ইদ্দত শেষে নতুন বিবাহের আগে তালাক দিলে কি তালাক হয়?
প্রশ্নঃ ১৬০৮৯৩. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, বিষয়: তালাক সংক্রান্ত ফতোয়া প্রসঙ্গে আবেদন। মুহতারাম, বিনীত নিবেদন এই যে, আমি মোছাঃ জুয়েনা আক্তার। আমার স্বামীর নাম মোঃ খোকন মিয়া। তিনি বর্তমানে প্রবাসে অবস্থান করছেন। বিবরণে আরজ করছি যে, ১.প্রায় ১৬ বছর পূর্বে আমি আমার স্বামীকে না জানিয়ে ঢাকাস্থ বাবার বাড়িতে যাই। পরবর্তীতে আমার স্বামী তা জানতে পেরে প্রবাস থেকে আমাকে ফোনে বলেন, "তুই যদি আজকে রাতের ভিতর আমার বাড়িতে না যাস তাহলে তুই বিনা তালাকে তালাক।" উল্লেখ্য যে, ঐ রাতে আমি স্বামীর বাড়িতে আসিনি। এবং পরের দিন আমার স্বামী বলেন,"আমি এই কথা উঠিয়ে নিলাম, সামনে আর এমন কথা বলব না। তুমি এখন বাড়িতে যাও।"পরে আমি স্বামীর বাড়িতে আসি। ২. এরপর প্রায় ১ বছর আগে আমার স্বামীর সাথে উনার চাচাতো ভাইদের জায়গা-জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল। সেই দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতে আমার স্বামী আমাকে শর্ত দেন যে, "যদি বাড়ির জায়গায় আমার চাচাতো ভাইয়েরা ঘর-বাড়ি করে এবং তুই যদি আমাকে না জানাস, তাহলে তুই বিনা তালাকে তালাক।" ৩.শর্ত দেওয়ার কিছুদিন পরেই তারা উক্ত জায়গায় ঘর তোলার জন্য ইটের দেওয়াল তোলে। কিন্তু আমি আমার স্বামীকে তা জানাইনি, এই ভেবে যে তিনি প্রবাসে থাকায় এটা নিয়ে টেনশন করবেন। ৪.অতঃপর ৪ মাস পর আমার স্বামী ভিডিও কলের মাধ্যমে দেখতে পান যে, চাচাতো ভাইয়েরা উক্ত জায়গায় ঘরের দেওয়াল তুলে ফেলেছে। তখন তিনি আমার প্রতি রাগান্বিত হয়ে বলেন,"আমি কেন তাদেরকে দেওয়াল তুলতে বাধা দিলাম না। এখন আমি তোকে আর রাখব না, তোকে এক তালাক দিলাম।" এক তালাক বলার সাথে সাথেই আমি ভয়ে ফোন কেটে দেই, যাতে তিনি আর তালাক না দিতে পারেন। এবং পরে তিনি আর বাকী তালাক গুলো বলেনি। উল্লেখ্য যে, দেওয়াল তোলার পর হতে আমার স্বামী জানার পর্যন্ত প্রায় ৪ মাস সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। সেই ৪ মাসে আমার ৩ বার মাসিকও শেষ হয়ে যায় এবং তার পরে তিনি আমাকে এক তালাক দেন। বি.দ্র. "তুই বিনা তালাকে তালাক" বলার দ্বারা আমার স্বামীর উদ্দেশ্য ছিল আমাকে ভয় দেখানো। এখন আমি আমার স্বামীর সাথে সংসার করতে ইচ্ছুক। এক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়তের বিধান মোতাবেক আমার স্বামীর সাথে ঘর-সংসার করা আমার জন্য জায়েয হবে কি না, সে বিষয়ে আপনার মূল্যবান ফতোয়া দিয়ে বাধিত করলে চিরকৃতজ্ঞ থাকব। অতএব, মুহতারামের নিকট আমার আকুল আবেদন, উপরোক্ত বিষয়ের উপর শরীয়তের বিধান জানিয়ে আমাকে উপকৃত করবেন। নিবেদক মোছাঃ জুয়েনা আক্তার গ্রামঃ গান্ধারচর থানাঃ পাকুন্দিয়া, জেলাঃ কিশোরগঞ্জ। তারিখ: ০১-০৭-২০২৬ ইং
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রথমবার যে “তুই বিনা তালাকে তালাক” বলার দ্বারা তালাকের শর্ত দেওয়া হয়েছিল এবং শর্ত পাওয়া যাওয়ার সাথে সাথে তালাকও কার্যকর হয়েছে, বিদেশে থাকা অবস্থাতেই সেটির ইদ্দত শেষ হয়ে গেছে। আর এই সময়ের মধ্যে স্বামী 'রুজু' করেননি অর্থাৎ স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়নি। তিনি কেবল বলেছিলেন 'তালাক উঠাইয়া নিলাম'। কিন্তু শরীয়তের বিধান অনুযায়ী তালাক দেওয়ার পরে আর তা উঠিয়ে নেওয়া যায় না, বরং 'রুজু' করতে হয়। তিনি মুখ দিয়ে কোন রুজু করার কথা স্পষ্টভাবে বলেনওনি, আর দেশে ফিরেও আসেননি যে ফিজিক্যালি (শারীরিকভাবে) রুজু হবে।
এর দ্বারা এটাই স্পষ্ট বোঝা গেল যে, প্রথম তালাকের পর ইদ্দত পার হয়ে যাওয়ার মাধ্যমেই স্ত্রী এক তালাকে বায়েন হয়ে গিয়েছিল।
অতএব, এর এক বছর পর বা পরবর্তীতে বিবাহ নবায়ন করা ছাড়া স্বামী যেসব তালাক দিয়েছেন, সেগুলোর আর কোনো কার্যকারিতা নেই; ওই তালাকগুলো কার্যকর হবে না। স্ত্রী ওই প্রথম এক তালাকের মাধ্যমেই বিচ্ছিন্ন (বায়েন) হয়ে আছেন। তাই এখন আর তারা স্বামী-স্ত্রী নেই।
সুতরাং প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে এক তালাকে বায়েন হয়ে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, এখন যদি তারা আবার সংসার করতে চায় তাহলে উভয়ের সম্মতিতে নতুন করে মোহরানা ধার্য করে পুনরায় বিবাহ করে নিতে হবে।
এক্ষেত্রে উক্ত স্বামী উক্ত নারীর ব্যাপারে আর মাত্র দুই তালাকের অধিকারী থাকবে। ভবিষ্যতে কখনো অবশিষ্ট দুই তালাক দিয়ে দিলে, তখন আর স্বাভাবিকভাবে সংসার করা বা স্বাভাবিকভাবে পুনর্বিবাহের সুযোগ থাকবে না।
উল্লেখ্য, যেহেতু প্রশ্নোক্ত সূরতে এক তালাকে বায়েনের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পূর্বেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, তাই এরপর তারা যে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে কথাবার্তা, মেলামেশা বা অন্যান্য আচরণ করেছে, তা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ ছিল না। এজন্য উভয়েরই আন্তরিকভাবে আল্লাহ তাআলার নিকট তাওবা ও ইস্তিগফার করা জরুরি।
(صحيح ابن حبان: - محققا (12/ 400) الناشر: مؤسسة الرسالة، بيروت)
عن جابر، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «ألا لا يبيتن رجل عند امرأة في بيت إلا أن يكون ناكحا أو ذا محرم»
(بدائع الصنائع في ترتيب الشرائع: کتاب الطلاق، فصل في شرائط جواز الرجعة، ج: 3، ص:183۔ ط: دار الكتب العلمية)
وأما شرائط جواز الرجعة فمنها قيام العدة، فلا تصح الرجعة بعد انقضاء العدة؛ لأن الرجعة استدامة الملك، والملك يزول بعد انقضاء العدة، فلا تتصور الاستدامة إذ الاستدامة للقائم لصيانته عن الزوال لا للمزيل كما في البيع بشرط الخيار للبائع إذا مضت مدة الخيار أنه لا يملك استيفاء الملك في المبيع بزوال ملكه بمضي المدة."
(مجمع الانہر فی شرح ملتقی الابحر: كتاب الطلاق،باب إيقاع الطلاق،406/1،ط:دار إحياء التراث العربي)
"(والصريح يلحق) الطلاق (الصريح) سواء كان صريحا بائنا مثل أن يقال للمدخول بها أنت طالق بائن وطالق، أو طالق بائن أو صريحا غير بائن مثل أن يقال أنت طالق وطالق وهي في العدة تطلق ثنتين لتعذر جعله إخبارا لتعينه إنشاء شرعا، وكذا لا يصدق لو قال أردت الإخبار (و) يلحق الصريح (البائن) يعني إذا أبانها، أو خالعها على مال، ثم قال لها أنت طالق، أو هذه طالق في العدة يقع عندنا؛ لحديث الخدري مسندا «المختلعة يلحقها صريح الطلاق ما دامت في العدة»."
(بدائع الصنائع: كتاب الطلاق، فصل في شرائط ركن الطلاق وبعضها يرجع إلى المرأة، 3/ 126، ط: دارالكتب العلمية)
"(فصل) وأما الذي يرجع إلى المرأة فمنها الملك أو علقة من علائقه؛ فلا يصح الطلاق إلا في الملك أو في علقة من علائق الملك وهي عدة الطلاق أو مضافا إلى الملك."
(فتاوی شامی: كتاب الطلاق، محل الطلاق، 3/ 230، ط: سعيد)
"(ومحله المنكوحة)
(قوله ومحله المنكوحة) أي ولو معتدة عن طلاق رجعي أو بائن غير ثلاث في حرة وثنتين في أمة أو عن فسخ بتفريق لإباء أحدهما عن الإسلام أو بارتداد أحدهما."
(الدر المختار وحاشية ابن عابدين: (3/ 409) الناشر: دار الفكر-بيروت)
(وينكح مبانته بما دون الثلاث في العدة وبعدها بالإجماع) ومنع غيره فيها لاشتباه النسب (لا) ينكح (مطلقة) من نكاح صحيح نافذكما سنحققه.
(فتاوی عالمگیری: كتاب الطلاق، الباب السادس، فصل فيما تحل به المطلقة وما يتصل به، 472/2، ط: دار الفكر)
"إذا كان الطلاق بائنا دون الثلاث فله أن يتزوجها في العدة وبعد انقضائها."
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
নায়েবে মুফতী, ফতোয়া বিভাগ
জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া, সাত মসজিদ, মুহাম্মদপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন