সন্তানকে পিতা-মাতার সম্পদ থেকে বঞ্চিত করা
প্রশ্নঃ ১৬১২৮১. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, ছেলে মাকে দেখাশোনা করে না, খোঁজখবর নেয় না, এবং বলে আমি তোমাকে বাদ দিয়ে দিয়েছি বা আমি মাকে বাদ দিয়ে দিলাম ( মা হিসাবে মানে না), সে ক্ষেত্রে ছেলে মায়ের সম্পত্তি থেকে ওয়ারিশ সূত্রে যে জমি পাবে, তা যদি মা ছেলেকে না দেয়। এক্ষেত্রে শরীয়তের হুকুম কি?
১৫ জুলাই, ২০২৬
কাজিপুর
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সন্তান যদি পিতা মাতার অবাধ্য হয় এবং পিতা-মাতার দেখাশোনা না করে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে যদি পিতা-মাতাও সন্তানকে তাদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে চায় তাহলে এখানে দুটি দিক রয়েছে-
১: সন্তানের গোনাহ বা অপরাধের দিক।
২: উত্তরাধিকার বা মিরাসের বিধান
১. সন্তানের অবাধ্যতা ও সম্পর্ক ছিন্ন করা, মা-বাবার সেবা না করা, খোঁজখবর না নেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক কবিরা গোনাহ এবং চরম অবাধ্যতা। কুরআনুল কারীমে সূরা বনী ইসরাঈলের ২৩ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের পরপরই পিতা-মাতার সাথে সৎব্যবহার করার নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেন-
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا
"তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সৎব্যবহার করো। তাঁদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাঁদের (আচরণে বিরক্ত হয়ে) 'উফ' শব্দটিও বলো না, তাঁদের ধমক দিও না এবং তাঁদের সাথে শ্রদ্ধাপূর্ণ ও নম্রভাবে কথা বলো।"
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।"(সহিহ বুখারি)।
সুতরাং সন্তান যদি পিতা-মাতার অবাধ্য হয়, দেখাশোনা না করে, খেদমত না করে বা পিতা-মাতাকে অস্বীকার করে, তাহলে সে আল্লাহর কাছে কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হবে এবং এর জন্য তাকে তাওবা করে পিতা-মাতার কাছে কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
২. উত্তরাধিকার বা মিরাসের বিধান।
মিরাসের বণ্টন আল্লাহর নির্ধারিত আইন। ইসলামে উত্তরাধিকার (মিরাস) নির্ধারিত হয় (نسب) রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে, সন্তান ভালো নাকি খারাপ, তার আচরণের ওপর ভিত্তি করে নয়।
তাই পিতা-মাতা যদি সন্তানকে মুখে বা লিখিতভাবে "সম্পত্তি দেব না" বলে যান, তবুও পিতা-মাতার মৃত্যুর পর সেই সন্তান শরীয়ত নির্ধারিত তার মিরাছ/ওয়ারিশের অংশ অবশ্যই পাবে। আমাদের সমাজে প্রচলিত মৃত্যুর পর সন্তানকে ওয়ারিশ থেকে বঞ্চিত করার "ত্যাজ্যপুত্র" করা বা মুখে/কাগজে বাদ দেওয়া, ইসলামী শরীয়তে এর কোনো ভিত্তি নেই। এ সম্পর্কে ফিকহে হানাফির অন্যতম গ্রন্থ ফতোয়ায় শামীতে আছে -
لأن الوارث لا يتغير بحكم المورث، والتوارث ثبت بحكم الشرع فلا يبطل بإبطاله
অনুবাদ: কারণ মুরিস (যার সম্পত্তি) তার আদেশে ওয়ারিশ পরিবর্তন হয় না। উত্তরাধিকার স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শরীয়তের বিধান দ্বারা; সুতরাং ব্যক্তির বাতিল করার মাধ্যমে তা বাতিল হয় না।
সুতরাং তেজ্যপুত্র করা অথবা মৌখিকভাবে সন্তানকে মিরাস থেকে বঞ্চিত করার কথা পিতা-মাতা থেকে বলা হলেও তাদের মৃত্যুর পর তা কার্যকর হবে না।
তবে পিতা-মাতা যদি জীবিত অবস্থায়, সুস্থ মস্তিষ্কে নিজের জমি বা সম্পত্তি অন্য কাউকে (যেমন অন্য সন্তান, এতিমখানা বা কোনো আত্মীয়) দান করে রেজিস্ট্রি করে বুঝিয়ে দেন, তবে জীবিত থাকা অবস্থায় সেই জমি তাঁর মালিকানাধীন থাকার কারণে তিনি তা যাকে ইচ্ছা দিতে পারেন।
কিন্তু শুধুমাত্র কোনো সন্তানকে বঞ্চিত বা ঠকানোর নিয়তে যদি পিতা মাতা জীবিত অবস্থায় সমুদয় সম্পত্তি অন্যদের লিখে দেন, তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে কাজটির আইনি প্রয়োগ কার্যকর হলেও পিতা-মাতার এ অন্যায় নিয়তের কারণে গোনাহগার হবেন।
তবে সন্তান যদি চরম অবাধ্য, দ্বীনহীন বা মা-বাবার চরম অহিতাকাঙ্ক্ষী হয়, সে ক্ষেত্রে আলেমদের একাংশের মতে মা-বাবা তাঁর নিজের জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি অন্য কাউকে দান করে দিলেও তা কার্যকর হয়ে যাবে।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতি মোহাম্মদ আমীর হোসাইন
মুহাদ্দীস, শাইখ আবু সাঈদ ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার মোহাম্মাদপুর।
মুহাদ্দীস, শাইখ আবু সাঈদ ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার মোহাম্মাদপুর।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১