স্ত্রী ও মার হকের ব্যাপারে সমন্বয়
প্রশ্নঃ ১৩৭১২১. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, মায়ের দাম বেশি না বইয়ের দাম বেশি
৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
ওয়েস্ট বেঙ্গল ৭২২১৬৪
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
এটি একটি জটিল ও সূক্ষ্ম বিষয় যা ভারসাম্যপূর্ণ বোঝাপড়ার প্রয়োজন। এক, দুই কথায় এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছা সম্ভব নয়। সুতরাং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
ইসলামী শরীয়তে উভয় অধিকারই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং প্রতিটির নিজস্ব ক্ষেত্র ও অগ্রাধিকার রয়েছে:
মার ক্ষেত্রে সম্মান ও সদাচরণ সর্বদা ওয়াজিব, কোনো পরিস্থিতিতেই এর বিপরীত করা যাবে না :
আল্লাহ তাআলা বলেন,
আয়াতঃ وَوَصَّیۡنَا الۡاِنۡسَانَ بِوَالِدَیۡہِ ۚ حَمَلَتۡہُ اُمُّہٗ وَہۡنًا عَلٰی وَہۡنٍ وَّفِصٰلُہٗ فِیۡ عَامَیۡنِ اَنِ اشۡکُرۡ لِیۡ وَلِوَالِدَیۡکَ ؕ اِلَیَّ الۡمَصِیۡرُ
অর্থঃ আমি মানুষকে তার পিতা-মাতা সম্পর্কে নির্দেশ দিয়েছি (কেননা) তার মা কষ্টের পর কষ্ট সয়ে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দু’ বছরে তুমি শোকর আদায় কর আমার এবং তোমার পিতা-মাতার। আমারই কাছে (তোমাদেরকে) ফিরে আসতে হবে।সূরাঃ লুকমান - আয়াত নংঃ 14
রাসূল সা.-এক হাদিসে বলেন,
حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدِ بْنِ جَمِيلِ بْنِ طَرِيفٍ الثَّقَفِيُّ، وَزُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، قَالاَ حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ عُمَارَةَ بْنِ الْقَعْقَاعِ، عَنْ أَبِي زُرْعَةَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ مَنْ أَحَقُّ النَّاسِ بِحُسْنِ صَحَابَتِي قَالَ " أُمُّكَ " . قَالَ ثُمَّ مَنْ قَالَ " ثُمَّ أُمُّكَ " . قَالَ ثُمَّ مَنْ قَالَ " ثُمَّ أُمُّكَ " . قَالَ ثُمَّ مَنْ قَالَ " ثُمَّ أَبُوكَ " . وَفِي حَدِيثِ قُتَيْبَةَ مَنْ أَحَقُّ بِحُسْنِ صَحَابَتِي وَلَمْ يَذْكُرِ النَّاسَ .
৬২৬৯। কুতায়বা ইবনে সাঈদ ইবনে জামীল ইবনে তারীফ সাকাফী ও যুহাইর ইবনে হারব (রাহঃ) ......... আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কছে এলো এবং সে প্রশ্ন করল,ইয়া রাসুলাল্লাহ! মানুষের মধ্যে আমার সদ্ব্যবহারের সর্বাধিক ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, এরপরও তোমার মা। সে বললঃ এরপর কে? তিনি বললেন, এরপরও তোমার মা। সে বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, তোমার পিতা। আর কুতায়বা বর্ণিত হাদীসে “আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার সর্বাপেক্ষা যোগ্য কে” এর উল্লেখ আছে। তিনি তাঁর বর্ণনায় (النَّاسَ) মানুষ শব্দটি উল্লেখ করেননি। সহীহ মুসলিম, হাদীস নংঃ ৬২৬৯
ঠিক একইভাবে স্ত্রীর সাথেও সদাচরণ বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। কুরআরেন এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
আয়াতঃ یٰۤ ۚ وَعَاشِرُوۡہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۚ فَاِنۡ کَرِہۡتُمُوۡہُنَّ فَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَہُوۡا شَیۡئًا وَّیَجۡعَلَ اللّٰہُ فِیۡہِ خَیۡرًا کَثِیۡرًا
অর্থঃআর তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবন যাপন কর। তোমরা যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে যে, তোমরা কোনও জিনিসকে অপছন্দ করছ অথচ আল্লাহ তাতে প্রভূত কল্যাণ নিহিত রেখেছেন। সূরাঃ আন নিসা - আয়াত নংঃ 19
রাসূল সা. হাদিসে বলেন,
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يَحْيَى قَالَ: حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يُوسُفَ قَالَ: حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي، وَإِذَا مَاتَ صَاحِبُكُمْ فَدَعُوهُ» هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ [من حديث الثوري ما أقل من رواه عن الثوري] وَرُوِيَ هَذَا عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُرْسَلًا
৩৮৯৫। মুহাম্মাদ ইব্ন ইয়াহ্ইয়া (রাহঃ)... আয়িশা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে উত্তম হল সে, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে উত্তম । তোমাদের এ সঙ্গী (অর্থাৎ আমি) যখন মারা যাবে, তার জন্য তোমরা দু'আ করবে। জামে' তিরমিযী, হাদীস নংঃ ৩৮৯৫
তবে হ্যাঁ, ভরণপোষণ ও ব্যয় বহন করার ক্ষেত্রে স্ত্রী ও সন্তানাদি প্রাধান্য পাবে। যদি এমন পরিস্থিতি দেখা দেয় যে, বাবা-মা নিজেদের খরচ বহন করতে পারছেন না। বরং আপনাকে তাদের ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। তাহলে এক্ষেত্রে আপনি প্রথমে আপনার স্ত্রী ও সন্তানাদির খরচের ব্যবস্থা করবেন, তারপর বাবা-মার খরচের ব্যবস্থা করবেন।
কেননা স্ত্রীর ভরণপোষণ দেওয়া স্বামীর ওপর ওয়াজিব :
«بدائع الصنائع في ترتيب الشرائع» (4/ 15):
«أَمَّا وُجُوبُهَا فَقَدْ دَلَّ عَلَيْهِ الْكِتَابُ وَالسُّنَّةُ وَالْإِجْمَاعُ وَالْمَعْقُولُ أَمَّا الْكِتَابُ الْعَزِيزُ فَقَوْلُهُ عز وجل {أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنْتُمْ مِنْ وُجْدِكُمْ} [الطلاق: 6]»
অর্থাৎ, "ইমাম কাসানী 'বাদায়েউস সানায়ে' গ্রন্থে বলেছেন: স্ত্রীর নফকা কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমা দ্বারা ওয়াজিব।"
«الفتاوى العالمكيرية = الفتاوى الهندية» (1/ 544):
«تَجِبُ عَلَى الرَّجُلِ نَفَقَةُ امْرَأَتِهِ الْمُسْلِمَةِ وَالذِّمِّيَّةِ وَالْفَقِيرَةِ وَالْغَنِيَّةِ دَخَلَ بِهَا أَوْ لَمْ يَدْخُلْ»
তবে সর্বাবস্থায় একজন মুসলিমের জন্য কর্তব্য হলো, সে তার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের হকের ব্যাপারে সচেতন থাকবে এবং বিজ্ঞতা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে উভয় অধিকারের মধ্যে সমন্বয় করবে, মাকে সম্মান করবে এবং স্ত্রীর সাথে উত্তম ব্যবহার করবে, এবং শরীয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করবে।
5199 - حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ مُقَاتِلٍ، أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ، أَخْبَرَنَا الأَوْزَاعِيُّ، قَالَ: حَدَّثَنِي يَحْيَى بْنُ أَبِي كَثِيرٍ، قَالَ: حَدَّثَنِي أَبُو سَلَمَةَ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، قَالَ: حَدَّثَنِي عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَمْرِو بْنِ العَاصِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا عَبْدَ اللَّهِ، أَلَمْ أُخْبَرْ أَنَّكَ تَصُومُ النَّهَارَ وَتَقُومُ اللَّيْلَ؟» قُلْتُ: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: «فَلاَ تَفْعَلْ، صُمْ وَأَفْطِرْ، وَقُمْ وَنَمْ، فَإِنَّ لِجَسَدِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَإِنَّ لِعَيْنِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَإِنَّ لِزَوْجِكَ عَلَيْكَ حَقًّا»
৪৮২৪। মুহাম্মাদ ইবনে মুকাতিল (রাহঃ) ......... ‘আব্দুল্লাহ ইবনে ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, হে ‘আব্দুল্লাহ! আমাকে কি এ খবর প্রদান করা হয়নি যে, তুমি রাতভর ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাক এবং দিনভর রোযা পালন কর? আমি বললাম, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন, তুমি এরূপ করো না, বরং রোযাও পালন কর, ইফতারও কর, রাত জেগে ইবাদত কর এবং নিদ্রাও যাও। তোমার শরীরেরও তোমার ওপর হক আছে; তোমার চোখেরও তোমার উপর হক আছে এবং তোমার স্ত্রীরও তোমার উপর হক আছে। সহীহ বুখারী, হাদীস নংঃ ৪৮২৪
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে উভয়ের হক যথাযথ আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী মুহাম্মাদ রাশেদুল ইসলাম
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা ৷
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা ৷
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১