মা'আরিফুল হাদীস
معارف الحديث
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায় - এর পরিচ্ছেদসমূহ
মোট হাদীস ২২ টি
হাদীস নং: ৭৪
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ কিয়ামতের আলামতসমূহ
যেভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের মধ্যে বিস্তার লাভকারী ফিতনাসমূহের সংবাদ দিয়েছেন, অনুরূপভাবে কতক বিষয় সম্বন্ধে তিনি বলেছেন, কিয়ামতের পূর্বে এগুলো প্রকাশ পাবে। সেগুলোর মধ্যে কতক অসাধারণ জাতীয় যা স্পষ্টত সেই সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মের পরিপন্থী, যে সব নিয়মের ওপর এ জগতের শৃঙ্খলা নির্ভরশীল। যেমন, পূর্ব দিকের পরিবর্তে পশ্চিম দিক হতে সূর্য উদিত হওয়া, দাবাতুল আরদ নির্গত হওয়া, দাজ্জালের প্রকাশ ও হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণ ইত্যাদি, এই সব অসাধারণ আলামত তখন প্রকাশ পাবে। এসব ঘটনা যেন কিয়ামতের অগ্রবর্তী ঘোষক ও ভূমিকাস্বরূপ। এগুলোকে কিয়ামতের 'আলামাতে খাস্সা' ও 'আলামাতে কুবরা'ও বলা হয়। এছাড়া রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিয়ামতের পূর্বে কতক এরূপ বিষয়, ঘটনাবলি ও পরিবর্তন প্রকাশের সংবাদ দিয়েছেন যেগুলো অসাধারণ নয় বটে, তবে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র ও উত্তম যুগে কল্পনাতীত ও অস্বাভাবিক ছিল। উম্মতের মধ্যে যে সবের প্রকাশ মন্দ ও ফাসাদের লক্ষণ হবে, সে সবকে কিয়ামতের সাধারণ আলামত বলা হয়। নিম্নে প্রথমে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সেই বাণীসমূহ উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেগুলোতে তিনি কিয়ামতের সাধারণ লক্ষণ উল্লেখ করেছেন। প্রথম প্রকার অর্থাৎ আলামাত কুবরা (বড় আলামতসমূহ) সম্বন্ধে হাদীস পরে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
কিয়ামতের সাধারণ আলামতসমূহ
যেভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের মধ্যে বিস্তার লাভকারী ফিতনাসমূহের সংবাদ দিয়েছেন, অনুরূপভাবে কতক বিষয় সম্বন্ধে তিনি বলেছেন, কিয়ামতের পূর্বে এগুলো প্রকাশ পাবে। সেগুলোর মধ্যে কতক অসাধারণ জাতীয় যা স্পষ্টত সেই সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মের পরিপন্থী, যে সব নিয়মের ওপর এ জগতের শৃঙ্খলা নির্ভরশীল। যেমন, পূর্ব দিকের পরিবর্তে পশ্চিম দিক হতে সূর্য উদিত হওয়া, দাবাতুল আরদ নির্গত হওয়া, দাজ্জালের প্রকাশ ও হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণ ইত্যাদি, এই সব অসাধারণ আলামত তখন প্রকাশ পাবে। এসব ঘটনা যেন কিয়ামতের অগ্রবর্তী ঘোষক ও ভূমিকাস্বরূপ। এগুলোকে কিয়ামতের 'আলামাতে খাস্সা' ও 'আলামাতে কুবরা'ও বলা হয়। এছাড়া রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিয়ামতের পূর্বে কতক এরূপ বিষয়, ঘটনাবলি ও পরিবর্তন প্রকাশের সংবাদ দিয়েছেন যেগুলো অসাধারণ নয় বটে, তবে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র ও উত্তম যুগে কল্পনাতীত ও অস্বাভাবিক ছিল। উম্মতের মধ্যে যে সবের প্রকাশ মন্দ ও ফাসাদের লক্ষণ হবে, সে সবকে কিয়ামতের সাধারণ আলামত বলা হয়। নিম্নে প্রথমে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সেই বাণীসমূহ উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেগুলোতে তিনি কিয়ামতের সাধারণ লক্ষণ উল্লেখ করেছেন। প্রথম প্রকার অর্থাৎ আলামাত কুবরা (বড় আলামতসমূহ) সম্বন্ধে হাদীস পরে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
কিয়ামতের সাধারণ আলামতসমূহ
৭৪. হযরত আবূ হুরাইরা (রা) বলেন, (একদিন) নবী করীম (সা) বর্ণনা করছিলেন, ইতোমধ্যে এক আরাবী (বেদুইন) এল। সে তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, কিয়ামত কবে হবে? তিনি বললেন, যখন (সে সময় এসে যাবে যে,) আমানত ধ্বংস করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা কর। আরাবী পুনরায় নিবেদন করল, আমানত কিভাবে ধ্বংস করা হবে? তিনি বললেন, যখন বিষয়াবলি অযোগ্যদের প্রতি অর্পিত করা হবে তখন কিয়ামতের অপেক্ষা কর। (সহীহ বুখারী)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: بَيْنَمَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُحَدِّثُ، إِذْ جَاءَ أَعْرَابِيٌّ فَقَالَ: مَتَى السَّاعَةُ؟ قَالَ: «إِذَا ضُيِّعَتِ الأَمَانَةُ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ»، قَالَ: كَيْفَ إِضَاعَتُهَا؟ قَالَ: «إِذَا وُسِّدَ الأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ» (رواه البخارى)
তাহকীক:
হাদীস নং: ৭৫
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ কিয়ামতের আলামতসমূহ: কিয়ামতের সাধারণ আলামতসমূহ
৭৫. হযরত জাবির ইবনে সামুরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কিয়ামতের পূর্বে কতক মিথ্যাবাদী লোক হবে। তোমরা তাদের থেকে দূরে থাকবে। (সহীহ মুসলিম)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : إِنَّ بَيْنَ يَدَيِ السَّاعَةِ كَذَّابِينَ فَاحْذَرُوهُمْ. (رواه مسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ৭৬
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ কিয়ামতের আলামতসমূহ: কিয়ামতের সাধারণ আলামতসমূহ
৭৬. হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যখন গনীমত ব্যক্তিগত সম্পদ হবে, আমানতকে গনীমতের মাল মনে করা হবে, এবং যাকাত জরিমানা মনে করা হবে, আর ইলম অর্জন করা হবে দীনের উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য (জাগতিক) উদ্দেশ্যে, মানুষ অনুগত্য করবে স্বীয় স্ত্রীর, আপন মার অবাধ্যতা করবে; আর বন্ধুদেরকে নিকটবর্তী করবে এবং পিতাকে দূর করবে, আর মসজিদগুলোতে কণ্ঠসমূহ উঁচু হবে, গোত্রের নেতৃত্বদান করবে তাদের ফাসিক; এবং সর্বাধিক নিচু লোক জাতির নেতা হবে। আর যখন মানুষকে সম্মান করা হবে তার অনিষ্টের ভয়ে। আর (পেশাদার) গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্র ব্যাপক হবে। এবং মদ পান করা হবে এবং উম্মতের পরবর্তীগণ তাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি অভিশাপ বর্ষণ করবে, তখন লাল ঝঞ্ঝাবায়ু, ভূমিকম্প, যমীন ধ্বসে যাওয়া, আকৃতি পরিবর্তন হয়ে যাওয়া, পাথর বৃষ্টি (এছাড়া এ জাতীয়) আরো লক্ষণসমূহ যা ক্রমান্বয়ে এভাবে আসবে যেমন একটি হার যার সুতা কেটে দেওয়া হলে এর দানাগুলো ক্রমান্বয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকে। (জামি' তিরমিযী)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا اتُّخِذَ الْفَيْءُ دُوَلاً وَالأَمَانَةُ مَغْنَمًا وَالزَّكَاةُ مَغْرَمًا وَتُعُلِّمَ لِغَيْرِ الدِّينِ وَأَطَاعَ الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ وَعَقَّ أُمَّهُ وَأَدْنَى صَدِيقَهُ وَأَقْصَى أَبَاهُ وَظَهَرَتِ الأَصْوَاتُ فِي الْمَسَاجِدِ وَسَادَ الْقَبِيلَةَ فَاسِقُهُمْ وَكَانَ زَعِيمُ الْقَوْمِ أَرْذَلَهُمْ وَأُكْرِمَ الرَّجُلُ مَخَافَةَ شَرِّهِ وَظَهَرَتِ الْقَيْنَاتُ وَالْمَعَازِفُ وَشُرِبَتِ الْخُمُورُ وَلَعَنَ آخِرُ هَذِهِ الأُمَّةِ أَوَّلَهَا فَلْيَرْتَقِبُوا عِنْدَ ذَلِكَ رِيحًا حَمْرَاءَ وَزَلْزَلَةً وَخَسْفًا وَمَسْخًا وَقَذْفًا وَآيَاتٍ تَتَابَعُ كَنِظَامٍ بَالٍ قُطِعَ سِلْكُهُ فَتَتَابَعَ. (رواه الترمذى)
তাহকীক:
হাদীস নং: ৭৭
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ কিয়ামতের আলামতসমূহ: কিয়ামতের সাধারণ আলামতসমূহ
৭৭. হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ (এরূপ সময় না আসবে) যে, মাল অধিক হবে, আর তা ভেসে ভেসে ফিরবে, এমনকি (অবস্থা এই দাঁড়াবে যে,) এক ব্যক্তি নিজের মালের যাকাত বের করবে আর সে পাবে না এরূপ (ফকির, মিস্কিন, অভাবী লোক) যে তার থেকে যাকাত গ্রহণ করবে। আর আরবের মাটি (বর্তমানে যার অধিকাংশ পানি ও তরুলতা শূন্য) সবুজ শ্যামল চারণভূমি হবে। নদী নালা হবে। (সহীহ মুসলিম)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لاَ تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يَكْثُرَ الْمَالُ وَيَفِيضَ حَتَّى يَخْرُجَ الرَّجُلُ بِزَكَاةِ مَالِهِ فَلاَ يَجِدُ أَحَدًا يَقْبَلُهَا مِنْهُ وَحَتَّى تَعُودَ أَرْضُ الْعَرَبِ مُرُوجًا وَأَنْهَارًا. (رواه مسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ৭৮
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ কিয়ামতের আলামতসমূহ: কিয়ামতের সাধারণ আলামতসমূহ
৭৮. হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কিয়ামত তখন পর্যন্ত হবে না যতক্ষণ না (এ ঘটনা ঘটবে) (অসাধারণ জাতীয়) এক আগুন উঠবে হিজায ভূমি থেকে, যা বুসরা শহরের উটগুলোর গর্দান আলোকিত করবে। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لاَ تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَخْرُجَ نَارٌ مِنْ أَرْضِ الْحِجَازِ تُضِيءُ أَعْنَاقَ الإِبِلِ بِبُصْرَى. (رواه البخارى ومسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ৭৯
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ কিয়ামতের বড় আলামত সমূহ- পশ্চিম দিকে সূর্যোদয়, দাব্বাতুল আরদ-এর নির্গমন, দাজ্জালের ফিতনা, হযরত মাহদীর আগমন ও হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণ
৭৯. হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে 'আমর ইবনুল আস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের আলামত সমূহের মধ্যে সর্ব প্রথম যা প্রকাশ পাবে তা হচ্ছে- পশ্চিম দিক হতে সূর্যোদয় হবে। আর মানুষের সামনে দ্বি-প্রহরে দাব্বাতুল আরদ বের হবে। আর উভয়ের মধ্যে যেটিই প্রথম হবে অন্যটি তার সাথে সাথেই হবে। (সহীহ মুসলিম)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: إِنَّ أَوَّلَ الآيَاتِ خُرُوجًا طُلُوعُ الشَّمْسِ مِنْ مَغْرِبِهَا وَخُرُوجُ الدَّابَّةِ عَلَى النَّاسِ ضُحًى وَأَيُّهُمَا مَا كَانَتْ قَبْلَ صَاحِبَتِهَا فَالأُخْرَى عَلَى إِثْرِهَا قَرِيبًا. (رواه مسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ৮০
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ কিয়ামতের বড় আলামত সমূহ- পশ্চিম দিকে সূর্যোদয়, দাব্বাতুল আরদ-এর নির্গমন, দাজ্জালের ফিতনা, হযরত মাহদীর আগমন ও হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণ
৮০. হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, (কিয়ামতের লক্ষণ সমূহের মধ্যে) তিনটি ঘটনা যেগুলো প্রকাশ পাওয়ার পর ইতিপূর্বে যারা ঈমান আনেনি ও নেক কাজ করেনি তাদের ইমান গ্রহণ কোন ফায়দা পৌঁছাবে না (কোন কাজে আসবে না) ১. পশ্চিম দিক হতে সূর্যোদয় হওয়া, ২. দাজ্জালের আবির্ভাব হওয়া, ৩. দাব্বাতুল আরদ বের হওয়া। (সহীহ মুসলিম)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ثَلاَثٌ إِذَا خَرَجْنَ لاَ يَنْفَعُ نَفْسًا إِيمَانُهَا لَمْ تَكُنْ آمَنَتْ مِنْ قَبْلُ أَوْ كَسَبَتْ فِي إِيمَانِهَا خَيْرًا طُلُوعُ الشَّمْسِ مِنْ مَغْرِبِهَا وَالدَّجَّالُ وَدَابَّةُ الأَرْضِ. (رواه مسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ৮১
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ কিয়ামতের বড় আলামত সমূহ- পশ্চিম দিকে সূর্যোদয়, দাব্বাতুল আরদ-এর নির্গমন, দাজ্জালের ফিতনা, হযরত মাহদীর আগমন ও হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণ
৮১. হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, হযরত আদম (আ) এর জন্ম থেকে কিয়ামত আগমনের পূর্ব পর্যন্ত কোন কাজ (কোন ঘটনা, কোন বিপর্যয়) দাজ্জালের ফিতনা থেকে বিরাট ও কঠিন হবে না। (সহীহ মুসলিম)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ عِمْرَانَ بْنَ حُصَيْنٍ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَا بَيْنَ خَلْقِ آدَمَ إِلَى قِيَامِ السَّاعَةِ خَلْقٌ أَكْبَرُ مِنَ الدَّجَّالِ. (رواه مسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ৮২
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ কিয়ামতের বড় আলামত সমূহ- পশ্চিম দিকে সূর্যোদয়, দাব্বাতুল আরদ-এর নির্গমন, দাজ্জালের ফিতনা, হযরত মাহদীর আগমন ও হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণ
৮২. হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি দাজ্জাল সম্বন্ধে তোমাদের এমন কথা বলব, যা কোন নবী (আ) স্বীয় উম্মতকে বলেন নি। (শুন!) সে কানা হবে। (তার চোখে আঙ্গুরের দানার ন্যায় পুতলি ফোলা হবে) তার সাথে জান্নাতের ন্যায় একটি জিনিস থাকবে এবং জাহান্নামের ন্যায় একটি জিনিস থাকবে। সুতরাং সে যেটিকে জান্নাত বলবে প্রকৃত পক্ষে তা জাহান্নাম হবে। হুযুর (সা) আরও বললেন, আমি তোমাদেরকে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করছি, যেভাবে সর্তক করেছিলেন আল্লাহর নবী হযরত নূহ্ (আ) তাঁর জাতিকে। (সহীহ বুখারী, সহীহ্ মুসলিম)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَلاَ أُحَدِّثُكُمْ حَدِيثًا عَنِ الدَّجَّالِ مَا حَدَّثَ بِهِ نَبِيٌّ قَوْمَهُ، إِنَّهُ أَعْوَرُ، وَإِنَّهُ يَجِيءُ مَعَهُ بِمِثَالِ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ، فَالَّتِي يَقُولُ إِنَّهَا الْجَنَّةُ. هِيَ النَّارُ، وَإِنِّي أُنْذِرُكُمْ كَمَا أَنْذَرَ بِهِ نُوحٌ قَوْمَهُ. (رواه البخارى ومسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ৮৩
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ হযরত মাহদীর আগমন, তাঁর মাধ্যমে অনুষ্ঠিতব্য বিপ্লব
এ বিষয় সম্পর্কিত যেসব হাদীস ও বর্ণনা কোন পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য, সেগুলোর মোদ্দাকথা হচ্ছে, এ জগতের শেষ ও কিয়ামতের পূর্বে শেষ যুগে, সে যুগের রাষ্ট্রীয় কর্ণধারদের পক্ষ হতে মুসলিম উম্মতের ওপর এরূপ কঠিন ও ভয়ানক অত্যাচার হবে যে, আল্লাহর প্রশস্ত যমিন তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে পড়বে। সবদিকে অত্যাচারের যুগ হবে। তখন আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মত হতে (কোন কোন বর্ণনা মুতাবিক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বংশ হতে) এক মুজাহিদকে দাঁড় করাবেন। তাঁর চেষ্টা-প্রচেষ্টার ফলে এরূপ বিপ্লব সাধিত হবে যে, দুনিয়া থেকে অত্যাচার অবিচার খতম হবে। চারদিকে ন্যায় ও ইনসাফের যুগ চালু হবে। তখন আল্লাহ্ তা'আলার নিকট হতে অসাধারণ বরকতসমূহ প্রকাশ পাবে। আসমান থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী ভরপুর বৃষ্টি হবে এবং যমিন থেকে অস্বাভাবিক ও প্রাকৃতিকরূপে ফসল উৎপন্ন হবে।
যে মুজাহিদ ব্যক্তির মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা এ বিপ্লব ঘটাবেন (কোন কোন বর্ণনা মুতাবিক তাঁর নাম মুহাম্মদ, তাঁর পিতার নাম আবদুল্লাহ্ হবে। মাহদী তাঁর উপাধী হবে।) আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর থেকে লোকদের হিদায়াতের কাজ গ্রহণ করবেন।
এই সংক্ষিপ্ত ভূমিকার পর এ ধারাবাহিকতায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীসমূহ সম্মানিত পাঠকবৃন্দ পাঠ করুন।
এ বিষয় সম্পর্কিত যেসব হাদীস ও বর্ণনা কোন পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য, সেগুলোর মোদ্দাকথা হচ্ছে, এ জগতের শেষ ও কিয়ামতের পূর্বে শেষ যুগে, সে যুগের রাষ্ট্রীয় কর্ণধারদের পক্ষ হতে মুসলিম উম্মতের ওপর এরূপ কঠিন ও ভয়ানক অত্যাচার হবে যে, আল্লাহর প্রশস্ত যমিন তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে পড়বে। সবদিকে অত্যাচারের যুগ হবে। তখন আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মত হতে (কোন কোন বর্ণনা মুতাবিক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বংশ হতে) এক মুজাহিদকে দাঁড় করাবেন। তাঁর চেষ্টা-প্রচেষ্টার ফলে এরূপ বিপ্লব সাধিত হবে যে, দুনিয়া থেকে অত্যাচার অবিচার খতম হবে। চারদিকে ন্যায় ও ইনসাফের যুগ চালু হবে। তখন আল্লাহ্ তা'আলার নিকট হতে অসাধারণ বরকতসমূহ প্রকাশ পাবে। আসমান থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী ভরপুর বৃষ্টি হবে এবং যমিন থেকে অস্বাভাবিক ও প্রাকৃতিকরূপে ফসল উৎপন্ন হবে।
যে মুজাহিদ ব্যক্তির মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা এ বিপ্লব ঘটাবেন (কোন কোন বর্ণনা মুতাবিক তাঁর নাম মুহাম্মদ, তাঁর পিতার নাম আবদুল্লাহ্ হবে। মাহদী তাঁর উপাধী হবে।) আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর থেকে লোকদের হিদায়াতের কাজ গ্রহণ করবেন।
এই সংক্ষিপ্ত ভূমিকার পর এ ধারাবাহিকতায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীসমূহ সম্মানিত পাঠকবৃন্দ পাঠ করুন।
৮৩. হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন (শেষ যুগে) আমার উম্মতের ওপর তাদের রাষ্ট্রীয় কর্ণধার থেকে কঠিন বিপদ পতিত হবে, এমনকি আল্লাহর প্রশস্ত যমিন তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে যাবে। তখন আল্লাহ্ তা'আলা আমার বংশ থেকে এক ব্যক্তিকে দাঁড় করাবেন। তাঁর চেষ্টা-প্রচেষ্টায় এরূপ বিপ্লব সাধিত হবে যে, যেভাবে অন্যায়-অত্যাচারে আল্লাহর যমিন পরিপূর্ণ হয়েছিল সেভাবে ন্যায় ও ইনসাফে পরিপূর্ণ হবে। আসমানের বাসিন্দা তার প্রতি সন্তুষ্ট হবে এবং যমিনের বাসিন্দাও। যমিনে যে বীজ ফেলা হবে, তা যমিন আঁকড়ে রাখবে না বরং তা থেকে যে চারা উৎপন্ন হওয়ার ছিল উৎপন্ন হবে। (বীজের একটি দানাও নষ্ট হবে না) এভাবে আসমান বৃষ্টির ফোঁটা আটকিয়ে রাখবে না, বরং তা বর্ষিত করবে (অর্থাৎ প্রয়োজন অনুযায়ী পরিপূর্ণ বৃষ্টি হবে) আর সেই মুজাহিদ ব্যক্তি মানুষের মধ্যে সাত বছর কিংবা আট বছর অথবা নয় বছর জীবনযাপন করবেন। (মুসতাদরাকে হাকীম)(১)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَنْزِلُ بِأُمَّتِي بَلَاءٌ شَدِيدٌ مِنْ سُلْطَانِهِمْ، حَتَّى يَضِيقَ الْأَرْضُ عَنْهُمُ، فَيَبْعَثُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ رَجُلًا مِنْ عِتْرَتِي، فَيَمْلَأُ الْأَرْضَ قِسْطًا وَعَدْلًا، كَمَا مُلِئَتْ ظُلْمًا وَجَوْرًا، يَرْضَى عَنْهُ سَاكِنُ السَّمَاءِ وَسَاكِنُ الْأَرْضِ، لَا تَدَّخِرُ الْأَرْضُ شَيْئًا مِنْ بَذْرِهَا إِلَّا أَخْرَجَتْهُ، وَلَا السَّمَاءُ مِنْ قَطْرِهَا إِلَّا صَبَّتْهُ، وَيَعِيشُ سَبْعَ سِنِينَ أَوْ ثَمَانَ سِنِينَ أَوْ تِسْعًا. (رواه الحاكم فى المستدرك)
হাদীস নং: ৮৪
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ হযরত মাহদীর আগমন, তাঁর মাধ্যমে অনুষ্ঠিতব্য বিপ্লব
৮৪. হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, দুনিয়া তখন পর্যন্ত শেষ হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমার বংশের এক ব্যক্তি আরবের মালিক ও শাসক হবে। আর তার নাম আমার নাম অনুযায়ী (অর্থাৎ মুহাম্মদ) হবে। (তিরমিযী)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ ابْنِ مَسْعُوْدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لاَ تَذْهَبُ الدُّنْيَا حَتَّى يَمْلِكَ الْعَرَبَ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ بَيْتِي يُوَاطِئُ اسْمُهُ اسْمِي. (رواه الترمذى)
তাহকীক:
হাদীস নং: ৮৫
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ হযরত মাহদীর আগমন, তাঁর মাধ্যমে অনুষ্ঠিতব্য বিপ্লব
৮৫. হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন মাহদী আমার বংশধর থেকে হবে। প্রশস্ত কপাল, উন্নত নাসিকা। সে পূর্ণ করবে যমীনকে ন্যায় ও ইনসাফ দ্বারা। সে সাত বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। (সুনানে আবূ দাউদ)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: الْمَهْدِيُّ مِنِّي أَجْلَى الْجَبْهَةِ أَقْنَى الأَنْفِ يَمْلأُ الأَرْضَ قِسْطًا وَعَدْلاً كَمَا مُلِئَتْ جَوْرًا وَظُلْمًا يَمْلِكُ سَبْعَ سِنِينَ. (رواه ابوداؤد)
তাহকীক:
হাদীস নং: ৮৬
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ হযরত মাহদীর আগমন, তাঁর মাধ্যমে অনুষ্ঠিতব্য বিপ্লব
৮৬. হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, শেষ যুগে এক খলীফা (অর্থাৎ ন্যায়পরায়ণ সুলতান) হবে, যে মাল বণ্টন করবে, আর গুণে গুণে দেবে না। (সহীহ মুসলিম)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَكُونُ فِي آخِرِ الزَّمَانِ خَلِيفَةٌ يَقْسِمُ الْمَالَ وَلاَ يَعُدُّهُ. (رواه مسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ৮৭
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ হযরত মাহদীর আগমন, তাঁর মাধ্যমে অনুষ্ঠিতব্য বিপ্লব
৮৭. উম্মুল মু'মিনীন হযরত উম্মে সালিমা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, মাহ্দী আমার বংশধর হতে ফাতিমার আওলাদের মধ্যে হবে। (সুনানে আবু দাউদ)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: الْمَهْدِيُّ مِنْ عِتْرَتِي مِنْ أَوْلَادِ فَاطِمَةَ. (رواه ابوداؤد)
তাহকীক:
হাদীস নং: ৮৮
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ হযরত মাহদীর আগমন, তাঁর মাধ্যমে অনুষ্ঠিতব্য বিপ্লব
৮৮. আবু ইস্হাক তাবিঈ (রহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত আলী (রা) স্বীয় পুত্র হযরত হাসান (রা)-এর প্রতি তাকিয়ে বলেন, আমার এ পুত্র (সায়্যিদ) যে রূপে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে এ নাম (সায়্যিদ) দিয়েছেন। সে অবশ্যই এরূপ হবে যে, তার ঔরসে এক ব্যক্তি জন্ম গ্রহণ করবে, তার নাম তোমাদের নবীর নামে (অর্থাৎ মুহাম্মদ) হবে। চরিত্রে সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সামঞ্জস্যশীল হবে। আর দৌহিক গঠনে সে তাঁর সাথে অধিক সামঞ্জস্যশীল হবে না। এরপর হযরত আলী (রা) এ ঘটনা উল্লেখ করেন যে, সে ন্যায় ও ইনসাফে ভূ-পৃষ্ঠ পূর্ণ করবে। (সুনানে আবূ দাউদ)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ قَالَ: قَالَ عَلِيٌّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَنَظَرَ إِلَى ابْنِهِ الْحَسَنِ ابْنِي هَذَا سَيِّدٌ كَمَا سَمَّاهُ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَسَيَخْرُجُ مِنْ صُلْبِهِ رَجُلٌ يُسَمَّى بِاسْمِ نَبِيِّكُمْ يُشْبِهُهُ فِي الْخُلُقِ وَلاَ يُشْبِهُهُ فِي الْخَلْقِ ثُمَّ ذَكَرَ قِصَّةَ يَمْلأُ الأَرْضَ عَدْلاً. (رواه ابوداؤد)
তাহকীক:
হাদীস নং: ৮৯
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণ
কিয়ামতের বড় আলামতগুলো যা হাদীসমূহের বর্ণনা অনুযায়ী দুনিয়া শেষ হওয়ার নিকটবর্তী পূর্বে প্রকাশ পাবে হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণও সেগুলোর মধ্যে একটি অস্বাভাবিক বড় ঘটনা। এ পৃষ্ঠাগুলোতে নিয়ামানুযায়ী এ বিষয় সম্পর্কিত কতক হাদীস পেশ করা হবে। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, হাদীসের প্রায় সব কিতাবেই বিভিন্ন সনদে এত অধিক সাহাবা কিরাম (রা) থেকে ঈসা (আ)-এর অবতরণের হাদীসসমূহ বর্ণিত হয়েছে, যাদের ব্যাপারে (তাঁদের সাহাবা মর্যাদা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে, বুদ্ধি ও রীতি নীতির হিসাবেও) এ সন্দেহ করা যেতে পারে না যে, তাঁরা পরস্পর যোগ সাজস করে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি মিথ্যা কাহিনী গড়েছেন যে, কিয়ামতের পূর্বে আসমান থেকে হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণের সংবাদ তিনি দিয়েছেন।
এভাবে এ সন্দেহও করা যায় না যে, সেই সাহাবা কিরাম (রা) তাঁর কথা বুঝতে ভুল করেছিলেন। বস্তুত হাদীস ভাণ্ডারে এ বিয়য়ে যে সব বর্ণনা রয়েছে, সেগুলো দৃষ্টিগোচর রাখলে প্রতিটি সুষ্ঠু জ্ঞানী ব্যক্তির এ বিষয়ে নিশ্চিত জ্ঞান অর্জিত হবে যে, কিয়ামতের পূর্বে হযরত মাসীহ্ (আ)-এর আসমান থেকে অবতরণের সংবাদ রাসূলুল্লাহ্ উম্মতকে দিয়েছিলেন। এজন্য আমাদের উস্তাদ হযরত আল্লামা মুহাম্মদ আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী (রহ)-এর পুস্তিকা- 'التَصْرِيحُ بِمَا تَوَاتَرَ فِي نَزول المسيح' (ঈসা (আ)-এর অবতরণের পারম্পরিক খবরের বিশ্লেষণ) পাঠই যথেষ্ঠ। এতে হাদীসের কিতাবসমূহ থেকে কেবল এ বিষয় সম্পর্কিত হাদীস নির্বাচন করে সত্তরের উপর হাদীস একত্রিত করা হয়েছে। তদুপরি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস ছাড়াও কুরআন মজীদ থেকে ঈসা (আ) কে আসমানের প্রতি উত্তোলন করা, কিয়ামতের পূর্বে এ জগতে তাঁর আগমন প্রমাণিত। এ বিষয়ে প্রশান্তি লাভের জন্য হযরত উস্তাদের পুস্তিকা- عقيدة الإسلام في حياة عيسى عليه السلام (ঈসা (আ)-এর জীবন সম্বন্ধে ইসলামের আকীদা) পাঠ করাই যথেষ্ঠ হবে। (উল্লেখ্য, হযরত উস্তাদের এ উভয় পুস্তিকা আরবী ভাষায় লিখিত)
এই অক্ষমের লিখিত قادیانی کیون مسلمان نہی ، اور مسئلہ نزول مسیح وحيات مسيح (কাদিয়ানী কেন মুসলমান নয় বরং ঈসা (আ)-এর অবতরণ ও জীবন) পুস্তিকায় প্রায় সত্তর পৃষ্ঠা এ বিষয়েই লিখা হয়েছে। উর্দুভাষীগণ এটা পাঠ করলে ইন্শাআল্লাহ্ এই প্রশান্তি ও ইয়াকীন অর্জিত হবে যে, স্বীয় মু'জিযাসুলভ ভঙ্গিতে কুরআন মজীদ এবং পূর্ণ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের সাথে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণের সংবাদ দিয়েছেন।
যেহেতু এ বিষয়ে বহু লোকের বুদ্ধিবৃত্তিক সন্দেহ ও সংশয় জাগে এবং কাদিয়ানী লেখকরা (মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর ঈসা দাবি করার সুযোগ সৃষ্টি করণে) এ বিষয়ে ছোট বড় অসংখ্য পুস্তিকা ও প্রবন্ধ লিখে সন্দেহ সংশয় সৃষ্টি করার চেষ্টা করে চলছে, তাই সঙ্গত মনে করা হয়েছে যে, হাদীসসমূহের ব্যাখ্যার পূর্বে ভূমিকাস্বরূপ এ সম্বন্ধে কিছু মৌলিক কথা পেশ করা হবে। আশা করা যায়, এসব পাঠের পর ইন্শাআল্লাহ্ মু'মিন ও জ্ঞানী পাঠকবৃন্দের এ বিষয়ে সেই প্রশান্তি ও ইয়াকীন অর্জিত হবে, যার পর সন্দেহ ও সংশয়ের কোন সুযোগ থাকবে না। (আল্লাহ্ তাওফীক দিন)।
ঈসা (আ)-এর অবতরণ সম্বন্ধে কতক মৌলিক কথা
১. এ বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করার কালে সর্ব প্রথম এ গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, এর সম্বন্ধ সেই সত্তার সাথে যার অস্তিত্বই আল্লাহ্ সাধারণ নীতি ও এ জগতে প্রচলিত প্রাকৃতিক নিয়মের সম্পূর্ণ বিপরীত। অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মারয়াম (আ) এরূপে জন্মলাভ করেননি যে রূপে আমাদের এ জগতে মানুষ নর-নারীর মেলা-মেশা ও সঙ্গমের ফলে জন্মলাভ করে থাকে। (আর যে রূপে সব মহান নবীগণ এবং তাঁদের শেষ ও সরদার হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও জন্ম গ্রহণ করেছেন) বরং তিনি আল্লাহ্ তা'আলার বিশেষ কুদরত ও তাঁর নির্দেশে তাঁর ফেরশতা জিবরাইল আমীন (রূহুল কুদ্দুস)-এর মাধ্যমে কোন পুরুষ কর্তৃক স্পর্শ ছাড়াই মারয়াম সিদ্দীকার গর্ভে মু'জিযা হিসাবে তাঁকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এজন্যই কুরআন মজীদে তাঁকে 'আল্লাহর কলিমাও' বলা হয়েছে। কুরআন মজীদ সূরা আল ইমরানের আয়াত-৩৫-৩৬ এবং সূরা মারয়ামের আয়াত ১৯-২৩ এর মধ্যে মু'জিযা হিসাবে তাঁর জন্ম লাভের অবস্থা বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। (ইঞ্জিলের বর্ণনাও এটাই। গোটা দুনিয়ার মুসলমান ও খ্রিস্টানদের আকীদা এ অনুযায়ীই)
এভাবেই তাঁর সম্বন্ধে কুরআন মজীদে অন্য এক আশ্চর্য কথা এই বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহর কুদরত এবং তাঁর নির্দেশ ও কালিমার মু'জিযাস্বরূপ তিনি যখন মারয়াম সিদ্দীকার গর্ভে পয়দা হলেন, (যিনি কুমারী ছিলেন এবং কোন পুরুষের সাথে তাঁর বিয়ে হয়নি) আর তিনি তাঁকে কোলে নিয়ে লোকালয়ে এলেন, আত্মীয় স্বজন ও লোকালয়ের বাসিন্দারা তাঁর সম্বন্ধে বাজে কথা প্রকাশ করল, (আল্লাহর আশ্রয় চাই) নবজাতক বাচ্চাকে জারজ সন্তান আখ্যায়িত করল। তখন সেই নব জাতক শিশু (ঈসা ইবনে মারয়াম) আল্লাহর নির্দেশে তখনই কথা বললেন, এবং নিজের সম্বন্ধে ও হযরত মারয়ামের পবিত্রতা সম্বন্ধে বর্ণনা দিলেন। (সূরা মারয়াম আয়াত ২৭-৩০)
এরপর কুরআন মজীদে বর্ণনা করা হয়েছে, আল্লাহর নির্দেশে তাঁর হাতে বুদ্ধি হতভম্বকারী মু'জিযাসমূহ প্রকাশ পায়। মাটির কাদা দিয়ে তিনি পাখির আকৃতি বানাতেন, এরপর তাতে ফুঁক দিতেন, তখন তা জীবিত পাখির ন্যায় শূন্যে উড়ে যেত। জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ রোগীদের ওপর হাতের স্পর্শ করতেন অথবা ফুঁক দিতেন তৎক্ষণাত তারা ভাল হয়ে যেত। অন্ধদের চোখ আলোকিত হত, আর কুষ্ঠ রোগীদের শরীরে কোন দাগ চিহ্নও থাকত না। এসবেরও ঊর্ধ্বে তিনি মৃতদেরকে জীবিত করে দেখাতেন। তাঁর এই বুদ্ধি হতভম্বকারী মু'জিযার বর্ণনাও কুরআন মজীদে (সূরা আল ইমরান ও সূরা মায়িদায়) বিস্তারিত সুস্পষ্ট বর্ণনা করা হয়েছে। ইঞ্জিলে এই মু'জিযাগুলোর উল্লেখ কতক বর্ধিত আকারে করা হয়েছে। খ্রিস্টান জগতের আকীদাও এরূপই।
এরপর কুরআন মজীদে এ কথাও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ্ তা'আলা তাঁকে নবুওত ও রিসালতের আসনে সমাসীন করলেন, আর তিনি স্বীয় জাতি বনী ইসরাঈলকে ঈমান ও ঈমানী জীবন যাপনের দাওআত দিলেন, তখন তাঁর জাতির লোকেরা তাঁকে মিথ্যা নবুওতের দাবিদার প্রতিপন্ন করে ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। (১) বস্তুত তাদের ধারণায় এই সিদ্ধান্তকে তাঁরা বাস্তবায়িত করেছে। ঈসা (আ) কে ফাঁসিতে চড়িয়ে মৃত্যুর ঘাটে পৌঁছিয়েছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে এরূপ হয়নি। (তারা যে ব্যক্তিকে হযরত ঈসা (আ) মনে করে ফাঁসীতে চড়িয়েছিল সে ছিল অন্য এক ব্যক্তি) ঈসা (আ) কে তো সেই ইয়াহুদীরা পায়ই নি। আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় বিশেষ কুদরতে তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেন। আর আল্লাহর নির্দেশে কিয়ামতের পূর্বে তিনি পুনরায় এ জগতে আসবেন, এখানেই ইন্তিকাল করবেন। তাঁর ইন্তিকালের পূর্বে সে সময়ের আহলি কিতাব তাঁর প্রতি ঈমান আনবে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর দ্বারা দীনে মুহাম্মদীর খিদমত উঠাবেন। তাঁর অবতরণ কিয়ামতের এক বিশেষ আলামত ও চিহ্ন হবে। সূরা নিসা ও সূরা যুখরুফে এ সব বর্ণনা করা হয়েছে। (২)
টিকা: ১. তাওরাতের কানূন ও ইসরাঈলী শরী'আতে নবুওত ও রিসালাতের মিথ্যা দাবিদারদের শান্তি এটাই ছিল, যেভাবে ইসলামী শরী'আতে মিথ্যা নবুওতী দাবিদারদের শান্তি রয়েছে।
টিকা: ২. সূরা নিসা ও সূরা যুখরুফের যেসব আয়াতে এ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ব্যাখ্যা ও তাফসীর, লিখকের قادیانی کیون مسلمان نہی ، اور مسئلہ نزول مسیح وحيات مسيح এ দেখা যেতে পারে। (পৃঃ ৯৪-১২০) আশা করা যায়, পুস্তিকাটি পাঠ করলে প্রত্যেক স্বাভাবিক মু'মিন ব্যক্তির ইন্শাআল্লাহ্ সান্ত্বনা হবে যে, সেই আয়াতগুলোতে হযরত ঈসা (আ)-এর আসমানে উঠিয়ে নেওয়া ও শেষ যুগে পুনরায় এ জগতে অবতরণের বর্ণনা করা হয়েছে। আর তাঁর এই অবতরণকে কিয়ামতের আলামত ও চিহ্ন বলা হয়েছে।
সুতরাং যে মু'মিন কুরআন মজীদের বর্ণনা মুতাবিক তাঁর মু'জিযাস্বরূপ জন্ম ও তাঁর উপরিল্লিখিত হতবুদ্ধিকারী মু'জিযাসমূহের প্রতি ঈমান এনেছে, আল্লাহর নির্দেশে তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া ও তাঁরই নির্দেশে তাঁকে আসমান থেকে অবতরণের ব্যাপারে সেই মু'মিনের কী সন্দেহ থাকতে পারে?
বস্তুত ঈসা (আ)-এর অবতরণের ওপর চিন্তা করার কালে সর্ব প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দৃষ্টিগোচর রাখা চাই যে, হযরত ঈসা (আ)-এর উদ্ভূত সত্তা এবং উপরিল্লিখিত তাঁর বৈশিষ্ট্যাবলি যা কুরআন মজীদের বরাতে উক্ত লাইনসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে এসব বিষয়ে মনুষ্য জগতে তিনি হচ্ছেন একক।
২. এভাবেই এ বিষয়ে চিন্তা করার সময় এ কথাও দৃষ্টিগোচর রাখা চাই যে, কুরআন মজীদে যার সংবাদ সংক্ষিপ্তভাবে এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীসমূহে বিস্তারিত ও সুস্পষ্টভাবে দেওয়া হয়েছে সেই ঈসা (আ)-এর অবতরণ তখন হবে যখন কিয়ামত সম্পূর্ণ সন্নিকটে হয়ে পড়বে। আর এর নিকটবর্তী বড় আলামতের প্রকাশ শুরু হয়ে থাকবে। যেমন, পূর্ব দিকের পরিবর্তে পশ্চিমদিক দিয়ে সূর্যোদয়, অপ্রাকৃতিক পন্থায় যমিন থেকে দাব্বাতুল আরদ-এর পয়দা হওয়া এবং সে তাই করবে যা সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
তখন যেন কিয়ামতের সুবহি সাদিক শুরু হয়ে গেছে। আর জাগতিক শৃঙ্খলার পরিবর্তনের কাজ শুরু হয়ে থাকবে। তখন ক্রমাগত সেই অপ্রাকৃতিক ও বিপর্যয় প্রকাশ পাবে, আজ যেগুলোর কল্পনাই করা যায় না। (সেগুলোর মধ্যে দাজ্জালের বের হওয়া ও হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণও হবে)।
সুতরাং ঈসা (আ)-এর অবতরণ কিংবা দাজ্জালের আবির্ভাব ও প্রকাশকে এই ভিত্তিতে অস্বীকার করা যে, তাঁর যে প্রকার ও বিশ্লেষণ হাদীসসমূহে বর্ণিত হয়েছে তা আমাদের বুদ্ধির বাইরে, সম্পূর্ণ এরকমই যেমন এ কারণে কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নামকে অস্বীকার করা যে, এগুলোর বিস্তারিত বিবরণ কুরআন মজীদে বর্ণনা করা হয়েছে তা আমাদের বোধগম্য নয়। যে সব লোক এ জাতীয় কথা বলে তাদের প্রকৃত পরিচয় হচ্ছে, তারা আল্লাহ্ তা'আলার পরিচয় থেকে বঞ্চিত এবং কুদরতের প্রশস্ততা সম্বন্ধে অপরিচিত।
৩. ঈসা (আ)-এর জীবন ও তাঁর অবতরণের ওপর চিন্তা গবেষণা করার কালে তৃতীয় এ কথাও দৃষ্টিগোচর রাখা চাই যে, কুরআন মজীদের বর্ণনা এবং আমরা মুসলমানদের আকীদা অনুযায়ী হযরত মাসীহ আমাদের এ জগতে নেই। এখানের সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়ম হচ্ছে, মানুষ পানাহারের ন্যায় প্রয়োজনাবলি ও চাহিদাসমূহ হতে অমুখাপেক্ষী হতে পারে না। বরং তিনি আসমানী যে জগতে আছেন সেখানে এ জাতীয় কোন প্রয়োজন ও চাহিদা নেই। যেমন ফেরতাদের কোন চাহিদা নেই।
হযরত মাসীহ্ (আ) যদিও মাতার পক্ষ হতে মনুষ্য বংশধারার, কিন্তু তাঁর জন্ম আল্লাহ্ তা'আলার 'কলিমা' দ্বারা তাঁর ফেরেশতা 'রুহুল কুদ্দুস'-এর মাধ্যমে হয়েছিল। এজন্য তিনি যতদিন আমাদের মনুষ্য জগতে ছিলেন মনুষ্য প্রয়োজনাবলিও তাঁর সাথে ছিল। তবে যখন মনুষ্য জগত হতে আসমানী জগত ও ফেরেস্তা জগতের প্রতি উন্নিত হলেন, তখন এই প্রয়োজনাবলি ও চাহিদাসমূহ থেকে ফেরেস্তাদেরই ন্যায় তিনি অমুখাপেক্ষী হয়ে যান। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়ার الجواب الصحِيحُ لِمَنْ بَدَّلَ دِيْنَ الْمَسِيحِ (যা প্রকৃত পক্ষে খ্রিস্টানদের প্রত্যাখ্যানে লিখা হয়েছিল) তাতে এক স্থানে যেন এ প্রশ্নেরই উত্তর দিতে গিয়ে যে, 'হযরত মসীহ (আ) যখন আসমানে আছেন তখন তাঁর পানাহার জাতীয় প্রয়োজনাবলির কী ব্যবস্থা?' শায়খুল ইসলাম লিখেন, فليست حالته كحالة أهل الأرض في الأكل والشرب واللباس والنوم والغائط والبول ونحو ذلك সেখানে (আসমানে) পানাহার, পোশাক, নিদ্রা ও পেশাব পায়খানার ন্যায় প্রয়োজনাবলি ও চাহিদার ব্যাপারে তাঁর অবস্থা জগতবাসীর অবস্থার ন্যায় নয়। (সেখানে ফেরেস্তাগণের ন্যায় এসব জিনিস থেকে তিনি অমুখাপেক্ষী)
এই মৌলিক কথাগুলো দৃষ্টিগোচর রাখা হলে আশা করা যায়, হযরত ঈসা (আ) -এর জীবন ও অবতরণের ব্যাপারে সেই সন্দেহ ও সংশয় ইন্শাআল্লাহ্ সৃষ্টি হবে না, যা বুদ্ধির দৈন্যতা, ঈমানের দুর্বলতা ও আল্লাহ্ তা'আলার কুদরতের প্রশস্ততা সম্বন্ধে অজ্ঞতার কারণে সৃষ্টি হয়ে থাকে।
এ ভূমিকার পর মাসীহ্ (আ)-এর অবতরণ সম্পর্কিত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীসমূহ পাঠ করা যেতে পারে।
কিয়ামতের বড় আলামতগুলো যা হাদীসমূহের বর্ণনা অনুযায়ী দুনিয়া শেষ হওয়ার নিকটবর্তী পূর্বে প্রকাশ পাবে হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণও সেগুলোর মধ্যে একটি অস্বাভাবিক বড় ঘটনা। এ পৃষ্ঠাগুলোতে নিয়ামানুযায়ী এ বিষয় সম্পর্কিত কতক হাদীস পেশ করা হবে। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, হাদীসের প্রায় সব কিতাবেই বিভিন্ন সনদে এত অধিক সাহাবা কিরাম (রা) থেকে ঈসা (আ)-এর অবতরণের হাদীসসমূহ বর্ণিত হয়েছে, যাদের ব্যাপারে (তাঁদের সাহাবা মর্যাদা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে, বুদ্ধি ও রীতি নীতির হিসাবেও) এ সন্দেহ করা যেতে পারে না যে, তাঁরা পরস্পর যোগ সাজস করে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি মিথ্যা কাহিনী গড়েছেন যে, কিয়ামতের পূর্বে আসমান থেকে হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণের সংবাদ তিনি দিয়েছেন।
এভাবে এ সন্দেহও করা যায় না যে, সেই সাহাবা কিরাম (রা) তাঁর কথা বুঝতে ভুল করেছিলেন। বস্তুত হাদীস ভাণ্ডারে এ বিয়য়ে যে সব বর্ণনা রয়েছে, সেগুলো দৃষ্টিগোচর রাখলে প্রতিটি সুষ্ঠু জ্ঞানী ব্যক্তির এ বিষয়ে নিশ্চিত জ্ঞান অর্জিত হবে যে, কিয়ামতের পূর্বে হযরত মাসীহ্ (আ)-এর আসমান থেকে অবতরণের সংবাদ রাসূলুল্লাহ্ উম্মতকে দিয়েছিলেন। এজন্য আমাদের উস্তাদ হযরত আল্লামা মুহাম্মদ আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী (রহ)-এর পুস্তিকা- 'التَصْرِيحُ بِمَا تَوَاتَرَ فِي نَزول المسيح' (ঈসা (আ)-এর অবতরণের পারম্পরিক খবরের বিশ্লেষণ) পাঠই যথেষ্ঠ। এতে হাদীসের কিতাবসমূহ থেকে কেবল এ বিষয় সম্পর্কিত হাদীস নির্বাচন করে সত্তরের উপর হাদীস একত্রিত করা হয়েছে। তদুপরি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস ছাড়াও কুরআন মজীদ থেকে ঈসা (আ) কে আসমানের প্রতি উত্তোলন করা, কিয়ামতের পূর্বে এ জগতে তাঁর আগমন প্রমাণিত। এ বিষয়ে প্রশান্তি লাভের জন্য হযরত উস্তাদের পুস্তিকা- عقيدة الإسلام في حياة عيسى عليه السلام (ঈসা (আ)-এর জীবন সম্বন্ধে ইসলামের আকীদা) পাঠ করাই যথেষ্ঠ হবে। (উল্লেখ্য, হযরত উস্তাদের এ উভয় পুস্তিকা আরবী ভাষায় লিখিত)
এই অক্ষমের লিখিত قادیانی کیون مسلمان نہی ، اور مسئلہ نزول مسیح وحيات مسيح (কাদিয়ানী কেন মুসলমান নয় বরং ঈসা (আ)-এর অবতরণ ও জীবন) পুস্তিকায় প্রায় সত্তর পৃষ্ঠা এ বিষয়েই লিখা হয়েছে। উর্দুভাষীগণ এটা পাঠ করলে ইন্শাআল্লাহ্ এই প্রশান্তি ও ইয়াকীন অর্জিত হবে যে, স্বীয় মু'জিযাসুলভ ভঙ্গিতে কুরআন মজীদ এবং পূর্ণ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের সাথে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণের সংবাদ দিয়েছেন।
যেহেতু এ বিষয়ে বহু লোকের বুদ্ধিবৃত্তিক সন্দেহ ও সংশয় জাগে এবং কাদিয়ানী লেখকরা (মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর ঈসা দাবি করার সুযোগ সৃষ্টি করণে) এ বিষয়ে ছোট বড় অসংখ্য পুস্তিকা ও প্রবন্ধ লিখে সন্দেহ সংশয় সৃষ্টি করার চেষ্টা করে চলছে, তাই সঙ্গত মনে করা হয়েছে যে, হাদীসসমূহের ব্যাখ্যার পূর্বে ভূমিকাস্বরূপ এ সম্বন্ধে কিছু মৌলিক কথা পেশ করা হবে। আশা করা যায়, এসব পাঠের পর ইন্শাআল্লাহ্ মু'মিন ও জ্ঞানী পাঠকবৃন্দের এ বিষয়ে সেই প্রশান্তি ও ইয়াকীন অর্জিত হবে, যার পর সন্দেহ ও সংশয়ের কোন সুযোগ থাকবে না। (আল্লাহ্ তাওফীক দিন)।
ঈসা (আ)-এর অবতরণ সম্বন্ধে কতক মৌলিক কথা
১. এ বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করার কালে সর্ব প্রথম এ গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, এর সম্বন্ধ সেই সত্তার সাথে যার অস্তিত্বই আল্লাহ্ সাধারণ নীতি ও এ জগতে প্রচলিত প্রাকৃতিক নিয়মের সম্পূর্ণ বিপরীত। অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মারয়াম (আ) এরূপে জন্মলাভ করেননি যে রূপে আমাদের এ জগতে মানুষ নর-নারীর মেলা-মেশা ও সঙ্গমের ফলে জন্মলাভ করে থাকে। (আর যে রূপে সব মহান নবীগণ এবং তাঁদের শেষ ও সরদার হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও জন্ম গ্রহণ করেছেন) বরং তিনি আল্লাহ্ তা'আলার বিশেষ কুদরত ও তাঁর নির্দেশে তাঁর ফেরশতা জিবরাইল আমীন (রূহুল কুদ্দুস)-এর মাধ্যমে কোন পুরুষ কর্তৃক স্পর্শ ছাড়াই মারয়াম সিদ্দীকার গর্ভে মু'জিযা হিসাবে তাঁকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এজন্যই কুরআন মজীদে তাঁকে 'আল্লাহর কলিমাও' বলা হয়েছে। কুরআন মজীদ সূরা আল ইমরানের আয়াত-৩৫-৩৬ এবং সূরা মারয়ামের আয়াত ১৯-২৩ এর মধ্যে মু'জিযা হিসাবে তাঁর জন্ম লাভের অবস্থা বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। (ইঞ্জিলের বর্ণনাও এটাই। গোটা দুনিয়ার মুসলমান ও খ্রিস্টানদের আকীদা এ অনুযায়ীই)
এভাবেই তাঁর সম্বন্ধে কুরআন মজীদে অন্য এক আশ্চর্য কথা এই বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহর কুদরত এবং তাঁর নির্দেশ ও কালিমার মু'জিযাস্বরূপ তিনি যখন মারয়াম সিদ্দীকার গর্ভে পয়দা হলেন, (যিনি কুমারী ছিলেন এবং কোন পুরুষের সাথে তাঁর বিয়ে হয়নি) আর তিনি তাঁকে কোলে নিয়ে লোকালয়ে এলেন, আত্মীয় স্বজন ও লোকালয়ের বাসিন্দারা তাঁর সম্বন্ধে বাজে কথা প্রকাশ করল, (আল্লাহর আশ্রয় চাই) নবজাতক বাচ্চাকে জারজ সন্তান আখ্যায়িত করল। তখন সেই নব জাতক শিশু (ঈসা ইবনে মারয়াম) আল্লাহর নির্দেশে তখনই কথা বললেন, এবং নিজের সম্বন্ধে ও হযরত মারয়ামের পবিত্রতা সম্বন্ধে বর্ণনা দিলেন। (সূরা মারয়াম আয়াত ২৭-৩০)
এরপর কুরআন মজীদে বর্ণনা করা হয়েছে, আল্লাহর নির্দেশে তাঁর হাতে বুদ্ধি হতভম্বকারী মু'জিযাসমূহ প্রকাশ পায়। মাটির কাদা দিয়ে তিনি পাখির আকৃতি বানাতেন, এরপর তাতে ফুঁক দিতেন, তখন তা জীবিত পাখির ন্যায় শূন্যে উড়ে যেত। জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ রোগীদের ওপর হাতের স্পর্শ করতেন অথবা ফুঁক দিতেন তৎক্ষণাত তারা ভাল হয়ে যেত। অন্ধদের চোখ আলোকিত হত, আর কুষ্ঠ রোগীদের শরীরে কোন দাগ চিহ্নও থাকত না। এসবেরও ঊর্ধ্বে তিনি মৃতদেরকে জীবিত করে দেখাতেন। তাঁর এই বুদ্ধি হতভম্বকারী মু'জিযার বর্ণনাও কুরআন মজীদে (সূরা আল ইমরান ও সূরা মায়িদায়) বিস্তারিত সুস্পষ্ট বর্ণনা করা হয়েছে। ইঞ্জিলে এই মু'জিযাগুলোর উল্লেখ কতক বর্ধিত আকারে করা হয়েছে। খ্রিস্টান জগতের আকীদাও এরূপই।
এরপর কুরআন মজীদে এ কথাও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ্ তা'আলা তাঁকে নবুওত ও রিসালতের আসনে সমাসীন করলেন, আর তিনি স্বীয় জাতি বনী ইসরাঈলকে ঈমান ও ঈমানী জীবন যাপনের দাওআত দিলেন, তখন তাঁর জাতির লোকেরা তাঁকে মিথ্যা নবুওতের দাবিদার প্রতিপন্ন করে ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। (১) বস্তুত তাদের ধারণায় এই সিদ্ধান্তকে তাঁরা বাস্তবায়িত করেছে। ঈসা (আ) কে ফাঁসিতে চড়িয়ে মৃত্যুর ঘাটে পৌঁছিয়েছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে এরূপ হয়নি। (তারা যে ব্যক্তিকে হযরত ঈসা (আ) মনে করে ফাঁসীতে চড়িয়েছিল সে ছিল অন্য এক ব্যক্তি) ঈসা (আ) কে তো সেই ইয়াহুদীরা পায়ই নি। আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় বিশেষ কুদরতে তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেন। আর আল্লাহর নির্দেশে কিয়ামতের পূর্বে তিনি পুনরায় এ জগতে আসবেন, এখানেই ইন্তিকাল করবেন। তাঁর ইন্তিকালের পূর্বে সে সময়ের আহলি কিতাব তাঁর প্রতি ঈমান আনবে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর দ্বারা দীনে মুহাম্মদীর খিদমত উঠাবেন। তাঁর অবতরণ কিয়ামতের এক বিশেষ আলামত ও চিহ্ন হবে। সূরা নিসা ও সূরা যুখরুফে এ সব বর্ণনা করা হয়েছে। (২)
টিকা: ১. তাওরাতের কানূন ও ইসরাঈলী শরী'আতে নবুওত ও রিসালাতের মিথ্যা দাবিদারদের শান্তি এটাই ছিল, যেভাবে ইসলামী শরী'আতে মিথ্যা নবুওতী দাবিদারদের শান্তি রয়েছে।
টিকা: ২. সূরা নিসা ও সূরা যুখরুফের যেসব আয়াতে এ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ব্যাখ্যা ও তাফসীর, লিখকের قادیانی کیون مسلمان نہی ، اور مسئلہ نزول مسیح وحيات مسيح এ দেখা যেতে পারে। (পৃঃ ৯৪-১২০) আশা করা যায়, পুস্তিকাটি পাঠ করলে প্রত্যেক স্বাভাবিক মু'মিন ব্যক্তির ইন্শাআল্লাহ্ সান্ত্বনা হবে যে, সেই আয়াতগুলোতে হযরত ঈসা (আ)-এর আসমানে উঠিয়ে নেওয়া ও শেষ যুগে পুনরায় এ জগতে অবতরণের বর্ণনা করা হয়েছে। আর তাঁর এই অবতরণকে কিয়ামতের আলামত ও চিহ্ন বলা হয়েছে।
সুতরাং যে মু'মিন কুরআন মজীদের বর্ণনা মুতাবিক তাঁর মু'জিযাস্বরূপ জন্ম ও তাঁর উপরিল্লিখিত হতবুদ্ধিকারী মু'জিযাসমূহের প্রতি ঈমান এনেছে, আল্লাহর নির্দেশে তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া ও তাঁরই নির্দেশে তাঁকে আসমান থেকে অবতরণের ব্যাপারে সেই মু'মিনের কী সন্দেহ থাকতে পারে?
বস্তুত ঈসা (আ)-এর অবতরণের ওপর চিন্তা করার কালে সর্ব প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দৃষ্টিগোচর রাখা চাই যে, হযরত ঈসা (আ)-এর উদ্ভূত সত্তা এবং উপরিল্লিখিত তাঁর বৈশিষ্ট্যাবলি যা কুরআন মজীদের বরাতে উক্ত লাইনসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে এসব বিষয়ে মনুষ্য জগতে তিনি হচ্ছেন একক।
২. এভাবেই এ বিষয়ে চিন্তা করার সময় এ কথাও দৃষ্টিগোচর রাখা চাই যে, কুরআন মজীদে যার সংবাদ সংক্ষিপ্তভাবে এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীসমূহে বিস্তারিত ও সুস্পষ্টভাবে দেওয়া হয়েছে সেই ঈসা (আ)-এর অবতরণ তখন হবে যখন কিয়ামত সম্পূর্ণ সন্নিকটে হয়ে পড়বে। আর এর নিকটবর্তী বড় আলামতের প্রকাশ শুরু হয়ে থাকবে। যেমন, পূর্ব দিকের পরিবর্তে পশ্চিমদিক দিয়ে সূর্যোদয়, অপ্রাকৃতিক পন্থায় যমিন থেকে দাব্বাতুল আরদ-এর পয়দা হওয়া এবং সে তাই করবে যা সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
তখন যেন কিয়ামতের সুবহি সাদিক শুরু হয়ে গেছে। আর জাগতিক শৃঙ্খলার পরিবর্তনের কাজ শুরু হয়ে থাকবে। তখন ক্রমাগত সেই অপ্রাকৃতিক ও বিপর্যয় প্রকাশ পাবে, আজ যেগুলোর কল্পনাই করা যায় না। (সেগুলোর মধ্যে দাজ্জালের বের হওয়া ও হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণও হবে)।
সুতরাং ঈসা (আ)-এর অবতরণ কিংবা দাজ্জালের আবির্ভাব ও প্রকাশকে এই ভিত্তিতে অস্বীকার করা যে, তাঁর যে প্রকার ও বিশ্লেষণ হাদীসসমূহে বর্ণিত হয়েছে তা আমাদের বুদ্ধির বাইরে, সম্পূর্ণ এরকমই যেমন এ কারণে কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নামকে অস্বীকার করা যে, এগুলোর বিস্তারিত বিবরণ কুরআন মজীদে বর্ণনা করা হয়েছে তা আমাদের বোধগম্য নয়। যে সব লোক এ জাতীয় কথা বলে তাদের প্রকৃত পরিচয় হচ্ছে, তারা আল্লাহ্ তা'আলার পরিচয় থেকে বঞ্চিত এবং কুদরতের প্রশস্ততা সম্বন্ধে অপরিচিত।
৩. ঈসা (আ)-এর জীবন ও তাঁর অবতরণের ওপর চিন্তা গবেষণা করার কালে তৃতীয় এ কথাও দৃষ্টিগোচর রাখা চাই যে, কুরআন মজীদের বর্ণনা এবং আমরা মুসলমানদের আকীদা অনুযায়ী হযরত মাসীহ আমাদের এ জগতে নেই। এখানের সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়ম হচ্ছে, মানুষ পানাহারের ন্যায় প্রয়োজনাবলি ও চাহিদাসমূহ হতে অমুখাপেক্ষী হতে পারে না। বরং তিনি আসমানী যে জগতে আছেন সেখানে এ জাতীয় কোন প্রয়োজন ও চাহিদা নেই। যেমন ফেরতাদের কোন চাহিদা নেই।
হযরত মাসীহ্ (আ) যদিও মাতার পক্ষ হতে মনুষ্য বংশধারার, কিন্তু তাঁর জন্ম আল্লাহ্ তা'আলার 'কলিমা' দ্বারা তাঁর ফেরেশতা 'রুহুল কুদ্দুস'-এর মাধ্যমে হয়েছিল। এজন্য তিনি যতদিন আমাদের মনুষ্য জগতে ছিলেন মনুষ্য প্রয়োজনাবলিও তাঁর সাথে ছিল। তবে যখন মনুষ্য জগত হতে আসমানী জগত ও ফেরেস্তা জগতের প্রতি উন্নিত হলেন, তখন এই প্রয়োজনাবলি ও চাহিদাসমূহ থেকে ফেরেস্তাদেরই ন্যায় তিনি অমুখাপেক্ষী হয়ে যান। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়ার الجواب الصحِيحُ لِمَنْ بَدَّلَ دِيْنَ الْمَسِيحِ (যা প্রকৃত পক্ষে খ্রিস্টানদের প্রত্যাখ্যানে লিখা হয়েছিল) তাতে এক স্থানে যেন এ প্রশ্নেরই উত্তর দিতে গিয়ে যে, 'হযরত মসীহ (আ) যখন আসমানে আছেন তখন তাঁর পানাহার জাতীয় প্রয়োজনাবলির কী ব্যবস্থা?' শায়খুল ইসলাম লিখেন, فليست حالته كحالة أهل الأرض في الأكل والشرب واللباس والنوم والغائط والبول ونحو ذلك সেখানে (আসমানে) পানাহার, পোশাক, নিদ্রা ও পেশাব পায়খানার ন্যায় প্রয়োজনাবলি ও চাহিদার ব্যাপারে তাঁর অবস্থা জগতবাসীর অবস্থার ন্যায় নয়। (সেখানে ফেরেস্তাগণের ন্যায় এসব জিনিস থেকে তিনি অমুখাপেক্ষী)
এই মৌলিক কথাগুলো দৃষ্টিগোচর রাখা হলে আশা করা যায়, হযরত ঈসা (আ) -এর জীবন ও অবতরণের ব্যাপারে সেই সন্দেহ ও সংশয় ইন্শাআল্লাহ্ সৃষ্টি হবে না, যা বুদ্ধির দৈন্যতা, ঈমানের দুর্বলতা ও আল্লাহ্ তা'আলার কুদরতের প্রশস্ততা সম্বন্ধে অজ্ঞতার কারণে সৃষ্টি হয়ে থাকে।
এ ভূমিকার পর মাসীহ্ (আ)-এর অবতরণ সম্পর্কিত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীসমূহ পাঠ করা যেতে পারে।
৮৯. হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সেই পবিত্র সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ! অচিরেই তোমাদের মধ্যে অর্থাৎ মুসলমানদের মধ্যে ঈসা ইবনে মারয়াম (আ) ন্যায় বিচারকরূপে অবতরণ করবেন। এরপর ক্রুশ ধ্বংস করবেন, শুকর হত্যা করাবেন, এবং জিযয়ার পরিসম্পপ্তি ঘটাবেন। মালের আধিক্য হবে, এমনকি কেউ তা গ্রহণ করবে না। তখন একটি সিজদা দুনিয়া ও তার মধ্যবর্তী সবকিছু হতে উত্তম হবে। এরপর আবূ হুরাইরা (রা) বলেন, (যদি কুরআন থেকে এর প্রমাণ চাও) তবে পাঠ কর সূরা নিসার এ আয়াত وَاِنۡ مِّنۡ اَہۡلِ الۡکِتٰبِ اِلَّا لَیُؤۡمِنَنَّ بِہٖ قَبۡلَ مَوۡتِہٖ ۚ الآية কিতাবীদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে নিজ মৃত্যুর আগে ঈসার প্রতি ঈমান আনবে না। আর কিয়ামতের দিন সে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হবে। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَيُوشِكَنَّ أَنْ يَنْزِلَ فِيكُمُ ابْنُ مَرْيَمَ حَكَمًا عَدْلاً، فَيَكْسِرَ الصَّلِيبَ، وَيَقْتُلَ الْخِنْزِيرَ، وَيَضَعَ الْجِزْيَةَ، وَيَفِيضَ الْمَالُ حَتَّى لاَ يَقْبَلَهُ أَحَدٌ، حَتَّى تَكُونَ السَّجْدَةُ الْوَاحِدَةُ خَيْرًا مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا. ثُمَّ يَقُولُ أَبُو هُرَيْرَةَ وَاقْرَءُوا إِنْ شِئْتُمْ: {وَإِنْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلاَّ لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا}. (رواه البخارى ومسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ৯০
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণ
৯০. হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমাদের কি অবস্থা হবে যখন তোমাদের মধ্যে ঈসা ইবনে মারয়াম অবতরণ করবেন। এবং তোমাদের মধ্যে তোমাদের ইমাম হবেন। (সহীহ্ বুখারী, সহীহ মুসলিম)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنِ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: كَيْفَ أَنْتُمْ إِذَا نَزَلَ ابْنُ مَرْيَمَ فِيكُمْ وَإِمَامُكُمْ مِنْكُمْ. (رواه البخارى ومسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ৯১
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণ
৯১. হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার উম্মতের মধ্যে সর্বদা এমন এক দল থাকবে যারা সত্যের জন্য লড়তে থাকবে, এবং বিজয়মণ্ডিত হবে। এ কথার ধারাবাহিকতায় সামনে তিনি বলেন, এরপর অবতরণ করবেন ঈসা ইবনে মারয়াম। মুসলমানদের সে সময়ের ইমাম ও শাসক তাঁকে বলবে, আপনি নামায পড়ান। ঈসা ইবনে মারয়াম বলবেন, না। (অর্থাৎ আমি ইমাম হয়ে নামায পড়াব না) তোমাদের শাসক ও ইমাম তোমাদেরই মধ্যে। আল্লাহ্ তা'আলার নিকট হতে এ সম্মান এই উম্মতকে প্রদান করা হয়েছে। (সহীহ মুসলিম)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنِ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ- قَالَ- فَيَنْزِلُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَيَقُولُ أَمِيرُهُمْ تَعَالَ صَلِّ لَنَا. فَيَقُولُ لاَ. إِنَّ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ أُمَرَاءُ. تَكْرِمَةَ اللَّهِ هَذِهِ الأُمَّةَ. (رواه مسلم)
তাহকীক:
হাদীস নং: ৯২
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণ
৯২. হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (হযরত ঈসা ইনবে মারয়াম (আ)-এর উল্লেখ করে এবং তাঁর সাথে নিজের বিশেষ সম্পর্কের কথা প্রসঙ্গে) বলেন, আমার ও তাঁর মধ্যখানে কোন নবী নেই। (তাঁর পর আল্লাহ্ তা'আলা আমাকেই নবী ও রাসূল করে পাঠিয়েছেন)। আর নিঃসন্দেহে তিনি (আমার নবুওতী যুগে কিয়ামতের পূর্বে) অবতরণকারী। তোমরা যখন তাঁকে দেখবে তাঁকে চিনতে পারবে, তিনি মাঝারী আকৃতির হবেন। তাঁর রং হবে লাল সাদা। তিনি হলুদ রংগের দু'কাপড়ের মধ্যে হবেন। মনে হবে, তাঁর মাথার চুল থেকে পানির ফোঁটা ঝরছে। যদিও মাথা ভেজা হবে না। তিনি অবতরণের পর ইসলামের শত্রুদের সাথে জিহাদ করবেন। তিনি ক্রুশ টুকরা টুকরা করবেন। শুকর ধ্বংস করবেন এবং জিয্য়া রহিত করবেন। তাঁর সময় আল্লাহ্ তা'আলা ইসলাম ছাড়া সব মিল্লাত ও মাযহাবকে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। হযরত মাসীহ দাজ্জালকে ধ্বংস করবেন, তাকে নিশ্চিহ্ন করবেন। তিনি এ যমিন ও জগতে চল্লিশ বছর অবস্থান করবেন। এরপর এখানে ইন্তিকাল করবেন এবং মুসলমানগণ তাঁর জানাযার নামায আদায় করবেন। (সুনানে আবু দাউদ)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَيْسَ بَيْنِي وَبَيْنَهُ نَبِيٌّ- يَعْنِي عِيسَى عليه السلام - وَإِنَّهُ نَازِلٌ فَإِذَا رَأَيْتُمُوهُ فَاعْرِفُوهُ رَجُلٌ مَرْبُوعٌ إِلَى الْحُمْرَةِ وَالْبَيَاضِ بَيْنَ مُمَصَّرَتَيْنِ كَأَنَّ رَأْسَهُ يَقْطُرُ وَإِنْ لَمْ يُصِبْهُ بَلَلٌ فَيُقَاتِلُ النَّاسَ عَلَى الإِسْلاَمِ فَيَدُقُّ الصَّلِيبَ وَيَقْتُلُ الْخِنْزِيرَ وَيَضَعُ الْجِزْيَةَ وَيُهْلِكُ اللَّهُ فِي زَمَانِهِ الْمِلَلَ كُلَّهَا إِلاَّ الإِسْلاَمَ وَيُهْلِكُ الْمَسِيحَ الدَّجَّالَ فَيَمْكُثُ فِي الأَرْضِ أَرْبَعِينَ سَنَةً ثُمَّ يُتَوَفَّى فَيُصَلِّي عَلَيْهِ الْمُسْلِمُونَ. (رواه ابوداؤد)
তাহকীক:
হাদীস নং: ৯৩
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণ
৯৩. হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে 'আমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ঈসা ইবনে মারয়াম (আ) যমীনে অবতরণ করবেন। এখানে এসে তিনি বিয়ে করবেন। তাঁর সন্তানাদিও হবে এবং তিনি পঁয়তাল্লিশ বছর বসবাস করবেন। এর পর তাঁর ইন্তিকাল হবে। ইন্তিকালের পর তাঁকে আমার সাথে (সেই স্থানে যেখানে আমাকে দাফন করা হবে) দাফন করা হবে। এরপর যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে তখন আমি ও হযরত ঈসা ইবনে মারয়াম, আবু বকর ও উমরের মধ্যবর্তী একই কবর থেকে উঠব। (ইবনে জাওযী কিতাবুল ওফা)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَنْزِلُ عِيْسَى بْنِ مَرْيَمَ اِلَى الْاَرْضِ فَيَتَزَوَّجُ وَيُوْلَدُ لَهُ وَيَمْكُثُ خَمْسًا وَاَرْبَعِيْنَ سَنَةً ثُمَّ يَمُوْتُ فَيَدْفَنُ مَعِىَ فِىْ قَبْرِىْ فَأَقُوْمُ أَنَا وَعِيْسَى بْنِ مَرْيَمَ فِىْ قَبْرٍ وَاحِدٍ بَيْنَ أَبِىْ بَكْرٍ وَعُمَرَ. (رواه ابن الجوزى فى كتاب الوفا)
তাহকীক: