সন্তানের প্রতি পিতা মাতার এবং পিতা মাতার প্রতি সন্তানের হকসমূহ
প্রশ্নঃ ১৬৩৭৪২. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, পিতা মাথার উপর সন্তানের হক ও সন্তানের প্রতি পিতা মাতার হক সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবেন ।
৭ আগস্ট, ২০২৬
ঢাকা
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
ইসলামে পিতা-মাতা ও সন্তানের মধ্যে হক (অধিকার) দ্বিমুখী — একে অপরের প্রতি নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও অধিকার আরোপিত। নিম্নে সংক্ষেপে কিছু হক সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে :
সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার হক (দায়িত্ব)
১. জন্মের প্রাথমিক পর্যায়ে
ক. জন্মের পর ডান কানে আজান ও বাম কানে ইকামত দেওয়া (মুস্তাহাব)।
খ. সপ্তম দিনে আকিকা করা।
গ. সুন্দর ও অর্থবহ নাম রাখা — রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন মানুষকে তার নাম ও পিতার নাম ধরে ডাকা হবে, তাই ভালো নাম রাখা জরুরি।
ঘ. মাথা মুণ্ডন করে চুলের ওজন সমপরিমাণ রূপা সদকা করা (মুস্তাহাব)।
২. লালন-পালন ও ভরণপোষণ
ক. খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা — এটা পিতার উপর ওয়াজিব দায়িত্ব। সন্তান স্বাবলম্বী না হওয়া পর্যন্ত (বা মেয়ে সন্তানের বিবাহ পর্যন্ত) এই দায়িত্ব বহাল থাকে।
খ. ন্যায়সঙ্গত আচরণ — ছেলে-মেয়ে, একাধিক সন্তানের মধ্যে সমান আচরণ ও উপহার-সম্পত্তি বণ্টনে ইনসাফ করা (হাদিসে এসেছে, এক সাহাবী এক ছেলেকে সম্পত্তি দিতে চাইলে রাসূল সা. তাকে ফিরিয়ে দিতে বলেন এবং বলেন, "সকল সন্তানের সাথে সমান আচরণ করো")।
৩. শিক্ষা ও দ্বীনি প্রশিক্ষণ
ক. দ্বীনি ও দুনিয়াবি উপকারী শিক্ষার ব্যবস্থা করা।
খ. সাত বছর বয়স থেকে নামাজের অভ্যাস করানো, দশ বছর বয়সে নামাজ না পড়লে (কোমল শাসনে) উৎসাহিত করা।
গ. উত্তম চরিত্র ও আদব শেখানো — রাসূল (সা.) বলেছেন, সন্তানকে সুন্দর আদব শেখানো তার জন্য সদকা দেওয়ার চেয়ে উত্তম।
৪. বিবাহের ব্যবস্থা
ক. উপযুক্ত বয়সে বিবাহের ব্যবস্থা করা, যাতে সন্তান হারাম কাজ থেকে বিরত থাকে।
থ. মেয়ে সন্তানের ক্ষেত্রে তার সম্মতি নিয়ে উপযুক্ত পাত্র নির্বাচনে সহায়তা করা।
৫. স্নেহ ও কোমলতা
সন্তানের প্রতি স্নেহ প্রদর্শন — রাসূল (সা.) নিজের নাতি-নাতনিদের চুমু খেতেন, কোলে নিতেন। একবার এক ব্যক্তি বলেছিল সে কখনো সন্তানকে চুমু খায়নি, তখন রাসূল (সা.) বলেন, "যে দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হয় না"।
পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের হক
কুরআনে আল্লাহর ইবাদতের পরপরই পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
আয়াতঃ وَقَضٰی رَبُّکَ اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّاۤ اِیَّاہُ وَبِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسَانًا ؕ اِمَّا یَبۡلُغَنَّ عِنۡدَکَ الۡکِبَرَ اَحَدُہُمَاۤ اَوۡ کِلٰہُمَا فَلَا تَقُلۡ لَّہُمَاۤ اُفٍّ وَّلَا تَنۡہَرۡہُمَا وَقُلۡ لَّہُمَا قَوۡلًا کَرِیۡمًا
অর্থঃ তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো, পিতা-মাতার কোনও একজন কিংবা উভয়ে যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে উফ্ পর্যন্ত বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো। সূরাঃ বনী-ইসরাঈল - আয়াত নংঃ 23
১. আচরণগত দায়িত্ব
ক. উফ পর্যন্ত না বলা — বৃদ্ধ বয়সে বিরক্তিকর আচরণ করলেও সামান্যতম বিরক্তি প্রকাশ না করা।
খ. নম্র ও সম্মানজনক কথা বলা — কুরআনে "কাওলান কারীমা" (সম্মানজনক কথা) বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গ. বিনয়ের সাথে আচরণ — কুরআনে বলা হয়েছে, "নম্রতার ডানা বিছিয়ে দাও"।
ঘ. তাদের জন্য দোয়া করা — কুরআনে দুআ শেখানো হয়েছে, "হে আমার রব, তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন"।
২. বাধ্যবাধকতা (আনুগত্য)
বৈধ বিষয়ে পিতা-মাতার আনুগত্য করা — তবে আল্লাহর অবাধ্যতার নির্দেশ দিলে সেখানে আনুগত্য নয় ("সৃষ্টির অবাধ্যতায় স্রষ্টার আনুগত্য নেই")
তাদের পরামর্শ গুরুত্ব দিয়ে শোনা।
আয়াতঃ وَوَصَّیۡنَا الۡاِنۡسَانَ بِوَالِدَیۡہِ حُسۡنًا ؕ وَاِنۡ جَاہَدٰکَ لِتُشۡرِکَ بِیۡ مَا لَیۡسَ لَکَ بِہٖ عِلۡمٌ فَلَا تُطِعۡہُمَا ؕ اِلَیَّ مَرۡجِعُکُمۡ فَاُنَبِّئُکُمۡ بِمَا کُنۡتُمۡ تَعۡمَلُوۡنَ
অর্থঃ আমি মানুষকে আদেশ করেছি তারা যেন পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করে। তারা যদি আমার সাথে এমন কিছুকে শরীক করার জন্য তোমার উপর বলপ্রয়োগ করে, যার সম্পর্কে তোমার কাছে কোন প্রমাণ নেই, তবে সে ব্যাপারে তাদের কথা মানবে না। আমারই কাছে তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে। তখন আমি তোমাদেরকে অবহিত করব তোমরা কী করতে। সূরাঃ আল আনকাবুত - আয়াত নংঃ 8
৩. আর্থিক ও শারীরিক সেবা
ক. প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তা করা, বিশেষত বৃদ্ধ বয়সে বা অসচ্ছল অবস্থায়।
খ. অসুস্থতায় সেবা-শুশ্রূষা করা।
গ. সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সাথে সময় কাটানো, দেখাশোনা করা।
৪. মৃত্যুর পর পিতা মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য
ক. তাদের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার করা।
খ. তাদের রেখে যাওয়া ওয়াদা/দায় পূরণ করা।
গ. তাদের বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা (হাদিসে এসেছে, পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের বন্ধুদের সম্মান করাও এক ধরনের পুণ্য কাজ)।
ঘ. তাদের পক্ষ থেকে সদকা করা।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী মুহাম্মাদ রাশেদুল ইসলাম
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা ৷
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা ৷
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১