রুপক ভাষা বা রহস্য ভাষা বা সাঙ্কেতিক ইঙ্গিত। বাউল মতবাদ। পর্ব—৪১
রুপক ভাষা বা রহস্য ভাষা বা সাঙ্কেতিক ইঙ্গিত। বাউল মতবাদ। পর্ব—৪১
মূলত বাউল ধর্মে রুপক ভাষা, রহস্য ভাষা বা সাঙ্কেতিক ইঙ্গিত ব্যবহার করা হয় আধ্যাত্মিকতার আড়ালে যৌনচর্চাকে গোপন রাখার কৌশলগত কারণে। এ সম্পর্কে লালন একাডেমির সাবেক পরিচালক ডক্টর আনোয়ারুল করীম লিখেছেন—
মূলতঃ বিকৃত যৌনাচারে অভ্যস্ত ভেকধারী এসব বাউলরা তাদের বিকৃত ও কুৎসিত জীবনাচারণকে লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখার জন্য বিভিন্ন গানে মোকাম, মঞ্জিল, আল্লাহ, রাসূল, আনল হক, আদম-হাওয়া, মুহাম্মদ- খাদিজাসহ বিভিন্ন আরবী পরিভাষা, আরবী হরফ ও বাংলা শব্দ প্রতীকরূপে ইচ্ছাকৃতভাবেই ব্যবহার করেছে। এদেশে বহুল প্রচলিত একটি লালন সঙ্গীত হলো, “বাড়ির পাশে আরশি নগর/সেথা এক পড়শী বসত করে, আমি একদিনও না দেখিলাম তারে” এই গানটিকে আমাদের সমাজে খুবই উচ্চমার্গের আধ্যাতিক গান মনে করা হলেও, এটি মূলত একটি নিছক যৌনাচারমূলক গান, যাতে আরশিনগর, পড়শী শব্দগুলো প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে তাদের বিকৃত জীবনাচারকে গোপন রাখার উদ্দেশ্যে। —(বাংলাদেশের বাউল পৃ. ৩৬৮-৩৬৯)
উউপরিউক্ত লেখা থেকে বুঝতে পারলাম—বাউলদের রুপক ভাষা, রহস্য ভাষা বা সাঙ্কেতিক ইঙ্গিত মূলত যৌনচর্চার একটি বড় মাধ্যম। কারণ, বাউল মতবাদ পুরোটাই যৌনতা আর লিপ্সায় মোড়ানো। এজন্য ডক্টর আনোয়ারুল করীম আরো লিখেছেন—
পশ্চিমবাংলায় হিন্দু, বৌদ্ধ ও বৈষ্ণব সমাজে কামসাধনা তাদের ধর্মের অঙ্গ। সুতরাং এসব কর্মকাণ্ডে সামাজিক কোনো প্রতিরোধ আসে না । সে অঞ্চলের মুসলমান নামধারী সাধকেরাও নির্বিঘ্নে নিজেদের মধ্যে সাধনপ্রণালী অনুসরণ করেন। কিন্তু বাংলাদেশে ইসলামের নৈতিকতা এবং মুসলিম আধিক্য হওয়ায় এই সাধনা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গুপ্তভাবে করা হয়। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ৩৯১)
দেহবাদের আড়ালে সমাজে যৌনাচারমূলক কর্মকাণ্ডকে একশ্রেণীর মানুষ ধর্মীয় চেতনা হিসেবে লালন করে আসছে। এরা সমাজে বিবাহবন্ধনকেও অস্বীকার করে নারী-পুরুষের একত্রে মেলামেশা, বসবাসকে (Living together) দর্শন হিসেবে অনুসরণ করে আসছে। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ২৪)
যৌনাচার এই (বাউল) সাধনার অপরিহার্য অঙ্গ। বাউল তার সামগ্রিক সাধনায় যৌনাচারকে প্রেমাচারে পরিণত করে সাধনায় সিদ্ধি লাভ করতে চেয়েছে। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ৩৯০)
লালন-পাঞ্জু অনুসারীদের সাধন-ভজন দেহকেন্দ্রিক এবং যৌনপ্রক্রিয়াজাত। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ২০)
যাইহোক, আমরা বুঝতে পারলাম—লালন মতবাদ বা বাউল ধর্মের মৌলিক মিশনের মধ্যে অন্যতম হলো যৌনচর্চাকে বৈধতা দেওয়া। আর এ কাজটি তারা লোকচক্ষুর আড়ালে রাখার জন্য রূপক ভাষা, রহস্য ভাষা বা সাংকেতিক ইঙ্গিত ব্যবহার করে।
লালন একাডেমির সাবেক পরিচালক ডক্টর আনোয়ারুল করীম-এর “বাংলাদেশের বাউল” গ্রন্থ থেকে কিছু নমুনা নিম্নে উপস্থাপন করা হল—
জ্যান্তে মরা, জীবস্মৃত বা ভেক-খিলাফত’ধারী : আমি বাউল ফকিরদের সঙ্গে দীর্ঘবছর মেলামেশার মাধ্যমে যা জেনেছি তা হলো, এই সাধনার অনুসারীদেরকে রতিনিরোধ কিংবা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে গুরু নিজেই তাদের শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ দেন। রতিনিরোধের একটি সাধনভাষা আছে, তা হলো ‘জ্যান্তে মরা'। একে বলা হয় জীবস্মৃত। বাউলেরা যখন দীক্ষা নেয় তখন তাকে বলা হয়—“তুমি আজ থেকে নিজেকে মৃত জানবে। কিন্তু তোমার কোনো সাধন প্রক্রিয়া থেমে থাকবে না। তোমার কোনো সংসার থাকবে না। তুমি কোনো সন্তানের পিতা-মাতা হতে পারবে না। তুমি সমাজেও ফিরে যাবে না। শুধু ভিক্ষাবৃত্তি করে যা পাবে তা দিয়ে তোমাকে আর তোমার সেবাদাসীকে জীবন নির্বাহ করতে হবে। কোনো অভিযোগ করতে পারবে না।” এর পরে তাকে কাফন পরানো হয়। তখন তাদের অনেককে ক্রন্দনরত দেখেছি। এই প্রক্রিয়াকে সন্ন্যাসধর্মের সাথে তুলনা করা চলে। এই পর্যায়ের সাধনা যৌনাচারভিত্তিক। এই পথের অনুসারীদেরকে ‘ভেক-খিলাফত’ধারী বলা হয়। পরিধানে শ্বেতবস্ত্র এই পথের পথিকদের পরিচয় বহন করে। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ৩৯১-৩৯২)
চেতন গুরু, সাধনসঙ্গিনী বা সেবাদাসী : দেহসাধনায় নারীই প্রধান। এই নারীকে বাউল ‘চেতন গুরু' হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারণ দেহসাধনায় এই নারীর হাতেই মূল চাবিকাঠি। নারীকে বাউলের সাধনসঙ্গিনী এবং সেবাদাসী হিসেবেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ৩৭২)
সাধনসঙ্গিনীকেও ‘গুরু' নামে অভিহিত করা হয়। মূলত সাধনসঙ্গিনীর সক্রিয় সাহায্য ও সহযোগিতা ব্যতিরেকে সাধনায় সিদ্ধি লাভ করা যায় না। তাই তাকে ‘চেতনগুরু' বলা হয়। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ২১)
‘সেবাদাসী’ : বাউলসাধনায় অংশগ্রহণকারী মহিলা বা সেবাদাসী এ বিষয়ে তার যা যা করণীয় সবকিছুই গুরু কর্তৃক নির্দেশিত হয়। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ৩৯৩)
দেহপূজা : শক্তিনাথ ঝা তাঁর গ্রন্থে পশ্চিম বাংলার মুসলিম বাউলসাধকদের সাধনপ্রণালী উল্লেখ করেছেন। যেমন : “দেহমিলনের আগে সাধক-সাধিকা পরস্পরের দেহকে পূজা করবে। সাধক নারীদের পাঁচটি স্থান স্পর্শ করে সেখানে ‘সেজদা' দেবে।
প্রথম পায়ে প্রণাম। সেজদার মন্ত্র—
গুরু সত্য, মা সত্য, মার নামে জয় হোক, আমার মনের বাঞ্ছা পূর্ণ হোক ।
মা তুমি গতি তুমি রতি তুমি জীবের নিস্তারণ,
আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ কর খাদেম মোক্তারগণ
সেজদা দিলাম এখানে, সেজদা যায় মা বরকতের চরণে
এই সেজদা মূল, এই সেজদা কবুল কর আল্লা মহম্মদ রসুল ॥
দ্বিতীয় সেজদা মক্কায় (জন্মস্থানে); মন্ত্র—
খাতনে মা জিন্নাত জহুর হুশিয়ার
দিনহীনকে দ্বীন দিয়ে কর মা উদ্ধার।
ও মা বরকত দাউনদার
এই কাবাতে মারিফাতে আল্লাহো আকবার !
আল্লাওলি মহম্মদ কলি মা বরকত দাউনদার
এই কাবাতে মারিফাতে নিষ্ঠা করে সেজদা করি
আল্লাহু আকরব
... ... ...
আল্লা বীজ মহম্মদ ডাল
মাদার নাথ আমার বাঞ্ছা পূর্ণ কর দীননাথ। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ৩৯৮)
কারুণ্যরস, তারুণ্যরস, লাবণ্যরস : প্রসংগত উল্লেখযোগ্য, বাউলসাধনা এক অর্থে অখণ্ড সাধনা। অর্থাৎ যে নারী কুমারী এবং সন্তানবতী হয়নি তাকে নিয়ে বাউলদের মূল সাধনা। নারীর প্রথম ঋতুকালীন অবস্থা শেষ হবার পর যে রস নিঃসৃত হয় তাকে বাউলেরা ‘শাম্ভু রস' বলে গণ্য করে এবং তা পান করে থাকে। এই পানের যৌক্তিকতা সম্পর্কে তারা বলে যে, এই পানে তাদের বিন্দুর যেমন স্থৈর্য ঘটে, তেমনি তারা জরা ব্যাধি ইত্যাদির হাত থেকেও মুক্ত হয়। এর পরের সাধনা উল্টা সাধনা। অর্থাৎ পূর্ণচন্দ্রের আগমনে সাধক যখন নারীর সাথে মিলিত হয় তখন যোগ প্রক্রিয়ায় শ্বাস-প্রশ্বাসকে ঊর্ধ্বগতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় সাধক কারুণ্য, তারুণ্য এবং লাবণ্য রস আস্বাদন করে। কারুণ্যরস সাধনার প্রথমাবস্থায় রতিকে ঊর্ধ্বে অর্থাৎ ইড়া নাড়ির মাধ্যমে মস্তিষ্কে চালনা শিক্ষা করতে হয়। এই সাধনায় সিদ্ধিলাভ হলে সাধক তারুণ্য বা প্রেমের তারুণ্যরূপ অমৃতধারা সিক্ত হয়। এই সাধনা এক অর্থে বিন্দুর অটল অবস্থার সাধনা। দ্বিতীয় রস সাধনার নাম তারুণ্য। সাধক বিন্দুধারণে সমর্থ হলে প্রয়োজন মতে বিন্দুকে ঊর্ধ্বে উত্তোলন এবং পিঙ্গলা নাড়ির সহায়তায় নিম্নে আনয়নের সাধনা করেন। স্নায়ুপথে নিম্নে আগমনের কালে, জোয়ারের জলের মতো প্রবাহ পায় বলে এই রসধারাকে তারুণ্যরস বলা হয়। তৃতীয় রসসাধনার নাম লাবণ্য। এই সাধনায় সাধক ইচ্ছামতো ইড়া, পিঙ্গলা এবং সুষুম্নাপথে বিন্দুকে পরিচালিত করতে সমর্থ হয়। এই অবস্থা সাধকের জন্য মহানন্দের অবস্থা। অনেক সময় প্রকৃতি সংগম না করেও সাধক এই অবস্থা লাভ করতে সক্ষম হন। এই রসসাধনায় শরীরমন পুলকিত থাকে বলে এই রসসাধনার নাম লাবণ্য নামে চিহ্নিত করা হয়। এই কারুণ্য, তারুণ্য এবং লাবণ্য রসসাধনার অপর নাম প্রবর্ত, সিদ্ধ, সাধক ।
কোন্ রাগে সে মানুষ আছে মহারসের ধনী
পদ্মে মধু চন্দ্রে সুধা যোগায় রাত্রি দিনি
সাধক সিদ্ধ প্রবর্তগণ, রাগ ধরে আছে তিনজন,
এ তিন ছাড়া রাগ নিরূপণ কোথাও হয় না জানি। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ৩৭৫)
পাঁচ পেয়ালা' বা পঞ্চরস : রতিনিরোধ সম্পর্কে গোঁসাই চণ্ডীদাস তাঁর গানে উল্লেখ করেন,
চৌষট্টি রস রাগের কারণ, চব্বিশ ভেঙে নয়তে মিলন
সপ্তম ভেঙে পঞ্চম সাধন, তিন রস নিরূপণ॥
চৌষট্টি রস বলতে শৃঙ্গার বুঝানো হয়েছে। চব্বিশ বলতে ‘মাসিক’-এর ২৪ দিন অথবা ‘দেহের চব্বিশ চন্দ্র' এবং পঞ্চম বলতে পাঁচ ধরনের পানির গুণ যাকে সুফি বাউল 'পাঁচ পেয়ালা' বা পঞ্চরসের সাধনার কথা বলেছে। 'নয়' বলতে দেহের নবদ্বার, এই নয় দ্বার রুদ্ধ করে হাওয়া দমের মাধ্যমে মিলন অথবা মাসিক শুরু থেকে নয় দিনে মিলন। তিন রস অর্থে তারুণ্য, কারুণ্য এবং লাবণ্য। বাউলদের সাধনায় শুক্লপক্ষ অর্থাৎ মাসিক শেষের প্রথম ১৩ দিন, এর পর কৃষ্ণপক্ষ। শুক্লপক্ষ মিলন সাধনার জন্য অপরিহার্য। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ৩৮৪)
বি. দ্র.‘পাঁচ পেয়ালা’ বা পঞ্চরসের সাধনা বলতে বোঝানো হয়—মল, মূত্র, রিতু, বীর্য ও দুগ্ধ এই পাঁচটি পদার্থ একত্র করে পান করা। বাউলরা এ সাধনাকে ‘পাঁচ পেয়ালা’ বা পঞ্চরসের সাধনা বলে অভিহিত করে। যদিও এগুলো পান করলে মৃত্যু হয় না, তাদের বিশ্বাস, এমন করার ফলে লাশও পচে না।
দমসাধনা বা রতিনিরোধের সাধনা : ‘দমসাধনা’, অর্থাৎ শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে সন্তানধারণ না করাই হচ্ছে বাউল মতবাদের প্রধান রীতি। সে রীতি সঠিকভাবে অনুসরণ করতে পারলেই একজন বাউল প্রকৃত সাধক হিসেবে গণ্য হবেন। —(বাউলসাধনা, পৃ. ৩১)
নাড়ার ফকির : সাধারণ্যে এরা নাড়ার ফকির হিসেবে গণ্য হলেও বাউলেরা নিজেদেরকে ফকির এবং বাউল নামে চিহ্নিত করে। 'নাড়া' অর্থে এরা শাখাপত্রহীন এবং এদের কোনো সন্তানসন্ততি হয় না। তাদের অস্বাভাবিক জীবনাচরণের কারণে তারা সমাজ এবং গোত্রচ্যুত। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ২০)
এছাড়াও, বাউল সম্প্রদায় তাদের অসুস্থতা নিরাময়ে কিছু অরুচিকর ও নাপাক পানাহার ব্যবহার করে। এ ক্ষেত্রে তারা কিছু সাংকেতিক শব্দও ব্যবহার করে। যেমন—
স্তনদুগ্ধপান : বাউলদের মধ্যে স্তনদুগ্ধ (মহিলাদের স্তনের দুধ) পান করার রেওয়াজ আছে। আমি বেশ কয়েকজন বাউলকে জানি তারা তাদের শিষ্যদের থেকে স্তনদুগ্ধ সংগ্রহ করে তা নিয়মিত পান করেছে। ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়াবাড়িতে বাউলদের একজন যক্ষ্মারোগী সে নিয়মিত স্তনদুগ্ধ পান করে অনেকদিন বেঁচেছিল। বাউলদের মধ্যে সর্বরোগ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ৪০৮)
মূত্রপান : জ্বর ইত্যাদিতে স্বীয় মূত্র শরীরে লেপনের বিষয়ও বাউলসমাজে প্রচলিত। এতে নিরাময় হয়ে থাকে। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ৪০৮)
স্বীয় প্রস্রাব মাটিতে মিশিয়ে তা কপালে বা গায়ে মাখালে মাথাব্যথা, গা ব্যথা এবং জ্বরাদির উপশম হয়। বাউলদের মধ্যে এমন ধারণা আছে শুক্রকে স্খলনের মুহূর্তে ঊর্ধ্বে ওঠাতে সক্ষম হলে অজর যৌবনলাভ সম্ভব হয়। চারিচন্দ্র অর্থাৎ মল, মূত্র, রজঃ, বীর্য একত্রে মিশিয়ে গায়ে মাখালে চর্মরোগ হয় না—এমন ধারণা আছে বাউলদের। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ৪০৮)
স্বীয় বীর্যপান : রতিনিরোধে স্বীয় বীর্যপান বাউলদের মধ্যে বহুল প্রচলিত। বাউলেরা বিশ্বাস করে এতে দেহের অভ্যন্তরে নানা রোগ দূরীভূত হয় এবং দেহ লাবণ্যময় হয়। এ ছাড়াও বীর্যপানে বীর্যস্খলন সহজে হয় না। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ৪০৮)
অখণ্ডপান বা রজঃপান : নারীর রজঃ পান বাউলদের মধ্যে নিত্যনৈতিক ঘটনা। বাউলেরা বিশ্বাস করে যে রজঃ পানে দোষ মুক্ত হয় এবং শরীরে রোগ প্রতিরোধক তৈরি হয়। অখণ্ড পান বলতে কিশোরী বা কুমারী মেয়ের রজঃ পানকে বোঝানো হয়েছে। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ৪০৮)
বাউলসাধনায় নারীরা পুরুষের বীর্য পান করে না। তা নিজ অধরে ধরে এবং পুরুষ তা পান করে নেয়। লালনের একটি গানে আছে :
ধরবে অধর চাঁদেরে অধরে অধর দিয়ে, অধরচাঁদ অর্থে বাউলের ‘সাঁই’। তিনি রজঃ-বীর্যে অবস্থান করেন। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ৩৯৪)
শৃঙ্গাররস : কোনো কোনো বাউলের এমন ধারণা আছে যে, মাসিক শেষে চন্দ্রের আবির্ভাবকালে যে শৃঙ্গাররস নিঃসৃত হয় তা পান করলে অটলত্ব প্রাপ্তি ঘটে। এই রসকে সাধকদের ভাষায় অমৃতরস বলা হয়। এই রস পান করলে বীর্য সহজে স্খলিত হয় না বলে কোনো কোনো বাউল বিশ্বাস করেন। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ৩৮২)
চারিচন্দ্র বা প্রেমভাজা : এ সাধন-পদ্ধতিতে অনেক বাউল ‘চারিচন্দ্র’ অর্থাৎ, শোণিত, চক্র, মল, মূত্র— দেহনির্গত ওই চারটি পদার্থকে পরিত্যাগ না করে গ্রহণ করে থাকেন। —(বাউল সাধনা, পৃ. ৩১)
চারিচন্দ্র অর্থাৎ মল, মূত্র, রজঃ, বীর্য মিশ্রণে একপ্রকার পদার্থ তৈরি করে তা ‘প্রেম ভাজা' নামে ভক্ষণের রীতি বাউলসমাজে আছে। এই চারিচন্দ্র সমগ্র শরীরে, কপালে, বুকে, পিঠে, মাথায় মর্দন করাও হয়ে থাকে। স্বীয় প্রস্রাব মাটিতে মিশিয়ে তা কপালে বা গায়ে মাখালে মাথাব্যথা, গা ব্যথা এবং জ্বরাদির উপশম হয়। বাউলদের মধ্যে এমন ধারণা আছে শুক্রকে স্খলনের মুহূর্তে ঊর্ধ্বে ওঠাতে সক্ষম হলে অজর যৌবনলাভ সম্ভব হয়। চারিচন্দ্র অর্থাৎ মল, মূত্র, রজঃ, বীর্য একত্রে মিশিয়ে গায়ে মাখালে চর্মরোগ হয় না—এমন ধারণা আছে বাউলদের। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ৪০৮)
আল্লাহ তাআলা এই সব নোংড়ামী ও যৌনচর্চা থেকে মুসলিম মিল্লাতকে হেফাজত করেন। মনে রাখতে হবে—মহান আল্লাহ সমস্ত অন্যায় যৌনতার ধারেকাছেও যেতে নিষেধ করে বলেন,
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
এবং ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীলতা ও বিপথগামিতা। —(সুরা ইসরা : ৩২)
বি. দ্র. বাউল সম্প্রদায়ের যৌনতা নিয়ে আলাদা একটি বই লিখব, ইনশাআল্লাহ। এ কারণে এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়নি। আফওয়ান।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
কুরআনের তাফসীর পড়া যাবে না! হেযবুত তওহীদ পর্ব–১৭
যদি কেউ বড় শিক্ষিত হয়, তবে তার বক্তব্য বুঝতে হলে নিশ্চয় জ্ঞানী হতে হয়, অথবা জ্ঞানীদের থেকে বুঝে নিতে...
মুফতী রিজওয়ান রফিকী
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
৫৫৪১
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন