجُودُ التَّسْمِيَةِ وَقْتَ الذَّبْحِ
"আর স্বাভাবিক বা ঐচ্ছিক পন্থায় জবাইয়ের রুকন (মূল স্তম্ভ) হলো—(গলা) কাটা। আর জরুরি বা বাধ্যগত পন্থায় (যেমন শিকারের ক্ষেত্রে) এর রুকন হলো—আঘাত করে রক্তাক্ত করা। আর এই কাজটি তীর নিক্ষেপকারী বা (শিকারী প্রাণী) প্রেরণকারীর দিকে সম্পৃক্ত হবে। মূলত তীর এবং শিকারী কুকুর হলো আঘাত করার হাতিয়ার মাত্র, অথচ কাজ বা কার্যকারিতা সম্পৃক্ত হয় হাতিয়ার ব্যবহারকারীর দিকে, হাতিয়ারের দিকে নয়। আর এ কারণেই জবাইয়ের সময় ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করাকে ধর্তব্য করা হয়েছে।"
ইমাম কাসানি রহ. আরো উল্লেখ করেন,
وَأَمَّا شَرَائِطُ الرُّكْنِ فَمِنْهَا أَنْ تَكُونَ التَّسْمِيَةُ مِنْ الذَّابِحِ حَتَّى لَوْ سَمَّى غَيْرُهُ وَالذَّابِحُ سَاكِتٌ وَهُوَ ذَاكِرٌ غَيْرُ نَاسٍ لَا يَحِلُّ؛ لِأَنَّ الْمُرَادَ مِنْ قَوْلِهِ ﵎ ﴿وَلا تَأْكُلُوا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ﴾ [الأنعام: ١٢١] أَيْ: لَمْ يُذْكَرْ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ مِنْ الذَّابِحِ فَكَانَتْ مَشْرُوطَةً فِيهِ…….(وَمِنْهَا) أَنْ يُرِيدَ بِهَا التَّسْمِيَةَ عَلَى الذَّبِيحَةِ فَإِنَّ مَنْ أَرَادَ بِهَا التَّسْمِيَةَ لِافْتِتَاحِ الْعَمَلِ لَا يَحِلُّ؛ لِأَنَّ اللَّهَ ﷾ أَمَرَ بِذِكْرِ اسْمِ اللَّهِ تَعَالَى عَلَيْهِ فِي الْآيَاتِ الْكَرِيمَةِ وَلَا يَكُونُ ذِكْرُ اسْمِ اللَّهِ عَلَيْهِ إلَّا وَأَنْ يُرَادَ بِهَا التَّسْمِيَةُ عَلَى الذَّبِيحَةِ، (المكتبة الشاملة)
جاء في "الهداية" (المكتبة الشاملة): ثم التسمية في ذكاة الاختيار تشترط عند الذبح وهي على المذبوح. وفي الصيد تشترط عند الإرسال والرمي وهي على الآلة، لأن المقدور له في الأول الذبح وفي الثاني الرمي والإرسال دون الإصابة فتشترط عند فعل يقدر عليه، حتى إذا أضجع شاة وسمى فذبح غيرها بتلك التسمية لا يجوز.
ফতোয়া শামী: (শামেলা ভার্সন):
وَفِيهَا (وَتُشْتَرَطُ) التَّسْمِيَةُ مِنْ الذَّابِحِ (حَالَ الذَّبْحِ) أَوْ الرَّمْيِ لِصَيْدٍ أَوْ الْإِرْسَالِ أَوْ حَالَ وَضْعِ الْحَدِيدِ لِحِمَارِ الْوَحْشِ إذَا لَمْ يَقْعُدْ عَنْ طَلَبِهِ كَمَا سَيَجِيءُ.
(وَالْمُعْتَبَرُ) (الذَّبْحُ عَقِبَ التَّسْمِيَةِ قَبْلَ تَبَدُّلِ الْمَجْلِسِ) حَتَّى لَوْ أَضْجَعَ شَاتَيْنِ إحْدَاهُمَا فَوْقَ الْأُخْرَى فَذَبَحَهُمَا ذَبْحَةً وَاحِدَةً بِتَسْمِيَةٍ وَاحِدَةٍ حَلَّا، بِخِلَافِ مَا لَوْ ذَبَحَهُمَا عَلَى التَّعَاقُبِ لِأَنَّ الْفِعْلَ يَتَعَدَّدُ فَتَتَعَدَّدُ التَّسْمِيَةُ ذَكَرَهُ الزَّيْلَعِيُّ فِي الصَّيْدِ، وَلَوْ سَمَّى الذَّابِحُ ثُمَّ اشْتَغَلَ بِأَكْلٍ أَوْ شُرْبٍ ثُمَّ ذَبَحَ، إنْ طَالَ وَقَطَعَ الْفَوْرَ حَرُمَ وَإِلَّا لَا، وَحَدُّ الطُّولِ مَا يَسْتَكْثِرُهُ النَّاظِرُ، وَإِذَا حَدَّ الشَّفْرَةَ يَنْقَطِعُ الْفَوْرُ بَزَّازِيَّةٌ.
وفيه أيضا بعد استر : (قَوْلُهُ مِنْ الذَّابِحِ) أَرَادَ بِالذَّابِحِ مُحَلِّلَ الْحَيَوَانِ لِيَشْمَلَ الرَّامِيَ وَالْمُرْسِلَ وَوَاضِعَ الْحَدِيدِ اهـ ح. وَاحْتَرَزَ بِهِ عَمَّا لَوْ سَمَّى لَهُ غَيْرُهُ فَلَا تَحِلُّ كَمَا قَدَّمْنَاهُ وَشَمِلَ مَا إذَا كَانَ الذَّابِحُ اثْنَيْنِ، فَلَوْ سَمَّى أَحَدُهُمَا وَتَرَكَ الثَّانِي عَمْدًا حُرِّمَ أَكْلُهُ كَمَا فِي التَّتَارْخَانِيَّة، وَسَيَذْكُرُهُ لُغْزًا مَعَ جَوَابِهِ نَظْمًا فِي آخِرِ الْأُضْحِيَّةَ (قَوْلُهُ حَالَ الذَّبْحِ إلَخْ) قَالَ فِي الْهِدَايَةِ: ثُمَّ التَّسْمِيَةُ فِي ذَكَاةِ الِاخْتِيَارِ تُشْتَرَطُ عِنْدَ الذَّبْحِ، وَهِيَ عَلَى الْمَذْبُوحِ وَفِي الصَّيْدِ تُشْتَرَطُ عِنْدَ الْإِرْسَالِ وَالرَّمْيِ، وَهِيَ عَلَى الْآلَةِ حَتَّى إذَا أَضْجَعَ شَاةً وَسَمَّى وَذَبَحَ غَيْرَهَا بِتِلْكَ التَّسْمِيَةِ لَا يَجُوزُ، وَلَوْ رَمَى إلَى صَيْدٍ وَسَمَّى وَأَصَابَ غَيْرَهُ حَلَّ، وَكَذَا فِي الْإِرْسَالِ، وَلَوْ أَضْجَعَ شَاةً وَسَمَّى ثُمَّ رَمَى بِالشَّفْرَةِ وَذَبَحَ بِأُخْرَى أُكِلَ، وَإِنْ سَمَّى عَلَى سَهْمٍ ثُمَّ رَمَى بِغَيْرِهِ صَيْدًا لَا يُؤْكَلُ اهـ (قَوْلُهُ إذَا لَمْ يَقْعُدْ عَنْ طَلَبِهِ) قَيْدٌ فِي الْمَسَائِلِ الثَّلَاثِ ا
আধুনিক জাবাই পদ্ধতি তথা রোবট বা মেশিনের জবাইয়ের মাসআলার সাথে ইমাম ইবনে আবিদীন শামি রাহ এর এই ইবারতটি বেশ সঙ্গতিপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ: কারণ তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, —
(قوله من الذابح) أراد بالذابح محلل الحيوان ليشمل الرامي والمرسل وواضع الحديد... واحترز به عما لو سمى له غيره فلا تحل... )
বিসমিল্লাহ “জবাইকারী”র পক্ষ থেকেই হতে হবে; অন্য কেউ তার পক্ষ থেকে বিসমিল্লাহ বললেও তা যথেষ্ট হবে না।
সম্মানিত দ্বীনি ভাই/বোন!
ওপরের বিবরণ থেকে আশা করছি আপনি স্পষ্টই বুঝতে পেরেছেন, যদি রোবটের মাধ্যমে জবাইয়ের সময় প্রতিটি প্রাণীর গলায় ছুরি লাগানোর সময় রোবটের মুসলিম পরিচালক বিসমিল্লাহ বলে সুইচ অন করে তাহলে সেই জবাই এবং কুরবানী সহিহ হবে।
পক্ষান্তরে যদি রোবটকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং তাতে কোনো মুসলিমের নিয়ন্ত্রন না থাকে, সাথে সাথে প্রতিটি পশু জবাইয়ের শুরুতে/সুইচ অন করার সময় বিসমিল্লাহ বলা না হয় বরং আগে থেকে প্রোগ্রাম সেট করে দেওয়া হয় এবং প্রোগ্রামিংয়ের কারণে রোবট নিজে একের পর এক পশু জবাই করতে থাকে তাহলে। সেই জবাই এবং কুরবানী কোনোটিই সহিহ হবে না।
পরামর্শ: কুরবানি যেহেতু একটি ইবাদত, তাই রোবট বা স্বয়ংক্রিয় মেশিনের মতো নতুন পদ্ধতির পরিবর্তে সম্ভব হলে নিজ হাতে কুরবানি করা অথবা কোনো যোগ্য মুসলিম ব্যক্তিকে দিয়ে জবাই করানোই উত্তম ও অধিক নিরাপদ পদ্ধতি। এতে জবাইয়ের শরঈ শর্ত, বিশেষত বিসমিল্লাহ ও জবাইকারীর ভূমিকা নিয়ে কোনো সংশয় থাকে না।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন