যাকাত ফরজ হওয়া সত্ত্বেও গড়িমসি করা
প্রশ্নঃ ১৩৬৩১৮. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমার ডিভোর্স হয়নি। এক মেয়ে সন্তান আছে। সামান্য বেতন। উপহার হিসেবে পাওয়া নিসাব পরিমাণের চেয়ে বেশি স্বর্ণ আছে। এছাড়া আমার তেমন কিছু নেই। স্বর্ণের দাম অনেক বেশি। এমতাবস্থায় বেতন সীমিত হওয়ার কারণে যাকাত আদায় করা আমার জন্য কষ্টকর। আমি কি করতে পারি?
৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
ঢাকা
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
যাকাতের মূল বিধান
যাকাত শরিয়তের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরয বিধান। নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের উপর যাকাত আদায় করা ফরয। সুতরাং আপনি যেহেতু নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক (বরং তারচেয়ে বেশি) তাই আপনার উপর যাকাত ফরয। যে কোন ভাবেই হোক এ ফরয বিধান আদায় করতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনে স্বর্ণ বিক্রি করে হলেও যাকাত দিতে হবে। মোটকথা নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের (যেমন আপনি) যাকাত আদায় না করার কোন সুযোগ নেই। আর স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির কারণে তো সম্পদ বেড়েছে। এজন্য শুকরিয়া আদায় হিসেবে তো যাকাত আদায়ের পাশাপাশি আরও বেশি দান করা উচিত।
মূল বিধান জানার পাশাপাশি নিচের বিষয়গুলো ধৈর্য্যের সাথে মনোযোগ দিয়ে পড়লে যাকাতের গুরুত্ব ও ফযীলত সম্পর্কে জানতে পারবেন। ফলে আপনি যাকাত আদায়ের প্রতি অনুপ্রাণিত হবেন ইনশাআল্লাহ।
যাকাতের গুরুত্ব
অসংখ্য আয়াতের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা সালাত আদায়ের সাথে যাকাতও আদায় করার কথা বলেছেন।
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ.
এবং সালাত কায়েম কর ও যাকাত আদায় কর। আর (স্মরণ রেখ) তোমরা যে কোনও সৎকর্ম কল্যাণার্থে সম্মুখে প্রেরণ করবে, আল্লাহর কাছে তা পাবে। নিশ্চয়ই তোমরা কে কোনও কাজ কর আল্লাহ তা দেখছেন। -সূরা বাকারা, আয়াত নং ১১০
আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন-
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ.
তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত আদায় কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমাদের প্রতি দয়া করা হয়। -সূরা নূর, আয়াত নং ৫৬
যাকাত মূলত গরিব অসহায়দের হক বা অধিকার। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
ﵟوَفِيٓ أَمۡوَٰلِهِمۡ حَقّٞ لِّلسَّآئِلِ وَٱلۡمَحۡرُومِ 19ﵞ
আর তাদের ধন-সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতের হক। -সূরা যারিয়াত, আয়াত নং ১৯
অন্য এক আয়াতে মু্ত্তাকীদের পরিচয় দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
ﵟٱلَّذِينَ يُؤۡمِنُونَ بِٱلۡغَيۡبِ وَيُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ وَمِمَّا رَزَقۡنَٰهُمۡ يُنفِقُونَ ﵞ [البقرة: 3]
যারা অদৃশ্য বিষয়ের উপর ঈমান রাখে এবং সালাত আদায় করে এবং আমি তাদেরকে যা কিছু দিয়েছি, তা থেকে (আল্লাহর সন্তোষজনক কাজে) ব্যয় করে।
যাকাত আদায়ের ফযীলত
যাকাত বা যে কোন দান সদকা করলে আল্লাহ সম্পদ বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
ﵟيَمۡحَقُ ٱللَّهُ ٱلرِّبَوٰاْ وَيُرۡبِي ٱلصَّدَقَٰتِۗﵞ [البقرة: 276]
আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান-সদকাকে বর্ধিত করেন। -সূরা বাকারা, আয়াত নং ২৭৬
অপর আয়াতে আল্লাহ বলেন-
ﵟمَّثَلُ ٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمۡوَٰلَهُمۡ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنۢبَتَتۡ سَبۡعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنۢبُلَةٖ مِّاْئَةُ حَبَّةٖۗ وَٱللَّهُ يُضَٰعِفُ لِمَن يَشَآءُۚ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٌ 261 ﵞ [البقرة: 261]
যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন সম্পদ ব্যয় করে, তাদের দৃষ্টান্ত এ রকম, যেমন একটি শস্য দানা সাতটি শীষ উৎপাদন করে, প্রত্যেক শীষে একশত শস্যদানা জন্মায়। আর আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন (সাওয়াব) কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় এবং সর্বজ্ঞ। -সূরা বাকারা, আয়াত নং ২৬১
যাকাত না দেওয়ার শাস্তি
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
ﵟوَٱلَّذِينَ يَكۡنِزُونَ ٱلذَّهَبَ وَٱلۡفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ فَبَشِّرۡهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٖ 34 يَوۡمَ يُحۡمَىٰ عَلَيۡهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكۡوَىٰ بِهَا جِبَاهُهُمۡ وَجُنُوبُهُمۡ وَظُهُورُهُمۡۖ هَٰذَا مَا كَنَزۡتُمۡ لِأَنفُسِكُمۡ فَذُوقُواْ مَا كُنتُمۡ تَكۡنِزُونَ 35 ﵞ
যারা সোনা-রূপা পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদেরকে যন্ত্রণাময় শাস্তির ‘সুসংবাদ’ দাও।
যে দিন সে ধন-সম্পদ জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে, তারপর তা দ্বারা তাদের কপালে, তাদের পাঁজর ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে (এবং বলা হবে) এই হচ্ছে সেই সম্পদ, যা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জীভূত করতে। সুতরাং তোমরা যে সম্পদ পুঞ্জীভূত করতে, তার মজা ভোগ কর। -সূরা তাওবা, আয়াত নং ৩৪-৩৫
বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
عن عمرو بن شعيب، أن امرأةً أتت رسولَ الله صلى الله عليه وسلم ومعها ابنة لها، وفي يدِ ابنتها مُسْكَتان غليظَتانِ مِنْ ذهبٍ، فقال لها: "أتعطين زكاة هذا؟ " قالت: لا، قال: "أيَسُرُّكِ أن يسوِّرَك الله بهما يومَ القيامَةِ سوارَينِ مِن نار؟ " قال: فخلعتهُما فألقَتهُما إلى النبي صلى الله عليه وسلم، وقالت: هُما لله ولرسوله
আমর ইবনু শু‘আইব রা. হতে বর্ণিত, এক মহিলা তার কন্যাসহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে আসলেন। তার কন্যার হাতে মোটা দু’টি স্বর্ণের বালা ছিল। তিনি তাকে বললেন, তুমি কি এর যাকাত দাও? মহিলাটি বললেন, না। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি পছন্দ কর যে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা এর পরিবর্তে তোমাকে এক জোড়া আগুনের বালা পরিধান করান? বর্ণনাকারী বলেন, একথা শুনে মেয়েটি তার হাত থেকে তা খুলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা সামনে রেখে দিয়ে বলল, এ দু’টি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৫৬৩
হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা. বলেন,
دَخَلَ عَلَىَّ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَرَأَى فِيْ يَدِيْ فَتَخَاتٍ مِنْ وَرِقٍ فَقَالَ مَا هَذَا يَا عَائِشَةُ فَقُلْتُ صَنَعْتُهُنَّ أَتَزَيَّنُ لَكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ قَالَ أَتُؤَدِّيْنَ زَكَاتَهُنَّ قُلْتُ لاَ أَوْ مَا شَاءَ اللهُ قَالَ هُوَ حَسْبُكِ مِنَ النَّارِ-
একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট উপস্থিত হয়ে আমার হাতে রূপার বড় বড় আংটি দেখতে পান এবং বলেন, হে আয়েশা! এটা কী? আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার উদ্দেশ্যে সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্য তা তৈরী করেছি। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি এর যাকাত দাও? আমি বললাম, না অথবা আল্লাহর যা ইচ্ছা ছিল। তিনি বললেন, তোমাকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৫৬৫
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ يَزِيْدَ قَالَتْ دَخَلْتُ أَنَا وَخَالَتِيْ عَلَى النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم وَعَلَيْهَا أَسْوِرَةٌ مِنْ ذَهَبٍ فَقَالَ لَنَا أَتُعْطِيَانِ زَكَاتَهُ قَالَتْ فَقُلْنَا لاَ قَالَ أَمَا تَخَافَانِ أَنْ يُسَوِّرَكُمَا اللهُ أَسْوِرَةً مِنْ نَارٍ أَدِّيَا زَكَاتَهُ-
আসমা বিনতে ইয়াযীদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ও আমার খালা হাতে স্বর্ণের বালা পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে প্রবেশ করলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বললেন, তোমরা কি এর যাকাত দাও? তিনি বলেন, তখন আমরা বললাম, না। তখন তিনি বললেন, ‘তোমরা কি ভয় কর না যে, এর পরিবর্তে আল্লাহ তা‘আলা আগুনের বালা পরিধান করাবেন! সুতরাং তোমরা যাকাত আদায় কর’। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২৭৬১৪
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুহাম্মাদ আশরাফুল আলম
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১