সরকারি কোটার পণ্য অবৈধভাবে বিক্রি ও অতিরিক্ত মুনাফার শরয়ি বিধান
প্রশ্নঃ ১৬৯৫১৪. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, একটি বৈধ ও জনপ্রিয় পণ্য উৎপাদন কম থাকায় সরকার নিয়ম করেছে প্রতিদিন একজন ব্যক্তি একবার কিনতে পারবেন। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে কেউ প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও নিজের কোটা ব্যবহার করে পণ্যটি কিনে দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে বিক্রি করলে তা কি জায়েয? জায়েয না হলে এ লাভের টাকার হুকুম কী?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
এই ক্ষেত্রে সরকারের নির্ধারিত সীমা ও উদ্দেশ্য বিবেচনা করা জরুরি। শুধু পণ্যটি বৈধ হওয়া এবং নিজের নামে এক ইউনিট কেনার অধিকার থাকাটাই এ ধরনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়; সরকার যখন সাধারণ মানুষের প্রয়োজন মেটাতে প্রত্যেককে সীমিত পরিমাণ দেওয়ার ব্যবস্থা করে, তখন সেই সুযোগকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা শরিয়তসম্মত নয়।
যদি পরিস্থিতি এমন হয় যে—
১. পণ্যটি মানুষের ব্যাপক প্রয়োজনের।
২. উৎপাদন বা সরবরাহ কম থাকায় সরকার প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য দৈনিক একবার কেনার সীমা নির্ধারণ করেছে।
৩. ব্যক্তি নিজের কোনো প্রয়োজন ছাড়াই শুধু ওই কোটা ব্যবহার করে পণ্যটি কিনছে (বিশেষত যদি এখানে এমন কোনো শর্ত থাকে যে, শুধু যাদের প্রয়োজন আছে তারাই পণ্যটি এ নির্ধারিত কোটা থেকে ক্রয় করবে; আর যাদের প্রয়োজন নেই তারা না নিয়ে প্রকৃত অভাবীদের জন্য সুযোগ করে দেবে)।
৪. এরপর কৃত্রিম সংকটের সুযোগ নিয়ে ২–৩ গুণ দামে তা বিক্রি করছে।
তাহলে এ প্রক্রিয়ায় কেনাবেচা করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। কারণ, যে ব্যক্তির প্রয়োজন নেই, সে যখন পণ্যটি ক্রয় করছে, তখন সে প্রথমেই প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে। এতে সরকারি নিয়ম লঙ্ঘন, অন্য মানুষের প্রাপ্য সুযোগ সংকুচিত করা এবং সংকটকে কাজে লাগিয়ে অন্যায়ভাবে লাভ করা—এসব নাজায়েজ দিক একসাথে পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، حَدَّثَنَا يَعْقُوبُ، - وَهُوَ ابْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ الْقَارِيُّ ح وَحَدَّثَنَا أَبُو الأَحْوَصِ، مُحَمَّدُ بْنُ حَيَّانَ حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي حَازِمٍ، كِلاَهُمَا عَنْ سُهَيْلِ بْنِ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ " مَنْ حَمَلَ عَلَيْنَا السِّلاَحَ فَلَيْسَ مِنَّا وَمَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا " .
১৮৫। কুতায়বা ইবনে সাঈদ এবং আবুল আহওয়াস মুহাম্মাদ ইবনে হাইয়ান (রহ.) ......... আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: যে ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়, আর যে ব্যক্তি আমাদের ধোঁকা দিবে সেও আমাদের দলভুক্ত নয়।
সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৮৫ (আন্তর্জাতিক হাদিস নং: ১০১)
হাদিসের লিংক: https://muslimbangla.com/hadith/7238
তিনি আরও বলেছেন,
حَدَّثَنَا عَبْدُ رَبِّهِ بْنُ خَالِدٍ النُّمَيْرِيُّ أَبُو الْمُغَلِّسِ، حَدَّثَنَا فُضَيْلُ بْنُ سُلَيْمَانَ، حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ عُقْبَةَ، حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ يَحْيَى بْنِ الْوَلِيدِ، عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَضَى أَنْ لاَ ضَرَرَ وَلاَ ضِرَارَ
২৩৪০। 'আব্দ রাব্বিহি ইবন খালিদ নুমায়রী আবুল মুগাল্লাস (রহ.).... 'উবাদা ইবন সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নির্দেশ দিয়েছেন যে, অন্যের ক্ষতি করা যাবে না এবং (ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে) ক্ষতির প্রতিশোধেও ক্ষতি করা যাবে না।
সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ২৩৪০ (আন্তর্জাতিক হাদিস নং: ২৩৪০)
হাদিসের লিংক: https://muslimbangla.com/hadith/27631
এছাড়া সংকটের সময় পণ্য কিনে তা আটকে রেখে বেশি দামে বিক্রি করা ফিকহের ভাষায় ‘ইহতিকার’ বা কালোবাজারির শামিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْلَمَةَ بْنِ قَعْنَبٍ، حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ، - يَعْنِي ابْنَ بِلاَلٍ - عَنْ يَحْيَى، - وَهُوَ ابْنُ سَعِيدٍ - قَالَ كَانَ سَعِيدُ بْنُ الْمُسَيَّبِ يُحَدِّثُ أَنَّ مَعْمَرًا، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " مَنِ احْتَكَرَ فَهُوَ خَاطِئٌ "
৩৯৭৭। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসলামা ইবনে কা’নাব (রহ.) ......... মামার (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: যে ব্যক্তি গুদামজাত করে সে অপরাধী।
সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৩৯৭৭
হাদিসের লিংক: https://muslimbangla.com/hadith/11026
তাহলে অর্জিত লাভের টাকার হুকুম কী এবং এখন করণীয় কী?
এ ক্ষেত্রে দুটো বিষয় আলাদাভাবে বুঝতে হবে। যেহেতু পণ্যটি মৌলিকভাবে হালাল এবং ক্রেতা-বিক্রেতার সম্মতিতে বেচাকেনা সম্পন্ন হয়েছে, তাই পণ্যটি বিক্রি করে যে অর্থ লাভ হয়েছে, তাকে সরাসরি ‘হারাম’ (যেমন—চুরির টাকা) বলার সুযোগ নেই।
কিন্তু এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, মানুষের অসহায়ত্ব ও সংকটকে পুঁজি করে এবং প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে যে ২-৩ গুণ বেশি লাভ করা হয়েছে, তার মাধ্যমে মূলত অন্যের অধিকার (হক্কুল ইবাদ) হরণ করা হয়েছে। তাই এ অবস্থায় করণীয় হলো:
যার হক নষ্ট করা হয়েছে বা যাকে ঠকানো হয়েছে, তাকে তার ক্ষতিপূরণ বুঝিয়ে দেওয়া। উদাহরণস্বরূপ— কোনো নির্দিষ্ট ক্রেতার কাছ থেকে যদি মাত্রাতিরিক্ত অর্থ (দ্বিগুণ বা তিনগুণ লাভ) গ্রহণ করা হয়ে থাকে, তবে তাকে খুঁজে সেই অতিরিক্ত টাকাটুকু ফেরত দেওয়া।
এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা হলো, (পণ্যটি যদি এখনো নিজের কাছে থাকে বা ভবিষ্যতে কেনার সুযোগ আসে) তবে যিনি বাস্তবিক অর্থেই পণ্যটির হকদার বা অভাবী, তাকে সরকার নির্ধারিত মূল্যেই সেটি দিয়ে দেওয়া।
আর ইতিমধ্যে এমন কাজ করে থাকলে, অতীতের এই প্রতারণা ও অধিকার হরণের জন্য আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তওবা করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা আবশ্যক।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা ৷
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন