অগ্রিম কেনাবেচায় পণ্যের মূল্য অনিশ্চিত রাখার বিধান
প্রশ্নঃ ১৬৯১৯৬. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমার আব্বু ৩০০ বস্তা সিমেন্ট এবং ১৫ টন রড কেনার জন্য একটি দোকানে 15 লক্ষ টাকা অগ্রিম প্রদান করেছে এই মর্মে যে তারা বর্তমান যে দাম আছে দাম বাড়লেও এই দামে দিবে দাম যদি কমে যায় তাহলে কমে দিবে কারণ সমস্ত মাল একসাথে প্রয়োজন নেই যখন ডেলিভারি নেওয়া হবে তখন এই হিসাবে দিবে। টাকা প্রেরণের পর থেকে আমরা কিছু মাল সংগ্রহ করেছি এখনো কিছু বাকি আছে জানার বিষয় হল এভাবে চুক্তি করা শরীয়তের আলোকে নাজায়েজ কিনা যদি নাজায়েজ হয়ে থাকে তাহলে এখন কি করনীয়?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
ইসলামী শরিয়তের আলোকে আপনাদের এই চুক্তি সহীহ বা বৈধ হয়নি; এটি একটি ফাসেদ (ত্রুটিপূর্ণ/নাজায়েজ) চুক্তি হয়েছে।
কেননা, শরিয়তের বিধান মতে ক্রয়-বিক্রয়ের নিয়মানুযায়ী, কোনো পণ্যের মূল্য অগ্রিম পরিশোধ করে পরে ডেলিভারি নেওয়ার চুক্তিকে 'বাইয়ে সালাম' (السَّلَم) বলা হয়। বাইয়ে সালাম চুক্তি সহীহ হওয়ার জন্য অন্যতম প্রধান শর্ত হলো—চুক্তির মজলিশেই পণ্যের মূল্য বা দরদাম সম্পূর্ণ সুনির্দিষ্ট, চূড়ান্ত ও পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে হতে হবে। যেমন আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। তবে পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে ব্যবসা হলে ভিন্ন কথা।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২৯)
অগ্রিম কেনাবেচার ক্ষেত্রে পণ্যের বিবরণ ও মূল্য সুনির্দিষ্ট করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে বলেছেন:
مَنْ أَسْلَفَ فِي شَيْءٍ، فَلْيُسْلِفْ فِي كَيْلٍ مَعْلُومٍ، وَوَزْنٍ مَعْلُومٍ، إِلَى أَجَلٍ مَعْلُومٍ
“যে ব্যক্তি কোনো পণ্যে অগ্রিম মূল্য পরিশোধ (সালাম) করবে, সে যেন সুনির্দিষ্ট মাপ, সুনির্দিষ্ট ওজন এবং সুনির্দিষ্ট মেয়াদের ভিত্তিতে তা করে।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ২২৪০; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৬০৪)
বুখারী: https://muslimbangla.com/hadith/2099
মুসলিম: https://muslimbangla.com/hadith/11023
আপনাদের চুক্তিতে "দাম বাড়লে আগের দামে দিবে, আর কমলে বর্তমান বাজারদরে দিবে"—এই শর্তটি রাখার কারণে পণ্যের চূড়ান্ত মূল্য বা দর লেনদেনের সময় অনিশ্চিত ও অস্পষ্ট রয়ে গেছে। ইসলামে মূল্যের মধ্যে এই ধরনের অনিশ্চয়তা বা ঝুলন্ত শর্ত রাখা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ (নাজায়েজ)। হাদিস শরিফে এসেছে:
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ بَيْعِ الْغَرَرِ
“রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রতারণা বা অনিশ্চয়তাপূর্ণ (গারার) ক্রয়-বিক্রয় নিষেধ করেছেন।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৫১৩)
মুসলিম: https://muslimbangla.com/hadith/10715
ফিকহের নিয়মানুযায়ী, মূল্যের এই অস্পষ্টতা চুক্তিকে ফাসেদ বা ত্রুটিপূর্ণ করে দেয়। বিখ্যাত ফিকহী বিশ্বকোষ 'আল-মাজাল্লা'-তে বলা হয়েছে:
تَسْمِيَةُ الثَّمَنِ حِينَ الْبَيْعِ لَازِمَةٌ، فَلَوْ بَاعَ بِدُونِ تَسْمِيَةِ الثَّمَنِ كَانَ الْبَيْعُ فَاسِدًا… يلزم ان يكون الثمن معلوما
“ক্রয়-বিক্রয়ের সময় মূল্য সুনির্দিষ্ট করা আবশ্যক। যদি মূল্য নির্ধারণ না করে কেনাবেচা করা হয়, তবে সেই চুক্তি ফাসেদ হবে।” (মাজাল্লাতুল আহকাম আল-আদলিয়্যাহ, মাদ্দাহ 237-238)
তাছাড়া, এমন শর্ত যা কেবল একপক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে (যেমন এখানে ক্রেতার সুবিধা যে দাম বাড়লে আগের দাম, কমলে কম দাম), তা চুক্তিকে নষ্ট করে। ফিকহের মূলনীতি হলো:
لا يصح، وهو الاظهر. شرنبلالية عن البرهان (و) لا (بيع بشرط) عطف على إلى النيروز: يعني الاصل الجامع في فساد العقد بسبب شرط (لا يقتضيه العقد ولا يلائمه وفيه نفع لأحدهما ….. الخ
“এমন প্রত্যেকটি শর্ত যা চুক্তির স্বাভাবিক চাহিদার পরিপন্থী এবং চুক্তি সম্পাদনকারী যেকোনো একপক্ষের একক স্বার্থ বহন করে, তা চুক্তিকে ফাসেদ করে দেয়।” (আদ-দুররুল মুখতার: শামেলা ভার্সন)
ফলে আপনাদের বর্তমান চুক্তিটিও ফাসেদ হয়েছে।
সুতরাং এখন আপনাদের জন্য করণীয় হলো:
এক. চুক্তি পুনর্বিন্যাস/সংশোধন করা: আপনারা বিক্রেতার সাথে পুনরায় কথা বলে চুক্তিটি পুনর্বিন্যাস/সংশোধন করে নেবেন। নতুন চুক্তিতে রড, সিমেন্টের একটি নির্দিষ্ট ও চূড়ান্ত দাম নির্ধারণ করবেন (যেমন: বর্তমান বাজারদর বা উভয়পক্ষের সম্মতিতে একটি নির্দিষ্ট দর)। এরপর বাজারদর যতই উঠানামা করুক না কেন, পুরো মাল ওই নির্ধারিত দামেই খালাস করতে হবে।
দুই. বর্তমান বাজারদরে কেনা-বেচা করা: পূর্বের চুক্তি বাতিল করে আপনারা যখন যতটুকু মাল দোকান থেকে বুঝে নেবেন, ঠিক ওই সময়ে বাজারে ওই মালের যে দাম থাকবে, সেই দামে মালের মূল্য কেটে নেওয়া হবে। অর্থাৎ, ডেলিভারি নেওয়ার দিনের বাজারদরে কেনা-বেচা সম্পন্ন হবে।
ইতিমধ্যে আপনারা যে পরিমাণ মাল সংগ্রহ করে ফেলেছেন, তা যদি বিক্রেতা আগের চুক্তি অনুযায়ী কোনো কম-বেশি দামে দিয়ে থাকে, তবে বিক্রেতার সাথে আলোচনা করে তা সমন্বয় বা পারস্পরিক ক্ষমা-সুুন্দর দৃষ্টিতে নিষ্পত্তি করে নেওয়া উচিত। বাকি মালের ক্ষেত্রে অবশ্যই ওপরের দুটি নিয়মের যেকোনো একটি মেনে নতুনভাবে চুক্তি চূড়ান্ত করতে হবে।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন