কুরআন-হাদীসে পুরুষবাচক সম্বোধন দ্বারা নারী-পুরুষ উভয়কে বোঝানোর কারণ
প্রশ্নঃ ১৭৩৫৫৬. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, কোরআনে কিংবা হাদিসে অনেক আদেশ উপদেশের ক্ষেত্রে শুধু مذكر ( পুংলিঙ্গ)- এর সীগাহ ব্যবহার করা হয়েছে যেমন : اقىموا الصلاة اتوا الزكاة ইত্যাদি তবুও এগুলো দ্বারা মহিলারা আদেশপ্রাপ্ত, তাদের উপরও এগুলো আবশ্যক।এটা কিভাবে? (একজন আমাকে এরূপ প্রশ্ন করেছে, আমি উত্তর দিতে সক্ষম হইনি।)
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
উত্তর:
কুরআন ও হাদীসে অনেক ক্ষেত্রে পুরুষবাচক শব্দ (مذكر) ব্যবহার করে সম্বোধন করা হয়েছে। যেমন:
وَاَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتُوا الزَّکٰوۃَ وَارۡکَعُوۡا مَعَ الرّٰکِعِیۡنَ
এবং তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত আদায় কর ও রুকূ‘কারীদের সাথে রুকূ‘ কর। -সূরা বাকারা, আয়াত ৪৩
এখানে পুরুষবাচক শব্দ ব্যবহার করা হলেও নারীরাও নামায কায়েম ও যাকাত প্রদানের আদেশের অন্তর্ভুক্ত। এর কারণ হলো, আরবি ভাষার একটি স্বীকৃত নিয়ম হচ্ছে, পুরুষ ও নারী উভয়কে একসঙ্গে সম্বোধন করতে হলে সাধারণত পুরুষবাচক শব্দ ব্যবহার করা হয়। আরবি ব্যাকরণে এই নিয়মকে تغليب (তাগলীব) বলা হয়।
বিষয়টি কয়েকটি দিক থেকে বোঝা যায়:
১. আরবি ভাষায় পুরুষবাচক শব্দ নারী-পুরুষ উভয়কে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে
আরবি ভাষায় পুরুষ ও নারী একসঙ্গে উপস্থিত থাকলে পুরুষবাচক শব্দ ব্যবহার করা হয়। এটি কেবল কুরআনের বিশেষ কোনো নিয়ম নয়; বরং আরবি ভাষার সাধারণ ও স্বীকৃত রীতি।
যেমন, কোনো শিক্ষক যদি ছাত্র ও ছাত্রী উভয়কে বলেন: اجلسوا (তোমরা বসো), তাহলে এই পুরুষবাচক শব্দের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রী সবাইকে বোঝানো হয়।
তাই কুরআনে পুরুষবাচক শব্দ ব্যবহৃত হলেই শুধু পুরুষদের উদ্দেশ্য করা হয়েছে- এমনটি মনে করা সঠিক নয়।
২. শরিয়তের বিধান নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য, যদি বিশেষ কোনো দলিল দ্বারা কাউকে পৃথক করা না হয়। শরিয়তের বিধান নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য- এটাই মূলনীতি। কোনো বিধান যদি বিশেষভাবে পুরুষ বা নারীর জন্য নির্ধারিত হয়, তাহলে দলিলের মাধ্যমে তা পৃথক হবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّمَا النِّسَاءُ شَقَائِقُ الرِّجَالِ
“নারীরা পুরুষদেরই সমতুল্য।” -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ২৩৬
অর্থাৎ, শরিয়তের বিধান ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ মূলত একই বিধানের অন্তর্ভুক্ত। তবে যে বিধান দলিলের মাধ্যমে বিশেষভাবে নারী বা পুরুষের জন্য নির্ধারিত হয়েছে, তা আলাদা।
৩. কুরআন নিজেই নারী-পুরুষ উভয়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করেছে
আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِنْكُمْ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَىٰ بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ
“তাদের রব তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে বলেন, ‘আমি তোমাদের কোনো আমলকারীর আমল নষ্ট করি না, সে পুরুষ হোক কিংবা নারী। তোমরা একে অপরের অংশ।” -সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯৫
এ আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আল্লাহর কাছে আমল ও প্রতিদানের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ই অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً
“পুরুষ বা নারী যে-ই সৎকর্ম করবে, যদি সে মুমিন হয়, তবে আমি অবশ্যই তাকে পবিত্র জীবন দান করব।” -সূরা নাহল, আয়াত: ৯৭
আবার আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ ... أَعَدَّ اللَّهُ لَهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
“নিশ্চয় মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী ... তাদের জন্য আল্লাহ ক্ষমা ও মহাপুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন।” -সূরা আহযাব, আয়াত: ৩৫
এ আয়াতে আল্লাহ নারী-পুরুষ উভয়ের কথা পৃথকভাবে উল্লেখ করেছেন, যাতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।
৪. কুরআনে কখনো পুরুষবাচক শব্দ দ্বারা নারীদেরও বোঝানো হয়েছে
আল্লাহ তাআলা মারইয়াম (আ.)-এর ব্যাপারে বলেন:
وَارْكَعِي مَعَ الرَّاكِعِينَ
“তুমি রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু করো।” -সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৪৩
এখানে الرَّاكِعِينَ (রুকুকারীরা) পুরুষবাচক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, অথচ সম্বোধন করা হয়েছে একজন নারীকে। এটি আরবি ভাষার تغليب (তাগলীব)-এর একটি উদাহরণ।
একইভাবে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَكَانَتْ مِنَ الْقَانِتِينَ
“তিনি (মারইয়াম) অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।” -সূরা তাহরীম, আয়াত: ১২
এখানেও নারীর ক্ষেত্রে পুরুষবাচক বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে।
আবার রানী বিলকিস সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّهَا كَانَتْ مِنْ قَوْمٍ كَافِرِينَ
“নিশ্চয়ই সে (বিলকিস) কাফির সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল।” -সূরা নামল, আয়াত: ৪৩
এখানে كَافِرِينَ (কাফিরগণ) পুরুষবাচক বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে, অথচ প্রসঙ্গটি একজন নারীকে নিয়ে।
একইভাবে আযীযের স্ত্রীর ব্যাপারে বলা হয়েছে:
وَاسْتَغْفِرِي لِذَنْبِكِ إِنَّكِ كُنْتِ مِنَ الْخَاطِئِينَ
“তুমি তোমার পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তুমি অপরাধীদের অন্তর্ভুক্ত।” -সূরা ইউসুফ, আয়াত: ২৯
এখানে الْخَاطِئِينَ (অপরাধীরা) পুরুষবাচক বহুবচন, অথচ সম্বোধন করা হয়েছে একজন নারীকে।
এগুলো থেকে বোঝা যায়, আরবি ভাষায় পুরুষবাচক শব্দ নারীকে বোঝানোর ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়। তাই কুরআনে পুরুষবাচক শব্দের ব্যবহার দ্বারা নারীদের বিধানের বাইরে রাখা হয়েছে¬- এমন ধারণা সঠিক নয়।
সারকথা
কুরআন-হাদীসে পুরুষবাচক শব্দ ব্যবহার করা মানেই শুধু পুরুষদের সম্বোধন করা নয়। আরবি ভাষার নিয়ম অনুযায়ী পুরুষবাচক শব্দ নারী-পুরুষ উভয়কে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। শরিয়তের মূলনীতি হলো, কোনো বিধান নারী বা পুরুষের জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত না হলে তা উভয়ের জন্য প্রযোজ্য।
সুতরাং أَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ-এর মতো পুরুষবাচক সম্বোধনের মাধ্যমে নারী-পুরুষ উভয়কেই নামায কায়েম ও যাকাত প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে নারীদের প্রতি কোনো অবমূল্যায়ন নেই; বরং এটি আরবি ভাষার স্বাভাবিক ও স্বীকৃত প্রকাশভঙ্গি।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন